অন্নপূর্ণা

চিত্রলেখা দে
গল্প
Bengali
অন্নপূর্ণা

ঘাড়ের কাছটা টনটন করে উঠল বলাইয়ের, বালিশটা বড্ড চিটে হয়ে গেছে। কতদিন যে মালতী রোদ্দুরে দেয় না কে জানে! ঘাড়ে হাত বোলাতে বোলাতে চৌকিতে উঠে বসে বলাই।

বাইরে সবেমাত্র আলো ফুটেছে। মেঝেতে পাতা বিছানাটাও এখনও তোলেনি মালতী, হয়ত বাইরে গেছে।দেবীপক্ষ শুরু হয়ে গেছে। মালতী সেই মহালয়ার দিন থেকেই রোজ ঘর, দোর উঠোন গোবরজল দিয়ে নিকিয়ে রাখে। হয়ত গোবর আনতেই গেছে গোয়ালঘরে। ছিন্ন আঁচলে হাত মুছতে মুছতে ঘরে ঢোকে মালতী। ততক্ষণে বলাই বিড়িতে সুখটান দিচ্ছে।

মালতী, আজ বালিশ একটু রোদে দিস তো, বড্ড ঘাড়ে ব্যথা করছে।

আচ্ছা… আমি আসলে অত উঁচু চালে নাগাল পাইনি তো টগরের বাপ, তাই দিতে পারিনি। এখন উঠুনটা নিকিয়ে রেকেচি, ধূলো আর উড়বেনে… চাটাই পেতে রোদে দেবো।

টগর কোতায় রে মালতী?

কূলকুলুতি পূজোর ফুল তুলচে তো দেকলুম, আজ শিউলিতলা বিচিয়ে আচে ফুলে। ওর ফুল কুড়োনো হলে আমি গোবর দিয়ে উঠুনে গোলা দোবো।

হুমমম্, আমি বাইরে থেকে আসি, তুই চা বসা তাড়াতাড়ি।আজ তাড়াতাড়ি নন্দীবাবুর গদিতে যেতে হবে

আচ্চা…

বলাই দাওয়ায় বেরিয়ে চালের বাতায় গোঁজা নিমের দাঁতনটা নিয়ে উঠোনে নামে। টগর একটা বেতের সাজিতে একটা একটা করে শিউলিফুল কুড়িয়ে রাখছে, কয়েকটা লঙ্কাজবা আর নীল অপরাজিতাও আছে। দুদিকে লাল ফিতে দিয়ে বিনুনি বাঁধা মেয়েটা বাপকে দেখেই দৌড়ে এল।

বাপ, ওই উঁচু ডালে কয়েকটা লাল জবা ফুটেচে, পেড়ে দেবে?  মায়ের থানে দে আসব।

দাঁড়া, আমি হাতমুখ ধুয়ে এসে দিচ্চি।

ঠিক আচে বাপ
বলাই হাঁটতে হাঁটতে মাঠের দিকে চলে যায়…

গরমচায়ে ফুঃ দিতে দিতে মেয়েটা রোল করা বাসি রুটি খাচ্ছে, ওরা স্বামী-স্ত্রীতে খেঁসারীর কড়াই আর তেল মাখিয়ে মুড়ি। মেলা কাজ পড়ে আছে মালতীর। আজ পুকুরে ফেলে রাখা তালপাতায় গেঁড়ি উঠবে কি না কে জানে? সেন বাড়ির পিসিমা কাল রাতে বলে রেখেছে চারটি গেঁড়ির জন্যে। দিলে একসরা চাল তো পাওয়া যাবে, এই বাজারে সেটাই বা কম কী!
চালের ওপর চালকুমড়োটা এতদিন ধরে বাঁচিয়ে রেখেছে দুজনে, ঘোষাল বাড়ির পূজোয় বলির জন্যে দেবে ওটা। এবারে পূজো অনেকটা পিছিয়ে, কার্তিক মাসে, মেয়েটা জন্মেছিল এই মাসে। একটু পায়েস রান্না করতে হবে।
বলাই যাবে নন্দীবাবুর গোলায়। শহরের বড়লোকদের পূজোতে চিংড়ি, পমফ্রেট সব সাপ্লাই যাবে, আড়তে যেতে হবে একবার।

টগর কালকে মাটি মেখে রেখে দিয়েছে, প্রদীপ গড়ে চালে শুকোতে দেবে, চারিদিকে জ্বালতে হবে এ মাসটা। তিনটে আড়ম্বড়হীন মানুষ নিজেদের দৈনন্দিন কাজের হিসেব করতে করতে সকালের জলখাবার শেষ করে।

বলাই আড়তে ঢোকার আগে ওর ছেঁড়া হাওয়াই চটিটা খুলতে খুলতে শুনতে পায়…
এবারে শুধু চিংড়ি, পমফ্রেটের মতো লোভনীয় মাছই নয়, শহরের এক বড়লোক বাবুর জন্য নন্দীবাবু এক নারীমাংসের ও ব্যবস্থা করেছে!

