অতুল মায়ার বৃষ্টি

ইসরাত জাহান
ছোটগল্প
Bengali
অতুল মায়ার বৃষ্টি

 বৃষ্টি হচ্ছে বাইরে। বসে আছি গুলশান ইউনাইটেড হাসপাতাল এর রিসেপশনে। হঠাৎই পেছন থেকে মাথার উপর কেউ হাতের তালু উল্টো করে গাট্টা মারল। ব্যথা পেলাম কিছুটা। ঘাড় ঘুড়িয়ে পেছনে তাকালাম। সাদা কালো চেক শার্ট, জিন্স প্যান্ট পরিহিত যিনি দাঁড়িয়ে আছেন তাকে চেনার কথা নয় কারণ তার মুখে মাস্ক। কিন্তু চিনতে হল তার চোখের দিকে তাকিয়ে। বড় গর্তের ভেতর থেকে সাদা রঙ ভেদ করে দুটো কালো মণি ঠিকরে বেরোচ্ছে যেন। তাকিয়ে থাকা যায় না। ভয়ংকর এই চোখ আমি আগে ও দেখেছি। শুধু চোখ নয় কোন মানুষের চেহারা যে এত ভীতিকর হয় তা এই মানুষটিকে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন হত আমার জন্য। আমি কথা বলার আগেই তিনি বললেন, শুধু অবাক হলেই চলবে বৃষ্টি?? চিনতে ও তো হবে। আমি বলি, চিনেছি তো। কিন্তু অনেক বছর পর আপনাকে দেখছি তো তাই হারিয়ে গিয়েছিলাম কোথাও। তিনি বসলেন পাশের চেয়ারে। উনার নাম অতুল। বলা বাহুল্য আমরা কেউ কিন্তু মাস্ক খুলিনি। জিজ্ঞেস করলাম, এতদিন কোথায় ছিলেন? এত বছর?
অতুল বললেন, হ্যাঁ অনেক বছর। তাও প্রায় এগারো বছর। কিন্তু তুমি কি আমাকে খুঁজেছ? খোঁজনি তো। খুঁজলে জানতে আমি কোথায় ছিলাম এতদিন। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলি। সত্যিই তো অতুল কে আমি খুঁজিনি। খোঁজার চেষ্টা ও করিনি।

তখন আমার কর্মজীবনে প্রবেশের ছয় মাস চলছে। স্নাতক সম্পন্ন করেই আমি কর্মজীবনে প্রবেশ করি। সামনেই এম,এস, এস পরীক্ষা। দিনভর অফিসে কাজ করি, সন্ধ্যায় অফিসের আবাসিক এ ফিরে গোসল খাওয়া সেরে পড়তে বসি। এক সন্ধ্যায় পড়তে বসেছি। আমার মোবাইল ফোনের রিং বাজছে। অচেনা নাম্বার। ০১৭০০০০০০০০। ফোন রিসিভ করি। অপর প্রান্তে নিশ্চুপ নিরবতা। আমি হ্যালো হ্যালো করি অনবরত কিন্তু অপর প্রান্তে কথা নেই। কেটে দিই আমি লাইনটা। পরদিন ঐ সময়ে আবার ঐ নাম্বার থেকে কল এলো। আমি রিসিভ করে হ্যালো বলি কিন্তু কেউ কথা বলে না। অদ্ভুত! আমি কিছুটা বিরক্ত। এভাবেই পরপর সাত দিন গেল। আট দিনের দিন ঐ সময়ের আগেই আমি অন্য নাম্বার থেকে ঐ নাম্বার এ কল দিই। অপর প্রান্ত থেকে ফোন রিসিভ করলেন কেউ । পুরুষ কন্ঠ। আমি নিজের পরিচয় দেয়ার আগেই বলি, কল টা কাটবেন না প্লিজ। আপনি গত সাত দিন রোজ সন্ধ্যায় আমার ফোনে কল দিচ্ছেন কিন্তু কথা বলছেন না , ব্যাপারটা অস্বস্তিকর।
তিনি বললেন, বৃষ্টি আপনি এখন ফোনটা রাখুন, আমি সন্ধ্যার পর আপনাকে কল দেব। আমি অবাক হয়ে বলি, আপনি আমার নাম জানেন? তিনি বললেন, জানি তো!
