অন্তর্গত সুখের খোঁজে

তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়
কবিতা, প্রবন্ধ
Bengali
অন্তর্গত সুখের খোঁজে

ঈশ্বরকে যদি জিজ্ঞেস করা যেত সৃষ্টি কেন করেন? সর্বসম্মত কি উত্তর হতো ঠিক জানিনা। কিন্তু কবিকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় কবিতা কেন লেখেন? অনেকগুলো কারণই সেক্ষেত্রে উত্তর হিসাবে উঠে আসতে পারে। হয়তো এক একজনের উত্তর এক একরকম হতে পারে, কিম্বা কিছু হতে পারে একইরকম।

কেন লিখি কবিতা? কেনই বা পড়ি?  প্রশ্ন খুবই পুরনো এবং বারেবারেই সামনে এসে যায়। আমি যে এই প্রসঙ্গে অভিনব কোন কথা বলতে পারব তেমন হয়তো নয়। হয়তো অনেকের কথার সঙ্গেই মিলে যাবে আমার কিছু কথাও। তবু নিজের কথা নিজের মতো করে তো বলতেই পারি।

কবিতা লেখার সূত্রপাত সেই স্কুল জীবনে ক্লাস এইটে। সেটা কিছুটা হুজুগ হয়তো। কিন্তু সত্যিকারের কবিতা লেখা শুরু হল কলেজে এসে। তখন আর যাই থাক অন্তত খ্যাতির কোন চিন্তাভাবনা মাথার মধ্যে ছিলনা। কবিতা লেখার ইচ্ছাটা তখন আবার জেগে উঠেছিল লিটল ম্যাগাজিনে কিছু কবিতা পড়ে। তখন তো চোখের সামনে একটু একটু করে উন্মুক্ত হচ্ছে এতদিনের দেখে আসা চেনা জগতটা। তার নতুন ডাইমেনশন ধরা পড়ছে অনুসন্ধিৎসু চোখে। তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন ভাবনা, নতুন বোধ। তৈরি হচ্ছে নতুন বন্ধুত্ব। জড়িয়ে পড়তে হচ্ছে কলেজের পড়াশোনার পাশাপাশি আরও অনেক কর্মকাণ্ডে। দিনরাত আকর্ষণ করছে ভুবন বিছানো নানান মায়াজাল, পাল্টে যাচ্ছে চেনা পৃথিবীর মানে। মনে তখন অজস্র ভাবনা, কল্পনা, স্বপ্ন আর পরিকল্পনা। তার কিছু কিছু আপনা আপনিই প্রকাশ পেতে চায়, ভিতরে অনুভূত হয় একটা তাগিদ। তা থেকে একসময় বেরিয়ে আসে কিছু কবিতা। আমি কবি হতে চাই ঠিক এরকম প্ল্যান করে নয়, লেখা হয়ে যায় স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে। তখন আর না লিখে উপায় থাকেনা। যেন কেউ হাত ধরে লিখিয়ে নেয়। সেটা আসলে নিজেকে প্রকাশ করার তাগিদ, পারিপার্শ্বিকের সার্বিক প্রতিক্রিয়ায় অন্তরের ভিতরে যে আলোড়ন চলে তাকে কিছুটা মুক্ত করে দেওয়ার তাগিদ। কে না জানে একটি কবিতা লিখতে পারলে তখন যেন মনের মধ্যে থেকে একটা ভার নেমে যাওয়ার স্বস্তি বোধ হয়। সেটা একটা আনন্দের অনুভূতি। সেটা বারবার পাওয়ার জন্যই আবার কবিতা লেখা।

আসলে কবিতা লেখার একেবারে প্রাথমিক কারণ হিসাবে যা থাকে তা হলো একটা মোটিভেশন। কিছু একটা যেন বেরিয়ে আসতে চায় অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে, প্রকাশ পেতে চায় যা এতকাল অব্যক্ত ছিল। ভিতরে হয়তো এমন কিছু একটা বোধ থাকে যা অনেকটা অসংলগ্ন, বিমূর্ত। তাকে রূপ দেওয়ার জন্য এক ধরনের তাগিদ যখন মনের ভিতর খুব চাপ দেয়, যেন তাকে প্রকাশ না করতে পারলে আমাকে খুন করে দেবে, তখন কবিতা লিখি। যা এতক্ষণ জমা হয়ে ছিল, অপ্রকাশিত ছিল, তাকে কবিতার কাঠামোয় বাঁধতে পেরে পাওয়া যায় একটা সৃষ্টির আনন্দ, অন্তর্গত সুখ। শুধু সুখই কেন, কবিতা লেখার মধ্য দিয়ে বেরিয়ে আসে আনন্দ ও বেদনা দুইই।

পাঠক পড়বে, সেটাও কবিতা লেখার একটা প্রেরণা নিশ্চয়। কিছু মানুষের সঙ্গে আমি কমিউনিকেট করতে পারবো আমার কবিতার মাধ্যমে এটা কিছু কম মোটিভেশন নয়। যদিও কবিতার পাঠক চিরকালই কম। হয়তো এখনও কম। কিন্তু সেটা ভেবে কেউ কবিতা লেখা ছেড়ে দেয়নি বা কমিয়ে দেয়নি। কবিতা যখন ভিতর থেকে আসে, তখন তা কবিকে দিয়ে লিখিয়ে নেয়। লিখতে বাধ্য হয় কবি। কে কবে সেই কবিতা পড়বে না পড়বে সেই ভাবনা কবি ভাবেন না। অন্তত সেই মুহূর্তে নয়। যদিও পড়া বা না পড়া কবিতার কোন সমস্যা নয়। সেটা পাঠকদেরই সমস্যা। ভালো কবিতা না পড়লে তা থেকে যিনি বঞ্চিত হন তিনি পাঠকই।

