অবেলায় রাঙানো মুকুল

মেহেরুন্নেছা
গল্প
Bengali
অবেলায় রাঙানো মুকুল

রাতের নিস্তব্ধতার যবনিকাপাত ঘটতে চলেছে। দু’একজন পথচারীর পদচারণা ভোরের নির্জনতাকে বিদায় জানালো। পর্দার ফাঁক গলে মরমি বাতাস শিহরিত করলো শিহাবের সদ্য জাগ্রত নয়ন যুগলকে।

আড়মোড়া ভাঙ্গতেই নীরার কথা মনে পড়লো। তড়াক করে শিহাব বালিশের পাশ থেকে মোবাইলটা নিয়ে মেসেঞ্জারে ঢুকলো। গতরাতে নীরা নক করেছিলো। হয়তো কোনো মেসেজ পাঠিয়ে থাকতে পারে। সোহানা যদি জানতে পারে একেবারে সর্বনাশ হয়ে যাবে।

শিহাবের অনুমান ঠিক। ইনবক্স খুলতেই নীরার বেদনার রাগে রাঙানো মেসেজ পেয়ে গেলো। মেসেজটিতে দ্রুত চোখ বুলিয়ে শিহাব তার চেয়েও দ্রুতগতিতে মেসেজটি মুছে দিলো। গোপন অস্থিরতাকে একরকম জোর করেই তার গোপন রাখতে হচ্ছে। নীরার মেসেজের কথাগুলো বুকের ভেতর ওলট-পালট করে চলেছে। নীরা লিখেছে, “গতরাতটা অনেক কষ্টে পার করেছি। আসলে ভার্চুয়ালি আপনার সাথের সম্পর্কটা আমাকে নিরন্তর কাঁদায়। আমি যেন আপনাকে পেয়েও হারিয়ে ফেলি। আমি জানি, এ সম্পর্কের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। একজীবনে আমরা একে অপরকে দেখবোও না। কোনো একদিন হয়তো সম্পর্কটা চিরকালের তরে হারিয়ে যাবে। সেদিন আপনি আমার হৃদয়টাকে কাচের টুকরোর মত খানখান করে চলে যাবেন। বাহ্যত সেটাই আপনার চিরায়ত ভুবন। নিশ্চিত এটা একদিন না একদিন ঘটবেই। তবুও কেনো যে আপনাকে ছেড়ে যেতে পারছিনা! জানেন, অনেক চেষ্টা করি ছাড়তে। কিন্তু তা আর হয়ে উঠেনা। এই আমি নিজের হৃদয়ের শৃঙ্খলে নিজেই বন্দী হয়ে আছি। তবে কি এই মরীচিকা অন্বেষণেই আমার জীবন আমৃত্যু ঘুরপাক খাবে?”

পাশেই সোহানা অঘোরে ঘুমুচ্ছে। তার ফর্সা মুখ শিহাবের কাছে দিনদিন আরো ফ্যাসফ্যাসে হয়ে উঠছে। সোহানার নীরস মুখ এখন আর শিহাবকে টানেনা। সোহানাকে নিয়ে রাতভর মিলনমালা গাঁথতে ইচ্ছে করেনা। সোহানাকে সে যেভাবে চেয়েছিলো সোহানা সেরকম হতে পারলোনা।

শিহাব সুদর্শন। শিহাবকে সোহানা প্রচন্ড ভালোবাসে। কিন্তু যার প্রতি সোহানার এই ভালোবাসার অর্ঘ্য তার মন পড়ে আছে অন্যজনে। শিহাবের কাছে সোহানার ভালোবাসার মাখামাখি বড্ড আটপৌরে। এখানে রোমাঞ্চ নেই, ভালোবাসায় আদিমতা নেই। শিহাব বুনো ভালোবাসা চায়। বুনো ভালোবাসা কি সেটাই সোহানা ধরতে পারেনা। ভালোবাসা এক তরুণ বৃক্ষের ন্যায় যাকে যত্ন করে বাঁচিয়ে রাখতে হয়। মাঝে মাঝে মনে হয় সোহানা প্রতিনিয়ত ভালোবাসার অজ্ঞানতায় ভালোবাসাকে খুন করে চলেছে।