বলাই ভিতরে ঢুকতেই মনোজ আর নগেন চুপ করে যায় কিন্তু বিহারী বলে ওঠে,আরে বলাইকে লুকিয়ে কী হবে! আসল কাজটা তো ওই করবে। আমাদের সকলে লোকে চেনে,কিন্তু ভালোমানুষ বলাইকে কেউ সন্দেহ করবেনে সহজে!

বলাই তোর আজকে রাতে ফাঁকা আচে তো?

কী করতে হবে গো বিহারীদাদা?

শোন্ বলাই, মাছের সাথে একটা মেয়েকে তুই ফেরীঘাটে পৌঁছে দিবি, কেউ তো শুধোলে বলিস তোর কুটুম বাড়ির মেয়ে, বুঝলি?

মেয়েটা কত বড়ো বিহারীদাদা?

ওই তোর মেয়ের থেকে একটু বড়ো… তেরো-চোদ্দ হবে বোধহয়।

একা একা এই বয়সের একটা মেয়ে ফেরীঘাটে কী করবে! ফেরীঘাটে পৌঁছাতে তো সেই বিকেল গড়িয়ে যাবে।

তাতে তোর কী রে হতভাগা? তুই পৌঁছে দিবি ব্যস্…

বলাই চুপ করে থাকে, সারাবচর যারা অন্নজলের ব্যবস্থা করে, তাদের মুখের ওপর আর কি কতা চলে!

আজ রাতে তোর বাড়িতেই মেয়েটা থাকবে বুঝলি! নন্দীবাবু এখানে কোন হাঙ্গামা চান না।

আমার তো একটাই ঘর, কোতায় রাকব!

দূর দূর…তোর গোয়ালে একপাশে ফেলে রাখবি, হাত-পা-মুখ বেঁধে। ভোর রাত থাকতেই বেরিয়ে পড়বি, তোর বউও টের পাবেনা। নগেন নিয়ে আয় তো মালটাকে,দেখে রাখ বলাই সন্ধ্যেবেলা এসে নিয়ে যাবি।

বলাই দেখল টুকটুকে ফর্সা একটা রোগা মেয়ে, চুল কোমর ছাপিয়েচে। চোকে আগুনের চাহনি, যেন ভস্ম করে ফেলবে কেউ! কিন্তু হাত – মুখ বাঁধা, তাই কিচু বলতেও পারচে না।

বিহারী বলাইয়ের হাতে কিছু টাকা দিয়ে বৌ-মেয়ের জন্যে নতুন জামাকাপড় কিনে নিয়ে যেতে বলে। আর বলাইকে এই কাজটা না করলে সারাজীবনের মতো আড়তের কাজ থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে, সেটাও বলে দেওয়া হল। বলাই মেয়েটার আগুনে চাহনি আর টাকা কটা নিয়ে কাঁপতে কাঁপতে আড়তের বাইরে আসে। বড্ড জ্বালা করচে গোটা শরীর। এর আগে কোনদিন এমন হয়নি।

মালতী গেচে ঘোষালবাড়ির ঠাকুরদালানে। পূজোর বাসন মাজবে সেটা বলতে। টগরও মায়ের সাথে গেচে, ওর কুলকুলাতি পূজোর প্রদীপদুটো এখনও টিমটিম করে জ্বলচে। বলাই মেয়েটাকে আস্তে আস্তে এনে গোয়ালে রাখে। গরুটা কদিন আগেই বাচ্চা দিয়েছে, বাছুরটাকে একদম কাচছাড়া করতে চায় নে।  ঘুঁটে আর খড়ের আড়ালে মেয়েটাকে বসায় বলাই। না খেয়ে মেয়েটা নিস্তেজ হয়ে পড়েছে কেমন ঢুলুঢুলু চোক।গোয়াল থেকে বেরিয়ে আগড়টা টেনে দিয়ে বলাইও ঘোষালবাড়ির দিকে যায়।

ঠাকুরদালানে বড়ঠাকরুণ দাঁড়িয়ে নির্দেশ দিচ্ছেন কার কী কাজ। বড়ঠাকরুণ বাল্যববিধবা, এবাড়িতে বহুকাল আছেন। বলাই গেলে পটুয়াদের সাথে ওকেও এককাপ দেয় ঘোষালবাড়ির চাকর বাবুয়া।  বলাই এবাড়ির পূজোয় কামার দয়ারামের সহকারী,  বলিতে সাহায্য করে। কথা শেষ হলে তিনজনে ঘরে ফেরে।

