অনির্বাণ সূর্যকান্তের দশটি কবিতা

অনির্বাণ সূর্যকান্ত
কবিতা
Bengali
অনির্বাণ সূর্যকান্তের দশটি কবিতা

বাড়ি ফেরার পর সিলিং ফ্যানের দিকে তাকাই
বৌ বলে তুমি অপদার্থ
মা বলে কী করেছিস জীবনে
বাবা বলে গাধা
ভাই বলে বেকুব

আমি ঠাকুরঘরে যাইনা, পেপার পড়ি না, টিভি তো নয়ই
আমার শরীরে কোনো ভাষা নেই
আমি ৭-৭ টা অফিস করি
আমার ভেতর থেকে কেউ বের হয়ে আসেনা, প্রতিবাদওনা
প্রতিকারও না, লাম্পট্য, লোভ,ক্রোধ কিছু না।

আমার বেতনও তেমন বেশি নয়,কারো বেডরুমে ধাক্কা দিয়ে জিজ্ঞেস করিনি কখনো মন খারাপ হয় কিনা!
অথচো যখন ছোট ছিলাম মনে হতো এই করবো সেই করবো
এখন নিজের থেকে বড় দেখি সবাইকে
কি যে এক জীবন,ডেবিট কার্ড নেই, ক্রেডিট কার্ড নেই
পাসপোর্ট নেই যে পালিয়ে যাবো।

হুট করে ইচ্ছে হয় মরার আগে যদি কালীপ্রসন্নের মহাভারত পড়ি
রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতা
বিভূতিভূষণের গল্প তবে কি আমার মনে হবে আমি বড্ড বড় হয়ে মরেছি
সিলিং ফ্যানে ঝোলার চাইতে মধু খেয়ে মরা কি সহজ?

এদেশে মুসলমান শুকর খায়না
হিন্দু গরু খায়না তবুও তারা মরে, তাদের কেউ ঘর থেকে বের হওয়ার সময় বিসমিল্লাহ বলে কেউ দূর্গা সহায় বলে তবুও তারা মরে
কেউ পালাতে গিয়ে মরে
কেউ পালিয়ে এসে মরে
তবুও মুখ ফসকে যখন গেয়ে ফেলি দীর্ঘশ্বাস আর সব ব্যর্থতা ইচ্ছে হয় নিজের ভেতরে বোমা পুতে মেরে ফেলি ভেতরের সকল টেররিস্ট।

মৃত্যুরও বহু নাম আছে,
কোনোটার নাম এশিয়া,কোনোটার নাম দক্ষিন এশিয়া কোনোটার নাম বাংলাদেশ, কোনোটার নাম তাবরেজ কোনোটার নাম বিশ্বজিৎ।

 

দুই.

আমি রাজনৈতিক, প্রতিবাদী, বিপ্লবী কবি নই
আমার ধর্ম নেই বললেও এই বাংলায় বিশ্বাস করে না
আমার গ্রন্থ নেই
কোরান, গীতা,উপনিষদ, ত্রিপিটক নয়
বাইবেল তো নয়ই

আমি যা লিখি তাই আমার ধর্ম,
যেমন তোমাকে শট লেখা, নিন্দা লেখা, ঘৃণা লেখা,
কাম ক্রোধ, লোভ, রমণ লেখা আমার ধর্ম

আমি রাত বাড়তে থাকলে পরনারীর গায়ের গন্ধ খুঁজতে থাকি
নারী বলতে ১৮ বছরের উপরই ৪০ এর নিচে, এই আমার ধর্ম
আবার বাজারে জিনিসপত্তের দাম বাড়লে মিছিলে যাই বক্তৃতা করি, জুতো ছিড়ে যায়, পুলিশের মার খাই, পাশ দিয়ে বেশ্যা যায় তাকে মা ডাকি, সেটাও আমার ধর্ম।

বাবাকে প্রতিমাসে কিছু টাকা পাঠানো, মাকে হাত খরচ দেয়া, বোনকে মাসোহারা, ভাইকে মন্দ কাজে শাসানো এসব আমার ধর্ম।

আমি প্রেমের জন্য যুদ্ধের পক্ষে
মানুষের জন্য সমাজতন্ত্রের পক্ষে
মুক্তির জন্য রক্তদানের পক্ষে
আলোর জন্য অবিশ্বাসের পক্ষে

এখানে কুড়িগ্রাম, থানচি, পেড়িয়ে ভগবান বলে ডাকা ভাতের কথা ভাবি
যারা একটু কম বেতন পান তাদের চোখ ও শিশ্ন কতটা হারামি সেটা জেনে নিই
গরীব হলেই ভগবানে ভক্তি বা সৎ এসব বাকোয়াজ কথাতে মোটেও বিশ্বাস করিনা
আমি চিন্তা করি কার হৃদয়ে কতটা পারমানবিক ধর্ম আছে

সামরিক বাহিনী পাহাড় পাহারা দেয় বাগান নয়
পুলিশ বাহিনী অবরোধ
সোভিয়েত আমার পকেটে নিয়ে হেঁটে আমি গাল দেই
অথচো এই দেশে আছে একজনই যিনি ঈশ্বরের কাছাকাছি যার চারপাশে অনেক ধণী যিনি জানেন না অক্সিজেন কতটা কমে যাচ্ছে।

কলম রেখে বোমা বানাবো একদিন আর যৌনতা শুকে শুকে কার হৃদয়ে কত শোক মেপে নেবো।মনে রাখতে হবে, শোকও যথেষ্ট চামার।

 

তিন.