তারপর আমি কল টা কেটে দিয়ে অপেক্ষা করি তার ফোনের। সন্ধ্যার পর ঐ নাম্বার থেকে কল এলো। রিসিভ করতেই অপর প্রান্ত থেকে বিকেলে শোনা কন্ঠ বললেন, আমি অতুল চৌধুরী। আপনার নাম বৃষ্টি। থাকেন রাজশাহী উপশহরে। সেক্টর নাম্বার তিন, বাড়ির নাম্বার তিয়াত্তর। কি ঠিক বলছি তো? আমি জড়ানো গলায় বলি, ঠিক। কিন্তু আপনি কি করে জানলেন এত সব? আমার মোবাইল নাম্বারই বা জানলেন কি করে? আর আপনি কি আমাকে দেখেছেন? অতুল নামের পুরুষ কন্ঠ বললেন, দেখেছি আপনাকে।
আর আপনার বিস্তারিত পেলাম কি করে?
সেসব পেয়েছি সিঙ্গাপুর থেকে ঢাকা আসার সময় আকাশ পথে বিমানে। বিমানে আপনার বাবা ও ফিরছিলেন। তিনি তার পাশের জন কে আপনার নাম বলে মোবাইল নাম্বারটা বলছিলেন। আপনি কোথায় থাকেন কি করছেন এখন তাও বলছিলেন। তিনি সম্ভবত আপনার বাবার বন্ধু। আপনার নাম ও মোবাইল নাম্বার কেন জানি আমার মগজে গেঁথে গেল। দেশে এসেই আপনাকে ফোন দিলাম। আপনি ধরলেন। আপনার কন্ঠ আমাকে আরাম দিল। তারপর রোজ সন্ধ্যায় আপনাকে কল দিতাম। কিন্তু কথা বলার জন্য নয় আপনার কন্ঠ শোনার জন্য। মাঝখানে আপনার অফিসে গিয়ে একদিন আপনাকে দেখেও এলাম।
আমার মনে পড়ল, গত সপ্তাহেই বাবা ও ফিরেছেন সিঙ্গাপুর থেকে। আমি বললাম, কিন্তু আমার কন্ঠ কেন আপনাকে আরাম দেবে? কেনই বা আমাকে কল দেন প্রতিদিন?
অতুল বললেন,
আমার স্ত্রীর নাম মায়া। সে ক্যান্সার এর রোগী। শেষ ধাপ চলছে। সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতাল থেকে ফিরিয়ে এনেছি। এখন বাড়িতেই আছে। যে কোন সময় চলে যাবে পৃথিবী ছেড়ে। কেমোথেরাপি দিতে হয়েছে অনেক। সেসব যন্ত্রনা মায়া কে এখনও যন্ত্রনা দেয় প্রতিনিয়ত। সারাদিন যন্ত্রনায় চিৎকার করে কাঁদে। সন্ধ্যায় হয়রান হয়ে ঘুমিয়ে পরে। তখন আমার অখণ্ড অবসর। সেই অবসরে আপনাকে খুঁজে পেয়েছি এক টুকরো ছায়ায়।
আমি উনার কথা গুলো মন্ত্র মুগ্ধ শ্রোতার মতো শুনছি। কোন পুরুষের কন্ঠ এত সুন্দর হয় জানা ছিলো না আমার। কথা নয় যেন কবিতা আবৃত্তি করছেন কেউ। তিনি আবার ও নিজে থেকেই বললেন, ভয় পাবেন না। আমি মিথ্যা বলছি না। আপনার অফিস আবাসিক এর উল্টো দিকের পথের শেষ মাথায় যেই দোতলা বাড়িটি, যে বাড়ির সামনে কামিনী ফুল ফোটে আর ঝরে, মায়া কে নিয়ে আমি সে বাড়িতেই থাকি। ওটা আমার পৈতৃক বাড়ি। সেদিন সে পর্যন্তই।
পরদিন খুব সকালে আমি আবাসিক থেকে বের হই। তারপর হাঁটতে শুরু করি উল্টো দিকের পথ ধরে। পৌঁছে যায় সেই দোতলা বাড়ির সামনে। কামিনী ফুল ঝরে ঝরে বাড়ির সামনের সবুজ ঘাস সাদার
