অভিসার

সুপ্রীতি বর্মন
কবিতা
Bengali
অভিসার

নিষ্ক্রিয়

অতলান্ত ঘরকুণো শৈবালদামে গচ্ছিত পড়ন্ত দুপুরে
নিদাঘ প্রিয় গুমোট আদিমতায় তথাকথিত

ইঁদারায় মুখ গুঁজেছিল দণ্ডমুণ্ডের কর্তা
নিষ্ক্রিয় অর্থদণ্ড লুকিয়ে, তমসার ঘোর নিদ্রায়।

নিধনযজ্ঞে পাছে যদি চামার করতোয়া লিখন দুর্বলতার মুদ্রাদোষে
পিতৃসত্য ঔরসে ঋণগত হয়, হাতছাড়া হয় সখের কড়ি, না আত্মজা শৈলজা

তুমি কন্যে মাঙ্গলিক দোষে অপয়া, পঙ্গু নিষ্কর্মা হস্তীবৎ
অলস ঘুমে দৈনিক সমাচার যাপন

দেওয়ালে ঠেস ভঙ্গুর শিরদাঁড়া কদর্য ক্ষণ কদলির কালরাত্রি, তবুও উঠাবেই সৌরপ্রাংশু মহাভুজ রথী
আত্মপ্রকাশের গরুড় তেজে
গাছে উঠতে না উঠতেই পিচ্ছিল বোলচালে এক্কেবারে এককাঁদি

কালসর্পযোগে শুধু নেই নেই খ‌ইমুড়ি ছড়াছড়ি
অলস মস্তিষ্ক এ গজাচ্ছে বার্দ্ধক্যের শেকড়, অকর্মণ্যতা, শর্টকাট দে ছাট, পারি না, একদম।

কর্কটরাশি গৃহস্থ সন্ন্যাসী লাল কাঁকড়া আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে বিকলাঙ্গ ব্যক্তিগত জরায়ুভোগ কাম, ক্ষুধকাতর পিপাসা ত্যাজে মোক্ষ
অমাবস্যার চাঁদ শুধু কঠোরতায় বিধিবৎ কালাতিপাত
গৃহে নিত্য চলছে কালাশৌচ
ঈশ্বরের ধ্রুপদী ছন্দনৃত্যে মিলবে গাঁটের কড়ি ঘুঙুর
তাই পঙ্গু জেনেও বলতে চায় নির্দিদ্ধায়, চল নাচময়ূরী

ভ্রু নাচানো মাচানে ভোগান্তির দীর্ঘায়িত রেখার দর কষাকষি, পুতুল নাচ, সুতোর ডগায় অধীশ্বর, কে ছোট আর কে বড়
ফুটকলাই বাচালতা, বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো
একটু আলগা হলেই আসলটাই ফসকে যায়
তখন কনকচাঁপার কেন্দ্রমুখী আকর্ষণ ছোবল,

তাই অগ্নিগর্ভ জাত কিশোরী আশ্চর্য উদগত বীজ
কোনারকের চক্রবৃদ্ধি সুদের অদম্য গতি উড়নছু পঞ্ছী
অপার স্বাধীনতার সঙ্গে সন্ধি,,,অনুঢ়া কুসুমের গাঁটছোলা।

ভারগ্রস্থ ঝুঁকে যাওয়া কাঁধের জোয়ালে তুমি পালকি
কন্যাদায়গ্রস্ত পৈতৃকপোলে শিরোধার্য
দীর্ঘায়িত দুশ্চিন্তার শমন যোগ উঠানামার সেনসেক্স
বিপ্রতীপ কোণে কলাকুশলী
নেই কোন মজলিশ হৈ হুল্লোড়
জমজমাট সাংসারিক হট্টগোলে মগের মুলুক
দীঘল কাকচক্ষু সরোবরে ছোঁড়া ঢিলের উৎপাত আলোড়ন, দীর্ঘশ্বাস, তাগড়াই শূন্যতা খোঁজে
যেন সে যমের‌ও অরুচি
তাই মৃত্তিকা ছেড়ে ভাবে মগডালে পা ঝুলিয়ে
পিতৃত্ববোধে,
আত্মদর্শনে জান্নাতের হুর বেগম কবুতর কে ডাকে কাছে
বলে শুনছো গো, একটুক্ষণ বসোনা আমার কাছে
কালাকালের কর্তা এলে তো আমাকেও একদিন দেবে ফেলে
কাতরতার অন্ধ সোহাগে
আমি মরলে পাগলী তোর কি হবে,

