অভিজিৎ দাশগুপ্তের ৪টি কবিতা

অভিজিৎ দাশগুপ্ত
কবিতা
Bengali
অভিজিৎ দাশগুপ্তের ৪টি কবিতা

কাঁটাতার

কেউ কি হলফ করে বলতে পারে-এই বিশ্বাসভঙ্গের
দুনিয়ায় তোমার বিশ্বাসের কেউ দাম দেবে!!!
হৃদয় বিস্ফোরণের পর হৃদয় তোমার কথা শুনবে!!
আজ যে তোমার হৃদয়ে বাসা বেঁধেছে; কাল
নদীর এ পারে তুমি, আর সে নদীর ওপারে।
কাঁটাতারের বেঁড়া আঁকড়ে ধরে ক্ষতবিক্ষত। আজ
যাকে তোমার মনের কথা শুধাবে; কাল
সেই কথাই তোমাকে বিষন্নতার বানে ভাসাবে। আজ
নিজেকে উজাড় করে কাল একটুকরো চাঁদ পাবে।

আমি নিয়তি হতে পারি নি–আমি অসহায় কবি
হতে পেরেছি হয়তো;-তবুও শুধু তোমার জন্য থাক
পূর্ণিমার চাঁদ, ভোরের সাদা রং, মহুয়ার বনে
মাতাল হাওয়া, সবুজ ফসলে ভরা জমি আর
সুখে থাকার চাবিকাঠি; আর আমি না হয়
অন্ধকারে বসে সময়ের অপেক্ষায় রইলাম।
কারণ, বিজ্ঞান আজও হৃদয় নিয়ন্ত্রক যন্ত্র
আবিষ্কার করতে পারলো না।।

এ কেমন শহর

কালো ধোঁয়ায় মোড়া আমার শহরটা;
কৃত্রিম প্রসাধনে মুখের
আদল বদলায় শহরের মানবিক রূপ।
প্রতিক্ষণ পুরোনো রঙে নতুন রঙ ঢালা।
বদ রক্ত ছড়িয়ে পড়েছে সমস্ত শিরায়;
পক্ষাঘাতে স্থবির এই কৃত্রিম
রঙীন শহর।
সিমেন্ট, বালির বুক চিরে
লৌহদন্ডগুলোর দানবীয় উপস্থিতি।
খোলা আকাশও বিক্রি হয় জলের দরে।
পঞ্চাশতলা থেকে মাটির দিকে তাকালে
মানুষের অস্তিত্ব পিঁপড়ের মত লাগে।
আমার শহরের সাথে অন্য পাঁচটা
শহরের বিশেষ কিছু তফাৎ নেই;
তফাৎ নেই ভগ্ন মানসিকতায়,
হারিয়ে যাওয়া অনুভূতিতে,
বিকৃত চোখের ভাষা, শুকনো ঠোঁট।
ভালোবাসা চার দেওয়ালের
ছোট্ট ফ্ল্যাটে বন্দি।
এ শহরকে চিনতে মাঝে মাঝে ভয় লাগে,
প্রাণের শহরের বদলে যাওয়া রূপটা
বড্ড কষ্ট দেয়……।

 

