অরাজনৈতিক অসাহিত্য

মুবিন খান
প্রবন্ধ
Bengali
অরাজনৈতিক অসাহিত্য

আজকে সাহিত্য নিয়ে কয়টা কথা বলি। আমাদের এক রসসিক্ত বন্ধু একটা উচ্চমার্গীয় কাব্য লিখে ফেলল। সে কবিতা আমার মাথার ওপর দিয়ে গেল। কবিতার কিছুই বুঝলাম না, কিন্তু কবিতাটি ভালো লেগে গেল। বন্ধুটি লিখেছে-

“বৃত্তের কেন্দ্রকে যদি মৃত্যু বলি
বৃত্তের ব্যাসার্ধ যদি হয়-কষ্টের পরিমাণ!
যিশুর বৃত্তের খুব কাছাকাছি,
বিশাল এই বৃত্তের অবস্থান!
যে ব্যাসার্ধের প্রথম ভাগে থাকে বেরুবার আকুতি
শেষ ভাগে থাকে ত্বরিত কেন্দ্রে পৌঁছনোর আহবান!”

আচ্ছা, সাহিত্য কী?

সাহিত্য বিষয়ক বইপত্র জানাচ্ছে, সহিত শব্দ থেকে সাহিত্য শব্দটির উৎপত্তি। কিসের সহিত? জীবনের সহিত। তো ভাষার সাহায্যে রচিত যে কোনও রচনা, বিশেষত যদি তার শৈল্পিক গুণাগুণ উচ্চমানের হয়, বা সুদূরপ্রসারী হয় সেটাই সাহিত্য। ছেলেমেয়েদের পাঠ্য বইয়ে প্রশ্ন আছে: ‘সাহিত্য কাকে বলে?’

এর উত্তরে বলা আছে: ‘লেখ্য-শিল্পকে এককথায় সাহিত্য বলা যায়। মোটকথা ইন্দ্রিয় দ্বারা জাগতিক বা মহাজাগতিক চিন্তা চেতনা, অনুভূতি, সৌন্দর্য্য ও শিল্পের লিখিত প্রকাশ হচ্ছে সাহিত্য।’ গদ্য, পদ্য ও নাটক – এই তিন ধারায় প্রাথমিকভাবে সাহিত্যকে ভাগ করা যায়। গদ্যের মধ্যে প্রবন্ধ, নিবন্ধ, গল্প ইত্যাদি এবং পদ্যের মধ্যে ছড়া, কবিতা ইত্যাদিকে শাখা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা যায়। সাহিত্যে বর্ণনামূলক গদ্যকে প্রবন্ধ বলা হয়। প্রবন্ধ সাহিত্যের অন্যতম একটি শাখা।

এবার আমাদের বন্ধুটির ‘বৃত্তের আবর্তে’ কবিতায় ফিরি। কখনও উচ্চমার্গীয় চিন্তাভাবনা ভাবতে ভালো লাগে। আমারও লাগে। আমিও ভাবতে বসলাম। ধরি, জীবন একটা বৃত্ত। বৃত্তের কেন্দ্রবিন্দুটি হলো মৃত্যু। তাহলে বৃত্তের চারপাশ ঘুরে ব্যাসার্ধ সীমানার যে দাগটি রয়েছে, সেটি জন্ম। আর সীমানা দাগ থেকে বিন্দু পর্যন্ত ব্যাসার্ধর জায়গাটি পুরোটা জীবন। ও জায়গাটাই কষ্ট। কিন্তু একটা জীবনের পুরোটা জুড়ে কি কষ্ট থাকে কখনও? থাকে না। মানুষ তো জন্মায় ছয়টি রিপু নিয়ে। এরা হলো, কাম , ক্রোধ , লোভ , মোহ , মদ ও মাৎসর্য। এরা তো মানুষের অনুভূতিতেই বাস করে। তার পুরো জীবন জুড়েই এদের আধিপত্য। কাম হলো ভোগবাদ। সকল প্রকার কামনা বাসনা। যখন এই ভোগবাদ কোনও কারণে বাধাগ্রস্ত হয়, তখনই জন্ম নেয় ক্রোধ। আসলে স্বরূপে আবির্ভূত হয়। আবার ভোগের যে ইচ্ছে, সেটিই লোভ। আর সে লোভে নিজেকে হারিয়ে ফেলাটাই মোহ। তখন সকল ভাবনা হয়ে ওঠে ব্যক্তিকেন্দ্রিক। হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলা যাকে বলে। এটাই মদ। তখন নিজের ভোগ বাধাগ্রস্ত হলো বলে অন্যর সফলতা বেদনা জাগায়। তৈরি হয় ঈর্ষা। ঈর্ষা থেকে হিংসা। এটা পরশ্রীকাতরতা। এটাই মাৎসর্য। স্বার্থপরতা। এই ষড়রিপুর ফলেই মানুষের ভাবনায় কষ্টটা প্রবল হয়ে ফুটে ওঠে। বিশাল ওই জীবন-বৃত্তে তখন আর সকলকিছুকে ছাপিয়ে ওঠে। বঞ্চনা ছাড়া জীবনে আর কিছু দৃশ্যমান হয় না তখন।

