অর্জুন গাছকে সবাই চিনতে পারেনা

শীর্ষেন্দু দত্ত
গল্প
অর্জুন গাছকে সবাই চিনতে পারেনা

রবার্তো গোমেজের বাড়ি খুঁজে পেতে খুব সমস্যা হয়না। বলা চলে বিন্দুমাত্র সমস্যাই হয়না। কারণ রবার্টো গোমেজ কে এ তল্লাটে সবাই চেনে। স্টেশনে রিক্সায় উঠে ওর নাম বললেই পৌছে দেবে। যদিও এখানে রবার্টো গোমেজের বাড়ি যাব শুনলেই অনেক কৌতুহল-প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। স্টেশন থেকে রিক্সায় প্রায় আধ ঘন্টা লাগে। গোটা পথটার আর্ধেক রিক্সাওয়ালার প্রশ্নবানে জর্জরিত হতে হতে যখন আপনি বিরক্তির শেষ সীমায় পৌছাবেন,তখন তার আস্থা অর্জন করতে পারলে সে আপনাকে রবার্টো গোমেজের সম্পর্কে ভুড়ি ভুড়ি তথ্য দিতে থাকবে। সেসব গল্পের মতো!

এই অভিজ্ঞতা আমারো হয়েছিল। রিক্সাওলা যখন নিশ্চিত হল যে আমি রবার্তো গোমেজের খুব আপনজন বা ঘনিষ্টজন কেউ নই,তখন সে তার গল্পের ঝুলি খুলল।
রিক্সাওলা দূর থেকে আমায় দেখিয়ে দিল ওটাই ওর বাড়ি। বিরাট পাচিল ঘেরা বাড়িটার গেটের সামনে রিক্সা থেকে নেমে গেলাম। প্রায় ত্রিশ মিটার দূরে বারান্দায় চেয়ারে বসে এক মাঝবয়েসী লোক। ওই রবার্টো গোমেজ। গেট থেকে সরু পায়ে চলা রাস্তা একেবেকে চলে গেছে বাড়ির দিকে।

আমরা দুজনেই দুজনের দিকে এগিয়ে এলাম। বাড়িটার চারপাশে বিরাট বাগান। বাগান বলতে গোলাপ ডালিয়ার বাগান নয়। সব বড়ো বড়ো বৃক্ষ। বেশ কিছু চারাগাছও পোতা। সেগুলোও সম্ভবত কোনো বড়ো গাছের চারা। বড়ো বড়ো ডালপাতায় আকাশ ধাকা। তার ফাঁক দিয়ে আলোর ঝিলিক।

প্রায় ছ’ফুটের রবার্টো গোমেজের চেহারা গাট্টাগোট্টা। কাচাপাকা চুল। অনিয়মিত কাটা দাড়িগোফ। মুখোমুখি হতে ক্ষণিকের কষ্টার্জিত হাসি হেসে সে বলল,
-আপনিই কলকাতা থেকে ফোন করেছিলেন?…

আমি আমার নির্ধারিত ঘরটি খুলে ঢুকে পরলাম। দোতলায়। বেশ খোলামেলা। পুরো দোতলাটাই আমার। মানে আমি ভাড়া নিলাম আজ থেকে। একতলায় বাড়িওলা গোমেজ থাকেন, একা। বাড়ির পিছন দিকে একটা বিরাট পুকুর। বা দীঘিই বলা চলে। সামনেটা বাঁধানো। গাছপালায় ঘেরা পুকুরটা। একপাল দিশি কুকুর এদিক ওদিক শুয়ে বসে আলসেমি করছে। হরেক চেনা অচেনা পাখির আনাগোনা বাগান জুড়ে। কোকিল আর কিংফিশার টাকেই শুধু চিনতে পারি। আমি শহরের মানুষ,এসব আমরা চিনবো কি করে! বেশি চিনেও বা কি করবো! এখানে তো সাত আট মাসের গল্প। তারপরে তো আবার সদরে। তখন বোউকে নিয়ে আসবো ইচ্ছে আছে।