সকালের কড়কড়ে বাসি ভাত, পোড়া লঙ্কা দিয়ে মাখা আলুভাতে আর চুনোমাছের টক। সকলের থালায় বেড়ে দেয় মালতী। নিজে একটা কানাভাঙা শানকিতে দুটো মুড়ি মিশিয়ে নেয় কম পড়া ভাতে। বলাই ভাত নিয়ে নাড়াচাড়া করে, গোয়ালে রাখা মেয়েটার চোখদুটো বড় টানছে ওকে। আজ ঠাকুরদালানে মায়ের মূর্তির চাইতে অসুরের দিকেই বারবার চোখ চলে যাচ্ছিল বলাইয়ের। অস্থির অস্থির লাগছিল বড্ড। এর আগে আড়তের মাছ টুকটাক চুরি করেছে বা মাছের পেটিতে লুকিয়ে রাখা প্যাকেটে রাখা সাদা সাদা পাউডারের গুঁড়ো ফেরী ঘাটে দিয়ে এসেচে, যেটা নাকি লক্ষ লক্ষ টাকা দাম!  কিন্তু কোন মেয়েকে এমন নৈবেদ্য সাজিয়ে দিয়ে আসেনি কোনদিন। মেয়েটা কতদিন খায়নে কে জানে? এ ভাত আর মুখে রুচবেনে ও জানে।

মালতী দাওয়া থেকে ঘরে উঠে যায় একটা পিঁয়াজ আনতে। সুযোগ বুঝে বলাই ভাতের থালা আর জলের বোতলটা নিয়ে উঠে যায়, আর চেঁচিয়ে বলে…

আমার খাওয়া হয়ে গেচে মালতী, আমি ফাঁক থেকে একবার আসচি…

গোয়ালের আগড়টা আস্তে করে ঠেলে ঢোকে বলাই। বড্ড অন্ধকার,ভাগ্যিস হাতে করে ছোট্ট টুনটুনি আলোটা এনেছিল। গোয়ালের এদিকটায় রাখলে মালতী বুঝবেনে।

মেয়েটার মুখের বাঁধনটা খুলে দেয় বলাই, মেয়েটা কিছু বলার আগেই বলাই ফিসফিস করে বলে ওঠে…আমার বাড়ির চারপাশে ওদের লোক আচে, তোর চিৎকার শুনলে চলে আসবে, চুপচাপ খেয়ে নে মা ভাতকটা। মেয়েটার বোধহয় ক্ষিদে পেয়েছিল। বলাই ভাতকটা মেয়েটার মুখে তুলে দেয়। মেয়েটাও গোগ্রাসে গিলতে থাকে। বোতলের জলটা খাইয়ে আবার মেয়েটার মুখ বেঁধে দিয়ে বলাই বাইরে আসে। পেটের ক্ষিধেটা থাকলেও মনের অস্বস্তিটা চলে গেছে অনেকটাই।

রাতে বিছানায় শুয়ে ছটফট করতে থাকে বলাই,দুবার উঠে ঢকঢক করে জল খেল। একবার গোয়ালের আগড়টা খুলে মেয়েটাকে দেখে এল। দুটো পায়ে মশায় কামড়ে লাল করে দিয়েছে। আহাঃ রে… কার বাড়ির মেয়ে কে জানে? তারা হয়ত কত খুঁজছে! নন্দীবাবু ভালো লোক নয় এটা বলাই জানত, তা বলে মেয়েছেলে নিয়ে ব্যবসা! ছিঃ ছিঃ।

ঘড়িটা টিকটিক করে বাজছে,সাড়ে তিনটে বাজে রাত। বলাই মালতীকে ধাক্কা দিয়ে মালতীকে ডাকে।

মালতী ধড়মড় করে উঠে বসে।

আমি বেরোবো একন।

কোতায় যাবে?

আড়ত থেকে মাল নিয়ে ফেরীঘাটে যেতে হবে।

ফিরবে কখন?

জানিনি, আজ রাতে, নাহয় কাল ভোরে।

কালকে পূজো শুরু হয়ে যাবে, জানো তো?