সোহানা শিহাবের স্ত্রী। তারা দুজনেই পেশায় চিকিৎসক। তাদের সাত বছরের সন্তান ইশতিকে নিয়ে সোহানা ঢাকায় থাকে। শিহাবের পোস্টিং ঢাকার কাছাকাছি একটা উপজেলায়। শিহাব তার আম্মুসহ উপজেলায় বসবাস করে। সপ্তাহ শেষে বৃহষ্পতিবার বিকেলে সোহানা আসে ইশতিসহ। মা-ছেলে শুক্রবার দিনটা শ্বাশুড়ি ও শিহাবের সঙ্গে কাটিয়ে শনিবার ভোরে আবার কর্মস্থলে চলে যায়। চাকুরীর কারণে সোহানাকে ঢাকায় থাকতে হয়। সে একটা বেসরকারি মেডিকেল কলেজের শিক্ষক।

একসময় মনে হয়েছিলো সোহানাকে না পেলে শিহাবের জীবন ঢেকে যাবে বেদনার মঞ্জরীতে। কিন্তু জীবনের এই বেলায় এসে মনে হলো, সোহানা তার জীবনে ভুল মানবি। সে একদমই তার মনের মত নয়, বিছানায় নিঃসাড় নিষ্প্রাণ। গতরাতে সোহানাকে মনে হলো একদলা মাংসপিন্ড। অথচ বেলাশেষে সোহানার সাথেই তার মিলিত হতে হয়।

কোনো এক নিঃসঙ্গ রাতে শিহাবের শূন্যমন্দিরে অকস্মাৎ ধরা দিয়েছিলো এক অচেনা রূপসী যার নাম নীরা। প্রাণের টানে এসে গুঞ্জরিয়ে উঠলো এই স্বপনরূপিণী। এ যেন তপ্ত মরু আঙ্গিনায় এক সমুদ্র একাকীত্বে চুপিচুপি বসন্তশোভা নিয়ে হাজির তার ললিতা। উচ্ছ্বাসে নিশ্বাসে ভরা রিনিরিনি নূপুরের স্পন্দন এই নীরা। শিহাবের কাছে সে এক অস্পৃশ্য মদিরার অদেখা নিশীথিনী। আবার ভাবে, নীরা তার অবেলায় রাঙানো মুকুল। কখনো কখনো মনে হয়, নীরা যেন শিহাবের জীবনে অশান্ত প্রসাদবৃষ্টি।

নীরা হলো সেইজন যাকে শিহাবের প্রথম দেখাতেই ভালো লেগে গিয়েছিলো। বছর দুয়েক আগে, সারাদিন ঝড়ো হাওয়া বইছিল। আকাশ তোলপাড় করে চলছিল টানা বর্ষণ। চারদিকে অজ্ঞাত দুর্যোগের আশঙ্কা। রাতের বেলায় বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে মোবাইলটা হাতে নিলো শিহাব। জগত সংসারের কঠিন সত্যটাকে গুটিয়ে রেখে কিছুক্ষণের জন্য হারিয়ে গেলো ভার্চুয়াল জগতে। ফেসবুকেই ঢুকলো সে প্রথম।

বাহিরে উন্মত্ত বাতাস আর বৃষ্টির প্রতিযোগিতা সমস্ত শহরকে সিক্ত করে চলেছে। মনে হচ্ছে এই বুঝি শুরু হলো মহাপ্রলয়ের তান্ডবনৃত্য। হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেলো। নিকষ কালো আঁধার চিরে মুহূর্তে শুরু হয়ে গেলো বিদ্যুতের চমক। এমনি ঝড়ো ভয়ঙ্কর রাতে ফেসবুকে ‘পিপল ইউ মে নো’ তে একটা চাঁদমুখে শিহাবের আনত দৃষ্টি আটকে গেলো। তাড়াতাড়ি সে আইডিটির প্রোফাইলে ঢুকলো। বাহ! একটি এনজিওর কর্মকর্তা এই সুবেশা নারী। টাইম লাইনে যতই ঢুকলো ততই তার দেহমনে এক ছন্দ খেলা করতে লাগলো। অচেনা কুসুমের গন্ধে বিভোর হয়ে পড়লো শিহাব।