এখানে এই আধা গঞ্জে বাড়ি ভাড়াই পাওয়া যাচ্ছিল না। এখানে আর কে বাড়ি ভাড়া দেবে। আমার মতো হাতে গোনা যে দু’চার জন চাকুরীজীবী বদলীর চক্করে এখানে আসে তারা কোনোমতে কোথাও গুজে যায়।

রবার্টো গোমেজের বাড়ি সব সময় ফাঁকা পড়ে থাকে। তবু এখানে কেউ ভাড়া নিতে চায়না। কারণ রবার্টো গোমেজের অতীত। আমি এসব শুনেও পরোয়া করিনি। পরোয়া করিনি এমনটা নয়। ভেবে চিনতে বুঝেছিলাম লোকটাকে নিয়ে মিথ ছড়ায় অনেক। ওর অতীত যাই হোক না কেন,এখন তাতে আমার কিছু বিগড়োবেনা।
একটা সাঁওতাল গোমেজের কাজকম্মো করে। সে আমারটাও করে দেবে এমনই বন্দোবস্ত হল।

শব্দহীন ঠা ঠা দুপুর। গ্রীষ্মকালের গনগনে রোদ। জানলা দিয়ে পুকুর দেখা যায়। গোমেজ পুকুরে নামছে। সিড়ির ধাপ বেয়ে ধীরে ধীরে ও পুকুরের ভিতরে এগোচ্ছে। হাটু,কোমর,বুক,গলা একে একে জলে ডুবে যাচ্ছে। ও কী আদৌ চান করতে নামছে? না জলকেলি? গলা জলে দাঁড়িয়ে আছে চুপ করে। মাঝে মাঝে দু’হাত দিয়ে বুকের সামনে থেকে জল ঠেলে সরাচ্ছে। পুকুর পারে দুটো কুকুর এসে সিড়ির জলে পেট ঠেকিয়ে বসেছে। সুপারি গাছের উপর একটা মাছরাঙা বিরক্তি মাখা ভঙ্গিতে উড়ে এসে বসলো। গোমেজের জলে নামায় মাছরাঙ্গাটার মধ্যাহ্ন ভোজনে সমস্যা হচ্ছে। পুকুরের ওপরের বড়ো বেপরোয়া আম গাছটায় এক ঝাক সবুজ পাখি চিৎকার করছে। ওগুলো কি চন্দনা? কে জানে!

রবার্টো গোমেজ টানটান হয়ে সাঁতরাতে শুরু করল। লোকটার দিকে এক দ্রিষ্টিতে চেয়ে ভাবছিলাম, সত্যিই কি ও এমন কাজ করতে পারে? ওর চোখদুটো অদ্ভুত শান্ত! পুকুরটার মতোই। কিন্তু গভীরতা অনেক।

রবার্টো গোমেজ বৃত্তাকারে পুকুরে সাঁতরে চলেছে। অনেক্ষণ। পাঁচ মিনিট,দশ মিনিট… সাতাঁর কাটা অবস্থায় ওকে কেমন বাচ্চা ছেলের মতো লাগছে!
কলকাতায় যে ওর বাড়ির হদিশ দিয়েছিল,সেই বলেছিল ঘটনাটা। বলেছিল,গোটা টাউনেই সবাই ওকে এড়িয়ে চলে। ও –ও কারোর সাথে মেশেনা। একা একা থাকে।

রবার্টো গোমেজ জাতে পর্তুগীজ। এই অঞ্চলে এরকম আরো কিছু পর্তুগীজ বংশোদ্ভুত লোকজন থাকে। এসব জায়গাগুলো একসময় পর্তুগীজদের দখলে ছিল। তাদেরই কিছু বৈধ অবৈধ বংশধর থেকে গেছে। যারা নিজেদের পর্তুগীজ হিসাবে পরিচয় দিয়ে গর্বিত হয়। নিজেদের চার্চও আছে নদীর দিকে। তবে রবার্টো গোমেজ তাদের সাথেও কোনো সংশ্রব রাখেনা। তারাও হয়ত ওকে এড়িয়ে চলে।