বহুদিন থেকে চোখে জড়ো হচ্ছে হিংসা, হৃদয়ের কাছাকাছি যে সকল হরিণী তাদেরও সঙ্গী দরকার এই ভেবে লাশগুলোকে একা ফেলে রাখিনি কোনদিন।

নির্মম সত্য অনুসন্ধানে আজ কতকটা সময় বন্ধক দিতে ঘুরেছি মহাজনের দোকানে,
কেউ কিনেনা শরীর
বেঁচে খাবো চাল ও কন্ডম,
উদযাপন করবো একলা থাকার চন্ডালী উপবাস।

এই যে ধর্ম, পুঁজি, আন্দোলন ও নারী একে অপরের সুত্রে নুনের মতো স্বাদ। সবই বলতে পারতেন স্বর্গীয় বিষ্ণুদা, অবশ্য ১৮ বছরের নিচে কিশোরীদের মতো পোকারা নাচেনা আজকাল।

কেউ যখন বলে ‘আমি একা’
আজকাল যে একা, সে নিরুঙ্কুশ একা, কিছুটা একা নয়।

 

চার.

যৌনজীবনকে বুঝুন, পরিবেশ বাঁচান
এই স্লোগানকে আগলে জীবনানন্দকে বুঝে ফেলুন

স্লোগানকে সামনে রেখে গণভবনে গিয়ে দেখি “আপা” থেকে ম্যাডাম হয়ে গেছে কাঁচা লঙ্কা

আজকাল নার্সিংহোমের ছেলেটা বিপ্লবের কথা বলেনা
খচ্চরও সভা উজ্জল করে বসে থাকে

প্রোমোট করে করে বেশ কয়েকটা খানকিলয়ের ব্যবস্থা হয়েছে
টকশোতে আসে নতুন প্রজাতি
শুধু আমাদের এখানে তুমুল বৃষ্টি হলে পিপড়ারা ঘরে উঠে আসে
প্রেসনোটে বলা হয়েছে ঠান্ডা আবহাওয়ায় ওয়ার্ম আপ ভালো হয়।যৌনজীবনকে বুঝুন, পরিবেশ বাঁচান।

 

পাঁচ.

আমার হাড়ে ব্লেড ঢুকিয়ে আমি মদ খাবো
আমি তোমাকেও খেতে পারি ডিয়ার
আমি যুদ্ধ করি
আমি বলি তোমরা রমণে লিপ্ত হও ফিজিকসের ভেতর

এই রাষ্ট্র ব্যবস্থাগুলো দানব
দ্রোহ নেই,
আছে শুধু দরজা ঠেলা দেয়ার শব্দ
দরজা ঠেলে দিলে যুদ্ধ হয়না
আই ফাক দ্যা পোয়েট

এই বলে বলে রানওয়ের দিকে উলঙ্গ দৌড়াচ্ছে এক কবি অনির্বাণ।

 

ছয়.

এই যে বড় হয়ে আমাকে মরতে হবে
এই যে শিশুবেলায় আমি মরতে পারিনি

এটাই আমার জন্য শাস্তি

এই যে ভালোবাসতে হয়, এই যে ঘৃনা করাও শিখতে হয়
এটাও কম শাস্তি নয়

আমাদের পেন্সিলের ব্যবহার কমতে শুরু করলেই বুঝতে পারি বড় হয়ে যাচ্ছি
বড় হতে শুরু করলে ভয় বাড়তে শুরু করে।

বড় হওয়াটা নারী পুরুষভেদে আবার আলাদা।
যেমন পুরুষের গলা বড় হলে তার প্রশংসা জোটে
তাকে বলা হয় সাহসী, নারীর কথা বলার শব্দ বড় হলে তাকে পাড়াতো, বেডাতো নারী বলা হয়!

পুরুষের পা বড় হলে এক রকম বোঝায়
নারীর হলে একরকম!
সবার ক্ষেত্রে বড় হতে দিতেই হবে তা নয়!

গাছ বড় হয়, মাছ হয়,
পরিবার বড় হয়, সমাজ বড় হয়, শোষনও পাল্লা দিয়ে বড় হয়। যা বড় হয়না তা হলো ভূমি ও হৃদয়!

আবার রোগকে বড় হতে দিতে নেই
নারীকেও বহু কষ্ট করেই বড় হতে হয়
কালো নারীদেরতো আরো কষ্ট করে বড় হতে হয়!

