অলখ সমুদ্দুর

ওয়াহেদ সবুজ
গল্প
Bengali
অলখ সমুদ্দুর

তন্বীকে আজ খুব বিচলিত দেখাচ্ছে৷ সারারাত ঘুমোতে পারেনি, শুধু এপাশ-ওপাশ করেছে৷ আজকে একটা সিদ্ধান্ত নিতেই হবে৷ বেশ কিছুদিন হলো একটা ব্যাপার নিয়ে খুব বিভ্রান্ত সময় কাটছে তার৷ অনেক ভাবনাচিন্তা করে সে ঠিক করেছে, অন্তত এই একটা ব্যাপারে সে অন্য কারো কথা ভাববে না৷ চিরদিনের নিতান্ত বাধ্যগত মেয়ে আজ একটি অত্যন্ত উগ্র অবাধ্যতা দেখাবে৷

 

আহাদ সাহেব দীর্ঘদিন দেশের বাইরে ছিলেন৷ বছর দুয়েক হলো দেশে ফিরেছেন৷ ফিরেই তিনি প্রত্যক্ষ করলেন, যে বিপুল সহায়-সম্পদ তাঁর বাবা রেখে গেছেন তা আসলে তার কাছে বোঝা বই কিছু নয়! তিনি একা মানুষ, পঁচিশ বছর দেশের বাইরে৷ অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন৷ ইতোমধ্যেই যে পরিমাণ সম্পদ তিনি সঞ্চয় করেছেন, তার পরবর্তী কয়েক প্রজন্ম তা খরচ করে শেষ করতে পারবে না৷

কয়েকদিন আগেই তিনি ৪৭টি ক্যান্ডেল নিভিয়ে কেক কেটেছেন৷ এখনো যেহেতু তিনি বিয়েশাদির পথে হাঁটেননি, আর তেমন কোনো সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না৷ সুতরাং, তাঁর নিজের অর্জিত সম্পদ নিয়েই তিনি বিচলিত৷ এসব ভেবেই দেশে ফেরার মাস ছয়েকের মধ্যেই উত্তরাধিকার সূত্রে যেখানে যা প্রাপ্য ছিলো সব বিক্রি করে ব্যাংক একাউন্টে আরো কিছু শূন্য যুক্ত করেছেন৷

 

খুরশিদ চৌধুরীর নানান ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য রয়েছে৷ তবে তাঁর মূল ব্যবসা হচ্ছে জমি কিনে বাড়ি তোলা৷ সারাজীবনে তিনি অনেক কিছুই চেষ্টা করেছেন; শেষমেষ এসে থিতু হয়েছেন রিয়েল এস্টেটের ব্যবসায়৷ তাঁর জীবনের উত্থান মূলত শুরু হয়েছে এই ব্যবসায়ে আসার পর থেকেই৷ তাঁর মতে, এটা হচ্ছে এক প্রকার ফাও ব্যবসা; অন্যের টাকায় ব্যবসা করে টাকা বানানো৷ তাঁর স্ত্রী একজন পুরোদস্তুর গৃহিণী, যিনি নাস্তা বানানোর মধ্য দিয়ে দিন শুরু করেন সকাল সাতটায়, সারাদিন এটা-সেটা প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় কাজ শেষে গোটা চার হিন্দি-বাংলা টিভি সিরিয়াল দেখে ফ্রি হন রাত সাড়ে এগারোটায়৷ তাঁদের দুই মেয়ে৷ ছোট মেয়েটি নবম শ্রেণিতে পড়ে, নাম বহ্নি৷ তার মাথা মোটামুটি একটি সার কারখানা, যেখানে প্রচুর পরিমাণে গোবর সার মজুদ রয়েছে বলে খুরশিদ সাহেবের ধারণা৷ কারণ, প্রথমত সে অঙ্ক বোঝে না, দ্বিতীয়ত সে ইংরেজিতে কাঁচা; অষ্টম শ্রেণির বোর্ড পরীক্ষায় ইসলাম শিক্ষার মতো বিষয়ে সে ‘বি গ্রেড’ পেয়েছে৷ বড় মেয়ে অত্যন্ত মেধাবী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এপ্লাইড কেমিস্ট্রিতে ফাইনাল ইয়ারে৷ তার নাম তন্বী৷

 

রিয়ান বছর দুই হলো একটি রিয়েল এস্টেট কোম্পানিতে চাকরি করছে৷ ম্যানেজমেন্টের ছাত্র রিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ে তার ব্যাচে টপার ছিলো৷ জীবনের প্রথম ইন্টারভিউতেই সে এ চাকরিটা পেয়ে যায়৷ বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান সে৷ মাত্র দু বছরেই সে নিজের যোগ্যতা ও সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে৷ আমাদের আহাদ সাহেবের উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত জমিজমা ক্রয়ে খুরশিদ চৌধুরীর পক্ষে যাবতীয় প্রসেস সে নিজে হ্যান্ডেল করেছে৷ গত দু বছরে রিয়ান এ রকম আরো অনেক বড় বড় ডিল এত দারুণভাবে হ্যান্ডেল করেছে যে তার বস খুরশিদ চৌধুরী তার ওপর যারপরনাই স্যাটিসফাইড৷ তিনি নানানভাবে খোঁজখবর করে জানতে পেরেছেন, ছেলের ফ্যামিলি ভালো, ছেলের ব্যাপারেও সন্দেহের কোনোই অবকাশ নেই৷ সুতরাং তাঁর বড় মেয়ের জন্য পাত্র হিসেবে সে একেবারে পারফেক্ট৷