যন্ত্রণার যন্ত্রণা

যন্ত্রণার মধ্যে একটা হাহাকার বোধ আছে,
সেও তো স্বাধীন হওয়ার ইচ্ছে রাখে,
তোমার, আমার ইচ্ছে হয়—
তার হবে নাই বা কেনো???
তার এ ইচ্ছে হলেই বুঝি দোষের!!
সেও তো চায় তার গভীর আক্ষেপে
কেউ তো তার পাশে বন্ধুর হাত প্রসারিত করুক।
সেও তো চায় তাকে অবহেলা না করে,
কেউ তো তাকে আনন্দে সামিল করুক।
যন্ত্রণার মধ্যে অন্য আরেক যন্ত্রণা
এক সুপ্ত কাহিনীর মতো
লুকিয়ে থাকতেও পারে।
আর আমরা চেতন, অবচেতনে
চাইলে বা না চাইলেও
সুন্দর বাক্সে সযত্নে যন্ত্রনাগুলোকে
তালাবদ্ধ করে রাখতে বেশি পছন্দ করি।
অলংকার হিসাবে সাজিয়ে
রাখতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি।
শাসকের মতো আমরা তাদের পীড়ন করি,
সেলুলার জেলের ছোট্ট অন্ধকার সেলে
বন্দিদশা কাটাতে তাদের বাধ্য করি।
অদ্ভুত এক টানাপড়েন……
সুযোগ পেলে বিদ্রোহ তো তারা করবেই।
এ তো বিশ্বজোড়া অমোঘ সত্য;
একে প্রতিহত করার সাধ্যি কার?

 

তোমার সকল উপস্থিতি

সারা রাত জেগে বসে বিছানায়,
আমি আর তুমি
জানালা দিয়ে বিষাদ শূন্য মেঘের
মাঝবরাবর মিটমিট গুচ্ছতারা দেখবো বলে।
শেষে ,তোমার আঁখি হতে আমার আঁখি
সরাতে না পেরে
তোমার আঁখিতেই গুচ্ছতারা দেখি।

ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে আছি
তুমি আর আমি
ঘন অরণ্য আবৃত পাহাড়ি ঝর্ণার
অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করবো বলে।
শেষে, তোমার ঘন কালো কেশ থেকে
আমার চোখ সরাতে না পেরে
তোমার কেশে ঝর্ণার সৌন্দর্য উপভোগ করি।

কনকনে ঠান্ডায় দু’কাপ কফির আলতো চুমুকে
আমি আর তুমি
ভেবেছিলাম, ঠোঁটদুটোকে উষ্ণতায় ভরিয়ে
সারা শরীরে তার অনুভূতি ছড়িয়ে দেবো।
শেষে, তোমার ঠোঁটের আলতো ছোঁয়া থেকে
আমার ঠোঁট সরাতে না পেরে
তোমার ঠোঁটেই উষ্ণতার পরশ উপভোগ করি।

বন্ধুর পথ, এই পথেই হাটতে শুরু করেছি
তুমি আর আমি
ভেবেছিলাম, আর বুঝি পারবো না এ পথ
পেরিয়ে সুখ-পথের সন্ধান পেতে।
শেষে, তুমি আমার হাত ধরলে সজোরে
আমি ভুলে গেলাম সব কষ্ট, বেদনা,যন্ত্রনা
তোমার হাতের ছোঁয়ায় জীবন সুখ উপভোগ করি।

তোমার সকল উপস্থিতি,
আমার জীবনের একমাত্র চরম সত্য।।

অভিজিৎ দাশগুপ্ত। কবি। অভিজিৎ দাশগুপ্তের জন্ম ১৯৭৬ সালে কলকাতায় এক মধ্যবিত্ত পরিবারে। এখন কবি কলকাতাতেই বসবাস করছেন। পিতা অরুণ কান্তি দাশগুপ্ত পেশায় শিক্ষক ছিলেন। পিতার অনুপ্রেরণায় বর্তমানে কবি শিক্ষকতার মহানব্রতে নিজেকে নিয়োজিত করেছেন। কবি ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

প্রতিভাস

প্রতিভাস

স্পষ্টতা অন্ধকারের মতো স্পষ্টতা আলোর মধ্যগগনে নেই। উত্তাপে ঝলসে যাওয়া চোখে শীতলপাটি বিছিয়ে দেয় রাত…..

চিঠি

ক্ষোভ রোদের দোকানি হয়ে, ছুঁয়ে গ্যাছি দূর পরবাস আলোর ক্রেতারা দেখে, শূন্য ঝুলি খালি সর্বনাশ।…..