প্রায়ই অনেককে বলতে শুনবেন, ‘দেখ, আমি অমন নই, আমি এমন, আলাদা আমি, সবার চেয়ে আলাদা।’ বস্তুত পৃথিবীর প্রতিটি মানুষই তো আলাদা। প্রতিটি মানুষই স্বতন্ত্র। দেখতে শুনতে তো বটেই, কারও সঙ্গে কারও চিন্তায়, চেতনায়, রুচিতে, এতটুকু সমিল নেই। তবুও নিজেকে আলাদা প্রমাণ করতে সেকি প্রাণপণ প্রচেষ্টা! বৃত্তের ব্যাসার্ধ কষ্ট দিয়েই ছাপিয়ে ওঠে যখন, তখন ওই বঞ্চনা প্রধান হয়ে ওঠে। মানুষের এই কষ্ট তার একলার কষ্ট, তবে একলা নয়। সমষ্টিরও বটে। সেকারণেই মানুষের কষ্ট মোটা দাগে দুটা ভাগ হয়ে গেছে। একটা তার নিজস্ব। আরটা অন্যর। সমষ্টির। এইই মানবতা। এই মানবতাই মানুষকে দিয়ে মানুষের রিপুদের থেকে জয় করিয়ে দেয়। মানবতার অনুপস্থিতিই মানুষকে পরাজিত করে রিপুদের বিজয়ী করে।

ধরুন, মৃত্যুর কষ্ট! সৃষ্টির শুরু থেকে এখন পর্যন্ত কত কত মানুষ মরে গেল! কিন্তু যিশুর মতো জীবন্ত ক্রুশবিদ্ধ মৃত্যুর সঙ্গে আর কারও মৃত্যুর তুলনা চলে কি? কি হিংস্র মৃত্যু! কিন্তু যিশু ক্রুশবিদ্ধ হতে হইতেও নিজের মৃত্যু যন্ত্রণা ছাপিয়ে মানবজাতির কথাই ভাবছিল। আবার সে ভাবনার ভেতরেও ভাবনা ছিল। যেমন, শুরুতে ক্রুশবিদ্ধ হওয়া থেকে রক্ষা পেতে চাওয়া। শেষে যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে চাওয়া। কদিন আগে বুলেটেও পিটিয়ো মেরে ফেলা আবরর ফাহাদেরও কি অমন হয়েছিল? শুরুতে প্রহার থেকে মুক্তি পেতে চাওয়া, পরে প্রহারের যন্ত্রণা থেকে রক্ষা পেতে আপন মৃত্যু কামনা করছিল? আবীরার ফাহাদরেই মৃত্যুটি রাজনৈতিক মৃত্যু। অথচ আবরর রাজনীতি করত না।