শ্রুভ্রতায় মেতেছে যেন। ভাবছি চলে যাব। দু কদম এগিয়েছি। দোতলার বারান্দা থেকে পরিচিত কন্ঠের কাকলী। যাবেন না। আমি দাঁড়িয়ে গেলাম। উপর থেকে যিনি নীচে এলেন তাকে দেখে আমি ভয়ে কুঁকড়ে গেলাম। উহ্ কি ভয়ানক।
বড় গর্তের ভেতর থেকে সাদা রঙ ভেদ করে দুটো কালো মণি ঠিকরে বেরোচ্ছে যেন। দু গালে মাংস নেই। যেন কংকাল। বেটে খাটো একটা অদ্ভুত মানুষ! ভীষণ সুন্দর কন্ঠের মানুষটি দেখতে এত ভয়ানক!! কিন্তু তিনি খুব প্রাণবন্ত। আমাকে অবাক করে বললেন, ভয় পাচ্ছেন কেন আমাকে? আমি দেখতে ভয় পাওয়ার মতো কিন্তু অনুভবে ভীষণ মায়ার।
আমি ভাবছি ইনি কি মাইন্ড রিডার? আমার ভেতর টা উনি পড়ছেন কি করে? অতুল বললেন এসো। এসো বলেই বললেন, তোমাকে আর আপনি বলব না, কেমন?
আমি মৌন সম্মতি দেই। বাড়ির ভেতরটা বড্ড চুপচাপ। কিন্তু আমার কেন জানি নিরাপত্তাহীন লাগছিল না। অতুল আমাকে দোতলার একটা বড় ঘরে নিয়ে এলেন। খুব সুন্দর সাজানো ঘর। পরিপাটি। খাটে শুয়ে আছেন এক কল্পিত রাজকন্যা যেন। অসম্ভব সুন্দর দেখতে অথচ মাথার চুল নেই একটা ও। শুকিয়ে বিবর্ণ মুচমুচে পাতার মতো এক টুকরো জীবন যেন। অতুল বললেন ওর নাম মায়া। চোখ খোলা। হাত বাড়িয়ে কাছে ডাকলেন আমায়। আমি কাছে গেলাম। আমার গালে পাখির ছানার মতো তুলতুলে হাত ছুঁয়ে বললেন, -বৃষ্টি, কেন এত মিষ্টি আর স্নিগ্ধ তুমি?
এই ছিলো মায়ার সাথে আমার প্রথম আলাপের শুরু। তারপর রোজ সকালে মায়ার কাছে যাওয়া আমার নিয়মে পরিণত হল। মায়া ও অতুল ছাড়া আর ও দুজন মহিলা থাকেন ও বাড়িতে। একজন গৃহস্থালি কাজ কর্ম করেন অন্যজন মায়ার দেখাশোনা করেন। যিনি মায়ার দেখাশোনা করেন তাকে ও বাড়িতে সবাই রমা খালা বলে ডাকে। প্রতিদিন যেতে যেতে আমি অতুল ও মায়ার খুব নির্ভরতার কেউ হয়ে উঠি। আমি একটু দেরি করে গেলেই মায়া রাগ দেখাতো। যেন কত অধিকার আমার উপরে। আমি একটা অদ্ভুত ব্যাপার খেয়াল করি। সাধারণত আমি বিবাহিত দম্পতিদের ভেতর যেটুকু দেখেছি তাতে মনে হয়েছে স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কে মানসিক সম্পর্কের চেয়ে ও শারিরীক এবং দ্বায়িত্ব কর্তব্য বোধের ব্যপারটাই বেশি থাকে। কিন্তু মায়া ও অতুলের ভেতর ঠিক তা নয়। মায়ার কাপড় বদলানো, বিছানা পরিষ্কার, ঔষধ খাওয়ানো, গোসল করানো, যাবতীয় কাজ রমা খালা করতেন। অতুল যদি ও পাশাপাশি