অমঙ্গল

কাজরী মজুমদার
গল্প
Bengali
অমঙ্গল

আজ বীণার খুব আনন্দের দিন। আজ বীণার ছেলের বিয়ে। গত কয়েকমাস ধরে এই বিয়ের জন্য বীণা কীই না করেছে! বড়বাজারে কোথায় একটু কম টাকায় ভালো শাড়ি পাওয়া যায়, সেটা একে তাকে জিজ্ঞেস করে নিজে গিয়ে শাড়ি কিনে আনা, তত্ত্ব সাজানোর বিভিন্ন জিনিস। বিয়ের সময় বাড়িতে যাঁরা আসবে, তাঁদের সুব্যবস্থা থাকার জন্যও নানা জিনিসপত্র কেনাকাটা করা, আরো কত কী। বীণার এক ছেলে, আর তাঁর বিয়েতে কোনো ত্রুটি রাখলে কী হয়? অজিত বীণাকে বার বার বারণ করেছিল, সে যেন একা একা সব কাজ না করে। বিয়ের একসপ্তাহ আগে থেকে অজিত বিয়ের জন্য ছুটি নেবে, তখনই সে বউয়ের সাথে গিয়ে সব কেনাকাটা করে নেবে। কিন্তু বীণা সেই ভরসায় থাকতে পারেনি। যদি তখন বৃষ্টি বাদলে দিন খারাপ থাকে কিংবা যদি তখন কারোর শরীর খারাপ হয়, তাই বীণা নিজেই আগে থেকে ছেলের বিয়ের সব আয়োজন করতে থাকে।

এতদিনের দৌড় ঝাঁপ করার পর এখন যখন ছেলে বিয়ে করতে গেছে, তখন এই কয়েকঘণ্টা বীণার একটু বিশ্রাম। আসলে সবাই তো এখন ছেলের শ্বশুরবাড়ির জন্য রওনা দিয়েছে। এতক্ষণ ঘরে যা তাণ্ডব চলেছে! এখন বীণা খালি ঘরে একটু শান্তি করে বসলো। বর আর বরযাত্রী বিয়ের লগ্নের বেশ অনেকটা আগেই বেরিয়ে গেছে। কারণ ওখানে গিয়ে আগে আশীর্বাদ হবে, তারপর বিয়ে আর তারপর রেজিস্ট্রি। বীণা বসে বসে মমতা ভরা চোখে খাটের দিকে তাকায় আর ভাবে…

“ছেলেটা আমার খুব তাড়াতাড়ি যেন বড় হয়ে গেল। এই তো সেদিনের কথা মনে হচ্ছে, হসপিটাল থেকে কাপড়ে মুড়িয়ে ওকে নিয়ে এসে প্রথম ওই খাটের ওপর শুইয়েছিলাম।তখন তো আলাদা করে দোলনা কেনার সামর্থ্য ছিল না।”

ওদিকে বরের গাড়িতে…

-কী রে নার্ভাস লাগছে নাকি?

-না রে, ওই ওখানে গিয়ে ড্রেস পাল্টাতে হবে, এটা একটা ফালতু নিয়ম

-ওরকম বলে না ভাগ্নে, আরে এসব নিয়মের মধ্যেই তো বিয়ের অনুষ্ঠানের মজা

বরযাত্রীর বাসে…

-ও বৌদি, আমাদের অঙ্কনের তো বিয়ে হয়ে যাচ্ছে, এবার কিন্তু তোমার পালা। মেয়ের জন্য পাত্র দেখছো তো?

বাসের পিছন দিকে…

-চল না গানের লড়াই খেলি, এই দিদি তুই শুরু কর না

-আমি? আচ্ছা দাঁড়া…

“কথা হয়েছিল…, তবু কথা হলো না…

আজ সবাই এসেছে…, শুধু তুমি এলে না…”

ন দিয়ে কর

-কিরে মৌ,  কে এলো না রে? কিছু লুকাচ্ছিস নাকি

-ধ্যাৎ

-হা হা…

এদিকে ছেলের বিয়ের বড় প্রদীপটার দিকে তাকিয়ে বীণা মনে মনে ভাবে…

“চন্দ্রিমা তো খুব ভালো মেয়ে। অবশ্য বাইরে থেকে তো সবাইকে চেনা যায় না। তবুও চন্দ্রিমা যেদিন প্রথম আমাদের বাড়িতে এলো, আমি সেদিনই বাবানের চোখে চন্দ্রিমার জন্য ভালোবাসা দেখেছিলাম। প্রথমথেকেই চন্দ্রিমাকে আমার খুব পছন্দ হয়েছিল, কিন্তু বিয়ের পর যেন ও বদলে না যায় ঠাকুর। আমি আমার যতটা সাধ্য চন্দ্রিমাকে সাথে নিয়ে, বিয়েতে ওর জিনিসগুলো ওর পছন্দেই কিনেছি, যাতে ও খুশি হয়”

