অভিজাতদের পাড়া

তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়
ছোটগল্প
Bengali
অভিজাতদের পাড়া

ডেঞ্জেল আমার এক আমেরিকান বন্ধু। আসলে আফ্রিকান আমেরিকান। আগে আটলান্টায় থাকত। এখন লস এঞ্জেলেসের কাছে থাকে। আমি এবার লস এঞ্জেলেসেই এসেছি। মাঝেমাঝেই আসি এই দেশে। ছেলে কুশল আর বৌমা আকৃতি থাকে এখানে। দুজনেই ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনা করে। ক’টা মাস কোথা দিয়ে যে কেটে যায় বুঝতেই পারিনা। এবার এলাম অনেকদিন পর।
আসার আগেই কুশলের মুখে শুনেছিলাম ডেঞ্জেল চাকরি ছেড়ে লস এঞ্জেলেসে এসে একটা স্ট্রিট ফুডের দোকান দিয়েছে। দোকানটা নাকি খুব ভালো চলে। ওদের মধ্যে যোগাযোগ আছে। ফোনে মাঝেমাঝে কথা হয়। আমিই বলেছিলাম, ‘যোগাযোগ রাখবি। মানুষটা খুব ভালো। তোকে ভালবাসে। স্নেহ করে’।
আর একটা খবরও শুনেছি। ওর ছেলে এখন জেল খাটছে।
‘বলিস কি রে? কী এমন হলো’? আমি অবাক হয়ে যাই শুনে।
‘হ্যাঁ, মাদকের কেসে এরেস্ট করেছিল পুলিশ। এখন লস এঞ্জেলেসের কোনও জেলে আছে’।
মাদকের কেস। মারিজুয়ানা। এখানকার উচ্চারণে মারিহুয়ানা। আমাদের যেমন গাঁজা। এরকম অনেক খবরই শোনা যায়। যারা এর মহিমা জানে তারাই জানে। শুনেছি এই কেসে যারা জেলে যায় তাদের মধ্যে বাদামী আর কালো রঙের মানুষদের সংখ্যাই বেশি। যেন নেশা ওরাই করে। পাচার ওরাই করে। ‘কালো’ কথাটা ব্যবহার করতে চাইনি। কিন্তু পৃথিবীটা যে সাদা কালোয় আড়াআড়ি ভাগ হয়েই আছে। লুকবো কি করে? অবচেতনে হয়তো আমার মধ্যেও আছে।
ডেঞ্জেলের সঙ্গে আমারও যোগাযোগ আছে। মাঝেমাঝে মেল আদান প্রদান হয়। কিন্তু ও যে আটলান্টা ছেড়ে লস এঞ্জেলেসে চলে এসেছে সেটা আমাকে জানায়নি। কারণটা এখন অনেকটা বুঝতে পারছি। একটা কথা বলতে হলে তার পিছনের কথাগুলোও বলতে হয়। সেটা হয়তো আমাকে মেলে বিস্তারিত লিখতে চায়নি। কুশলকে হয়তো সহজেই ফোনে বলতে পেরেছে।
ওর ছেলের জেল খাটার খবরটা শুনে খুব খারাপ লেগেছে আমার। ডেঞ্জেলকে তো খুব ভালো মানুষ মনে হয়। সৎ, পরিশ্রমী। তার ছেলে মাদকের কারবারে জড়িত? কে জানে! জীবন বড় বিচিত্র। তবে এবারে এসে ওর সঙ্গে আবার দেখা হবে, এটা ভাবতে ভালো লাগছে। সেই প্রথম দেখার পর আর দেখা হয়নি ওর সঙ্গে। যদিও সেই দেখা হওয়াটা খুব ভয়ের ছিল। আতংকের ছিল।
এর পিছনে কাজ করছিল সেই সাদা কালোর ব্যাপারটা। ঘটনাটা দশবছর আগের। আমরা তখন প্রথম আমেরিকায় আসি। সেবার আটলান্টায়। কুশল তখন আটলান্টায় থাকত। আমি আর আমার স্ত্রী একদিন সন্ধ্যার দিকে একটা শপিং কমপ্লেক্স থেকে হেঁটে হেঁটে ফিরছি। একসময় বুঝতে পারি আমাদের পিছন পিছন কেউ একজন আসছে। মনে হলো আমাদের ফলো করছে। একবার তাকিয়ে দেখে নিলাম। একজন কালো মানুষ। আফ্রিকান আমেরিকান। পরনে ভীষণ ঢোলা টিশার্ট