একটু আগের বর্ষণমুখর রাত ছিল শিহাবের জন্য প্রচন্ড মন খারাপ করা রাত! ইদানীং প্রায়ই অজানা কারনে মনটা বিষাদাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। হয়তো অতৃপ্তিরা জীবন নৌকায় ঝেঁকে বসেছে। কিন্তু এক্ষণে সদ্য দেখা প্রোফাইলের মধুবায়ে হৃদয়ের গহনে মৃদুমন্দ সুর আনমনে গুনগুনিয়ে উঠলো। কি ভেবে সে নীরার আইডিতে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠিয়ে দিলো। তারপর একসময় ব্যাপারটা ভুলেও গেলো।

তারও বহুদিন পর নোটিফিকেশন আসলো, সেই চাঁদমুখের অপ্সরি অবশেষে রিকুয়েস্ট একসেপ্ট করেছেন। সৌজন্যতাবশত হোক আর খেয়ালবশত হোক, শিহাব সঙ্গে সঙ্গে নক করে বসলো মেসেঞ্জারে। কিন্তু ওদিক থেকে কোনো সাড়া নেই। বারবার নক করে, কেনো জানি সাড়া আর মেলেনা।

শিহাবের প্রোফাইল পিক এবং টাইম লাইন দেখে শিহাব সম্পর্কে কিছুই জানা যায়না। কিন্তু অঘটনের শুরুটা ছিলো সেদিন, যেদিন শিহাব তার একটি সেমিনারের কিছু ছবি আপলোড করেছিলো। সেদিনই তার সেই কাঙ্খিত নারীর মেসেজ আসলো মেসেঞ্জারে। আর তাতেই শিহাবের বিরহী পৃথিবী আচমকা চঞ্চল হয়ে উঠলো।

…….”হ্যালো….! আমি নীরা! প্রোফাইল পিক দেখেতো আপনাকে চেনা যায়না হে সুদর্শন! আজ আপনার অনেকগুলো ছবি দেখলাম! আপনিতো অদ্ভূত সুন্দর এক আকর্ষনীয় পুরুষ! কিছু মনে করবেন না। আমি বোধহয় একটু বেশি বলে ফেললাম। সরি ফর এভরিথিং।”

…….”আরে নাহ! আমি শিহাব! কেমন আছেন আপনি ? অবশেষে আপনার কঠিন নীরবতা ভাঙ্গলো তাহলে?”

নীরাও সোৎসাহে মেসেজ করলো, “আমি ভালো আছি! আপনি কেমন আছেন?”

তড়িৎগতিতে শিহাব লিখলো,”একদম ভালো নেই!”

……”কেনো..? কেনো..?

……”আপনার জন্য।”

……”আমি আবার কি করলাম?”

……”আপনি আমার সর্বনাশ করেছেন!”

…….”কিভাবে?”

শিহাব এ প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গেলো। পাল্টা লিখলো, “আচ্ছা! আপনি এতো সুন্দর কেনো?”

এবার নীরা চুপ! কেবলি সুনসান নীরবতা।

প্রায় মাসখানিক সে শিহাবের কোনো মেসেজের রিপ্লাই দেয়নি। কিন্তু শিহাব অনবরত মেসেজিং করেই যাচ্ছে। নীরাও কি এক অমোঘ টানে মেসেজগুলো দেখে যায়। যখন মেসেজ দেখে তখন তার ঠোঁটের কোনে পুলকিত হাসির মৃদু স্পন্দন ফুটে ওঠে।

একদিন নীরা জানতে চাইলো “আপনি কিসে আছেন? আপনার পরিবারে কে কে আছে? কোথায় থাকেন?”