গোমেজ সাতাঁর শেষ করে সিড়ি ভেঙ্গে ঘাটে উঠে এল। এই বয়সেও ওর পেটানো শরীর নজর কাড়ে। গোমেজ ঘাটে উঠতেই সুপারি গাছ থেকে মাছরাঙাটা শোঁ করে জলে নেমে এল। একটা মাছকে ঠোঁটে তুলে নিয়ে উড়ে গেল। জলে পেট লাগানো কুকুর দুটো গোমেজকে দেখে লেজ নাড়াতে লাগল। গোমেজ পাড়ে দাঁড়িয়ে গা মুছছে। আমি ওকে জরিপ করে যাচ্ছি। সত্যিই কী লোকটা এমন করতে পারে? দেখেতো মনে হয়না। অবিশ্যি কাউকে দেখে কিছুই বোঝা যায়না। কারোর গায়ে তো কিছু লেখা থাকেনা।

রবার্টো গোমেজ কেসটায় কয়েক বছর জেলও খেটে এসেছিল। তারপর মেয়েটার গরহাজিরা,লড়াই দিতে না পারায় গোমেজ জামিন পেয়ে যায়। যেকোনো পুলিশ কেসে ফাঁসলে ছাড়ান পাওয়া মুশকিল। আবার উল্টোদিকে এসব কেস প্রমাণ করাটাই কঠিন। তখনকার দিনে এসব গঞ্জ এলাকায় মেডিক্যাল টেস্ট টাই ঠিকঠাক হতনা। দ্বিতীয়ত,টাকা না থাকলে আইন তো ঢোঁড়া সাপ।

রবার্টো গোমেজ বিশ বছর আগে একটা বৌকে নাকি রেপ করেছিল। কাছের এক খাটাল মালিকের বৌ।

আমি এর আগে কোনোদিন এত কাছ থেকে কোনো রেপিস্ট কে দেখিনি। তাই গোমেজকে সুযোগ পেলেই দেখতাম। দেখতাম আর ভাবতাম, ওকে তো আর দশটা মামুলী লোকের মতোই দেখতে! রেপিস্টরা কি এরকমই হয়? কোনো বিশেষত্ব তাদের থাকেনা?

জেল খেটে ফিরে আসার পর গোটা তল্লাটের মানুষজন ওকে একরকম বয়কটের মুখে ফেলে দেয়। কারণ এই শান্ত নিরীহ অঞ্চলে এই জাতীয় অপরাধ প্রবণতা আগে কখনো দেখা যায়নি। গোমেজও নিজেকে গুটিয়ে নেয়। দরকার ছাড়া বাড়ি থেকেও বেরয়না। তার সঙ্গী এখন শুধু এই গাছ,পুকুর আর কুকুর। এইসব বলেছিল রিকশাওয়ালাটা।

ছুটির দিনগুলোতে এখানে আমার তেমন কিছুতো করার নেই। মনোরঞ্জন-বিনোদনের কোনো বন্দোবস্তই এখানে। তাই সারাদিন জানালায় বসে প্রকৃতি দেখা আর রবার্টো গোমেজের দিন যাপন করা। লোকটা সারাদিন বাগানের এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ায়। কখনো নতুন গাছ লাগাচ্ছে,কখনো গাছের ডাল ছাটছে,জল দিচ্ছে। আবার কখনো কুকুরগুলোকে মাটিতে চিতপটাং ফেলে ওদের এঁটুলি মারছে। লোকটাকে দেখলে বোঝাই যায়না যে ওর একটা কালো অতীত আছে।
এই এত বড়ো বাড়িতে শুধু আমরা দুজন। আমি এক কেরাণী, নিরীহ, গোবেচারা। আর আরেকজন,যার ধমণীতে পর্তুগীজ রক্ত বইছে।

মাঝে মাঝে গভীর রাতে ঘুম ভেঙ্গে গেলে জানলার সামনে এসে সিগারেট ধরিয়েছি। গোটা বাগান নিস্তব্ধ,অন্ধকার,ভুতুড়ে। অর্জুন গাছটার তলায় রবার্টো গোমেজ বসে মদ খাচ্ছে। একা একা। ও কি ঘুমোয় না!