আজকাল টেলিভিশনে খুব আলোচনা অনুষ্ঠান হয়। তার প্রায় সবই রাজনৈতিক আলোচনা। একটা চ্যানেলে তাদের অনুষ্ঠান শুরু করে এই বলে-‘ভাবছেন রাজনীতিই কি সব! ভাবছেন আপনি সাধারণ ছাপোষা মানুষ রাজনীতির খবরে আপনার কি লাভ! আমি কিন্তু দেখি পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, অর্থনীতি, ধর্ম, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, এমনকি দেশপ্রেম- সবকিছুর সুতো বাঁধা সেই রাজনীতির নাটা ইয়ে।’… ‘বাঙালি বরাবরই রাজনীতি সচেতন। সেই থেকে মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা অর্জন। চায়ের দোকানে তুমুল বাকবিতন্ডা কিংবা জ্ঞানীগুণীদের সংযমী আড্ডা। ঘরে বাইরে মতের মিল অমিল কিংবা রাজপথ কাঁপানো মিছিল। রাজনীতি সবকিছুর কেন্দ্রে।’

ওপরের ওই ভাষ্য আমাদেরকে জানাচ্ছে, সকালে ঘুম থেকে জাগবার পর থেকে রাতে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত আমাদের জীবনে রাজনীতি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। আচ্ছা, আপনি রোজ কতজনের সঙ্গে রাজনৈতিক আলোচনা-বিতর্কে লিপ্ত হন? আমাদের পরিবার থেকে রাষ্ট্রর শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত আমরা জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে রাজনীতিতেই কিন্তু বুঁদ হয়ে থাকি।

রাজনীতিই আমাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে। সে আজকে থেকে নয়, সেই সৃষ্টির শুরু থেকেই। যিশুর মৃত্যু কি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র নয়? কিংবা সক্রেটিসের মৃত্যু? অথবা জিওর্দানো ব্রুনোর মৃত্যু? যিনি বলেছিলেন, পৃথিবী সূর্যের চারপাশে ঘুরছে। পৃথিবী সৌরজগতের তুচ্ছ গ্রহ ছাড়া এর আলাদা কোনও গুরুত্ব নেই। পৃথিবী ও বিশ্বজগৎ চিরস্থায়ী নয়, একদিন এসব ধ্বংস হয়ে যাবে। এই বলার জন্যে ব্রুনোকে ধর্মদ্রোহী আখ্যা দিয়ে জ্যান্ত আগুনে পুড়িয়ে মেরেছিল। আমরা সাহিত্য করা লোকেরা তো বিজ্ঞানের লোক নই, সাহিত্যর লোক। তাঁরা সাহিত্য উদাহরণ দাবী করবেন। আমরা তাহলে সাহিত্যর উদাহরণ দেব। আমাদের জাতীয় সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে এই গানটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচনা করেছিলেন। ১৯১১ সাল পর্যন্ত চলতে থাকা বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনকে উৎসাহিত করতে টানা লিখে গেছেন নানান গান ও কবিতা। বঙ্গভঙ্গর সক্রিয় বিরোধিতা করেছেন।

কাজী নজরুল তো নিজের পরিচয়টিই বিদ্রোহী বানিয়ে ফেলেছেন। লিখতে লিখতে জেলও খেটেছেন। সুকান্ত রাজনীতি করতে করতে তো অকালে মরেই গেলেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা বলতে গিয়ে বলা হয়, ‘শিল্পগুণের প্রশ্নে বামপন্থী সাহিত্য ব্যর্থ’— এই ধারণা যাঁরা প্রকাশ করে আসছিলেন তাঁদের ভুল প্রমাণ করেছেন তিনি। ‘৭১-এ কবি ও লেখকরা মুক্তিযোদ্ধাদের উৎসাহিত করতে অবিরাম লিখে গেছেন কবিতা, গান আর গদ্য।