শিহাব সবই বলে গেলো। অতঃপর নীরা আবারও মাসখানিকের জন্য নীরব হয়ে রইলো।

কিন্তু শিহাবের ক্লান্তি নেই। সে নীরার সান্নিধ্য পেতে ব্যাকুল, “হ্যালো নীরা! আমাকে আর কতগুলো নদী সাঁতরাতে হবে আপনার একটু কথা শোনার জন্য? জীবনে চলার পথে কেউ কেউ নয়নে লেগে যায়। আপনি আমার হঠাৎ পাওয়া সহসা দ্বীপ! আমার চারপাশে প্রচুর জল। তারপরেও আমি তৃষ্ণার্ত! আমি অহর্নিশি বনপথে আপনার নূপুরধ্বনি শুনতে পাই। আপনি আমার অন্ধকারের সন্ধ্যাযুথী! আমার মনকে আমি আপনার দ্বারে সঁপে দিয়েছি। আপনি আমার জন্ম-জন্মান্তরের সাথী। আমি সত্যি আপনার সান্নিধ্য কামনা করি।”

এ লেখার পর নীরা আর সাড়া না দিয়ে পারেনি।

……”আপনি আমার সম্পর্কে কতটা জানেন?”

……”প্লীজ নীরা, আমার রাণী! আমি আপনাতেই অন্ধ! আমি কিছুই জানতে চাইনা। আমাকে বুঝতে চেষ্টা করুন।”

…..” আপনি আমার সম্পর্কে কিছু না জেনেই খুব উত্তেজিত হয়ে উঠেছেন।”

…..”ঠিক আছে বলুন!”

…..”আমি একজন বিধবা। চল্লিশোর্ধ এক নারী। আমার দুটি সন্তান আছে।”

….”তাতে কি? আমার বয়সও চল্লিশ! আমারও একটা বাবু আছে। তাছাড়া আমি আপনার চেয়ে পাঁচ বছরের ছোট। ভালোবাসার ক্ষেত্রে এসবতো কখনো অন্তরায় হতে পারেনা। আমার আপনাকে ভালো লাগে। এটাই আমার কাছে সত্যি।”

…..”আপনি আমাকে বিয়ে করার সাহস রাখেন?”

…..” জানিনা! জানতে চাইনা! শুনুন, আমি বিয়েতে বিশ্বাসী নই। বিয়ের মাধ্যমে সমাজ অনেক কিছুই জোর করে চাপিয়ে দেয়। একজীবনে একটা মানুষকে একটা বিয়ে নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে বাধ্য করে এই ভ্রষ্ট সমাজ। একসাথে থাকা দুটি মানুষ সুখী হলো কিনা তা নিয়ে সমাজের মাথাব্যাথা নেই। দেখুন,আমি শুধু ভালোবাসা চাই। আমার আত্মার শান্তি চাই। আপনাকে মনে হলেই আপনার মাঝে বিলিন হয়ে যাই। আপনি কি তা বুঝেন? তাছাড়া ভালোবাসলেই বিয়ে করতে হবে এমনটা আমি বিশ্বাস করিনা, ধারণও করিনা।”

….” তাহলে এ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কি?” নীরা ব্যাকুল কণ্ঠে জানতে চাইলো।

শিহাবের সেই একই উত্তর, ” আমার কাছে এসব প্রশ্নের উত্তর নেই। আমি আপনার সান্নিধ্য চাই। কেবল ভার্চুয়াল সান্নিধ্য। গোপনে! ভীষণ গোপনে! যে সম্পর্ক কেবল আপনাতে আর আমাতেই থাকবে।”

……” আপনি কি জানেন, আপনি আমাকে কোথায় টানছেন? এভাবে সম্পর্ক রাখা আর জেনেশুনে বিষপান করা একই কথা। হোক না ভার্চুয়াল, কিন্তু পরকিয়ায় সুখ নেই।”