সেদিনও মাঝরাতে ঘুম ভেঙ্গে গেল একটা কুকুরের বিকট চিৎকারে। জানালার সামনে এসে দেখলাম নিচে অর্জুন গাছের তলায় গোমেজ বসে আছে। এদিকে মুখ করে,সামনে মদের বোতল। খানিক দূরে একটা কুকুর শুয়ে আছে। মাঝে মাঝে করূণ তীব্র স্বরে চিৎকার করছে। গোমেজ আমাকে দেখতে পেয়ে নিচে আসতে ইশারা করল। আমি যেন এমনই একটা ডাকের অপেক্ষায় ছিলাম।

-সিগারেট আছে?

গোমেজ হাত বাড়িয়ে সিগারেট নিয়ে ধরালো।

-কুকুরটার কি কিছু হয়েছে?

গোমেজ আড়চোখে কুকুরটাকে দেখে নিয়ে বলল,

-ওটার সময় ঘনিয়ে এসেছে।

আমি একটু অবাক হয়ে বললাম,

-সেকী! আপনি কিছু করছেন না কেন?

-সময় এসে গেলে কিছু করার থাকেনা। এখন প্রহর গুনছে।

গোমেজ খানিক থেমে সিগারেটে লম্বা টান মেরে বলল,

-আপনি ভাবছেন আমার কষ্ট হচ্ছেনা? ওটা তো আমার হাতেই জম্মেছিল। কিছু করার নেই। আমি দেখে নিয়েছি। ওর শেষ সময়ে কেউ ওকে বিরক্ত করছেনা, তাড়া দিচ্ছেনা এটাই তো বড়ো কথা। সবার মরতে একটা জায়গা লাগে। আমি ওদের সেই জায়গাটা দিয়েছি। আপনি কি খান? ঢালবো?

গোমেজের প্রস্তাব সবিনয়ে এড়িয়ে প্রসঙ্গ ঘোরালাম।

-একা একা থাকতে আপনার অসুবিধা হয়না?

ও হাসল! দুর্লভ হাসি।

-আমি কেন একা থাকি আপনি জানেন না? জোর করেতো কারোর সাথে মেশা যায়না। তাছাড়া এই গাছপালা,কুকুর,বেড়াল এটা ওটা নিয়ে সময় কাটাতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি এখন। এমন সময় কুকুরটা মরণ চিৎকার শুরু করল। করুণ সেই স্বর ক্রমশ ধারালো হয়ে অর্জুন গাছের উপর চড়ে গেল। গোমেজ গ্লাসের মালটা এক ঢোকে শেষ করে বলল,

-শেষ হবে এবার।

বলে ও কুকুরটার কাছে গিয়ে বসল। ওর প্রাণটা বেরিয়ে গেছে। কষ বেয়ে গ্যাজলা বেরিয়ে গেছে, চোখদুটো খোলা, পাছা দিয়ে গু বেরিয়ে পড়েছে। গোমেজ ওর চোখ বুজিয়ে সারা শরীরে হাত বুলোতে লাগল। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত ভাবে হাসলো। আমার মনে হল আসলে কাঁদতে চাইছে। অন্য কুকুরগুলো এসে মৃত কুকুরটাকে শুকতে লাগল। গোমেজ ওদেরও আদর করল। বোধহয় স্বান্তনা দিল। মড়া কুকুরটাকে দুহাতে বুকে তুলে ও বাগানের দিকে এগিয়ে চলল। আমিও ওর পিছু নিলাম। একটা কাঠবাদাম গাছের নিচে বড়ো গর্ত খোড়া আছে আগে থেকে। গোমেজ কুকুরটাকে সেই গর্তের ভিতর শুইয়ে দিল।

সেদিন রাতের পর থেকে গোমেজের সাথে আমার সম্পর্কটা অনেক স্বাভাবিক হয়ে গেল। আমিও ওর সাথে মিশতে শুরু করলাম। আমার একঘেয়েমিটা একদমই চলে যেতে লাগল।

-আপনি কি বাকি জীবনটা এইভাবেই কাটিয়ে দেবেন? \

-কি ভাবে?

