অনির্বাণ তোমায়

অন্তরা দাঁ
কবিতা
Bengali
অনির্বাণ তোমায়

অনির্বাণ তোমায়

তোমাকে আমার জীবনের দীর্ঘতম
চিঠিটি লিখছি অনির্বা, আজ।
কেন যে লিখছি তা স্পষ্ট নয় আমার কাছে
তবু তোমাকেই যে বলতে চাই
যা আর কাওকে বলতে পারবো না কোনদিন।
সেই শিশুকাল থেকে শুনে আসছি
মঙ্গলশঙ্খের আওয়া, কাঁসরঘন্টার শব্দ
মায়ের লালপেড়ে শাড়ির আঁচলে
চন্দনের সুবাস…
আকন্দফুলে শিবপুজোর কৈশোর
আর মায়াময় ছাতিমের সুঘ্রাণে
প্রথম যৌবনে কখন যে পা দিয়েছি
গীতবিতান বুকে জড়িয়ে যে মেয়ে
ঝড়ের রাত কাটায়
তার সাথে বৃহত্তর সমাজের
আপোষ করার কোন দায় নেই
প্রথম ঋতুর দিনেই অনুভব করেছিলাম
ভরন্ত কলসের মত এক নিখাদ অস্তিত্বসুখ
বয়ঃসন্ধির কল্পনায় মশগুল
এক অমল কিশোরী আমি
রবীন্দ্রপ্রেমে পাগলিনী প্রায়।
ঠাকুর নয়,দৈব নয়,ঈশ্বর নয়
প্রেম জেগেছিল মনে, সুতীব্র অনুভবে।
আমি কখনও ‘যোগাযোগের ‘কুমু
কখনও ‘চোখের বালি’র বিনোদিনী
শেষের কবিতার লাবন্য হতেও
সময় লাগেনি বিশেষ।
আমি কবিতাপড়া মেয়ে
ইস্কুলের শেষ পরীক্ষায়
প্রথম হতে পারিনি
ক্যামেলিয়া ফুটে উঠেছিল চেতনায়
এগজামের খাতায় রডোডেনড্রগুচ্ছ।
এসব কথা কখনো কাউকে
বলতে পারিনি অনির্বাণ
আমি শিবরাত্রি করিনি কোনোদিন
ওই এক ঠাকুর আমাকে
পঁচিশে বৈশাখের আলোর ভোরে
‘সাধারণ মেয়ে ‘ পড়তে বাধ্য করেছে
আমি সঞ্চয়িতায় সে ঠাকুরকে অর্ঘ্য দিয়েছি
আমার কন্ঠকে নৈবেদ্য করে
পাড়াগাঁ ‘র মধ্যবিত্ত সমাজ ছি ছি করেছে
‘এ মেয়ে গোল্লায় গেছে ‘
তবু প্রেম তো ছেড়ে যায়নি আমায়
নিঃসঙ্গ রাতে কল্পনায় এঁকেছি তাকে
‘ধায় যেন মোর সকল ভালবাসা ‘
যে প্রভু সেই তো প্রিয়তম
প্রিয়তমই তো ঈশ্বর
আমি যে আলাদা করতে পারিনি অনির্বান।

আমি মীরা হতে চাইনি
রাধাজন্ম চেয়ে কাঙালিনী আমি
আমার উদ্বেল যৌবন
এসব কথা তোমাকেই বলি আজ
তুমিও সেই প্রথম প্রেমের মত
অধরা থাকবে সারাজীবন
অমলিন প্রেম ছোঁয়া যায় না আঙ্গুলে
এই ধূলিমলিন সস্তা সাধারণ জীবনে
শুধু সেই অপার্থিব আলো
ছু্ঁয়ে দেয় মানবহৃদয়, ঐহিক বাসনা।
দিনবদলের সাথে সাথে জীবন প্রবাহমান
থেমে থাকেনি হৃদয়ের আকন্ঠ পিপাসা
সময় হাত রেখেছে চেহারার উজ্জ্বলতায়
মাঝরাতে ঘুমের শিকল ভেঙ্গে
উঠে বসি মধ্যতিরিশের প্রশান্ত অনুভব
তবু সেই আশ্চর্য চোখ দ্যুতিময়
ছুঁয়ে গেছে প্রেমে, বিরহে , আনন্দে, বেদনায়।
যন্ত্রণাকে সযত্নে লালন করি
কি নিবিড় অনুভব হৃদয়ে তার
আমার কবিতারা ডানা মেলে বাঁচে
সেই সুনীল আকাশে আলোর সকালে
তুমি আছ তাই।

