অমাবস্যায় আসে

কাজরী মজুমদার
ছোটগল্প
Bengali
অমাবস্যায় আসে

তখন আমার আস্তানা জঙ্গলের ভিতর নদীর ধারের বাংলোয়। এক সন্ধ্যেবেলায় বারান্দায় বসে আছি। সামনে কুয়াশার চাদরে মোড়া অমাবস্যার জঙ্গল। কানে আসছে নদীর জলের আওয়াজ আর অন্ধকারে জোনাকির আলোগুলো রাতের সৌন্দর্য আরো বাড়িয়ে তুলেছে। ঘরের ভিতরে বাপ্পাদিত্য আর সৌমেন অতিরিক্ত ড্রিংকস করে বেহুঁশ। হঠাৎ কানে একটা শব্দ আসায়, কান খাড়া করে, মনে হলো কারোর হাঁটার আওয়াজ পেলাম। চোখ খুলেই দেখি বারান্দার বাল্বটা নিভে গেল। ফোনের টর্চটা জ্বালানোর সঙ্গে সঙ্গে দেখি নদীর দিকে,  একটা সাদা শাড়ি পরা কে জানি যাচ্ছে, ভাবলাম ওটা কে? এত রাতে যদি নদীতে ঝাঁপ দিতে যায়? তাড়াতাড়ি ওই মহিলাকে ধরবো বলে প্রচণ্ড জোরে চলতে থাকলাম।

অন্ধকারকে কখনোই ভয় পাই না, ভুত প্রেত এসবও মানি না। আমি খুব সহজেই ওই মহিলার কাছাকাছি পৌঁছে গেলাম, কারণ উনি খুব আস্তে আস্তে হাঁটছিলেন, বুঝলাম উনি বেশ বয়স্ক, কিন্তু এতো রাতে উনি এই জঙ্গলে নদীর ধারে কি করছেন? বললাম-

-শুনছেন!

থমকে দাঁড়িয়ে উনি গম্ভীর গলায় বললেন-বাড়িতে কে কে আছে?

আমি অবাক! এত রাতে এই গভীর জঙ্গলে, এই প্রশ্ন?

তাও ভদ্রতার খাতিরে বললাম-বউ, মা আর ছেলে

-মাকে অন্য কোথাও পাঠিয়ে দাও না কেন?

খুব বিরক্তিতে বললাম-মাকে পাঠিয়ে দেবো মানে? আমরা ছাড়া মা কোথায় যাবে?

-মা এখন আদৌ কোনো কাজে আসে?

-আমার মার অনেক বয়স হয়েছে, এখন মা কি কাজ করবে?

-সেইজন্যই তো বলছি, মাকে রেখে কোনো লাভ নেই

খুব রাগ হলো, বললাম-মা আমার কাছে থাকবে কি, না থাকবে সেটা আমি বুঝবো,আপনি নিজে একজন মায়ের মতো হয়ে, এসব কুপরামর্শ দিচ্ছেন কি করে?

কথার সাথে চলতে চলতে কখন একদম নদীর ধারে চলে এসেছি, খেয়ালও করি নি। একটা বড় পাথরের একধারে উনি আমায় ইশারা করে বসতে বললেন। লম্বা পাথরের আরেক প্রান্তে উনি দাঁড়িয়ে রাতের নদীর দিকে তাঁকিয়ে বললেন-