\-এই এখন যেভাবে আছেন,একা একা?

-আমরা তো সকলেই একা! তাই না?

-ঠিক সেই অর্থে বলছিনা। কিন্তু নিজের পরিবার,সন্তান এটাতো আমাদের সকলেরই ভাল লাগে। বংশে বাতি দেবারও তো লোক লাগে।

-এসবের জন্য নিজেকে যে উদ্যোগ নিতে হয় সেটা আমার নেওয়া সম্ভব না এই জীবনে। যদি কিছু হয়ে যেত সেটা আলাদা কথা।

খানিক থেমে গোমেজ গ্লাশে নতুন করে মদ ধালে। তারপর আবার বলতে শুরু করে,

-আমার বংশ একটা অভিশপ্ত বংশ। এই বংশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কোনো মানে হয়না।

-কেন? আপনার মতো অন্যান্য পর্তুগীজ বংশোদ্ভুতরা তো এটা নিয়ে গর্ব বোধ করে।

গোমেজ পুরো গ্লাশ এক চুমুকে খতম করে আমার প্যাকেট থেকে সিগারেট ধরায়। ওর চোখদুটো ভাটার মতো লাল। একটু উত্তেজিত লাগে। বলে,

-আরে ছাড়ুন তো মশাই। গর্ব! কতগুলো জলদস্যু এখানে এসে মাঠেঘাটে যাকে পেয়েছে ধরে লাগিয়ে দিয়েছে। এইতো আমাদের জম্মোবেত্তান্ত। এটা নিয়ে আবার গর্বের কি আছে মশাই? কোনোদিন স্বীকৃতিটাও দেয়নি। ফুর্তি খতম করে লুটপাট করে আবার জাহাজে ফেরত গেছে। আর আমরা এখানে বংশ দেখাচ্ছি!

পরপর সিগারেটে টান মারতে থাকে গোমেজ।

-আমাদের রক্ত ডাকাতে রক্ত। মগ,হার্মাদের রক্ত। এই বংশ এই জনজাতি ধ্বংস হয়ে যাক।

গোমেজ কে দেখে কষ্ট হয়। বুঝতে পারি ভিতরে অনেক জ্বালা। কিছুই মেনে নিতে পারেনি ও। আর দশজনের সাথে এটাই তফাত গোমেজের। স্রোতে গা ভাসাতে পারেনা ও। ওর অতীত ওর বংশ পরিচয় সবকিছু ওকে কুরে কুরে খায়। তাই বোধহয় স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনা ও।

দেখতে দেখতে বেশ কয়েকমাস কেটে গেল এই অঞ্চলে। গোমেজের সাথে সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ট হয়েছে। ও-ও আমাকে অপছন্দ করেনা। বরং আমার সঙ্গ উপভোগই করতে থাকে। অফিস থেকে বাসায় ফিরলেই ও চলে আসে দোতলায়। জানালার সামনে বসে আমরা গল্প করি। কখনো কখনো পুকুর পারে বা অর্জুন গাছের তলাতে বসেও আড্ডা চলে। পরদিন ছুটি থাকলে আড্ডা চলে গভীর রাত পর্যন্ত। আর রাতের আড্ডায় গোমেজ মদ খাবেই।

এক রবিবার গোমেজ বলল,

-অনেকদিন বাড়ি থেকে বেড়োইনি। চলুন ঘুরে আসি।

-কোথায়?