…..”না নীরা! আপনার সাথে আমি একমত হতে পারলামনা। পরকিয়া শব্দটিতে আমার প্রবল আপত্তি। পরকিয়া সমাজ কর্তৃক আরোপিত নেতিবাচক শব্দ যা ভালোবাসার গভীরতাকে হালকা করে দেয়। আকাশ-পাতাল কাঁপিয়ে আপনাকে আমি আমার ভালোবাসার কথা বলে গেলাম। ইচ্ছে হলে আপনি আমাকে ভালোবাসতে পারেন। যদিও আমরা দুজন সামাজিকভাবে দুমেরুর বাসিন্দা। সমাজের কঠোর বেড়াজাল ডিঙিয়ে হয়তো বিয়ের পিঁড়িতে বসা কখনই আপনার-আমার পক্ষে সম্ভব নয়; কিন্তু ফেসবুক-মেসেঞ্জার আমাদের বড্ড কাছাকাছি এনে দিয়েছে। জীবন একটাই। আমরা দুজন যদি ভালোবেসে সুখ পেতে পারি তাওতো জীবনের কাছ থেকে কম প্রাপ্তি নয়।”

এক নিঃশ্বাসে শিহাব প্রায় এক পৃথিবী সমান কথা লিখে ফেললো। আবারও সে নীরার কাছে জানতে চাইলো, নীরার কোনো ভালোবাসার মানুষ আছে কিনা। নীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে জবাব দিলো, তার এমন কেউ নেই। আর বাচ্চাদের রেখে তার পক্ষে বিয়ে করাও সম্ভব নয়।

সাথে সাথে শিহাব বলে উঠলো, “তাহলে এতো পিছুটান কেনো? আজ থেকে আমার নীরাকে আমি ‘তুমি’ বলেই ডাকবো! ওকে?”

নীরা লিখলো, “ওকে!”

তারপর যা হওয়ার তাই হলো। দুজনের কথোপকথন অবিরাম চলতে লাগলো। কথা যেন আর ফুরোয়না। ধীরে ধীরে দুজনের আঙিনায় কেবলি দখিনা হাওয়া বয়ে যেতে থাকে। কি নেই সেই কথার কাব্যে! সাহিত্য, শিল্প, সঙ্গীত, রাজনীতি, সংস্কৃতি, ধর্ম, প্রেম, ভালোবাসা, পরকিয়া, পরিবার সবই আছে। একসময় তারা কঠিন ভালোবাসায় জড়িয়ে পড়লো। ভার্চুয়ালি তারা মিলিত হয়। নিজেরা নিজেদের জৈবিক চাহিদা মেটায়। শিহাবের ভাষায় এটাই আত্মিক ভালোবাসা। ভালোবাসা থাকে মগজে। ভালোবাসা থাকে ভাবনায়।ভালোবাসা থাকে মননে।

তবুও নীরা বেশ কয়েকবার শিহাবকে দেখতে চেয়েছে। শিহাব ধীরে-সুস্থে নীরাকে বুঝিয়ে বলতো, “বাংলাদেশ একটা দ্বীপের মতো। কেউ দেখে ফেললে তোমার-আমার সামাজিক মর্যাদা ক্ষুন্ন হবে। তার চেয়ে বরং এভাবেই আমরা বেশ আছি।”

নীরা ভেবে দেখলো, ঠিকইতো। এ সমাজ কোনোভাবেই তাদের সম্পর্ক মেনে নেবেনা। শিহাবের সংসারের কথা মনে হলেই নীরার হৃদয় মোচড় দিয়ে ওঠে। মানসলোকের শুভ্র আলোরা তখন ধপ করে নিভে যায়। প্রেম নদীর উতলা হাওয়া নিমেষেই তিরোহিত হয়। বেদনায় ভরে যায় তার জীবন পেয়ালা।

