অগ্রজ এবং অনুজ

মীনাক্ষী লায়েক
প্রবন্ধ
Bengali
অগ্রজ এবং অনুজ

কাজী নজরুল ইসলাম কল্যাণীয়েষু,
আয় চলে আয় রে, ধূমকেতু /আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু,
দুর্দ্দিনের এই দুর্গশিরে/উড়িয়ে দে তোর বিজয়কেতন।
অলক্ষণের তিলকরেখা/রাতের ভালে হোক না লেখা,
জাগিয়ে দে রে চমক মেরে/আছে যারা অর্ধচেতন।
২৪শে শ্রাবণ, ১৩২৯

বলাই বাহুল্য লেখাটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। নজরুল যখন ‘ধুমকেতু’ কাগজ প্রকাশ করছেন, প্রথম সংখ্যায় প্রথম পৃষ্ঠায় পত্রিকার নামের নীচেই রবি ঠাকুরের এই আশীর্বাণীটি মুদ্রিত হয়।
কাজী নজরুল ছিলেন রবীন্দ্রনাথের একান্ত স্নেহভাজন, অশেষ প্রীতির পাত্র। শুধু কি প্রীতি, নজরুলের প্রতি তাঁর যে শ্রদ্ধা ও অনুরাগ ছিল তা বোঝা যায় যখন তিনি ‘বসন্ত’ নাটিকা উৎসর্গ করলেন নজরুলকে এবং সেখানে রবি ঠাকুর তাঁকে ‘কবি’ বলে সম্মোধন করেন। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন বাংলা সাহিত্যে নজরুলের ভবিষ্যৎ আসন তাঁরই পার্শ্বে। কাজী নজরুল  ইসলাম, দেওয়া হয়নি স্কুলের শেষ পরীক্ষা অথচ দাপটের সঙ্গে শাসন করছেন বাংলা সাহিত্যের সাম্রাজ্য।  জন্ম ১৮৯৯ সালের ২৪ শে মে, আসানসোলের নিকট চুরুলিয়া গ্রামে।

পিতা কাজী ফকির আহমেদ, মাতা জাহেদা খাতুন, পর পর চারটি শিশুসন্তানের  মৃত্যুর পরে এই ছেলের নাম দিলেন দুখু মিয়াঁ। দুখু মিয়াঁর সারা জীবন সংগ্রামেই কাটে। সংগ্রাম দারিদ্রের বিরুদ্ধে, সংগ্রাম অসত্যের বিরুদ্ধে, সংগ্রাম সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে,  সংগ্রাম বিদেশী শাসনের বিরুদ্ধে। শেষমেশ সংগ্রাম মৃত্যুর সাথে। ধর্মীয় সংকীর্ণতা  দুখু মিয়াঁর জীবনে বালক অবস্থাতেও কোন রেখাপাত করেনি। তার কারণ একটিই – আসানসোল শিল্পাঞ্চলে তাঁর জন্ম ও বড় হওয়া। বাবা ধর্মনিষ্ঠ মানুষ ছিলেন কিন্তু সংস্কারান্ধ ছিলেন না। নজরুল বাল্যাবস্থায় যেমন কোরাণ পাঠ করেছিলেন, তেমনি রামায়ণ, মহাভারত পাঠ ও শ্রবণে তাঁর কোন বাধা ছিলো না। আসলে শিল্পাঞ্চলগুলোতে পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশ এমনই থাকে যেখানে ধর্মীয় সংকীর্ণতা মাথা তোলে না। পিতা ফকির আহমেদ উর্দু, ফার্সি ও বাংলা ভাষা জানতেন। নজরুলও জন্মসূত্রে এই তিনটি ভাষা অর্জন করেছিলেন। পরে ইংরেজীও শিখেছিলেন।  রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ, ভাগবত, কোরাণ ছোটবেলা থেকে পড়তে ভালোবাসতেন এবং এগুলি তাঁর উপর কি পরিমান প্রভাব বিস্তার করেছিলো তা তাঁর পরবর্তী সাহিত্যসৃষ্টিতে দেখতে পাই। উদাহরণ:

আমি বজ্র, আমি ঈশান বিষান ওঁকার
আমি ইস্রাফিলের শিঙ্গার মহাহুঙ্কার।

অসাম্প্রদায়িক মনটিকে আরও শক্ত করেছিলো তাঁর শিল্পী হিসেবে লেটো দলে যোগদান। তিনি লেটো গান- পালা রচনা করতেন, আর রচয়িতাকে মুসলিম ও হিন্দু ধর্মীয় আখ্যানকাব্যগুলি জানতেই হতো। বিদ্যাপতি, চন্ডীদাস, জয়দেবের রচনা ছাত্রাবস্থাতেই পড়া শেষ এবং তখন থেকেই শুরু গভীর রবীন্দ্রানুরাগ। রবীন্দ্রনাথের যেসব কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হচ্ছে তিনি পড়ে ফেলছেন। অতঃপর বাঙালী পল্টনে যোগ দেওয়া, করাচীতে অবস্থান,  তখনই নজরুলের প্রথম প্রকাশিত কবিতা ‘মুক্তি’। প্রথম কবিতাতেই রবীন্দ্রনাথের স্পষ্ট ছায়া আমরা দেখতে পাই। তাঁর রবীন্দ্র আবেগ দেখতে পাওয়া যায় তাঁর ‘স্বামীহারা’ গল্পেও। সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত যখন নজরুলকে বলছেন যে গুরুদেব তাঁর লেখা পড়ে বিস্মিত হয়েছেন,গুরুদেবের মতে নজরুল ভাবের সংস্কৃতি -সমন্বয়ের সাধনায় এক নতুন অবস্থান রাখছেন (তথ্যসূত্র -অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য)   — তা শুনে নজরুল বাক্যহারা কারণ,  নজরুলের কাছে রবীন্দ্রনাথ দেবতুল্য এক স্রষ্টাকবি। গীতাঞ্জলির সমস্ত গান নজরুলের কণ্ঠস্থ। সদ্যপ্রকাশিত কোন কবিতা রবীন্দ্রনাথের কেমন লাগলো তা জানতে তিনি অস্থির হতেন। রবীন্দ্রনাথের তারিফ নজরুলের কাছে ছিলো খুব মূল্যবান ও প্রয়োজনীয়। একবার হয়েছে কি, নজরুল শান্তিনিকেতনে গিয়েছেন কবিগুরুর আশীর্বাদ নিতে। রবীন্দ্রনাথ চেয়ারে বসে রয়েছেন নজরুল তাঁর পায়ের কাছে। হঠাৎ কবিগুরুর পা-টি ধরে নিজের কোলের কাছে টেনে নিতেই রবীন্দ্রনাথ জোর করে তা সরিয়ে নিলে নজরুল বলেন — মাঝে  মাঝে মনে হয় একটা লাঠির বাড়ি মেরে আপনাকে শেষ করে দিই। কবি বলেন –কেন?

— তাহলে আপনার পাশাপাশি চিরকাল আমার নামটাও মুদ্রাক্ষরে ছাপা হবে আর, আপনার ছবির পাশে আমার ছবিটাও ছাপা হবে। এমনই ছিলো দুজনের মিষ্টিমধুর সম্পর্ক।  রবীন্দ্রনাথ ‘বসন্ত’ গীতিনাট্যটি নজরুলকে উৎসর্গ করলেন। লিখলেন —

উৎসর্গ  – শ্রীমান কবি নজরুল ইসলাম স্নেহাষ্পদেষু, ১০ই ফাল্গুন, ১৩২৯। নজরুল তখন জেলে, রাজদ্রোহিতার অপরাধে বন্দী। রবীন্দ্রনাথ সেখানেই দু’কপি ‘বসন্ত’ পাঠালেন নজরুলের কাছে। নজরুল তা পেয়ে উচ্ছ্বসিত, অভিভূত,  কৃতার্থ।  বহরমপুর জেল থেকে নজরুল রবি ঠাকুরকে লিখলেন — “আপনার জীবদ্দশায় কবিতা বা গান লিখে নাম করবার মতো ভাগ্য আমি কেন কারো সাধ্যেই কুলোবে না।” নজরুলের কবিতা সংকলন ‘সঞ্চিতা’ যখন প্রকাশিত হয় নজরুল উৎসর্গ করলেন রবীন্দ্রনাথকে।

— বিশ্বকবিসম্রাট
শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শ্রীশ্রী চরণারবিন্দেষু…

নজরুল -রবীন্দ্রনাথের বয়সের ব্যবধান ছিলো আটত্রিশ। উভয়ের কথাবার্তায় ও আচরণে বয়সের এই ব্যবধান ছিলো সুস্পষ্ট। তবু ক্রমে ‘সঞ্চিতা’র নজরুল, ‘সঞ্চয়িতা’র রবীন্দ্রনাথ  — দুজনার পারস্পরিক শ্রদ্ধা, অকৃত্রিমতা বয়সের ব্যবধান অনেকটা কমিয়ে এনেছিলো। দেখে নেওয়া যাক দুই কালজয়ী সৃষ্টিকর্তার জীবনপঞ্জির কয়েকটি মিল ও অমিল —

একজন বিশ্বকবি, একজন বিদ্রোহীকবি। একজনের আয়ুষ্কাল আশি, অন্যজনের সাতাত্তর।  উভয়েরই তিরোধান আগস্ট মাসে। একজন সঞ্চয়িতার কবি, অন্যজন সঞ্চিতার।

মীনাক্ষী লায়েক। লেখক ও সম্পাদক। জন্ম নিবাস ভারতের পশ্চিমবঙ্গরাজ্যের পুরুলিয়ায়। তিনি 'বর্ডার লাইন দি' নামক সংবাদপত্র এবং 'মহুয়া' সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদনা কাজে যুক্ত।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