-চার্চে।

সুযোগ হাতছাড়া করার কোনো মানেই হয়না। বেড়িয়ে পড়লাম।

বড়ো রাস্তায় গিয়ে একটা রিক্সা পেয়ে চেপে বসলাম। যদিও গোমেজ হেঁটেই যেতে চাইছিল। রাস্তার দুধারের লোকজন কাজ চলা থামিয়ে আমাদের অবাক হয়ে দেখতে লাগছিল।

জনপদ থেকে অনেকটা দূরে গিয়ে চার্চটা। গোমেজ চার্চে না ঢুকে সোজা ছলে গেল পিছনে কবরখানায়। প্রায় মাঝখানে গিয়ে ও থামল। সামনের দূটো পাশাপাশি কবরের দিকে ইঙ্গিত করে বলল,

-এই দুটো আমার বাবা আর মায়ের সমাধি।

গোমেজ হাঁটু গেড়ে সমাধির সামনে বসল। লক্ষ্য করলাম ও ওর বাবার ফলক টার গায়ে হাত বোলালো। মায়েরটায় নয়!

-চলুন,ফেরা যাক।

বলে গোমেজ উঠে দাঁড়ালো। আমরা ফিরে চললাম। অনেকক্ষণ পর গোমেজ মুখ খুলল।

-বাবা আমায় খুব ভালোবাসত।

আমি অনুভব করছিলাম ও একটা ঘোরের মধ্য দিয়ে চলছে। মায়ের ব্যাপারে ওর নিরাসক্তিটাও চোখে লাগল।

-বাবা খুব কম বয়সে বুড়িয়ে গিয়েছিল। নার্ভের রোগ ছিল। হাত পা কাঁপত সব সময়। যত বয়স বাড়ছিল সমস্যা ততো বেড়ে চলছিল। মা ছিল বাবার থেকে অনেকটা ছোটো। শক্তপোক্তও ছিল বরাবর। বাবাকে সবসময় খোঁটা দিত মা ওর অক্ষমতার জন্য। বাবা চুপ করে শুনত। কিছু বলত না।

কথা বলতে বলতে আমরা বাড়ি চলে এলাম।

একদিন অফিসে গিয়ে আমার বদলীর চিঠি হাতে পেলাম। অফিসার চিঠিটা ধরিয়ে বললেন,

-যান মশাই,আপনার দ্বীপান্তর শেষ হল। বড়ো টাউনেই পোস্টিং পেয়েছেন। আর ক্রিমিনালের বাড়ি ভাড়া থাকতে হবেনা।

আমি হেসে অফিসারের ঘর থেকে নিজের চেয়ারে ফিরে এলাম। চিঠিটা পেয়ে প্রথমেই আমার রবার্টো গোমেজের কথা মনে এল। গোমেজ কে ছাড়ার সময় এসে গেছে। মনটা একটু ভারিই হয়ে গেল। কটা মাসে ওর সাথে একটা টান তৈরি হয়ে গেছে। ছেড়ে যেতে বেশ কষ্টই হবে। এখানকার লোক ওকে নিয়ে যাই বলুক না কেন,আমার ওকে ভালই লাগত। ওর যে কালো অতীত আছে সেটা বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়না। মাঝে মাঝে মনে হয় সত্যি কি এরকম কিছু হয়েছিল? গোমেজ সম্পর্কে অনেকে অনেক কথা বললেও তার সাথে আমি ওকে মেলাতে পারিনি। অন্যদের মতই ও একজন আবেগ অনুভুতি সম্পন্য মানুষ।

অর্জুন গাছের তলায় বসে গোমেজ মদ খাচ্ছে। সামনে আমি। কাল এখান থেকে চলে যাচ্ছি। আজি শেষবার এখানে বসছি,এইখানে এই অর্জুন গাছের তলায়। গোমেজ চুপ করে আছে। ও জেনেছে আমার চলে যাবার খবর। চলে যাব সেতো জানাই, কিন্তু দুম করে আজকে সেটা শোনার কথা অপ্রত্যাশিত। খবরটা শোনার পর চুপ করে ছিল,কষ্ট পেল বুঝি। কিন্তু কিইবা করার আছে! গুমোট পরিবেশটা কাটাতে আমিই উদ্যোগ নিই।

-আমার নতুন ডেরায় আসবেন কিন্তু।

ও চোখ তুলে তাকায়। চুল্লির ভাটার মতো ওর চোখদুটো লাল। নেশা টা বেশি রকম হয়েছে।

-আপনি চলে গেলে আমি আবার একা হয়ে যাব।

খানিক থেমে আবার বলতে শুরু করে,

-অবিশ্যি একাই ছিলাম এয়াদ্দিন। কিন্তু বরাবরই এমন ছিলনা আমার জীবন।

-এমনটা হল কি করে?

