অপেক্ষা

রুমা ব্যানার্জি
ছোটগল্প
Bengali
অপেক্ষা

আজকাল আর সব কথা স্পষ্ট করে মনে পড়ে না। সারাদিন জিনিস হাতড়াতে হাতড়াতে সময় কেটে যায়। মাঝে মাঝে চমকে উঠি চেনা গলার ডাকে, কিন্তু মনে করতে পারিনা কার গলা। কোথায় যেন শুনেছিলাম।

– “ওওওও দিদা! কি খুঁজে যাচ্ছ?

ওওওও মাআআ! কি অনাছিষটির কাণ্ডি! দুকুর বেলা খাও নি কো? তুমাকে কয়ে গেনু যে। নাইয়ে দে, থালায় খাবার বেড়ে দিনু। তা খাও নি কো? কেনে গা?

– খাবার দিয়েছিলি বুঝি? কে জানে মনে ছিল না। তা দে খেয়েনি।

-সেকি গো দিদা? সেই কোন সগালের নান্না, সেকি আর খাতি পারবে? লিচয় আলিয়ে গেছে। রোসো দিনি আগে চারডি মুড়ি দে হরলিস্ খাও।

-তার চেয়ে একটু চা দে। দিবি?

-অঅঅ চা খাবে? আনতেছি গো। তুমি চুপডি করি বসো।

এই বলে সেই মেয়েটা বেড়িয়ে গেল। এদিকে কি খুঁজছি কিছুতেই মনে করতে পারছি না। থাক ওই মেয়েটাকেই বলব খুঁজে দিতে। কিছুই আর সামলাতে পারি না। সেইজন্য শাড়িও পরি না। মেম সাহেবের মত নাইটি পরি। নিজেকে দেখে নিজেরই হাসি পায়। ঠিক যেন সঙ। কত শাড়ি ছিল, এই মেয়েটাকে ক’টা দেব ভাবছি। আঁচলের কাছটা ছিঁড়ে গেছে দেখলাম।

এখন বরং একটু টিভি দেখি। কিন্তু এত হাঁপানির কষ্ট বেড়েছে যে উঠতে পারছি না। মেয়েটা কিন্তু বেশ চটপটে। আর কেমন মিষ্টি করে কথা বলে। ঠিক যেন কতদিনের চেনা। ওকেই বরং বলি টিভি চালিয়ে দিতে।

-‘অঅঅ মেয়ে! শোনো। একটু টিভিটা চালিয়ে দাও তো।

শুনেই ভিজে হাত ছেঁড়া আঁচলে মুছতে মুছতে একগাল হেসে ঘরে ঢুকলো।

আমার দিকে হাত বাড়িয়ে বলল- দাও।

– আমি আবার কি দেব?

– রিমোড গো। সকালে বেরুনোর আগে তোমারে দেয়ে গেলুমনি? কোন খানে থুলে?

-তুই সকালে এসে ছিলিস? সদরে তো তালা থাকে। তুই ঢুকলি কি করে?

-উউফফফ দিদা। আবার ভুলে গেছ? বুড়ি তুমি সব ভোলো কিন্দু তালা দিতি আর টিপি দেখতি ভোলো না। সরো দেকি রিমোড ডা কোই থুলে দেকি।

এইবলে সে আমার সব পোঁটলা পুঁটলি সরাতে লাগল। ওগুলো সব আমার দরকারি জিনিস। পাছে ভুলে যাই তাই সব খাটে তুলে রাখি। দিল সব লণ্ডভণ্ড করে! আমার জিনিস কেউ হাত দিক সে আমার মোটেই পছন্দ নয়। মুখখানা ব্যাজার করে বললাম,

– এই মেয়েটা, সব জিনিস ঘেঁটে ফেলবি নাকি? দাঁড়া আমাকে বল। আমি দিচ্ছি। এদিক ওদিক হলে আবার খুঁজে পাওয়া মুশকিল হবে।

– দিদা, তুমি কি দুকুরে টিপি দেকোনিকো? যে চেয়ারে রেকে গেনু সেগানেই পড়ে আচে দেখতেচি। রিমোড খুঁজচিলে বুজি?

-হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিক বলেছিস। তা তুই কি রোজ আসিস?

-অঅঅমাআআ! বোজো কাণ্ডি। দিদা আমায় চিনতি পারচো না নাকি? হায় রে কপাল।

ওওও দিদা আমি বেলা গো, বেলা। গত ছ’মাস তো তোমার নান্না করি। তার আগে পাঁচ বচ্ছর ঠিকে কাজ করেচি। নেহাত আমি গরিব মানুষ তাই মাস গেলে ট্যাকা নিতি হয়। তাও তো তুমি এমন অসহায় মানুষ বলি তো ছান করিয়ে দি, বিকালে টিপিন আর রাতের খাবার খাইয়ে তপে বাড়ি যাই। ঘরেও তো রোগা মানুষডারে দেখতি হয় বলো? নিজের ছেলেপুলে থাকলি অন্য কতা। তা তোমারে দেকে শিক্ষে হয়চে। এতগুলান সমত্ত ছেলে পুলে, নাতি নাতনি, ভরা সংসার। কেউ এগডা খপর নেয় নে। ঝেঁটা মারি অমন বেটা বেটির মুকে। নেহাত আমার উপায় নেই। নইলে রাতে থাকতুম। এমন ভুলো মানিষ্যি রে একা একা রাখি যাই।মনডা কান্দে গো।

তোমার ছেলেদের এত ভাবার ট্যেম নেই। তবে হ্যাঁ, মাসে মাসে অবশ্যি তারা মাইনে দিতে কেপ্ননতা করে না। তোমারই বাঙ্কের ট্যাকা তো। আর খরজ বলতি তো দুটি নিরমিষ ভাত তরকারি। তাও খাতি চাও না।

তা দিদা আজ আর রুটি খেয়ে কাজ নেই। দুটো গরম ভাত আর ডাল দি। সঙ্গে কড়কড়ে করে আলু ভাজা খাও। করি?