ওদিকে বরের গাড়িতে…

-বাবা, রাতে অলোকদা আর টুকাই আমার সাথে থাকলেই হবে, আর বাকিদের নিয়ে তুমি ফিরে যেও

-ভাগ্নে জানিস তো, কাল সকালে শালিরা টাকা চাইবে কিন্তু, একটু দরাদরি করে টাকা দিস

-মামু, ভোরবেলায় উঠে যদি ওরা দ্যাখে বর ভেগে গেছে

-সামনের সিটে তোর কাকাশ্বশুর বসে আছেন, ভুলে গেছিস নাকি

কাকাশ্বশুর- আমি কিছু শুনতে পাচ্ছি না… হা হা…

বরযাত্রীদের বাসে…

-ফুল কাকী তোমার হারটা ভীষণ সুন্দর। কত পড়লো গো?

-ওই একের কাছাকাছি

-সত্যি! সোনার কী দাম বেড়েছে বলো? একটা ছোট কানের দুল দশের কমে হয়ই না

এদিকে খালি ঘরে বীণা উঠে জলের বোতলটা নিয়ে বসলো… দু চোখ ছল ছল…

“ঠাকুর, অনেক কষ্টের মধ্যে ছেলেকে মানুষ করেছি, ভালো শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। আজ তোমার কৃপায় আমাদের সংসার স্বচ্ছল হয়েছে, আমার সংসারে যেন অশান্তি না আসে। আমি যতটা পারবো চেষ্টা করবো, ওদের বুঝে চলতে”

ওদিকে কনের বাড়িতে…

-ও জেঠি, বাবা ফোন করেছিল, বলল আর দশ মিনিটের মধ্যে পৌঁছিয়ে যাবে। বরণডালা নিয়ে তোমায় বাইরে চলে যেতে। ও মা… চলো চলো… বাবারা জামাইবাবুদের নিয়ে এখনই পৌঁছাবে

এদিকে বোতলের ঢাকনাটা খুলে জল খেতে খেতে আড়চোখে দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বীণা ভাবলো ‘এতক্ষণে হয়তো ওরা বিয়ে বাড়িতে পৌঁছিয়ে গেছে। চন্দ্রিমাকে আশীর্বাদ করে হারটা পরালে ওকে খুব সুন্দর লাগবে’

ওদিকে বিয়ে বাড়িতে বরের গাড়ি আর বর যাত্রীর গাড়ি পৌঁছে, বরণ করা হয়ে গেছে। আশীর্বাদের আয়োজন করা হচ্ছে। বরযাত্রীরা একেএকে সবাই চন্দ্রিমার সাথে দেখা করছিল। চন্দ্রিমার মুখে বিয়ের কোনো টেনশানের ছাপ ছিল না। সারা বিয়েবাড়িতে আনন্দের হৈ হুল্লোড় চলছে

এদিকে বীণা খাটের কোণার কাঠটা ধরে হাউ হাউ করে কাঁদছে, কিছুক্ষণ কাঁদার পর নিজেই ভালো করে চোখ মুছতে মুছতে…”আমার খুব কষ্ট হচ্ছে ঠাকুর, আজ ছেলের এতবড় একটা দিন আর আমি ছেলের সাথে থাকতে পারলাম না। আসলে সেই ছোট থেকে স্কুলে যাওয়ার প্রথমদিন থেকে, ছেলের প্রথম স্টেজে ওঠা, খেলার মাঠে, হসপিটালে, মাধ্যমিক পরীক্ষায়, ওর প্রথম দাড়ি কাটায়, ওর ল্যাপটপ কেনা এমনকী এখনো ওর আন্ডারওয়্যার কেনাতেও তো আমি থাকি। আর আজ…”

এমনসময় দরজার বেলটা বেজে উঠলো। বীণা খুব অবাক হলো, “এখন আবার কে এলো?” দরজা খুলে দ্যাখে পাশের বাড়ির সাগর…

-কীরে সাগর, কী হয়েছে?