আমি প্রশ্ন করি।

-আমার বাবা খুব ভালমানুষ ছিল বলেছিলামতো। জ্ঞান হওয়া ইস্তক দেখেছি মা বাবার সাথে খারাপ ব্যবহার করে কারণে অকারণে। প্রথমে বুঝতাম না মা কেন এমন করে। কিছুটা বোঝার বয়েস হতে ব্যাপারগুলো বুঝতে শুরু করলাম। রাতের বেলায় একদিন ঘুম ভেঙ্গে গেল বাবা মায়ের ঘর থেকে অদ্ভুত কিছু শব্দ শুনতে পেয়ে। উঠে গিয়ে উঁকি মারলাম পাশের ঘরে।

গোমেজ থামল। আমার থেকে সিগারেট চেয়ে ধরাল। দুরের পুকুরের দিকে চেয়ে থাকে শূন্য দৃষ্টিতে। খানিক পর আমিই কথা বলি,

-তারপর কি হল গোমেজ?

গোমেজ মুখ ঘুরিয়ে আমার দিকে শূন্য চোখে তাকাল খানিক। তারপর বলতে লাগল আবার,

-দেখলাম বাবা বিছানায় শুয়ে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে আর মা বাবার উপর বসে আছে।

গ্লাশের অবশিষ্ট মদটা এক চুমুকে মেরে ও একবার মুখটা বিকৃত করে ঝাঁকিয়ে নিয়ে আবার বলতে লাগল,

-অনেক বছর পর এরকমই সিন দেখেছিলাম ওই খাটালে। তখন আমি প্রায় কলকাতা যেতাম। শেষ ট্রেনে ফিরতাম। খাটালের পাশ দিয়ে শর্টকাট করতাম। যখনি আসতাম লোকটার কাতরানি শুনতে পেতাম। কৌতুহল চাপতে না পেরে একদিন জানালা দিয়ে উঁকি মারলাম। সেই দৃশ্য, ছোটোবেলায় যেমন দেখেছিলাম। লোকটাকে দেখে আমার বাবার কথা মনে পড়ে যেত। এই লোকটারও শরীরে সমস্যা ছিল কোনো। খাটালের কাজ সব ওর বৌই সামলাত। দিনের শেষে বউএর চাহত পূরণ করতে পারতনা। কিন্তু শালার বৌ তা শুনবে কেন! তাই চলত বলাৎকার। ছোটোবেলায় মার উপর খুব রাগ হত,ঘেন্না করতাম মাকে। এই শালি গয়লানিও একই চিজ, বলাতকারি। মেয়েছেলে জাতটার উপর ঘৃণা ধরে গিয়েছিল। আমাদের বাড়ি দুধ দিতে আসতো বউটা। জল মেরে মেরে দুধটা আর দুধ থাকতনা। সেই নিয়ে বলতে গিয়ে লেগে গেল তর্ক। আঙ্গুল তুলে ও আমার সাথে মুখ লাগাতে লাগল,যেভাবে ও ওর বরের সাথে কথা বলে সেভাবে। যে ভাবে আমার মা আমার বাবার সাথে কথা বলত সেভাবে। মাথা গরম হয়ে গেল বুঝলেন। হাত পা বেঁধে শালিকে দুদিন বন্ধ করে রাখলাম। তারপর যেভাবে ও ওর বরকে লাগাত,যেভাবে আমার মা আমার বাপকে বলাৎকার করত সেভাবে আমিও ওকে পালটা দিলাম।

টানা কথা বলে গোমেজ থামল। এই প্রথমবার ওর মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হল ও একজন পর্তুগীজ বংশদ্ভুত। এই প্রথমবার আমি রবার্টো গোমেজকে ভয় পেলাম যেন! মনে হল অর্জুন গাছের তলায় সত্যি সত্যি এক জলদস্যু বসে মদ খাচ্ছে!