হুমমম রে…আমি বেরোলুম, তুই আর খানিক ঘুমিয়ে নে।

মালতীর চোখে ধূলো দেওয়ার জন্য বলাই কিছুটা রাস্তা হনহন করে হেঁটে গিয়ে আবার চুপিসাড়ে গোয়ালের দিক দিয়ে ঢোকে। মেয়েটাকে পাঁজাকোলা করে তুলে আস্তে আস্তে ওর ডিঙি নৌকোয় বসায়। মেয়েটা অজ্ঞান হয়ে গেচে নাকি! কোন সাড়া নেই তেমন। আড়তের পাশের খালের ধারেই নগেন মাছের পেটি নিয়ে অপেক্ষা করছিল। নৌকায় তুলে বলাই রওনা দেয়। বড় খাল পেরিয়ে নদীতে এসে যখন পড়ল, তখন সবে ভোরের আলো ফুটচে। পূব আকাশ লালে লাল। ছপ ছপ করে দাঁড় বাইতে বাইতে বলাই আনমনা হয়ে যায়। মাঝনদীতে আসার পর মেয়েটার মুখের বাঁধনটা খুলে দেয় বলাই। একটু জল দেয় ওর চোখেমুখে। মেয়েটাও বলাইয়ের দিকে ভ্যাবলার মতো তাকিয়ে থাকে। যেন ওর সব কথাই ফুরিয়ে গেছে, কোন অভিযোগও নেই কারও বিরুদ্ধে। একজন শিকারকে নিয়ে তার শিকারির কাছে পৌঁছে দিতে চলেছে বলাই। খানিকক্ষণ পর মেয়েটা মুখ খুলল…

একটু জল দেবে আমায়?

দিচ্চি দাঁড়া

বলাই জলের বোতলটা এগিয়ে দেয় মেয়েটাকে…

মেয়েটা জল খেয়ে নদীর দিকে তাকিয়ে আনমনে বলাইকে বলতে থাকে…

জানো কাকা, আমার মা নেই.. বাপ আবার বিয়ে করেছে। এই মাও খারাপ ছিল নি। আমাকে দুবেলা খাটালেও খেতে দিত পেটভরে দুবেলা। চলছিল সবই ঠিক করে। কিন্তু আমার বাপের অসুখটাই আমাকে শেষ করে দিল গো। বাপের কিডনি খারাপ হয়ে গেছে, অনেক টাকা চাই। মা দোরে দোরে ভিক্ষে করতে যেত, সঙ্গে আমিও। হঠাৎ একদিন বাস থামার জায়গায় দুটো লোক মাকে কিছু বলে চুপিচুপি, আর মা ঘাড় দোলায়। পরে শুনলুম আমাকে শহরে এক বাবুর বাড়িতে বাচ্চা দেখার কাজ করতে হবে। মাসে মাসে তিনহাজার করে টাকা, সঙ্গে থাকা-খাওয়া। শুনে মায়ের আগে আমিই রাজী হলুম। তখন কি আর জানতুম, আমাকে নৈবেদ্য সাজিয়ে কোন বাবুর কাছে পাঠানো হচ্ছে। কালকে যে দুটো লোক তোমার সাথে কথা কইছিল, ওরা আমাকে বাস থেকে নামিয়ে একটা ঝোপে নিয়ে গিয়ে বেঁধে ফেলে রাখে জানো।বাঁধা অবস্থায় আমার সারাশরীরে ওদের নোংরা হাত খেলা করেছে, আমার খুব বমি পাচ্ছিল।

জানো কাকা কিন্তু কালকে তোমাকে আড়তে দেখার পর আমি বুঝেছিলুম তুমি ওদের মতো নয়, আর আমাকে যখন খাইয়ে দিলে তুমি, আমার বাপের মুখটা বড্ড মনে পড়ছিল।

বলাইয়ের দুচোখে জলের ধারা। এ মেয়েকে কী করে তুলে দেবে ওদের হাতে!  হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখ মোছে বলাই। মা রে….

দূর থেকে সাইরেন বাজিয়ে একটা লঞ্চ আসচে। পুলিশের লঞ্চ নাকি!  বেআইনি জিনিস চালানের উপদ্রব বেড়েচে খুব এলাকায়…তাই হয়ত টহলে বেরিয়েচে। এখন কী করবে বলাই?

তবে মেয়েটাকে বাঁধা নেই, এই যা রক্ষে!

কাকা, তুমি সত্যি আমায় দিয়ে আসবে ফেরীঘাটে?

বলাই কী বলবে ভেবে পায় না। তার টগরকেও যদি কেউ এমনি ভাবে! না না…কক্ষনো নয়। কিছুক্ষণ ভাবে বলাই…তারপর ওর ডিঙিনৌকোটা লঞ্চের কাছাকাছি নিয়ে যায়। যতটা গলার জোর ছিল চিৎকার করে ডাকে…

বাবুউউউ….