– করবি? তা কর। আমার ছোট খোকা খুব ভালো বাসে অমন আলু ভাজা। একটু বেশি করে ভাজ। কলেজ থেকে এলে দিস কনে। ঘরের জন্য দুটো নিয়ে নিস।

– সত্যি সত্যি! এমন মায়ের যে অমন কুসন্তান কি করি হয় তা ভগমান জানেন। তোমার সেই আদরের ছোট ছেলে আজ ক’বচ্ছর রাজার হাটে বড় পাসাদ করিছে গো। সে আর আসতিচে তোমার আলু ভাজা খাতি। যত্তোসব!

– ঠিকই বলেছিস রে। আমার সব ভুল হয়ে যায়। সেই তোদের বাবু চলে যাবার পরেই তো যে যার মত চলে গেল। তবে আসা যাওয়া, ডাক খোঁজ সবই করে।

-থাক্ থাক্। আর শাক দে মাচ ঢাকতি হবে নে। তোমার কে কত খপর নেয় সে এই বেলা রানী ভালোই জানে। বাবু মারা যাওয়ার সময় ছাড়া ওই একপাল নাতি নাতনিদের তো মুক দেকিনি। ছেলে মেয়েরাও মাস ভাগ করে নিয়েচে দেকা করতি আসার। মুক খুলিওনি।

-‘আহ্ চুপ কর। আমি আমার স্বামির বাড়ি ছেড়ে যেতে চাইনি। এই বেশ আছি।

– তা থাকবেনি? একা একা এই পাষাণপুরীতে সুস্থ মানুষ পাগলপারা হয়। তুমি তো কোন ছাড়।

– চিন্তা করিস না। আমার ডাক এসে গেছে। আর বেশিদিন তোকে জ্বালাব না।

– শুনতি খারাব লাগলে ও তাই যেন হয় গো। এবার গোবিন্দ যেন তোমাকে পায়ে ঠাঁই দেন। কাপড়ে চোপড়ে গুয়ে মুতে যেন তোমাকে না থাকতি হয়।

-রাধা গোবিন্দ। রাধা গোবিন্দ।

-নাও গো চলো। সারাদিন উপোসী রয়েচ। আমার নান্না কমপিলিট। চট করে গরমগরম খাপার খেয়ে নাও। এবার থেকি খাইয়ে তবে যাব। এসো। এসো। পিত্তি পড়ে পেটে তো পিলে বাড়বে।

-‘তুই কত আর করবি?

-শোন বুড়ি বাজে বকবে না। যা বললুম করো। এই নাও খাবার আগের অষুদটা খাও। নাও ধরো।

বেলার বকুনি খেয়ে হাত ধুয়ে খেতে বসলাম। গরম ধোঁয়া ওঠা ভাত। চিরদিন আমি ছেলে পুলেদের বেড়ে দিয়েছি। হয়তো কোন জন্মে এই মেয়েটার কাছে আমার ঋণ ছিল সেটাই শোধ করছে। ওর আন্তরিকতা আর ভালবাসা দিয়ে এবার সে আমায় ঋণী করে রেখে দিল।

খাওয়া শেষে। বেলা তালা দিয়ে চাবি আমার হাতে দিয়ে চলে গেল। চাবির থোকা গলায় ঝুলিয়ে আমি ফিরে এলাম ঘরে। আবার শুরু হল অপেক্ষা।
টিভিতে কে যেন কি পড়ে যাচ্ছে। তবে কথাগুলো যেন আমার উদ্দেশেই বলা…

বিদায়ের সেহনাই বাজে। নিয়ে যাবার পালকি এসে দাঁড়ায় দুয়ারে সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে এই যে বেঁচে ছিলাম দীর্ঘশ্বাস নিয়ে যেতে হয় সবাইকে অজানা গন্তব্যে হঠাৎ ডেকে ওঠে নাম না জানা পাখি অজান্তেই চমকে উঠি জীবন, ফুরালো নাকি! এমনি করে সবাই যাবে, যেতে হবে…

সম্পাদনা: জোবায়েন সন্ধি

রুমা ব্যানার্জি। কবি ও গল্পকার। জন্ম ভারতের পশ্চিমবঙ্গরাজ্যের কলকাতায়, ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে। রুমা মূলত প্রকৃতি প্রেমিক ও সাহিত্য অনুরাগী। পড়াশুনা করেছেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভিদ বিদ্যায় স্নাতক, এরপর আইন ও ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর। ছেলের উৎসাহেই লেখালিখির জগতে আসা।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

পটচিত্র

পটচিত্র

  সৌম দাদুর কাছে থাকতে ভালোবাসত। গ্রামের নাম পাঁচুন্দি।আশেপাশে প্রচুর গ্রাম।সবাই সকলের খবর রাখে।সৌমদীপ এখানকার…..