অজানা গন্তব্য

অনুশ্রী তরফদার
গল্প
Bengali
অজানা গন্তব্য

সকাল থেকে চালের ওপরে কাক টা ডেকেই চলেছে। এইভাবে কাক ডাকলে মনের মধ্যে কেমন খটকা লাগে। আবার কোনো খারাপ কিছু হবেনা তো!এমনিতেই সময় টা ভালো যাচ্ছেনা। সাথ পাঁচ ভাবতে ভাবতে মিনতী সকালের বাসী কাজ সারছিলো।মনটা বড় অস্থির হয়ে আছে নানা চিন্তায়। আজকের দিনটা তো কোনোরকমে কেটে যাবে। আগামীকাল কিভাবে সব যোগার হবে মিনতী জানেনা। সমীর আজ দেড় মাস হোলো বাড়িতে বসা। তবে শুধু তো সমীর নয় হাজার হাজার সমীরের একই অবস্থা। লকডাউনের জন্য দোকান খুলতে পারছেনা। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দোকান হলেও নাহয় একবেলা খুলতে পারত। কিংবা সরকারি নিয়মের আওতায় মিষ্টির দোকান হলেও চলতো। সমীরের তো ষ্টেশন বাজারে ঘড়ি মেরামত, ঘড়ির বেল্ট, ব্যাটারী ও কমদামী কোম্পানির ঘড়ি কেনাবেচা নিয়ে কারবার। কমার্স নিয়ে বিকম পাশ করলেও মন্দার বাজারে কোন চাকরি জোটাতে পারেনি। মোটামুটি ভালো পরিবারের ছেলে। বাইরে থেকে এসে থাকলে লজ্জা শরমের বালাই ত্যাগ করে যে কোন কাজ করতে পারতো। কিন্তু জন্ম কর্ম বেড়ে ওঠা এই শহরেই। প্রায় সাত দশকের বাস এখানে। সমীরের বাবা সরকারি স্কুলের কেরাণী ছিলেন। বাবা গত হয়েছেন পনেরো বছর। মা পেনশন পেতেন। কিন্তু মায়ের মারা যাওয়ার পর থেকে তাও বন্ধ। জমানো যেটুকু ছিল তা মায়ের মারণব্যাধী তে শেষ।এখন সমীরের ভরসা তার দোকান। যাই হোক টেনেটুনে ডাল ভাত ও দুই সন্তানের পড়াশোনা চলে যাচ্ছিল। ব্যাংকে অবশ্য সঞ্চয় নেই।

মিনতী সমীরের স্ত্রী।।সে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ। কাছেই ময়নাগুড়ির মেয়ে। হিসেবী ভীষন। বাড়িতে কটা নার্সারীর বাচ্চা পড়িয়ে বাচ্চাদের আঁকা শেখানো ও টুকটাক খরচ করে সংসারে সাহায্য করে। বৃহস্পতিবার করে দশ, কুড়ি টাকা লক্ষীর ঘটে জমায়। এমনি করেই সুখ স্বাচ্ছন্দ না থাকলেও শান্তি ছিল সংসারে। পরিবার গত সামাজিক শ্রেণি অনুযায়ী আপার পোভার্টি লেভেলের নাগরিক। তাই সুযোগের ভান্ডার কাঁচকলা। এভাবেই কেটে যাচ্ছিল সংসার সংগ্রাম। বাধ সাধলো সেই উটকো এক বিষাক্ত অনু। পোশাকি নাম কোভিড19 যা করোনা ভাইরাস হিসেবে সমাদৃত। কানাঘুসো শুনছিলো কিছুদিন ধরে কি একটা ভাইরাস নাকি চীন, ইটালি, ইংল্যাণ্ড, আমেরিকা, স্পেন, ফ্রান্স থেকে শুরু করে পৃথিবীর তাবড় তাবড় দেশে তান্ডব করছে। যে জাতি, ধর্ম,ধনী,দরিদ্র ও দেশের মধ্যে পার্থক্য করেনা। সম্পূর্ণ সাম্যবাদী ভাইরাস। সমীর ভাবতে পারেনি যে এদেশে ও উনি প্রবাসী দের বুকে চেপে বিমানযাত্রা করে চলে আসবেন। প্রথম প্রথম যখন শুনেছিলো ভেবেছিল না এখানে কোন ভয় নেই।