মানুষটা বোধহয় কখনও ঠাকুর হতে চাইনি জানো
তোমারা তাকে দেবত্বে উন্নীত করে
ঠেলে দিয়েছ সমাজের মূল স্রোত থেকে
তাই তার কবিতায়, গানে
‘নাই রস নাই দারুন দহনবেলা ‘
রবীন্দ্রপ্রয়ানের প্রায় চল্লিশবছর পর
জন্মানোর মত প্রগাঢ় অপরাধে
নির্বাসিতা আমি তোমাদের সামাজিক
চেনা জানা ছকের বাইরে
একটা সময়, কয়েকটা যুগ, জেনারেশন গ্যাপ
এসব কি বেঁধে দিতে পারে প্রেম
আটকাতে পারে মন?
বাসরঘরের লৌহবর্মে ছিদ্র খুঁজে
প্রেম ঢুকেছে কালনাগিনীর মত
তার দুর্মর বিষে আমি মৃতপ্রায়
আমায় বাঁচাও অনির্বাণ
সারাজীব, সারাটিজীবন সব পুরুষপ্রেম
ফিরে ফিরে যায়
শুধু তার অস্তিত্ব মস্তিষ্কে চেতনায়
শরীরের হয় বিনিময়
উষ্ণ করতল,উষ্ণতর নিঃশ্বাস
প্রেম সে তো নয়।

গার্হস্থ্যজীবনের মায়াকাজল দুচোখে
এঁকেছি নির্দ্বিধায়
অপত্যস্নেহে ভরেছে মায়াময় বুক
চিৎকৃত বিপ্লব, অনুযোগ অভিযোগ যত
বদলেছে দিক,সেরেছে অসুখ
তবু সুখ ধরা দেয় নাই
জোৎস্নায় ভিজে, রোদে পুড়ে
আমি দেখি নাই ফিরে
আমার গন্তব্যের পথটিরে
পরে আছে নিঃসঙ্গ একাকী
সেই পথ দিয়ে হেমন্তের সকালে
এক অমৃতের পুত্র বুঝি ছু্ঁয়ে দেয় মন
আমার এই রংহীন জীবনযাপন
সেই তোমাকেই লিখি অনির্বাণ
তবু তো এলে না জীবনে তুমি
আসা যায় না বোধহয় কারোরই
শুধু ইচ্ছেরা ডানা ঝাপ্টায়
রুদ্ধ পথ,বন্ধ খাঁচা!
নারীজন্মের জন্য কোথাও নেই লজ্জা
শুধু যখনই ভাবি যন্ত্রণাকাতরতা
তার না পাওয়ার অনুভব
আমি কোথাও নিজেকে খু্ঁজে পাই না।

এ পৃথিবী আজ সমস্ত মাধুরী দিয়ে
পূর্ণ করেছে আমায়
কোন দ্বিধা নেই আর মনে
তাই সমস্ত বন্ধন থেকে মুক্ত করি নিজেকে
হে মৃত্যু আমায় নাও
তোমার হিমশীতল আলিঙ্গনে
যেখানে আমার মানবপ্রেম
ঈশ্বরপ্রেম মিলেমিশে একাকার।

এ চিঠি যখন পড়বে
তখন হয়তো আমার শবদেহ
ছাতিমতলায় সাদা চাদরে ঢাকা
আমার প্রিয় ছাতিমের সুঘ্রাণ
তোমায় একবার আমায় মনে করাবে অনির্বান?
যে মেয়েটির নাম লিখেছ
জলের আঁখরে হৃদয়ে তোমার
তার আর কোন সাধ নেই
স্বপ্ন নেই, রঙ নেই, মোহ নেই
শুধু যাবার সময় তোমার
একফোঁটা অশ্রুজল তার বিশুষ্ক অধরে
আর একটি গীতবিতান বুকের ওপরে।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