এ মেয়ের ভাবগতিক সত্যিই বোঝা দায় ও কি চায়
না এমনি করেই চলতে থাকবে ওর ধুন্ধুমার গতি
লাগামছাড়া,
আর আমাকেই থাকতে হবে সংযমী অভ্যেসে নিষ্ক্রিয় কোন কেন্দ্ররূপে
তোর কোনারকের চাকার তুখোড় কেন্দ্র
সদাহাস্যে।

অহংসর্বস্ব সপ্তাশ্ব

সপ্তাশ্বের ক্ষুরে ক্ষুৎকাতর পিপাসায় জমাট ছিল যে
অহংকারের প্রাচুর্য এর অন্ধনাল,

আজ একটা ছোট্ট হীনম্মন্যতার আঘাতে চূর্ণ দম্ভ তোমার অট্টালিকা

তবুও তোমার দর্পের আস্কারার ইন্দ্রিয়পতনে
তোমার মতিভ্রমের দর্পণে দৃশ্য ঘুমন্ত অর্ধেক চন্দ্র

তর্জণীর সঙ্গদোষে বেচালে ছিনিয়ে নিলে কূলবধূর

উত্তুঙ্গ অপত্যস্নেহ শোষিত স্তনযুগলের উপরি আঁচল

কুচক্রী দলপতি কর্তার খেয়ালে শকুণির হিংস্র
ইচ্ছাকৃত আক্রোশের ভুলভাল পাশার চালে

ইচ্ছে করে কুরুক্ষেত্র এর ভবিতব্য ঘটাতে চাইলে
ভাইয়ে ভাইয়ে অনাসক্তির দুমুখো সাপের খোলস

শ্যাম মনোহরা হাত থেকে প্রণয়বিষ বাঁশি ছাড়িয়ে
ধরিয়ে দিলে সুদর্শন চক্র, মার মার কাট কাট, মানি

নাগরের দোলায় যে সোহাগ মর্মর জীবাশ্ম আমার লেগে ছিল আদ্যপ্রান্ত, লাল তন্তুজ শাড়ি কিশোরীর লাগামছাড়া

কোমর অবধি জড়িয়ে জড়িয়ে যে উঠছিলাম আমি তোমাতে, আদ্যাশক্তি হতে, জাগ্রত কুণ্ডলিনীচক্রে

তুমি কেন হিমশৈল ঘৃণার রক্তজবা ঘষে করতে চাইলে
আমার ক্ষত বিষাক্ত দগদগে, তুমি তো নাকি মায়ের খ্যাপা ছেলে, নিষ্পাপ সাধক

এটুকু বোঝো না সহনশীলতায় হাড়গোড় থাকলেও
উড়ন্ত পক্ষীরাজ সাইকেলে থাকে না কোন মেরুদণ্ড।

 

অভিসার

পোড়ামুখী কোকিল লাজ লজ্জার মাথা খেয়ে,
উপসর্গের আগামী সানাইয়ের ডাক ঝোপেঝাড়ে প্রস্ফুটিত কুসুমকলি।
নিঃশব্দে চয়ন অনাবিল সুখ তস্করের পরের সম্পদ অপহরণে।
একই তোর বিষেলা বাঁশি মনমোহনের মানভঞ্জন রাধিকার কুঞ্জউপবনে।
রৈ রৈ একটানা সুর হতভম্বে দিশাহারা তুই,
কপোত কপোতীর আলাপচারিতা দেখবি তুই দুচোখ ভরে।