আর হাফপ্যান্ট। আমরা ভয় পেলাম। তারপর অনেক জোরে হাঁটতে শুরু করলাম। দিনের আলো নিভে গেছে অনেকক্ষণ। আমাদের একটু দেরিই হয়ে গেছিল ফিরতে। কুশল ফোন করে নিষেধ করেছিল। বলেছিল, ‘তোমরা অপেক্ষা কর। আমি একটু পরে ইউনিভার্সিটি থেকে বেরিয়ে তোমাদের নিয়ে আসছি’। আমরাই শুনিনি। ভাবলাম ও আসার আগেই আমরা পৌঁছে যাব। এই ভেবে হাঁটতে শুরু করলাম। তারপর পিছনে তাকানো। ওকে দেখে ভয় পাওয়া। কিন্তু গায়ের রঙ কালো বলে ভয় পাওয়া কেন?
সেইটাই ব্যাপার। কালো মানেই যেন অন্ধকার, ভয়ের। অপরাধ অনেকেই করে। কিন্তু আঙ্গুলটা বেশি ওঠে কালোদের দিকে। ইতিমধ্যে সেরকম কিছু ঘটেও গেছিল সেই এলাকাটায়। ছিনতাই, ব্রেক ইন, এমনকি খুন পর্যন্ত। প্রায় সবগুলোতেই তারা জড়িয়ে ছিল। তাই সন্ধ্যা হয়ে গেলে রাস্তায় একা একা তেমন কেউ হাঁটতনা। যেন পথে বেরলেই সেরকম কারও খপ্পরে পড়তে হবে। তারপর যদি কিছু ঘটে? ওকে দেখে আমাদের ভয়ের কারণও তাই। যদি কিছু ঘটে? ও তো কালো। বর্ণবিদ্বেষ খাতায় কলমে দূর হলেও মনের বিদ্বেষ দূর হয়েছে কোথায়? মনে মনে আমরা এখনও রেসিস্ট।
“হে, আর ইউ স্কেয়ার্ড”?
চমকে উঠলাম পিছন থেকে তার ডাক শুনে। আমাদেরকেই তো বলল। হ্যাঁ, আমাদেরকেই। আমরা জোরে হাঁটছিলাম তখন। প্রায় দৌড়ানোর মতো। কোনভাবে ও বুঝতে পেরেছে আমরা ভয় পেয়েছি। কিন্তু ওর ডাকে ভয় আরও বাড়ল। কি করব এখন? আরও তাড়াতাড়ি হাঁটব? নাকি দাঁড়িয়ে ওর কথা শুনব? ও পিছন থেকে এবার যা বলল তার মানে হলো, আমরা যেন ভয় না করি। ও আমাদের সঙ্গে আছে।
ও আমাদের সঙ্গে আছে? বিশ্বাস করব ওর কথা? না করেই বা উপাই কি? আর একটু গেলেই যদিও এপার্টমেন্ট গেটে পৌঁছে যাব, কিন্তু তাও তো মিনিট দুয়েক লাগবে। ও ছুটে এসে আমাদের সঙ্গ নিল।
মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ, মনে পড়ে গেল। তবু ওকে সামনে দেখে ভয় ভীতি ভরসা বিশ্বাস কোন বোধই যেন আর কাজ করছিলনা। যা হবার হবে ভেবে বললাম, ‘হাই’।
ও নিজের নাম বলল, ডেঞ্জেল। জানালো, ও আগেও আমাদের দেখেছে। আমাদের পিছনের কমপ্লেক্সে ও থাকে। স্ত্রী আর এক ছেলে নিয়ে। আমরাও পরিচয় দিলাম। আমরা ইন্ডিয়ান শুনে বলল, ‘আমার ইন্ডিয়া যাওয়ার খুব ইচ্ছা’। তারপর বলল, ‘চলো, তোমাদের গেটের পাশ দিয়েই আমি যাব।
সেই থেকে ও আমাদের বন্ধু হয়ে গেছে। যদিও আমার চেয়ে বয়সে অনেক ছোট। সেই ডেঞ্জেলের কুড়ি বছর বয়সী ছেলে এখন মারিজুয়ানা রাখার অভিযোগে জেল খাটছে। কুশলকে ও বলেছে, ওর ছেলে এসবের সঙ্গে জড়িত নয়। মিথ্যা অভিযোগে ফাঁসানো হয়েছে।
আমেরিকাতেও এরকম হয়? এরকম অভিযোগ আর বিতর্ক তো আমাদের বাংলা টিভি চ্যানেলে শুনে থাকি। ক্ষমতা অপব্যবহারের রাস্তাগুলো বোধ হয় সব দেশেই এক।দো