-কাকিমা তুমি শিগগিরি রেডি হয়ে দরজা-জানলা সব ভালো করে বন্ধ করে নাও, তোমাকে নিয়ে এক্ষুণি বিয়ে বাড়ি যেতে হবে

-সেকী! কেন? কী হয়েছে? আমি কী করে যাবো? বিয়ের প্রদীপ জ্বলছে তো! প্রদীপ খালি ঘরে রাখতে নেই

-কাকিমা, এত প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার এখন সময় নেই। তুমি না গেলে হয়তো বিয়েটা…

-কী হয়েছে বলবি তো? আর তোর পায়ে ব্যান্ডেজ থাকায় তুই বরযাত্রী গেলি না, এখন যাবি কীভাবে?

-ওলায় যাবো, গাড়িতে যেতে যেতে সব বলছি তোমায়, হাতে একদম সময় নেই। কাকুরা ওখানে সবাই খুব টেনশনে আছে, তুমি শিগগিরি রেডি হও

প্রায় চল্লিশ মিনিট পরে বীণার গাড়ি যখন বিয়ে বাড়ির সামনে দাঁড়ালো, বিয়ে বাড়ির সামনে তখন প্রচুর ভিড়। বীণা সবার চোখেমুখে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলো। বীণা গাড়ি থেকে নামলেই, বীণার বড় জা বীণার একদম কাছে এসে প্রায় ফিস ফিস করে বলেন “তুই এতটা ভুল কী করে করলি ছোট? এ মেয়ে কী সাংঘাতিক জেদি, মুখোরা আর তুই বাবানের জন্য…” বীণার ভয়ে হাত পা কাঁপছিল, বীণার চোখ তাঁর স্বামী, ছেলেকে খুঁজছিল, গলা কাঁপা স্বরেই বললো…

-কি হয়েছে দিদিভাই? তোমার ঠাকুরপোরা কোথায়?

-ওরা তো এখনো ওই মেয়েকে বুঝিয়ে যাচ্ছে। শোন, ওই দিকটা চল, বলছি সব। তুই ভিতরে ঢোকার আগে সবটা শুনে যা

বাইরে বিয়ে বাড়ির দেওয়ালের একটা কোণায় বীণার বড় জা, আর ভাশুর গিয়ে দাঁড়ালেন। সবাই এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে বীণার দিকে তাকিয়ে ছিল। বড়জা বললেন…

-সবই ঠিকই চলছিল রে ছোট। আমরা বৌমার সাথে দেখা করলাম। ও হঠাৎ সাথীকে বললো যে তোকে যেন সাথী বলে যে ওর তোর সাথে একটু কথা আছে। সে কথা শুনে সাথী বলে যে তুই তো ছেলের মা, তুই কি করে বিয়েতে আসবি। তুই বাড়িতে আছিস। তারপর বললো ঠাকুরপোকে ডেকে দিতে, ও ঠাকুরপোর সাথে কথা বলবে। ঠাকুরপো ওর সাথে ঘরের ভিতরে কথা বলার পর দেখলাম বাবানকে ঘরে ডাকলো। তখন আমরা বুঝলাম যে কিছু তো গড়বড় হয়েছে, তখন বাবানের সাথে আমি আর তোর দাদাও গেলাম। গিয়ে দেখি তোর বউয়ের কী মূর্তি, বাবানের সামনে গিয়ে বলল…

-সরি অঙ্কন এই মুহূর্তে আমার আশীর্বাদের জন্য বসাটা সম্ভব হচ্ছে না

– হোয়াট!

-হম, ঠিকই শুনছো। শুধু আশীর্বাদ কেন, মামণি এখানে এখন না এলে, এই লগ্নে হয়তো বিয়েটাও হবে না

-কি হয়েছে, চন্দ্রা? আমি তো কিচ্ছু বুঝতে পারছি না?

-আমার মনে হয় তোমার সাথে আমার আলাদা কথা বলা দরকার

“তখন ছোট আমি বলেছি, যা কথা বলবে, আমাদের সামনেই বলবে। কারণ এসবের জন্য আর বেশী সময় ছিল না। সেই শুনে তোর বউ বাবানকে বলল…”

-ওকে! তুমি আমাকে বিয়ের আগে কি বলেছিলে?

-কি বলেছি?

-বলেছিলে, তোমার বাবা মা তোমার জন্য সারাজীবন অনেক কষ্ট করেছেন, আমি যেন তাঁদের সাথে কখনো খারাপ ব্যবহার না করি। বিশেষ করে তোমার মার সাথে। তোমার মার জীবন শুধু তোমাকে ঘিরেই…

-হ্যা বলেছি, তাতে?