রাত ক্রমশ ফিকে হয়ে যাচ্ছে। দু একটা পাখি ডাক দিচ্ছে। ঘুম আর হবেনা। দশটায় ট্রেন ধরতে হবে। একটু গড়িয়ে নেওয়া যায় যদি। উঠে পড়লাম।

-এখন উঠি গোমেজ।

গোমেজ মুখ তুলে তাকাল। ওর রক্তাক্ত চোখ জলে ভরা। যা আমার অ্যালকোহলিক মনে হলনা যতই মাল টানুক ও।

-বাবাকে আমি খুব ভালবাসতাম। যখন ওই গয়লানীটাকে চুদছিলাম তখন শুধু বাবার অসহায় মুখটার কথা মনে পড়ছিল। বদলাটা আসলে তো মায়ের উপর নেবার কথা,কিন্তু সেটা তো পারিনা।

অসহায় আমার ওকেও লেগেছিল। ওর কাঁধে হাত রেখে বলি,

-নতুন ভাবে সবকিছু শুরু করুন। পুরনো অতীতকে ভুলে যান।

-আমি ভুলতে চাইলেও কেউ আমায় ভুলতে দেবেনা।

-এখান থেকে চলে যান। দুরে কোথাও। যেখানে কেউ আপনাকে চিনবেনা।

এই প্রথম আমি ওকে স্পর্শ করলাম। আর এই ভাবে হুইপ করে কথা বল্লাম। ও কিছু বলল না,চুপ করে শুনল।

জিনিসপত্র গুছিয়ে বেরিয়ে পরলাম। শেষবারের মত ঘরটা থেকে বেরিয়ে এলাম। মনটা আমারো খারাপ হয়ে গেল। অথচ এখান থেকে বদলি হবার চেষ্টা কম করিনি। রিকশা বলা ছিল। গেটের কাছে অপেক্ষা করছে। গোমেজ নিচে দাঁড়িয়ে ছিল।আমাকে রিকশা অব্দি এগিয়ে দিতে এল। বললাম,

-কথাগুলো খেয়াল রাখবেন। নতুন করে শুরু করুন।

-তখন থেকে আমি এইসবই ভেবে চলেছি।

-শুধু ভাবলে হবেনা,করতে হবে।

রিকশার কাছে এসে গোমেজ থমকে দাড়াল। আমার মুখোমুখি। চোখে চোখ রেখে বলল,

-আচ্ছা,যদি আপনার সাথে যাই?

আমি একটু অবাক হলাম। বললাম,

-আসতেই পারেন। আপাতত তো আমি একা। পরে ফ্যামিলি এলে অন্য কোথাও ব্যবস্থা করে নিতে হবে।

-সে ঠিক আছে। দাড়ান একটু।

বলে ও বাড়ির দিকে ছুটল। কি কাণ্ড! ও কি এখনি আমার সাথে যাবে? ভারি ছেলেমানুষ তো! কেন জানিনা রবার্টো গোমেজ কে আমার অর্জুন গাছ মনে হল হঠাৎ করে! অর্জুন গাছকে কি আদৌ ভুমি থেকে শিকড় চ্যুত করা সম্ভব? অর্জুন গাছকে সব মানুষ ফট করে চিনতে পারেনা। আমি রিকশায় উঠে অপেক্ষা করতে লাগলুম গোমেজ অথবা অর্জুন গাছটার।

শীর্ষেন্দু দত্ত। লেখক ও ঔপন্যাসিক। জন্ম ১৯৬৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ভারতের ইস্পাত নগরী জামসেদপুরে। পেশায় মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার বাবাকে চার বছর বয়সে হারান পথ দুর্ঘটনায়। মায়ের সাথে কলকাতায় চলে আসেন। মেজমামা অরুন আইন একজন পরিচিত লেখক ছিলেন। তার কাজে প্রাণিত হয়ে লেখা...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..