কুশল ডেঞ্জেলকে বলে রেখেছিল, আমরা আজ ওর সঙ্গে দেখা করতে যাব। নির্দিষ্ট সময়ে গিয়ে হাজির হলাম ওর দোকানের সামনে। দেখে খুব অবাক হলো ও। আনন্দিতও। বলল, ‘কী আনন্দ, তোমরা এসেছ! এই দেখ আমার রেস্টুরেন্ট’। বলে ওর দোকানটা দেখাল। ফাস্ট ফুডের দোকান। খুব বড় নয়। বলল, ‘এল এ তে ফাস্ট ফুড লোকে খুব ভালো খায়’। লস এঞ্জেলেসকে সংক্ষেপে ‘এল এ’ বলে সবাই।
ভাবলাম জিজ্ঞেস করি যে তুমি তো আটলান্টায় চাকরি করতে। এল এ তে ফাস্ট ফুডের দোকান দিতে এলে কেন? কিন্তু মনে পড়ে গেল, এটা হয়তো ওর দুর্বল জায়গায় আঘাত দেওয়া হবে। ওর ছেলে এখানকার জেলে আছে। আমি যে সেটা জানি তাও ও জানেনা। তাই চেপে গেলাম।
কিন্তু ও নিজেই বলল, ‘চলো, তোমাদের আর একটা দোকান দেখাব’।
‘আরও দোকান আছে তোমার’? জিজ্ঞেস করলাম আমি।
‘চলোই না’। বলে আমাদের নিয়ে চলল পাশের রাস্তায়। একজন সহকারীকে বলে এল, ‘একটু আসছি’।
এলাকাটায় অভিজাতদের বাস। রাস্তাঘাট ঘরবাড়ি মানুষজন দোকানপাট সবেতেই তার ছাপ স্পষ্ট। সেখানে তার আরও একটা দোকান? যাক, ভালোই গুছিয়ে নিয়েছে ডেঞ্জেল। ভাবতে ভাবতেই ওর সেই ‘আরও একটা’ দোকানের সামনে এসে গেলাম। ছোট গুমটির মতো। কিন্তু কিসের দোকান ঠিক বুঝতে পারছিনা। ভিতরে বসে রয়েছে এক যুবক। ডেঞ্জেল পরিচয় করিয়ে দিল, ‘এই আমার ছেলে, পিটার’।
কিছু বিস্ময় আর কিছু ভালোলাগা নিয়ে আমি মনেমনে বললাম, ‘বাঃ’! ডেঞ্জেলের মুখেও খুশির ছটা। আটলান্টা ছেড়ে এসে লস এঞ্জেলেসের শহরতলীতে থাকতে পারলে এই খুশি খুব স্বাভাবিক। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে বসে থাকতে হয়নি পিটারকে। বড়লোকদের এলাকায় রাস্তার ধারে ডেঞ্জেল ওকে দোকান করে দিয়েছে। মারিজুয়ানার দোকান। যে জিনিসের জন্য জেল খাটতে হয়েছে এতগুলো বছর, এখন প্রকাশ্যে পিটার তাই বিক্রি করে। এখন আর তা নিষিদ্ধ নয়। যারা কেনে, তারা বিত্তবানদের সন্তান। ডেঞ্জেলদের মতো লোকেরা সেখানে থাকতে পারেনা। এলাকাটা এতই অভিজাত।

তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়। কবি ও গদ্যকার। জন্ম ও বাস ভারতের পশ্চিমবঙ্গরাজ্যের বাঁকুড়া জেলায়। এবং কর্মসূত্রে কলকাতায় বসবাস। বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত। লেখালেখি শুরু সত্তরের দশক থেকে। প্রকাশিত বই: ‘মার্কিন মুলুকে, মফস্বলে’(২০২০)। যৌথভাবে প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ: ‘রক্তাক্ত চন্দনের বনে’(১৯৭৭) এবং ‘সপ্তর্ষির আলো’(২০১৫)।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

প্রাণপাখির খাঁচা ও মধুর মুক্তি

প্রাণপাখির খাঁচা ও মধুর মুক্তি

  চান্ডুলি গ্রামের মধু লরির ড্রাইভার।মধু বলছে মালিকের মাল লরি করে চলে যায় ত্রিপুরা,ঝাড়খন্ড,বিহার,উত্তরপ্রদেশ,পাঞ্জাব পর্যন্ত।…..