-তাতে? হবু বউকে তো দেখালে যে মার প্রতি তোমার কত দরদ আর নিজের বেলা কি হলো?

-মানে?

-মানে, তুমি যে তোমার জীবনের এত বড় একটা কাজ করতে চলেছো, আজ তোমার জীবনের এই আনন্দের দিনে তোমার পাশে তোমার মা নেই কেন?

-চন্দ্রা, বিশ্বাস করো আমি তোমার কোনো কথা বুঝতে পারছি না

-না বোঝার মতো কিছু বলিনি, তোমাদের সাথে মামণি আসে নি কেন?

“বাবান উত্তর দিতেই যাচ্ছিল, তখন আমি বললাম…

এসব কি কথা বলছো বৌমা! ছেলের মা ছেলের বিয়ে দ্যাখে নাকি? তাতে যে ছেলের অমঙ্গল… কথাটা আমায় শেষ করতে দিলো না রে ছোটো, বলে…

-প্লিজ জেঠি, উত্তরটা আমি ওর কাছ থেকে শুনতে চাই। বলো!

-কী আশ্চর্য, এসব আমি কী করে জানবো? আমি তো মাকে বলেছিলাম, মা তো এই কথাগুলোই বললো। সবাই বলল, আমাকে আগে মার কোলে বসে ওই কীসব বলে উঠতে,  তারপর আর ঘরে না ঢুকতে

-বাবা কিছু মনে করবেন না, আমার ধারণা ছিল আপনারা আধুনিক শিক্ষিত

-বৌমা, এসব রীতি নীতি জন্মজন্মান্তর ধরে চলে আসছে

-যাক আমি তোমাদের বলে দিচ্ছি, মামণি এখন না আসলে আমি আশীর্বাদেই বসবো না

-চন্দ্রা অবাস্তব কথা বলো না, মা বাড়িতে একা, মা কী করে এত দূরে আসবে?

-তোমার বলতে একটু লজ্জাও করছে না? যে মা তুমি ছাড়া কিছু জানে না। যেই মা তোমার বিয়ের জন্য না খেয়ে দেয়ে, রোদে জলে কয়েকমাস ধরে সব ব্যবস্থা করেছে আর সেই মাকে ঘরে একা রেখে তুমি সবার সাথে ড্যাং ড্যাং করে বিয়ে করতে চলে এসেছো? সবাই বলল আর তুমি শুনলে অঙ্কন? মা তো সবার না, তোমার! তুমি মার মন বুঝলে না? মা যতই মুখে বলুক মা ছেলের এই শুভক্ষণে থাকতে পারবেনা, এটা কত কষ্টের, কত অসহায়তার কথা বলতো?

-চন্দ্রা প্লিজ, পরিস্থিতি বোঝো, বাইরে সবাই এটা ওটা বলছে। ঠিক আছে আমি তুমি এক্ষুণি মার সাথে ফোনে কথা বলে নেবো

-না! তুমি আমাকে খুব ভালো চেনো। আমি মামণি না এলে এই ঘর থেকে বেরোবো না। দেখছো না আমার বাবা মা এই ঘরে ঢুকছে না। ওরা জানে আমায় অন্য কিছু বুঝিয়ে লাভ নেই

“বাবানের মুখটা যদি দেখতি ছোট। ও বলল, ও দেখছে কী করা যায়। তারপর তো ঠাকুরপো বলল ওই তোদের পাশের বাড়ির ছেলেটাকে ফোন করতে। শোন, তুই ভিতরে গিয়ে ওকে বলে দিস, আশীর্বাদ তুই করবি কিন্তু বিয়ে হওয়ার সময় তুই ওখানে থাকবি না। বাবানের অমঙ্গল হবে। আর কিছু না, ওই সবাই বলে মায়ের নজর লাগে। তুই তোর দাদার সাথে ভিতরে যা”

বীণা কোনো কথা না বলে উৎকণ্ঠা নিয়ে বিয়ে বাড়ির ভিতরে ঢুকলো, কারণ বিয়ের লগ্নের আর বেশি সময় বাকি নেই। চন্দ্রিমার ঘরে ঢুকতেই চন্দ্রিমা বীণাকে দেখে একটা শান্তির হাসি দিয়ে…

-অঙ্কন, এবার আমার বাবা মা খুব নিশ্চিন্ত হলো যে, তুমি আমায় সত্যিই খুব ভালোবাসো

বীণা-আমি এসে গেছি, এবার তাড়াতাড়ি আশীর্বাদটা শেষ করে ফেলতে হবে। (চন্দ্রিমার দিকে এগিয়ে গিয়ে) এবার আমার চন্দ্রা খুশি তো? তবে বিয়ের সময় আমি এই ঘর থেকে তোমাদের দেখবো

-না! কেন মামণি? তোমার ছেলের অমঙ্গল হবে?