যে ভালোবাসার মূল্য দেয় তাকে মনে মনে সঙ্গী করে নেয় মানুষ। কবিতা ভালোবাসার মূল্য দেয়। যিনি লেখেন, তাঁর কাছে কবিতা একটা ভাষা। অন্তরের কথাগুলি, হৃদয়ের আবেগ সমূহ ক্রমশ জমতে জমতে এক সময় একটা দুর্বার ধারায় বয়ে যেতে চায়, বিস্ফোরণের মত চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে চায়। সেই চাওয়াটা আসলে প্রকাশ পাওয়ার আকুলতা। কবিতা দিয়ে আমি সেটাই প্রকাশ করি।

কোথায় যাই কবিতার খোঁজে? না, প্রকৃতির কাছে আমি কবিতার তেমন প্রেরণা পাইনা। দেশে এবং বিদেশেও চিরহরিৎ বৃক্ষের গভীর জঙ্গলে কিম্বা সাদা বালির মরুভূমিতে, আটলান্টিকের সৈকতে কিম্বা আল্পসের কোলে বসে কবিতা লেখার কোন তাগিদ অনুভব করিনি কখনো। কবিতার খোঁজে আমি নিজের ভিতরে যাই, নিজেকে দেখি, চারপাশের বহমান সময়টাকে দেখি। তা থেকেই উঠে আসে কবিতা।

নিজেকে জানা, নিজেকে আবিষ্কার করার একটা অন্য আনন্দ আছে। আমি ঠিক কিরকম ভাবনা চিন্তা করতে পারি, প্রেম ভালোবাসা, সুখ দুঃখ সহ পুরো জীবন সম্বন্ধে আমার বোধ ঠিক কিরকম, কতটা আনন্দ হলে কিরকম উল্লসিত হই বা কতটা দুঃখ পেলে ভীষণ মুষড়ে পড়ি এগুলো বুঝতে চাওয়া মানুষের সহজাত অভিলাষ। কবিতায় কিভাবে এইগুলো প্রকাশ করতে পারি তার একটা এক্সপেরিমেন্ট করার সুযোগ থাকে। সেগুলোও অন্তত আমার ক্ষেত্রে কবিতা লেখার প্রেরণা।

কবিতার সঙ্গে আবেগের সম্পর্ক যে কত নিবিড় তা তো আর আলাদা করে বলে দিতে হয়না। ভিতরের আবেগ যখন জমতে শুরু করে, একসময় তা ছুটে বেরিয়ে আসতে চায়। চাওয়া পাওয়া, ব্যাথা বেদনা, সুখ দুঃখ প্রাপ্তি অপ্রাপ্তি এগুলো ভিতরে তৈরে করে আবেগ। সেই আবেগের হাত ধরে বেরিয়ে আসে কবিতা। বলতে পারি কত কারণেই যে কবিতা লিখি। ভালো লাগায় মন যখন আনন্দে পরিপূর্ণ থাকে, কবিতা লিখি। ভালো না লাগায় ফিরে যাই সেই কবিতার কাছেই। সে এলে কবিতা লিখি, সে না এলেও লিখি। ভালোবাসলে কবিতা লিখি, ভালো না বাসলেও লিখি। মিলনে লিখি, বিরহেও। কবিতা যে কতশত কারণে এবং অকারণেও আমাকে দিয়ে তাকে লিখিয়ে নেয়!

কবিতা কেন পড়ি? কবিতা পড়ে বড় সুখ পাই। নিজের চেনা জানা জগতের বাইরে যে আরও বৃহত্তর জগত, তার সন্ধান পাই কবিতায়। নিজে যা বলতে পারিনা, অন্যের কবিতায় যখন তা পাই, তখন এক অন্যরকম আনন্দে মন ভরে ওঠে। সে এক অনির্বচনীয় অনুভূতি। ঠিক বলে বোঝানো যায়না। সেও এক আবেগ, এক অদ্ভুত সৌন্দর্য ভাবনা। এত দুর্ভাবনা আর অনিশ্চয়তা নিয়ে যে কাটছে আমাদের বর্তমান জীবন, অজানা আশংকায় স্তব্ধ হয়ে আছে পুরো পৃথিবী, একটি ভালো কবিতা পড়লে সেই অবস্থাটা থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারি। আবার আত্মবিশ্বাস আর অধিকারের জায়গাটা ফিরে পাই। সেই অর্থে কবিতা একটা আশ্রয়ের মত, যার কাছে যাওয়া যায় যেকোন সময়, কোন অজুহাত ছাড়াই।

তাছাড়া কবিতা পড়ি নিজে আরও একটি কবিতা লিখতে চাই বলে। কবিতা পড়া আর লেখা দুটোই যে ওতোপ্রোত ভাবে জড়িয়ে থাকে জীবনে।

তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়। কবি ও গদ্যকার। জন্ম ও বাস ভারতের পশ্চিমবঙ্গরাজ্যের বাঁকুড়া জেলায়। এবং কর্মসূত্রে কলকাতায় বসবাস। বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত। লেখালেখি শুরু সত্তরের দশক থেকে। প্রকাশিত বই: ‘মার্কিন মুলুকে, মফস্বলে’(২০২০)। যৌথভাবে প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ: ‘রক্তাক্ত চন্দনের বনে’(১৯৭৭) এবং ‘সপ্তর্ষির আলো’(২০১৫)।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