অপরিণত যে খেলা 

অমিত মুখোপাধ্যায়
অণুগল্প
Bengali
অপরিণত যে খেলা 

একটা যুদ্ধ বেধেছে দূরে। সঠিক বললে আক্রমণ। ঠিক তা-ও নয়,স্বার্থ বাঁচাতে সংঘর্ষের আয়োজন বলা চলে। অথবা শত্রুপক্ষের দাদাগিরি রুখতে ছোটো ভাইকে শাস্তির পাঠ দেওয়াও হতে পারে।
এ এক যুদ্ধ যাকে সমর্থন তো নয়ই, অতনুকে নিন্দেও করতে হয় নানা অব্যয় ব্যয় করে। এ তো বিনা উস্কানিতে স্রেফ জমির দখল নয়!তাই দুনিয়া জুড়ে সে বিচিত্র মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ করে।
অতনু ভাবে, কার হাতে গেছে ভূখণ্ডের ভার! ছোটো ভাই নামক পুতুলটি নিজের ওজন না বুঝে কেবল লোভের সুতোর ভরসায় দোলে এত বেশি জোরে, যে ছিঁড়ে পড়ে যায়। নাচার বদলে জোটে আছাড়!
এ এক কৌতুকাভিনেতা যে বীর সাজতে গিয়ে হারায় কোমরের জোর। অতনু পড়েছে যে চার বছর ধরে চলা ধারাবাহিকে রাষ্ট্রনায়কের ভূমিকায় অভিনয় করে সে স্বপ্ন দেখে যে বাস্তবেও তাই হবে। কমেডির নামেই রাজনৈতিক দল তৈরি করে সে, জিতেও যায় নির্বাচনে। কিছু আশ্চর্য নয় যে ধারাবাহিক আর সিনেমা দেখা গণজন নানা দেশে ও রাজ্যে ভাবে পর্দার মুখোশ বাস্তবের বীর-মুখ হয়ে উঠবে! নিজেকে ঠকানোর এ খেলায় এই ভাবেই পুতুলকে জীবন্ত দেখানো হয়।
মার যত খায়, সাথি দাদারা যত প্রবোধ দেয় হাত তুলে, ভরসা তার তত যায় ফরসা হয়ে। শেষে সে ঘরে ঘরে বোতল-বোমা বানাতে বলে। আঠের হাজার অ্যাসল্ট রাইফেল বিলি করে সংসারীকে বলে অস্ত্র ধরতে। অতনুর মুখে দু:খেও হাসি ফোটে, এ যেন গৃহীর ভূমিকা ছেড়ে সৈনিকের অভিনয় করো! ফল কী হলো! ষোলো লক্ষ নাগরিক আতঙ্কে দেশছাড়া!
এ এক নেতা যে বন্ধুদের দোষ দেয়, কাঁদে, কখনো লুকোয় মাটির তলায়, ভাষণ দিতে উঠে আসে। যে রাগ দেখিয়ে আগ্রাসীকে ফাঁসী দেবার কথা বলে। অতনুর মনে পড়ে যে এই লোকটাই মসনদে বসার পরে বলেছিল শক্তিধর প্রতিবেশীর সাথে চলা দীর্ঘ বিবাদ মিটিয়ে ফেলবে। হায় রে, হাতের পাখির বদলে সে দেশকে বিপদে ফেলল ঝোপের বড় পাখিদের ডাক শুনে! এর আগে দু’তিনটে অঞ্চল হাতছাড়া করেও শেখে নি সে।
এ যুদ্ধ দেখিয়ে দেয় কে বা কারা বসে আছে ডালে পাতায় মাথায়!তারা বাজার নিয়ে নাচার, সম্পদ কাড়তে ডাকে বিপদ। ব্যবসা আর ব্যবসা হলো আজ সব ঝগড়ার আদত কারণ। যে এক কুড়ি দেশ গোপনে অস্ত্র দিয়ে চলেছে, তারাও প্রকাশ্যে মুখের রুমাল সরাতে চায় না!
একে নাকি আবার যুদ্ধ বলে, অতনু ভাবে, এ তো একতরফা গলা টিপে ধরা! প্রতি দিন দোষারোপ, নিত্য শহর বন্দর বিলোপ! নিরীহ নাগরিক নিধনের সাথে সংখ্যাহীন সৈন্যক্ষয়! দেশকে দেউলিয়া করা!
দিন যায়, এক সময় এই অসম সমর, যার কথা শোনা রোজনামচা হয়ে দাঁড়ায়, ক্রমে গুরুত্ব হারাতে থাকে। লোকে কাজ করে, কেনাকাটা সারে, আর বিশ্রামে বিনোদন হিসেবে ধ্বংসলীলা দেখে। আরও উদাসীন হয়ে যায় মানুষ। সে দেশ থেকে নিজের সন্তানের ফেরা নিয়ে থাকে তার যে টুকু উদ্বেগ! তেলের দাম আর সুদের হারে সীমাবদ্ধ থাকে চিন্তা। শেষে কিল চড় ঘুষি লাথির মাত্রায় নেমে আসে দুই দেশের এই দৈনিক দীনতা।
অতনু অনুভব করে, দূরের একটা যুদ্ধ কেমন করে যেন কাছে এসে গেল! একটা গুরুত্বপূর্ণ সংকট, যা নিয়ে আগেই অত সতর্কতা, হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছিল, যা নাকি হতে পারত আরেক বিশ্বযুদ্ধ, তা হয়ে গেল কেমন নন-ইস্যু, স্রেফ পাতি এক সমস্যা!

জন্ম:১৬ আগস্ট, ১৯৬২, কৈশোর কেটেছে মালভূমি, পাহাড় ও নদীঘেরা মাইথনে। কলকাতায় প্রথম গল্প প্রকাশিত ১৯৯৩ সালে "ঘোড়সওয়ার" ও "কবিপত্রে"। শৈবাল মিত্র ও হীরেন চট্টোপাধ্যায়ের নামাঙ্কিত পুরস্কারে বাধিত। উপন্যাস লেখা "কড়ি ও কোমল" এবং "নন্দন" পত্রিকায়। উপন্যাসিকা প্রকাশিত হয়েছে "আরম্ভ" পত্রিকায়।...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