বসন্ত মধুবনীর হিন্দোল মিষ্টি খোলা হাওয়া,
সর্বরোগহর চরম পথ্য রোগীর যন্ত্রনা,
বৃশ্চিক বিরহ দপাদপ দংশনে ছটফট।
তুই তো আগন্তুক,
আয়োজনের পূর্বরাগে লেজ দোলাস শীর্ণ ডালে,
তারপর তো ভোঁ ভা, কে আর তোর কথা ভাবে।

অচ্ছুত অস্তিত্ব জরায়ু প্রসবে ডিম অপরের কোলে,
ইচ্ছাকৃত গুরুভার প্রনয়ালাপে মত্ত আপন সংসার অবহেলা,
লোকমুখে প্রচারিত বসন্ত প্রচ্ছদে প্রস্তাবনা তোর ঠোঁটের।
সুরেলা মিষ্টি সুর।

নৈশিল মাদকতায় পার্কে গাছের গুঁড়ির আশ্রয়ে,
মাদকাসক্ত আগামী অভিসার,
নিছক অবহেলা কাজকর্ম ফেলে সকলের মিলনমেলা।
মুগ্ধ পরম্পরা তোমার হাতে আমার হাত,
আস্কারা চাহিদা আরো একটু পশ্চাদগমনে নষ্ট অতীত অবসাদ।
হারানো সুর পায় প্রাপ্তি অন্তিমচরণ,
তোমার আমার অভিসার।

ফেলে রাখা আবর্জনা কাগজে দুজনের ঠেসাঠেসি,
চোখে চোখ যেন নতুন করে রোজ শুভদৃষ্টি বিনা পৌরহিত্য মন্ত্রউচ্চারণ,
অনাবিল সুখ বাঁধ ভাঙে নিঃশ্বাসে প্রশ্বাসে সহবাস।
ক্লান্তি ঢালতে লাগো নিঃশব্দ চয়নে আমার বক্ষে।

খড়কুঁটোর ছড়াছড়ি ভূতলে গা মাখামাখি আনমনা পাতার খসখস।
ছন্নছাড়া উদাসী বাউল মন,
কিছু খড় সান্নিধ্যে নির্মান করি শিরোপার মুকুট,
আজ আমি কল্পলোকের অপ্সরা রাজকন্যা।
আর তুমি সাদা ঘোড়ায় চড়া রাজকুমার,
আলিঙ্গনের স্নেহাধিক চুম্বনে করো রূপকথা,
উপসংহারে শিরোপা রাজমুকুট।।

পোড়ামুখী কোকিল তুমি ভুক্ত জঠরে ঠাঁই পরচর্চা,
সাক্ষী থাকো তুমি অপ্রেমিকের চোরাপথ,
যদি পারো মুখ ফুটে বলে উঠো অগ্নিদগ্ধ প্রতিবাদী সুর,
হও যদি একবার সোচ্চার,
হলেও সাবধান হতে পারে অভিসার।

 

বিবাহিত

বিদায়কালে কনকাঞ্জলী ছড়িয়ে ছিটিয়ে মায়ের আঁচলে ভাতের শোধ,
নান্দনিক মিষ্টি উপাদেয় মুখভরা রস সুমিষ্ট মাঙ্গলিক আশীর্বাদে।
জনসমুদ্রে মানুষের আনাগোনা গুনেছি ঢেউ,
কানাকানি গুজবে কোনঠাসা অস্তিত্ব,
সিঁথি ভরা সিঁদুরে আগামী বসন্ত প্রচ্ছদে রাজপথ,
উথলিয়ে সামুদ্রিক উচ্ছাস আলতা চরনে গৃহপ্রবেশ।
মঙ্গল শঙ্খের একঘেঁয়েমি সুর মনের কোনে বিষাদ ডাকে।

শঙ্খচিল বিদায়কালে সৈকতে ছোঁ মেরে,
খুঁজে নিতে চায় নতুন আশ্রয় সন্দিহান অন্বেষনে।
ঘোমটার ভেতরে জড়ানো পরজীবী অন্তর্স্বত্বা,
আগামী অবলম্বনকে আঁকড়ে ধরে।
উর্ধ্বগামী হতে চায় চির উন্নত শির স্বর্গসুখে,
আগামী চিত্রপটে মানানসই টানাপোড়েনে সামঞ্জস্য।

আলোকপাতে ভবিতব্য অক্ষম দোলাচালা,
মারে সহস্র উন্মোচনী টান নাভিমূলে,
কি হয় কি হয় প্রশস্ত অঞ্চলে রঙবেরঙ নতুন সংসার গুটিয়ে।
এসব সাত পাঁচ চিন্তার জট ভ্রকুটি বলিরেখার ভাঁজ,
সঙ্গে ঘর্মক্লান্ত কলেবর আঁচলের তলে,
তবুও সাহস ভরে নতুন পদক্ষেপে গ্রন্থিত আটচালা।
প্রত্যাশা নাগালের বাইরে সমৃদ্ধি,
লক্ষ্মীর আলতা চরন অন্নভর্তি কলস ঠেলে,
দোরগোড়ায় সঙ্গপানে নতুন চরন আগামী জীবন।
হাতে হাত নব বিবাহিত দম্পতি,
সঙ্গ ছাড়বে না কোনদিন দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ প্রতিশ্রুতি।

নতুন করে ধার উদ্যোগ পুরানোকে পরিশোধ,
আইবুড়ো তকমার শিরোচ্ছেদ গান্ডেপিন্ডে গিলে,
পেছনে ফেলে দিতে বাধ্য শৈশব,
ছেলেবেলার সেই প্রিয় খেলা কাঠপুতুলের বউ বর।
বাস্তবিকতার আটচালায় চিন্তিত মস্তিষ্কে গুছিয়ে সংসার,
মু়খে হাসি চোখে জল ঝাপসা আগামী,
সানাইয়ের রোশনচৈকি একগাদা ভিড়,
আসতে লেগেছে বলে নিছক আড়ম্বরে খুব ভালো,
আজকে আমি কাঠপুতুল প্রদর্শনে কেন্দ্রীভূত,
উপহাস ঠাট্টায় সরব দু চারদিন,
মহুয়ার তো এমনি হয়েছিল বিয়ে,
তবে বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর।
লাঞ্ছনা, গঞ্জনায় অতিষ্ঠ জীবন,
স্বামীসোহাগে কন্যাভ্রুন সন্তান দুচোখের বিষ,
সকলের অত্যাচারে গলগ্রহ বাপের বাড়ি।
উঠতে বসতে শুনতে হয় ধিক্কার সে বিবাহিত এক নারী।

ভাবলেই দমচাপা বৈবাহিক নিলম্বু আচার বিচারে উপবাস,
ধোঁয়াশা অতীত উচ্ছিষ্ট চেটেপুটে খেয়ে শেষপাতে।
অনেক হয়েছে ভাবনা এবার তো ঘোমটা খুলে জেগে উঠি,
বলি আপন সংকল্প করি শক্ত পায়ের তলার জমি,
হাঁটতে আগে শিখি আপন প্রত্যয়ে।
অনেক ধরেছি বাবার হাত, স্বামীর হাত,
এবার পথ চলা হোক নিজে নিজে।
খুঁজে পাক নিজ পরিচয় নারীত্ব,
সহগামী হোক অস্তিত্ব।

সুপ্রীতি বর্মন। কবি। জন্ম ভারতের পশ্চিমবঙ্গরাজ্যে। লেখাপড়া করেছেন বাণিজ্যের ম্যানেজমেন্টে স্নাতক আর আর্থিক হিসাব সংরক্ষণে স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা। প্রকাশিত বই: 'হৃদয় সরসী' (কাব্যগ্রন্থ), 'সোহাগ প্রজাপতির ফুলশয্যা' (সম্পাদিত যৌথ কাব্যগ্রন্থ)। 'চন্দ্রমুখী' সাহিত্য ব্লগজিনের সম্পাদনা ছাড়াও তিনি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও ওয়েবজিনে নিয়মিত লেখালিখি...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