একসময় নীরা অনুভব করে, শিহাবকে নীরা প্রচন্ড ভালোবেসে ফেলেছে। শিহাব এখন নীরার দেখাশোনা করে। প্রনয়িনীর শরীর খারাপ করলে ভার্চুয়ালি চিকিৎসা দেয়। অনুভবে দুজন দুজনের শরীরের ঘ্রাণ নেয়। ইচ্ছে মতো দুজন দুজনের ছবি দেখে। দিনমান নীরা থাকে ফুরফুরে। ধীরে ধীরে অপ্সরী নীরা আরো অপরূপা হয়ে উঠলো। আনমনে নীরা ভাবে, শিহাব তার সন্ধ্যার মেঘমালা, তার সাধের সাধনা।

এমনি করে ভার্চুয়াল প্রেমগাঁথা দিনের পর দিন রচিতো হতে লাগলো। এই প্রেমকাব্যে খুনসুটিও ছিলো, সন্দেহ ছিলো, অভিমান ছিলো, রাগ ছিলো, ক্ষোভ ছিলো, অতৃপ্তি ছিলো। তবুও বেলাশেষে তারা ছিলো দুজন দুজনার।

বৃহষ্পতিবার আসলেই নীরা আর শিহাবকে পেতোনা। বৃহষ্পতিবার শেষে, শুক্রবার পার করে, শনিবারের সকালে সোহানা ঢাকা চলে গেলেই শিহাব আবার নীরার কাছে ফিরে আসতো।

আজকাল সোহানা শিহাবকে নিয়ে বেশ চিন্তিত। সোহানার প্রতি শিহাবের নির্লিপ্ততা দিন দিন বেড়েই চলেছে। শিহাব যেন কি এক ঘোরের মধ্যে আছে।

…..”এমরান…! এমরান…!”

কি যে হলো শিহাবের কে জানে! গোসলে ঢুকেই চেঁচামেচি শুরু করে দেয়। একটা না একটা কিছু ফেলে রেখে সে গোসলে ঢুকবেই। তারপর লংকাকান্ড বাঁধিয়ে ফেলবে।

শিহাব রাতভর বুঁদ হয়ে থাকে ফেসবুক-মেসেঞ্জারে। বিরক্ত সোহানা এখন আর শিহাবের সাথে ঘুমোয় না। প্রযুক্তি তাদের একেবারে দুই মেরুর বাসিন্দা বানিয়ে দিয়েছে। ঢাকায় থাকলে বাচ্চাকে স্কুলে নিয়ে যাওয়া হতে শুরু করে সংসারের যাবতীয় ক্রিয়াদি সোহানাকেই সামাল দিতে হয়।

সোহানা এগিয়ে গেলো,”এমরানকে দোকানে পাঠিয়েছি। কি জন্য ডাকছো?”

…..”আমার টাওয়েলটা!”

সোহানা দ্রুত টাওয়েলটা এগিয়ে দিলো। তারপর হাতটা অবচেতনে ধীরে ধীরে বের করে আনলো। আনমনে যেন কিসের এক অপেক্ষা ছিলো সোহানার!

বিয়ের পরপর বৃহষ্পতিবারে যখন সোহানাকে শিহাব পেতো, তখন রোমাঞ্চে রোমাঞ্চে ভরে যেত দুজনার তনুমন! এভাবে টাওয়েল কিংবা শাবান এগিয়ে দিতে গেলে শিহাব আলতো করে সোহানার হাত চেপে ধরতো। তারপর ভেজা লোমশ হাত সোহানার শরীরের আরো গভীরে চলে যেতো।

লাজে রাঙা সোহানা তখন মৃদু আপত্তি জানিয়ে বলতো,” আহ! করছো কি! কেউ দেখে ফেলবে যে!”