একজন পুলিশ অফিসার বেরিয়ে আসেন শুনে।

বলাই বলে…মেয়েটাকে ও নদীর চরে কুড়িয়ে পেয়েচে, ও গরীব মানুষ কী করবে? তাই পুলিশ হেপাজতে ওকে রাকতে চায়।
পুলিশ অফিসারের অভিজ্ঞ চোখ মেয়েটার হাতের বাঁধনের দাগ আর চেহারা দেখে বুঝতে কিছু অসুবিধা হয়নি। তিনি মেয়েটাকে লঞ্চে তোলার ব্যবস্থা করেন। মেয়েটা যাবার আগে বলাইয়ের দিকে তাকায়।বলাই বৈঠার দাঁড় মেয়েটার হাতে দিয়ে বলে… এটা দিয়ে জোরে মার একবার আমাকে, নাহলে আড়তে গেলে আমাকে ওরা মেরে ফেলবে। বলব,তুই আমাকে মেরে পালিয়ে গেচিস।

কিন্তু কাকা,আমি তো পুলিশের কাছেই যাচ্ছি!

তা হোক…তোকে দেখে সন্দেহ তো করেনে ওরা। নগেনরা ভাববে আমিই হয়ত…আমার পরাণটা বাঁচানোর জন্য অন্তত এটুকু কর মা…

মেয়েটার ইচ্ছে না থাকলেও বৈঠা দিয়ে বলাইকে আঘাত করে, ওর কপাল কেটে রক্ত পড়ে। মেয়েটা মুখে কাপড় চাপা দিয়ে ফুঁফিয়ে কেঁদে ওঠে। পুলিশের লোকজন ওকে তুলে নেয় লঞ্চে। অফিসার সবটা দেখেও নীরব। এমন ঘটনা তিনি বিগত অনেক বছর দেখছেন। অনেক মাঝিই এরকম করে, দারিদ্র্যের কাছে সকলে বিকোয় না। তিনি তাই আর কিছু জিজ্ঞেস করেন না। কারণ এই নারীপাচার অনেক ওপরতলার মানুষের সাথে যুক্ত। যাদের মুখোশটা বড় শক্ত।তাই অপরাধ দেখেও চুপ করে যেতে হয়।

মেয়েটা পুলিশ লঞ্চে যাওয়ার আগে বলাই ট্যাঁক থেকে কালকের পাওয়া টাকাটা মেয়েটার হাতে দিয়ে বলে…তোর বাপকে দিস মা।
মেয়েটা হাতপেতে টাকাটা নিতে চায় না। তবু জোর করে দেয় বলাই।

তোর নাম কী রে?

অন্নপূর্ণা…

অন্নপূর্ণা!  তুই প্রার্থনা করিস আমার টগরের যেন এমন দশা কোনদিন না হয়।

হবে না গো কাকা তুমি যে বড্ড ভালোমানুষ গো। তোমার টগর খুব ভালো থাকবে দেখো।

পুলিশ অফিসার লঞ্চ থেকে বলাইকে একটা স্যালুট ঠোকেন সবার অলক্ষ্যে। এটা ওর পাওনা।

বলাই ফিরে এসেছে নগেনদের আড়তে। নগেন খুব চেঁচামেচি করলেও বলাই যে ধরা পড়েনি,  এটার জন্য খানিক আশ্বস্ত হয়… বলাইকে ছেড়ে দেয়।

কুলকুলাতি কুলের বাতি…

কার্তিক মাসে তুলা রাশে ধূপ-ধূপায় নমোঃ

টগর মন্ত্র পড়ে পূজো করছে। মাটির প্রদীপের আলোয় দুদিকে বিনুনি বাঁধা টগরের মুখখানা যেন মাদূর্গার মুখের মতো লাগছে।পাশে মালতী দাঁড়িয়ে।গরুটাও বাছুরটাকে চেটে চেটে আদর করছে।

বলাই দাওয়ায় বসে উপভোগ করে… দ্রিমদ্রিম করে ঢাক বাজছে। ঠাকুরদালানে ঢাকীরা এল বোধহয়।মায়ের পূজো শুরু হয়ে গেল… শক্তিরূপী মা… মাগো

চিত্রলেখা দে। লেখক। প্রকাশিত বই দুটি। একটি দ্য ক্যাফে টেবল থেকে ২০১৮ বইমেলায় প্রকাশিত "ছিন্নপত্রের স্বপ্নসাজি", আর একটি খোয়াবনামা থেকে ২০১৯ বইমেলায় প্রকাশিত "মনপাহাড়ের চুপকথারা"।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..