কিন্তু প্রকৃতির রোষানলে কে কবে বিজয়ী হতে পেরেছে? এবার ও তাই। আচমকা পূর্ব নির্ধারিত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ ছাড়াই সরকার বাহাদুর ঘোষণা করে দিলেন আজ রাত থেকে লকডাউন। লকডাউন শব্দ টা ও কেতাবি থেকে কেমন করে হঠাৎ মাটিতে আছড়ে পড়লো। সব কিছু সামলানোর আগেই কেমন যেন বেসামাল হয়ে গেল। সামান্য কিছু যা ছিল তা দিয়ে কোনরকমে চাল,ডাল, নিত্য প্রয়োজনের সামান্য রসদ নিয়ে এলো। একুশ দিনের জন্য এই লকডাউন স্থির হোলো।ভেবেছিল যে এমন সংকটজনক পরিস্থিতি তে দাঁতে দাঁত চেপে কাটিয়ে দেবে কদিন। সপ্তাহে একদিন নাহয় মাছ কিনবে, মাংস টাংস দরকার নেই। ওহ বাচ্চাদের ঠিক বুঝিয়ে নেবে। মিনতী ও দিব্যি হঠাৎ মাছ কেনে বা নতুন নতুন সবজি দিয়ে মজার মজার রান্না করে বাচ্চাদের কে খাইয়ে দেয়। ম্যাগী বা ঐ জাতীয় খাবার কেনা বন্ধ, চকলেট বা চিপস্ মানে বাচ্চাদের বায়না যা থাকে সব বন্ধ। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে মিনতীর টিউশনি ও এখন বন্ধ, তাই তার সামান্য যে আয় সেটাও নেই। তাই অনেক ভেবে চিন্তে চলতে হচ্ছে।

বাচ্চারা ও বেশ সহযোগিতা করছে। তাদের আবার এখন আনন্দ বেশি বাবাকে সারাদিন কাছে পায়। চলতে থাকলো লকডাউন জার্নি। ক্রমশ রসদ ফুরিয়ে আসছে। হাত ও প্রায় খালি। তার মধ্যেই দুই বার লকডাউনের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। এবার আর শান্তি তে থাকতে পারছেনা সমীর মিনতী। যেখানে যা ছিল সব শেষ। এদিকে ওদিকে বিভিন্ন সমাজসেবী সংগঠন, রাজনৈতিক সংগঠন ও কিছু এনজিও রা গরীব খেটে খাওয়া মানুষ কে প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী দান করছে প্রতিদিন। রেশনে ও কম বেশি পাচ্ছে বিপিএল তালিকাভুক্ত মানুষ। যদিও সব বিপিএল ই বিপিএল নয়। এপিএল এর ও মাথার উপরে ক্ষমতা তাদের। কিন্তু তাদের লাইনে দাড়িয়ে ত্রান নিতে কোনো লজ্জা নেই। সমীর এর কোনটাই পারবেনা। তাদের এপিএল এর কার্ড ও পারিবারিক পরিচিতির প্রেক্ষাপটে অবস্থানের জন্য না খেয়ে থাকলেও হাত পাততে পারবেনা।

পাড়ায় যেখানে মাস কাবারির জিনিস নেয় সেটা বাকির খাতাতে। মাস শেষ হয়েছে এখন তো কিছু জিনিস না আনলেই নয়। সকাল হতে আনমনা সয়ে জানালা দিয়ে তাকিয়ে ছিল বাইরে। হঠাৎ সামনের বাড়ির নারকেল গাছে দুটো কাঠবিড়ালীর হুটোপুটি চোখে পড়তেই একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। কি যেন খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে ওরা। সদ্য ফুল থেকে বের হওয়া নারকেল এর কড়া হবে হয় তো। কি নিশ্চিন্ত মুক্ত জীবন ওদের। কারো কাছে কোনো চাওয়া পাওয়া নেই, জবাবদিহি করার ও নেই। সমীর মনে মনে ভাবে স্বাধীন ভাবে ঘুরছে। আর আমরা নিরূপায় দুর্দশায় বন্দি জীবন কাটাচ্ছি।

এইসব ভাবতে ভাবতে গায়ে জামাটা গলিয়ে একটা ব্যাগ হাতে ফর্দ নিয়ে পাড়ার মুদি দোকানের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয়। মুদি দোকান যে চালায় সে সমবয়সী পাড়ার ছেলে দিলীপ। একসাথে খেলাধুলা পড়াশোনা করে বড়ো হয়েছে। বন্ধু স্থানীয়। সেখানে গিয়ে ফর্দ বের করে জিনিস দিতে বললে, সম্পর্কের রেয়াত না করে দোকানী দিলীপ বলে এখন থেকে বাকির খাতাতে সে জিনিস দেবেনা। সমীরের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। কি করবে এখন তারা? দু বেলা বাচ্চাদের মুখে দুটা ডাল ভাত ও দিতে পারবেনা সে। এই লকডাউন তো পেটের খিদে কে ডাউন করতে পারবেনা। আকাশ পাতাল ভাবতে ভাবতে সমীর বাড়ি ফিরে আসে।