কাছাকাছি থাকতেন কিন্তু কখনও মায়াকে ছুঁয়ে থাকতে দেখিনি। এমন কি অতুল কে দেখেছি মেঝেতে বিছানা করে ঘুমোতে। অবশ্য সে ভাবনা গভীর হওয়ার আগেই এক ভোরে মায়া চলে গেল সব মায়া ত্যাগ করে। তার এক মাস পরেই আমার বদলি হল ঢাকায়। এই এক মাসে অতুলের সাথে আমার দেখা হয় নি। তবে কথা হত ফোনে রোজ সন্ধ্যায়। সেই প্রথম দিনের মত। খুব কম কথা, নিশ্চুপ নিরবতা। যেদিন আমি ঢাকা আসব তার আগের সন্ধ্যায় আমি আর অতুল দেখা করি একটি কফি শপে। ফেরার পথে ঝুম বৃষ্টি। দুজনেই বৃষ্টিতে ভিজে হেঁটে ফিরেছিলাম যার যার ঠিকানায়। ঢাকা এসেই আমি খুব ব্যস্ত হয়ে পড়ি। নতুন অফিস , এম, এস, এস পরীক্ষা ও কদিন পর। হঠাৎই অতুল এলেন ঢাকায়। একেবারে আমার অফিসে। বললেন, বৃষ্টি আমার অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার কাগজ পত্র তৈরি। আজ রাতেই ফ্লাইট। অতুলের অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার কথা মায়া বেঁচে থাকতেই শুনেছিলাম। সে রাতে অতুল চলে গেলেন। অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছে অবশ্য ফোন দিয়েছিলেন আমাকে। তারপর প্রতিদিন একবার করে ফোন করতেন। ইতিমধ্যে আমার পরীক্ষা শুরু হল। একদিন পরীক্ষা শেষে আবাসিক এ ফিরে দেখি সেখানে চুরি হয়েছে। কার কি খোয়া গেছে তল্লাশি করতেই বুঝলাম বিছানায় আমার রেখে যাওয়া মোবাইল ফোন নেই। তারপর একমাস ফোন ছাড়া রইলাম। যখন আবার মোবাইল কিনলাম তখন সিম রিপ্লেসমেন্ট করতে চাইলাম কিন্তু করা গেলোনা বলে নতুন সিম কিনলাম। হারিয়ে গেল অতুলের নাম্বার। অবশ্য অতুলের বাড়ির ল্যান্ড ফোনের নাম্বারে কল দিয়ে খোঁজ নিতে পারতাম কিন্তু তা আর করা হয়ে ওঠেনি।
স্বম্বিত ফিরল আমার। অতুল বলছেন, বৃষ্টি কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলে???
আমি অতুলের দিকে না তাকিয়েই বলি। কোথাও না।
অতুল বলতে থাকেন, জানো? কত কত খুঁজেছি তোমাকে? তোমার মোবাইল নাম্বারে কত দিন কল দিয়েছি? বন্ধ পেয়েছি নাম্বারটা। আমি বলি অতুল কে সবটা। তারপর জানতে চাই কবে এসেছেন? একা ?নাকি দোকা? অতুল হাসলেন হা হা করে। বললেন এসেছি তো দুমাস, চলে যাওয়ার সময় ও হয়ে এল। আর একাই এসেছি। দোকা আর হলাম কোথায়? এবার আমি সব দ্বিধা ঝেড়ে জানতে চাই অনেক বছরের গেড়ে থাকা প্রশ্নটা।
জিজ্ঞেস করি অতুল কে, আপনার আর মায়ার সম্পর্কটা আসলে কি??
অতুল একটা ধাক্কা খেল যেন! মেঘ গমগম স্বরে বললেন, মানে?