-তোমার একটা কথা আমি রাখলাম, এবার আমার এই কথাটা তোমায় রাখতে হবে

-না মা! চন্দ্রা ঠিক বলেছে। বিয়ের সময় তুমি আমার পাশে থাকবে। আমরা দুজনেই দেখতে চাই তোমার জন্য আমাদের কী অমঙ্গল হবে

-ছি ছি বাবান এরকম বলতে নেই

-বীণা, তোমার ছেলে আর বৌমা যখন চাইছে, তুমি ওঁদের সাথেই থাকবে। সত্যিই আজ বৌমা আমাদের নতুন করে ভাবালো। আমি বাবা বলে, ছেলের সামনে থাকলে আমার নজর লাগবে না, শুধু মা দের জন্য এসব নিয়ম কেন? তাহলে তো বাবাদেরও আসা উচিত না। তুমি আমাকে ক্ষমা করো বীণা, আমিও অন্যদের মতো তোমায় নিয়মের নামে একা ছেড়ে চলে এসেছি। এবার চলো আর বেশি সময় নেই

-বাবা তোমরা সবাই যাও, আমি আর মামণি আসছি

সবাই এক এক করে ওই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। চন্দ্রিমা দরজাটা বন্ধ করে বীণাকে প্রণাম করে বলল…

-মামণি, আমায় ক্ষমা করো, আমি জেঠুদের সামনে তোমার ছেলের সাথে, বাবার সাথে অনেক খারাপ ভাবে কথা বলেছি

-বিয়ের দিন এসব কেউ করে? যদি সত্যি সত্যি আমার আসতে দেরি হয়ে যেত?

-তোমার ছেলের ওপর আমার এতটুকু ভরসা তো ছিলই। আমি জানি মনে মনে তোমার ছেলে, বাবা দুজনেই খুব খুশি হয়েছে। কিন্তু আত্মীয় স্বজনদের মুখ বন্ধ করতে আমার এই রূপ নিতেই হয়েছিল

-এদিকে এসো

বীণার দুচোখ দিয়ে সমানে জল গড়িয়ে যাচ্ছিল

-মামণি, তুমি কাঁদছো কেন?

চন্দ্রিমাকে বুকে জড়িয়ে “আমার কষ্ট কেউ বোঝে নি। আমার কেন, বিয়ের দিনে কোনো মায়ের কষ্ট কেউ বোঝে না। আমারও যে তোমাদের বিয়েটা দেখতে ইচ্ছা করছিল। আমার সেই ছোট্ট বাবান আজ বিয়ে করতে চলেছে আমি দেখবো না? আমার দৃষ্টি কখনো খারাপ হতে পারে? মার উপস্থিতিতে কখনো কোনো সন্তানের অমঙ্গল হতে পারে বলো?

-আর কাঁদে না মামণি। এসব সব মিথ্যে। মা বাবার থেকে শুভ আর কেউ হতে পারে না

বীণা চোখ মুছে,চন্দ্রিমার হাত দুটো নিজের দুহাতে নিয়ে চুমু খেয়ে বলে, তোমাকে ধন্যবাদ দেবো না, কিন্তু কী বলবো জানি না

-মামণি তোমাকে একটা গোপন কথা বলি। আজ যা করলাম তা শুধু তোমার জন্য করিনি, আমি নিজের জন্যও করেছি

-নিজের জন্য?

-হ্যা, আমি যে চাই না মামণি, ভবিষ্যতে আমার ছেলের মেয়ের বিয়েতে আমিও তোমার মত একা ঘরে প্রদীপ জ্বেলে চোখের জল ফেলি।

 

(ঈষৎ সম্পাদিত)

কাজরী মজুমদার। লেখক। জন্ম ও ভিটেমাটি ভারতের কলকাতায়। বর্তমানে স্বামীর কর্মস্থলের সূত্রে দিল্লিতে বসবাস। গল্প, উপন্যাস, কবিতা ও সামাজিক বিষয়ে সরল ভাষায় লেখালিখি করেন। তিনি বিশেষত সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে লিখতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এছাড়া বিভিন্ন ম্যাগাজিন আর পত্রিকায় নিয়মিত লেখালিখি করে...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..