এদিকে বাড়িতে আসতেই মিনতী বলে গ্যাসের সিলিন্ডার এসেছে। টাকা কি আছে? সমীর ঘরের ভেতরে গিয়ে ডায়েরির পাতার নীচ থেকে দুশো টাকা পায় ও এমারজেন্সি হিসেবে কটা টাকা রেখেছিল আলমারি তে কাপড়ের ভাঁজের ভেতরে। সেটাও বের করে আনে। সব মিলিয়ে সাড়ে চারশো মতো হয়। মিনতীর হাতে দিয়ে বলে এইটুকুই আছে। মিনতী সমীরের মুখের দিকে চেয়ে অসহায় মানুষটিকে দেখে ভেতরে ভেতরে ভেঙে যায়।মুখে প্রকাশ করেনা। শুধু বলে তুমি চিন্তা কোরোনা। আমি বাকিটা ঠিক দিয়ে দিচ্ছি। তুমি ঘরে গিয়ে ছেলেদের কে একটু অঙ্ক করাও। সমীর চলে যায় ঘরে। মিনতী রান্না ঘরে গিয়ে চালের বালতির ভেতর থেকে একটা ছোট্ট কৌটা বের করে। খান কতক দশ, বিশ ও পঞ্চাশ টাকার নোট ছিল ওতে। কটা গুনে সমীরের টাকার সাথে মিলিয়ে সিলিন্ডারের দাম মেটায়।

রান্না ঘরে ফিরে এসে বাকি টাকা গুনতে বসে।সব মিলিয়ে তিনশো টাকা হয়। সেটা নিয়ে গিয়ে সমীরের হাতে দিয়ে বলে কদিন হয়ে যাবে। সমীর মিনতী কে জানে। ভীষন রকমের হিসেবী মেয়ে। তার পক্ষেই শুধু সম্ভব এমন পরিস্থিতিতে অবিচল থাকা। এইভাবে কটা দিন কেটে গেল ডাল ভাত চিড়ে মুড়ি দিয়ে। এবার তাও শেষ। মিনতী বিলম্ব না করে এবার তার প্রতিদিনের রান্নার চাল থেকে দুই মুঠ করে রাখা মুষ্টির ভান্ডার বের করে।কেজি তিনেক চাল জমেছে। সেটা দিয়ে পাঁচদিন চলে যাবে, তারপর দেখা যাবে।

চালের যোগাড় না হয় হলো কিন্তু আনাজপাতি তেল বাচ্চাদের জন্য দুধ একটু বিস্কুট কি করে আনবে? এবার সে সব ধর্মীয় আচার কে মাথায় রেখে ঠাকুর ঘরে ঢুকে লক্ষীর ঘট টি টেনে আনে। কপালে দুই হাত দিয়ে বলে মা আগে আমার সন্তান, পরিবারের বেঁচে থাকা তারপর ধর্ম। আমায় ক্ষমা কোরো মা। আমি তোমার ঘটে হাত দিলাম। এই বলে সে এক বাড়ি মেরে ঘট টা ভেঙে ফেলে। ঘটের সব টাকা গুলো ধীরে ধীরে গুনতে থাকে। গোনা শেষ হলে টাকা কটা সমীর কে নিয়ে গিয়ে দেয়। বলে মা লক্ষী থাকতে চিন্তা কোরোনা। ঠিক কঠিন সময় পার করব আমরা। সমীর মিনতীর মুখের দিকে চেয়ে মনে মনে বলে কে যে মা লক্ষী? এই চিন্ময়ী না ঐ মৃন্ময়ী? সাতদিন কেটে গেছে তারপরে। লকডাউন আর উঠে যায়নি। বরঞ্চ এই মাসের সতেরো তারিখ পর্যন্ত তা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তার সাথে সমীরের শহর ও জেলা রেডজোনে পৌঁছে গেছে।

মিনতী সেই খবর টা ও শোনে।সে ভাবে আজকের দিন তো কেটে যাবে। কিন্তু আগমী দিন গুলো কি করে চলবে সে ও সমীর জানেনা। সমীররা একসময়ের মধ্যবিত্ত শ্রেণির অংশ হলেও বর্তমানে নিম্ন মধ্যবিত্ত। কিন্তু কখনো হাত পেতে দাড়াতে পারবেনা ত্রানের লাইনে আবার হাত উপুড় করে দেয়ার সামর্থ্য ও নেই। তাহলে সমীরের মতো হাজার হাজার সমীরের কাল থেকে কি হবে? উত্তর………… অজানা।

অনুশ্রী তরফদার। কবি ও সম্পাদক। জন্ম ভারতের পশ্চিমবঙ্গরাজ্যের শিলিগুড়ি। দ্রোহকাল নামক ছোট কাগজ সম্পাদনা করেন।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..