সেই দিনগুলোতে এমনি করে সোহানাকে পেতে চাইতো শিহাব। কোথায় হারিয়ে গেলো সেই দিন! বৃহষ্পতিবার রাতটা এলেই সোহানার শরীর-মন তপ্ত হয়ে যেতো। এ যেন বাসরশয্যার অপেক্ষা।এখন আর সোহানার জীবনে কোনো বৃহষ্পতিবার নেই। অজান্তেই জীবনটা নিদারুণ ম্যাড়ম্যাড়ে হয়ে গেলো।

তারপরেও আজ বৃহষ্পতিবার! ঢাকার ব্যস্ত জীবন থেকে ছুটি নিয়ে সোহানা স্বামীর সান্নিধ্যে এসেছে একদন্ড নির্ভার সময় কাটিয়ে যাওয়ার জন্য। অতীতের সেই হারিয়ে যাওয়া প্রেমময় স্পর্শগুলো এখনো দিনমান থেকে থেকে সোহানাকে আলোড়িত করে। কেনো জানি এই রাত্রিতে শিহাবকে সে মনে-প্রাণে কামনা করছে। সারাক্ষণ শিহাবের কাছাকাছি ঘুরঘুর করলো, কারণে-অকারণে স্পর্শ করলো। নিজের মনেই ধরে নিয়েছে, হয়তো আজ শিহাব তার কাছে আসবে। জীবন খাতার বিবর্ণ পাতারা যতোই বুড়িয়ে যাক না কেনো তবুও আচমকা মানব শরীর সোহাগের উন্মাদনায় মেতে উঠতে চায়। কামনার উদগ্রতায় ভাসতে চায়।

কিন্তু বিক্ষিপ্ত সব ভাবনাদের পরাজিত করে, সোহানার চোখ কখন যে ঘুমের রাজ্যে পাড়ি জমালো, তা ভালোবাসার এই কাঙ্গালিনী টেরই পেলোনা।

হঠাৎ সোহানার ঘুম ভেঙ্গে গেলো। ধীরে ধীরে মনে পড়লো, সে তো কিসের অপেক্ষায় ছিলো। রাত প্রায় দুটো। নাহ! শিহাব আসেনি তার কাছে। নিজেকে চারপাশের তুলনায় প্রচন্ড ভারী মনে হলো। এ ভারিক্কি বিরহের, এ ভারিক্কি অবজ্ঞার, এ ভারিক্কি অবহেলার। চারপাশের সবকিছুই হালকা হতে হতে দূরে সরে যাচ্ছে। চকিতে খানিকটা অসহায়ত্বও পেয়ে বসলো সোহানাকে। রাগে-অভিমানে কিছুক্ষণ বসে রইলো। তারপর ধীর পায়ে এগুলো শিহাবের রুমের দিকে।

……”কি করছো এতো রাতে?”

এক টানে শিহাবের হাত থেকে মোবাইলটা কেড়ে নিলো সোহানা। শিহাব কিছু বুঝে উঠার আগেই সোহানার চোখ আটকে গেলো মোবাইলের স্ক্রীণে।

……” ছি…শিহাব! তুমি এতো নীচে নেমে গেছো! এ অসভ্য মহিলাটা কে…?”

শিহাব হতচকিত হয়ে গেলো। একি ঘটতে যাচ্ছে তার জীবনে! নীরার আর তার ভালোবাসার আখ্যান যে পুরোটাই সোহানা দেখে ফেললো। সে দুচোখে ধোঁয়া দেখতে লাগলো। সোহানাকে সে কি বলবে। নাহ! তার মাথা ভোঁভোঁ করছে।

দূর থেকে রাতের নৈঃশব্দ ভেদ করে কুঁইকুঁই করে ডেকে উঠলো অতৃপ্ত কুকুর। ঘরের সামনে কাঁঠাল গাছে ডানা ঝাপটালো এক নাম না জানা রাতের পাখি।

পরদিন শুক্রবার। নীরা ঘুম থেকে উঠলো বেশ দেরীতে। গতরাতে বৃহষ্পতিবার হওয়া সত্ত্বেও শিহাবকে সময় দিতে হলো। শিহাব গতরাতে নীরার জন্য বেপরোয়া হয়ে ওঠেছিলো। অথচ বরাবর শিহাব অন্তত বৃহস্পতিবার স্ত্রীর ভয়ে নীরা থেকে দূরে থাকে।

রুটিনের ব্যতিক্রম নীরাকে পুলকিত করেছিল বটে তবুও মৃদুলয়ে জিজ্ঞেস করলো, “সোহানা কোথায়?”