আমি বলি, যা জিজ্ঞেস করেছি তার উত্তর দিন।
অতুল কিছুক্ষণ চুপ থাকলেন। তারপর যা বললেন তা শোনার জন্য আমি তৈরি ছিলাম না।
অতুল বলতে শুরু করলেন,
– মায়া আর আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম। আমি রসায়নে। মায়া চারুকলায়। আমি ও মায়া কিন্তু চাচাতো ভাই বোন। আমার বাবা মা মারা যাওয়ার পর আমি মায়াদের ঢাকার বাড়িতে থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস করতাম। দেখতে অসুন্দর বলে মায়া কখনও আমাকে চাচাতো ভাই বলে পরিচয় দিতো না। ও একজন কে ভালোবাসতো। সেই ছেলেটার নাম রাকিব। একই বিভাগে পড়ত দুজন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ হলে আমি উচ্চতর ডিগ্রির জন্য দেশের বাইরের ইউনিভার্সিটিতে আবেদন করছি যখন, তখন মায়া আর রাকিব মিলে ওদের সব ছবির একটি প্রদর্শনী করতে চাইল। করল ও। কিন্তু কি একটা বিষয় নিয়ে দুজনের মধ্যে ঝামেলা শুরু হল। একদিন মায়া আমাকে নিয়ে গেল কাজী অফিসে। প্রথমে আমি ভেবেছিলাম রাকিবের সাথে বিয়ে করবে বলেই আমাকে সাক্ষী হিসেবে ডেকেছে। কিন্তু সেখানে গিয়ে মায়া আমাকে বলল, আমাকে তোমার বিয়ে করতে হবে। আমি আকাশ থেকে পড়লাম। মায়া খুব বিশ্রী ভাবে বলল, বিগত পাঁচ বছর তুমি আমাদের বাড়িতে থেকেছো, খেয়েছো, অথচ আমার বিপদে তুমি সাহায্য করবে না। আমি বলি কিসের বিপদ?? মায়া বলল রাকিব আমাকে বিয়ে করতে চায় না। সে নাকি তার মায়ের পছন্দের মেয়েকে বিয়ে করবে। নইলে তার মা মরে যাবে। তাই ও বিয়ে করার আগে আমি বিয়ে করব আর তুমি বিয়ে না করলে আমি আত্মহত্যা করব।
আমি কি করব ভেবে ওঠার আগেই কাজী অফিসের রেজিস্ট্রেশন খাতায় সই সাবুদ হয়ে গেল। দুজনেই ফিরে এলাম বাড়ি। চাচার বাড়ি।বাড়ি এসে দেখি রাকিব বসে আছে বসার ঘরে। সামনে চাচা ও চাচী। চাচা বলছেন, কিরে মায়া তুই আর রাকিব যে বিয়ে করতে চাস সে কথা বলিস নি কেন এতদিন? রাকিব কে তো আমার খুব পছন্দ। আর রাকিব বলেছে তোদের বিয়ের পর আমার ব্যবসা দেখাশোনা করবে। রাকিবের মা ও রাজি।
মায়া কে শেষ পর্যন্ত বিয়ে করতে রাজী হওয়ার কারণটা আমি বুঝলাম কিন্তু মায়া বুঝল না। তাই আমাকে অন্য ঘরে ডেকে নিয়ে বলল , বিয়ের কথাটা কাউকে বলবে না। আমরা আবার ডিভোর্স নেব। আমি অবাক হইনি তাতে। বুঝে গিয়েছিলাম আমি বদলি খেলোয়াড়। তারপর মায়া আর রাকিবের বিয়ের দিন ধার্য হল। তিন মাস পর বিয়ে। আর আমি?? দু চোখ ভরে দেখি ওদের বিয়ের আয়োজন। এদিকে গোপনে আমার ও মায়ার ডিভোর্স ডিভোর্স খেলা। আমার হাতে দুটো কাগজ। একটা বিয়ের অন্যটা বিচ্ছেদ। দুটোই মূল্যহীন। মায়া আর রাকিবের বিয়ের তিন দিন আগে মায়া হঠাৎই এক রাতে খুব অসুস্থ হয়ে পরে। হাসপাতালে নেয়ার পর মায়াকে বেশ কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে হয়। জানা যায় মায়ার জরায়ুতে টিউমার আছে বেশ বড়। দ্রুত অপসারণ করতে হবে। কারণ পরীক্ষা নিরীক্ষার পর নিশ্চিত হওয়া গেছে মায়া ক্যান্সার বহন করছে। অপারেশন করে মায়ার জরায়ু ফেলে দেয়া হল। কিন্তু মায়া আরো অসুস্থ বোধ করতে লাগলো। এদিকে রাকিব ও তার মা যোগাযোগ বন্ধ করে দিল। মায়া কে সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতাল এ নেয়া হল। সঙ্গে গেলাম আমি, চাচা ও চাচী। চিকিৎসা চলল ছয় মাস। কেমোথেরাপি দেয়া হল। ওর সব চুল উঠে গেল। মায়া আর সুস্থ হলো না। সেখানকার ডাক্তাররা আর কোন আশার আলো দেখতে পেলেন না। মায়ার ইচ্ছে অনুযায়ী আমরা ফিরলাম দেশে। কিন্তু ঢাকা নয় রাজশাহী, আমার বাড়ি। কারণ মায়া চেয়েছিল। চেয়েছিল আর ও কিছু। একটি পরিচয়। স্বামী স্ত্রীর। কেন চাইল তা আমার বোধগম্য হলো না। মায়া নিজেই চাচা কে বলল সবটা। আমার সাথে বিয়ে ও ডিভোর্সের ব্যাপারটা। চাচা ভীষণ রেগে গেলেন।এবং আমার সাথে মায়া কে রেখে গেলেন রাজশাহীর বাড়িতে। বলে গেলেন আমার মেয়েকে স্ত্রী পরিচয় দিয়ে আমার স্নেহের ঋণ শোধ কর। সেই থেকে আমি ঋণ শোধের চেষ্টা করে গেলাম কারো স্বামী হয়ে। শেষ পর্যন্ত আমি বদলি খেলোয়াড়ের ভূমিকায় পালন করলাম।
বৃষ্টি, এই ছিল তোমার উত্তর।
আমি এবার জানতে চাই,
এতদিন কেন একা আছেন? বিয়ে করেন নি কেন? মায়া কে তো আপনি ভালোবাসেন নি। তবে?
অতুল বললেন, ভালোবাসিনি এ কথা ঠিক। কিন্তু আমাকে ও তো কেউ ভালোবাসেনি। তাই একাই রয়ে গেলাম।
বৃষ্টি কমে এসেছে। আমি জিজ্ঞেস করি অতুল কোথায় যাবেন ? আমার সাথে গাড়ি আছে পৌঁছে দিই।
অতুল বললেন, আমার সাথে ও গাড়ি আছে।
কিন্তু গাড়ি না থাকলেই ভালো হত।
সেই বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যার মতো দুজনে আবার ভিজে ভিজে ফিরতে পারতাম বোহেমিয়ান ঠিকানায়।
আমি এবার তাকালাম সেই ভয়ংকর চোখের দিকে। সেই ভয়ংকর চোখ দুটো আমাকে বলছে, -বৃষ্টি খুব মায়া— বৃষ্টিতে।

ইসরাত জাহান। কবি। জন্ম বাংলাদেশের পাবনা জেলার ঈশ্বরদী। বর্তমান নিবাস ঢাকায়। তেরোবছর বয়স থেকে লেখালিখি শুরু। লেখা শুরু করেছিলেন দৈনিক বাংলার বাণীর মাধ্যমে। তারপর দৈনিক আজকের কাগজে নিয়মিত লেখালিখিতে ছিলেন। এরপর হঠাৎ করে বারোবছর লেখালিখি থেকে স্বেচ্ছা নির্বাসন। প্রকাশিত বই: 'তোমার...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

পটচিত্র

পটচিত্র

  সৌম দাদুর কাছে থাকতে ভালোবাসত। গ্রামের নাম পাঁচুন্দি।আশেপাশে প্রচুর গ্রাম।সবাই সকলের খবর রাখে।সৌমদীপ এখানকার…..