 

তন্বীর সাথে রিয়ানের বেশ কয়েকবার দেখা হয়েছে৷ শুরুতে সে মেয়েটির দিকে ঠিক চোখ তুলে তাকাতে সাহস করে ওঠেনি৷ যেদিন বাড়ি ফিরে সে খুরশিদ চৌধুরীর ইচ্ছের কথাটা জানতে পারে, সেদিনের পর দ্বিধা অনেকটাই কেটে গেছে৷ এরপর প্রথম যেবার তন্বীর সাথে দেখা হলো, সেদিন সে বেহায়ার মতো চোখে চোখে তাকিয়ে থাকলো বেশ কিছুক্ষণ৷ তন্বী প্রচণ্ড বিরক্ত হলো৷ এ ঘটনার পর রিয়ান লুকিয়ে লুকিয়ে তন্বীকে দেখেছে বহুবার৷ বিশেষত মেয়েটি যখন হাসে, তখন রিয়ানের পৃথিবী ওলোটপালোট হয়ে যায়৷ চোখ দুটো সুগভীর প্রশান্ত, কণ্ঠস্বরে বয়ে যায় সে কী এক কালবৈশাখী ঝড়! বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন অনেক মেয়েই তার প্রেমে হাবুডুবু খেয়েছে, কিন্তু সে নিজে গর্তে পড়েছে এই প্রথম৷

 

এই মুহূর্তে তন্বী দাঁড়িয়ে আছে আহাদ সাহেবের ফ্ল্যাটের দরজায়৷ দু বছর আগে তার বাবার সাথে ব্যবসায়িক লেনদেনের প্রেক্ষাপটে বেশ কয়েকবার আহাদ সাহেব তাদের বাড়িতে গিয়েছেন৷ তার পরিবারের সাথে আহাদ সাহেবের এক ধরনের যোগাযোগ সৃষ্টি হয়েছে তখন থেকেই৷ যেহেতু তিনি ভীষণ রকম একা একজন মানুষ, খুরশিদ চৌধুরীর পরিবার তাঁর প্রতি অপরিসীম মমতা প্রদর্শন করেছে৷ তাছাড়া মানুষ হিসেবে আহাদ সাহেব অত্যন্ত আকর্ষণীয়; আচার-ব্যবহার, বাচনভঙ্গী ও কথাবার্তায় প্রচণ্ড স্মার্ট! দু বছরের পারিবারিক যোগাযোগের প্রাকৃতিক অভিশাপ তন্বীকে আজ আহাদ সাহেবের ফ্ল্যাটের দরজায় এনে দাঁড় করিয়েছে৷ এখানে এসেই বাড়ির কেয়ারটেকারের হাত থেকে সে একটি ছোট্ট চিঠি পেয়েছে৷ সেখানে লেখা—

“প্রিয় তন্বী,

চলে যাচ্ছি; আবারো সব ছেড়েছুড়ে দেশের বাইরে৷ জীবনের শেষ সময়টা স্বদেশে কাটানো আর হয়ে উঠলো না; কারণ এটা করতে গেলে একটি পরিবার টুকরো টুকরো হয়ে যেত৷ যদিও ভালোবাসা এ পক্ষেও অস্বীকার করার শক্তি আমার নেই, তবুও তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা দাবি করে যেন তোমার একটি সুন্দর জীবনের সম্ভাবনা নষ্ট না হয়ে যায়!

ভালো থেকো!”

 

চলুন, আরো একটি চিঠি পড়া যাক:

“বাবা,

ক্ষমা কোরো৷ যে কাজটি আমি আজ করতে যাচ্ছি, সেটা তোমাদের খুব কষ্ট দেবে জানি৷ কিন্তু, আমি খুব সুখী হবো৷ আর তোমাদের চাওয়াটাও নিশ্চয়ই তা-ই?

রিয়ান ছেলে হিসেবে যথেষ্ট ভালো৷ তোমরা আমার জন্য অনেক যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নিয়েছো— সন্দেহ নেই৷ কিন্তু, মন আজ সকল যুক্তিকে ভেঙেচুরে ফেলতে চায়৷

ভালো থেকো বাবা! যদি প্রকৃতি চান, হয়তো কোনোদিন আবারো ফিরবো! সেদিন চাইলে আমাকে অগ্রাহ্যও করতে পারো!

তোমার তনু!”

 

বৃষ্টি শুরু হয়েছে; প্রচণ্ড বৃষ্টি! সিঁড়িঘরের কাঁচের দিকে তন্বী তাকিয়ে আছে৷ কাঁচটা অপরিষ্কার, বৃষ্টির ফোঁটাগুলো অস্পষ্ট৷

 

 

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..