এম আর আখতার মুকুলের ‘চরমপত্র’ কি কালজয়ী নয়? ‘৯৬ সালের এক খটখটে রোদ্দুর দুপুরে মতিঝিলের রাজপথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে এক সাংবাদিক বন্ধু বলেছিল, সাত মার্চের ভাষণটার পুরোটাই একটা কবিতা। আমার সে বন্ধুটি তখন থেকে এখনও জামায়াতে ইসলামীর সক্রিয় সমর্থক। নির্মলেন্দু গুণ সাত মার্চের ভাষণকে কবিতা আখ্যায়িত করে লিখলেন, ‘স্বাধীনতা, এই শব্দটি কিভাবে আমাদের হলো’- মনে আছে? ‘৯০-এর গণআন্দোলনই কিন্তু আজকের ‘জাতীয় কবিতা পরিষদ’ প্রতিষ্ঠা করিয়েছিল। জেনারেল এরশাদ কবিদেরকে কিনতে শুরু করলে দেশের শীর্ষ কবিরা এর প্রতিবাদে গঠন করেছিলেন জাতীয় কবিতা পরিষদ। ‘দাঁড়াও, নিজেকে প্রশ্ন কর- কোন পক্ষে যাবে’ উচ্চারণ করে রুদ্র কেমন ঝাঁকুনি দিয়েছিল মনে পড়ে? ছাত্রর দল সে উচ্চারণ করতে করতে বারুদ হয়ে উঠেছিল। সকলের জানা থাকলেও রুদ্রই কবিতায় প্রথম বলেছিল, জাতির পতাকা যারা খামচে ধরেছে তারা নতুন কেউ নয়, সেই ‘৭১এর পুরনো শকুন। আজকের আনিসুল হকের যে লেখক পরিচিতি, সে পরিচয় প্রতিষ্ঠা করেছিল তার ‘গদ্যকার্টুন’, যার সবটাই রাজনৈতিক রচনা। তার প্রথম উপন্যাস ‘অন্ধকারের একশ’ বছর’-এ পুরো পটভূমিতে জাতির পতাকা কালো শকুনেরা গ্রাস করেছিল।

আর না বলি। এভাবে বলতে গেলে বলতেই থাকা লাগবে। আমাদের বাস্তবতায় রাজনীতি আমাদের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও সাহিত্যর ধ্বজাধারী হওয়া কিছু লোক এখন সেটা মেনে নিতে রাজি নয়। তাঁরা বলছেন, সাহিত্য করতে গেলে তাতে রাজনীতি দেওয়া যাবে না। রাজনীতি যে আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য সেটা সাহিত্য করায় স্বীকার করা যাবে না। এঁরা রাজনীতিতে সাহিত্যে টেনে আনতে দিতে রাজি না। এঁরা সাহিত্য সভা করে, সাহিত্য আড্ডা করে, সাহিত্য চর্চায় বিভিন্ন গ্রুপ করে, সেখানে তারা সাহিত্যে সমাজের নির্মল চিত্র তুলে ধরতে উৎকৃষ্ট উৎসাহর জোগান দেয়। কিন্তু সমাজের নির্মল চিত্রঅলা সে সাহিত্যে রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে বলাবলি করা যাবে না, রাজনীতির চলমান ঘটনাবলীরা সে সাহিত্যে থাকতে পারবে না। তাদের জন্যে আমাদের নর-নারীর ফ্রয়েডিয়ো ফ্যান্টাসি নিয়ে কাব্য লেখা লাগবে।

মানবতার কথাও লিখব আমরা। নারীর অধিকারের কথা বলতে বলতে কলমের গলার রগ ফুলিয়ে ফেলবো। কিন্তু নারীকে যে নারীবাদের রাজনীতিই অবদমিত করে রেখেছে, সেটা লিখব না। মানবতাকে যে রাজনীতির কলুষিত দিকটা আর্ত করে রেখেছে সেটাও লিখব না। কেননা রাজনীতি কেবল হোটেল-রেস্টুরেন্টের টেবিল থাপড়ানোর দ্রব্য। এখনকার সাহিত্য রাজনৈতিক চর্চা নির্ভর সাহিত্য নয়। আর তাই সাহিত্যে রাজনীতি নিয়ে লেখা নিষিদ্ধ। সুপ্রিয় সুহৃদগণ, ভদ্রমহোদয়রা-মহোদয়ারা, আপনারা সে নিষেধাজ্ঞা মেনে চলুন।

মুবিন খান। লেখক ও সাংবাদিক। জন্ম ও বাস বাংলাদেশের ঢাকায়।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