-রাগ করো না। সবাই তো আর তোমার মতো ভালো ছেলে হয় না! আমার ছেলে আর বৌমাও খুব ভালো ছিলো। আমাকে খুব ভালোবাসতো। একবার আমরা তিনজনে এখানে বেড়াতে এসেছিলাম।ওই যে, ঐ দেখো, ঐদিকের ঢিবিটার ওপর বসে সেই রাতে আমরা গল্প করছিলাম। তাঁর এক সপ্তাহ আগেই আমি উইল করেছিলাম যে, আমার অবর্তমানে আমার বাড়ি, জমি সব আমার ছেলে পাবে। আমার ছেলেই বলেছিল, উইলটা করে রাখতে। আমি যতদিন বেঁচে থাকবো, সব তো আমারই থাকবে। সেই রাতও আজকের মতো অমাবস্যার রাত ছিল। কি সুন্দর মুহূর্ত ছিল, আমরা ওই খানে বসে কি মজা করছিলাম। হঠাৎ ছেলে নদীর ধারে মাছ দেখার জন্য আমাকে ডাকছিল। অন্ধকারে কি মাছ দেখা যায় বলো? প্রচণ্ড জলের স্রোত ছিল, আমি তো কোনো মাছ দেখতেই পাচ্ছিলাম না। কখন বৌমাও পিছনে এসে দাঁড়িয়েছিল, জানিই না। হঠাৎ কে যেন আমাকে ধাক্কা দিলো…

সঙ্গে সঙ্গে ওদিকে আওয়াজ হওয়ায় আমি তাঁকিয়ে দেখি জলের ধারে একজন পুরুষ আর মহিলা দাঁড়িয়ে হাসছিল, আর জলে এই মহিলার মতো সাদা শাড়ি পরা কে জানি পড়ে গেছে, জলে ভেসে যাচ্ছে। চিৎকার করছে বাবু, আমায় বাঁচা… বাঁচা। একি! আমার সাথে যে মহিলা কথা বলছিল, সে কোথায় গেল? ভেসে যাওয়া মহিলাকে আমি ছুটে বাঁচাতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু অন্ধকারে হোঁচট খেয়ে পড়ে আর আমার কিছু মনে নেই।

পরেরদিন সকালে যখন ঘুম ভাঙলো দেখি আমি বিছানায় শুয়ে আছি। ডান হাঁটুটা ছুলে গেছে। দেখি দরজার কাছে বাপ্পাদিত্যরা বুড়ো কেয়ারটেকারের সাথে কথা বলছে। উনি বলছেন…

-কয়েকবছর আগে এখানে একটি ছেলে আর তাঁর বউ সম্পত্তির লোভে, মাকে অন্ধকারে নদীর জলে ভাসিয়ে মেরে ফেলে। তাঁর বডি কোথাও পাওয়া যায় নি। শোনা যায়, সেই ছেলে আর বউ বাড়ি ফেরার সময় কার অ্যাক্সিডেন্টে মারা যায়। তারপর থেকে প্রতি অমাবস্যায় ওই বুড়িকে এখানে দেখা যায়। দুবার দুজন লোক এখানে খুন হয়েছে। শোনা যায়, ওই বুড়ি ওদের কিছু প্রশ্ন করে, তারপর উত্তর শুনে মারে নয়তো ছাড়ে। আপনারাও সাবধানে থাকবেন।

সবটা শুনে আমার গা’টা কেমন গুলিয়ে উঠলো, তারমানে আমি যদি আমার মাকে নিয়ে অন্য উত্তর দিতাম, তাহলে….

কাজরী মজুমদার। লেখক। জন্ম ও ভিটেমাটি ভারতের কলকাতায়। বর্তমানে স্বামীর কর্মস্থলের সূত্রে দিল্লিতে বসবাস। গল্প, উপন্যাস, কবিতা ও সামাজিক বিষয়ে সরল ভাষায় লেখালিখি করেন। তিনি বিশেষত সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে লিখতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এছাড়া বিভিন্ন ম্যাগাজিন আর পত্রিকায় নিয়মিত লেখালিখি করে...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

পটচিত্র

পটচিত্র

  সৌম দাদুর কাছে থাকতে ভালোবাসত। গ্রামের নাম পাঁচুন্দি।আশেপাশে প্রচুর গ্রাম।সবাই সকলের খবর রাখে।সৌমদীপ এখানকার…..