অন্ধকার বড় হলেই যত দুঃশ্চিন্তা
অথচো আলো বড় হতে শুরু করলে তাকে বড় হতে বাধা দিই!
মেয়েরা যখন জন্মায় ঈশ্বর বড় হয়ে উঠে, ডাকাতরাও।
মেয়েরা জন্মাবার আগেই পাথর বড় হতে থাকে
ছুঁড়ে মারতে!

আমাদের অহংকারও বড় হয়,
দানের হাত দারিদ্রতাকে বাঁচিয়ে রাখতে বড় হয়
ছোটলোককে শোষণ করতে ধনীরা আরো বড় হয়।

কি যে তাজ্জব! জনগণকে শোষনে অর্থমন্ত্রীর শয়তানি বড় হয়।আমরা এমন এক দেশে বড় হচ্ছি যেখানে আমরা বড় হলে পতাকা দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে ছোট হয়!

 

সাত.

আজকাল মানুৃষের ভবিষ্যৎ পড়ে নীল ঘোড়া,
আমি পড়ি ব্যক্তিগত নরকের মুখোশ, বিষন্ন ল্যাপটপের মুখ থেকে ঝরছে লালা।
এই যেমন তোমার নাভি ছেড়ে গেছে কোনো ফোঁস ফোঁস করা স্টেশন।

তোমার স্তন নিয়ে বহুবার জুয়া খেলতে বসেছে দেবতা।আমি বর্ণপ্রথার জমিতে চাষ করি কিছু স্কুল বীজ।

 

আট.

পুলিশকে মেয়র বানিয়ে দেবো
তারপর সামনে দেবো ইয়াসমিনের গোসত

পুলিশও ডুব দিতে জানে
পুলিশও জানে ইংরেজি সাহিত্য

পুলিশও দেখে বৌদিরা স্নান করে ভোরবেলা ফেরে ভাত রাঁধার কৌশলে
মেয়ে মাছ নিয়ে

পুলিশের ঘরে একদিন মেয়ে মাছ আসে
যেহেতু পুলিশ মেয়র
যেহেতু পুলিশ বানানে দীর্ঘ ঈ কার নেই

আমি রেডিও স্টেশনে নেমে যাই
বাড়ি ফিরবো ভদকা বনশ্রী ও বিছানা নিয়ে

এবার পুলিশকে দেখাবো পাখিরা স্কার্ট পরে
এবার পুলিশকে মেয়র বানিয়ে দেবো।

 

নয়.

রাষ্ট্রের প্রেমিকারা কেমন হয়? তাদের মুখোশ?
হর্ণ বাজাতে বাজাতে বাবারা তাকায় মেয়েদের বুকে
বাবারা একদা প্রেমিক ছিলো ময়ূরী ধুন্ধুলের।

ট্রাফিক উঠিয়ে নিয়ে যায় বৃক্ষরোপণ উৎসব,
মিলনবঞ্চিত হোয়াংহো নদীর পাড়ে যে রমনীয় হরিণ দাড়িয়ে উদাত্ত আহবান জানাচ্ছে তাদেরকে নিমন্ত্রণ দিলো মেয়র

মিথ্যা কথা বলছে মা শহরের বাসিন্দারা।ছিদ্রপথে ঢুকে গেছে নষ্ট পানির লহর,কাক পৈতা ধারন করে শোনায় কোমরের জলকথাদের পুরাণ।

 

দশ.

আমরা কেউ কারো ভাষা বুঝিনা
বিপ্লবী পুঁজিবাদের ভাষা বোঝেনা
পুঁজিবাদী বিপ্লবীর ভাষা…

শৈশব আগামীর ভাষা বুঝে না, ভাষা বুঝিনা বলে আঘাত করি, ভাষা বুঝলেই বেঁচে থাকা স্বীকার করতে ইচ্ছে করে!

আমি অজ্ঞাত কবিদের ভাষা বোঝার চেষ্টা করি,আমি রক্তের ভেতরে নাইট গার্ডের ভাষা বুঝতে চাই,আমি বুঝতে চাই দাতের মাজনের ভাষা
কেমন করে চিৎকার করে আয়নাভাঙা নারী
কামিজ খুলে পালিয়ে যায় ফাঁদপাতা ঠোঁট।

মানুষের উপত্যকায় নেশার ভাষা, ধর্মের ভাষা, শাসনের ভাষা নিয়ে থেঁতলে যাচ্ছে পতিতার পায়ের নুপুর

আমি ভেবে রেখেছি ভাষা না বুঝলেই পুরো পৃথিবীটা ইনজেকশনে ভরে গাভীন গ্রহে ঢুকিয়ে দেবো।

অনির্বাণ সূর্যকান্ত। কবি। জন্ম বাংলাদেশের কুমিল্লা জেলায়। লেখাপড়া করেছেন চট্টগ্রাম সরকারি কমার্স কলেজে। মূলত: কবি, কবিতাই তাঁর প্রাণ। কবিতা দিয়েই তিনি পৃথিবীকে জানতে চান। বোহেমিয়ান জীবনে হেন কোন কর্ম নেই করেন নি! কৃষক হয়েছেন, মুদি দোকানের কর্মচারী হয়েছেন, হোটেলের কর্মচারী হয়েছেন,...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