…..”বাসায়।”

…..”তাহলে তুমি যে আমার সাথে..?”

…..”আমার তোমার সাথে থাকতেই ভালো লাগে।”

নীরার মুখখানি ভালোবাসার আবেশে আরক্ত হয়ে উঠলো। জীবনের এ পর্যায়ে এসে এতোটা সুখ আশা করেনি। হোক না ভার্চুয়াল, তবুওতো ভালোবাসা! কখন শিহাব তাকে নক করবে সেই আশায় তার বেলা বয়ে যায়। ভালোবাসা দিয়ে কানায় কানায় ভরে দিয়েছে শিহাব তার হৃদয়তন্ত্রী।

যথারীতি দুজনের ভালোবাসার কথোপকথন চলছিলো। প্রেমের মুকুল অন্ধকার ফুঁড়ে সবে প্রস্ফুটিত হচ্ছিল মাত্র। হঠাৎ শিহাবের নীরবতা। তারপরেও নীরা বেশ কিছুক্ষণ মেসেজ পাঠিয়ে গেলো। কিন্তু ওদিক থেকে আর প্রতিত্তোর আসেনা। নীরার বদনে অজানা আশঙ্কা রেখাপাত করলো। নীরা যতই নক করে গেলো, গতরাতে শেষ অবধি শিহাবের কোনো সাড়া পেলোনা।

নীরা ভাবলো, শিহাব হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে। অতীতে বেশ কয়েকবার তাদের দুজনের এমনটা ঘটেছে। কখন যে বেরসিক ঘুম এসে তাদের প্রেমালাপে ভিলেন হয়ে দাঁড়াতো তা তারা টেরও পেতোনা।

অতঃপর দিনমান নীরা বুঁদ হয়ে রইলো ভালো-মন্দের অজানা আশঙ্কায়। সন্ধ্যা পেরিয়ে মৌনতার আঁধার নিয়ে শনিবার এলো। শনিবারেও শিহাব সাড়া দিলোনা।

আজ রবিবার। নিশ্চয়ই শিহাব নক করবে তার নিজস্ব সুরের সুন্দরতম আবেদন নিয়ে। এক অদ্ভূত অনুভূতিতে আচ্ছন্ন হয়ে আছে নীরা। শিহাবের প্রতি ভীরু বাসনারা কেবলি তাকে টলোমলো করে দিয়ে যায়। পুরো ধরণী সেজেছে কি এক অনুপম রূপ-বৈভবে। নীরাও রয়েছে ভালোবাসার নিঃসঙ্গ সাধনায়।

কিন্তু রবিবারের সন্ধ্যাপ্রদীপও যে সেদিন হয়ে গেলো মলিন। সেই রাতেও শিহাব এলোনা তার ভুবন-ভুলানো শুভ্র শব্দের তরঙ্গমালার কম্পন বল্লরী নিয়ে। খুবই সন্তর্পণে বিন্দু বিন্দু করে নীরার ভালোবাসার শিশিরগুলো সরে যেতে লাগলো। সুখের অজস্র মুক্তোদানারা নিরুদ্দেশ যাত্রায় নেমে পড়লো। সাত-পাঁচ না ভেবে সকল আতঙ্ক আর পান্ডুর বিবর্ণতা ছাড়িয়ে নীরা তড়িঘড়ি করে শিহাবের আইডিতে ঢুকতে গেলো।

একি দেখলো নীরা!

“Content not available”!

শিয়রের খোলা জানালা দিয়ে তখন হুড়মুড় করে ঢুকছে হিমেল বাতাস। মাত্র রাত্রির প্রথম প্রহর। প্রচন্ড ঝড় বইছে।নীরার মনে হলো তার জীবনের ঝড় আজিকার এই ক্ষিপ্ত ঝড়ের চেয়েও নির্মম।

মেহেরুন্নেছা। গল্পকার ও শিক্ষক। জন্ম ও বাস বাংলাদেশ। পেশাগত জীবনে তিনি কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..