অসময়ের গান

ইমেল নাঈম
কবিতা
Bengali
অসময়ের গান

পরিণতি

দাঁড়াতে হয়। বিভ্রম কাটলেই অন্য সকাল।
আলোর বিপরীতে দাঁড়িয়ে ভাবনার স্তর মাপি,
বিচ্ছুরণের বিনির্মাণে কাল্পনিক মেঘ বিষাদ
মায়াজালে উড়ে যায় চোখ, পুড়ে যায় মন।

মৌন’র বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে থাকি দুঃখ নিয়ে
দিকভ্রান্ত সময় পালিয়ে যায় অগোচরে
নিজের জন্য অবশিষ্ট রাখে না কোনোকিছু
ঝড়ের শেষে থাকে ভ্যাপসা গুমোটে দৃশ্যপট

উড়ে যায় মন ভালো করার সকল উপাদান,
প্যান্ডোরাবক্স ও তার মুহূর্তের নাটকীয়তায়
ক্রমাগত ফিকে হয়ে যাচ্ছে বর্তমান,
কাঙালপনায় লিখে রাখছি অপ্রাপ্তি ক্রোধ

গম রঙা দুপুরের নরম চিলতে রোদের
সালতামামি শেষে অপেক্ষায় থাকে নির্জনতা,
বিভ্রমে কেটে যায় মুখরিত জীবনের অধ্যায়
প্রতিটি বাঁক লিখে রাখে অপ্রাপ্তির পয়েন্ট।

দৈনন্দিন প্রশ্নের ফাঁকে জেগে থাকে জীবন
স্রোতের চোরাবালিতে জাগে ক্ষীণ আশা
সেটুকু নিয়েই মুছে যাচ্ছে প্রণয়ের পরিণতি।

পথ

And miles to go before I sleep.

– Robert Frost

পথ মেপে রাখি। সামনের আড়াল থেকে কেউ হয়তো দেখে লুকিয়ে, মেঘ গেছে ছুটিতে, হেমন্তের শেষভাগে প্রভাতকালীন শীত জানান দেয় উৎসবের মৌসুম ঘনিয়েছে দ্রুত। প্রবঞ্চক সময় ছুটে চলে অনামা পথ ধরে, শুনেছি প্রেমে পড়লে মানুষ ভুল রাস্তায় চলে যায়। সেপথে অদৃশ্য কাঁটা থাকে, সেগুলো আঘাতে আহত করে চেনাজানা উঠোন।

পথের গল্পে কোনো মেটাফোর নেই, পরিযায়ী জীবন নয়, বেদুইনের মতো ছুটে চলাও মিলে না এই পথচলায়। উদ্দেশ্যহীন কেবল ছুটে চলা এক প্রান্ত থেকে অন্য একপ্রান্তে। নীরবে ছুঁয়ে দেখতে চাওয়ার অভীপ্সায় পেরিয়ে যাচ্ছে ঘড়ির কাঁটা। নীরবতা ছুঁয়ে পড়ছে ব্যস্ত সড়কের সান্ধ্যকালীন ল্যাম্পপোস্টে, একটু প্রসন্নতার খোঁজে।

গল্পের মোড়কে বাঁধানো জীবন, কেবলই রূপকথায় পালটে যায় গতিপথ, জীবনকে ভাগ করি নানা অধ্যায়ে। সকল অধ্যায়েই পরাজয় আঁকা। বিব্রত সময় দৌড়ে চলে ক্যানভাসে, ধূসর রঙে মণ্ডিত করে আগাগোড়া। ভুলের বৃত্ত ভুলে গিয়ে দাঁড়াতে বলে। পথ সেতো মায়ার খেলা, শান্ত নদীর বুকে বয়ে চলা খেয়া।

ভ্রান্ত সময়টুকুকে পাড়ি দিতে হয়, যেটুকু মৌন হতে হয় সেখানে উড়ে যেতে হয়, পাইনবনের নীরবতা ভাঙুক, ছিঁড়ে ফেলে সকল হিসাব, যতটুকু আড়াল চিনেছে সকাল, তার কাছেই ফিরে আসতে হয়… বিনিময়ে ঝুলে থাকে একরাশ প্রহসন, কাল্পনিক গল্পের ভিড়ে, উষ্ণতার বিনির্মাণে পথই বলে দেয় ফেরার গল্প।

 

পরিণতি

পরিণতি ভেবে লিখে রাখছি দূরের নির্বাসন
পাখিরা মৌন হলে পারিজাত ফোটে
প্রেম হয়ে ওঠে সন্ন্যাস যাপন

দৃশ্যমান কোনো কাটাছেঁড়ার পরে
এন্টিসেপটিক চুম্বন আঁকা প্রেয়সীও
পালিয়ে যায় দূরত্বের অংকে,

ম্যাথমেটিসিয়ান ম্যাজিক খেলেন
তাতেই পথ ভুলে যায় পরিযায়ী মেঘ
থোকায় থোকায় জমে দুঃখকণা

ইশ্বরকণায় চোখ রেখে বিজ্ঞানীও
প্রেম আঁকছেন তোমার উন্মুক্ত গ্রীবায়,
আর, বিজ্ঞাপনের ফাঁকগলে কিশোরটি
হয়ে যাচ্ছে দুরন্ত যুবক…

ইথারে ভেসে আসে চেনা কণ্ঠস্বর
উত্তেজনাপূর্ণ শ্বাস প্রশ্বাসের শব্দ।

 

অসময়ের গান

আকর্ষণহীন সমুদ্রের গর্জন, কাকাতুয়ার অগোছালো সমাবেশ আর প্রতারকই এখানে মুখ্য চরিত্র, কাল্পনিক গণিতে উড়ে আসে অর্ধসমাপ্ত ক্যালকুলাস। তার চেয়েও বেশি যন্ত্রণাদায়ক মনের গতিপথ আর বিচ্ছেদের উপপাদ্য। অহর্নিশ ডাকাডাকি শুনি, সরুপথে কেবলই পাতাবাহারের ছড়াছড়ি, হেমন্তেই ঝরেছে গাছের পাতা, পথটিও পড়েছে চাপা মৃত পাতাদের সন্নিবেশে…

উড়ে চলার বয়সটিও হারিয়ে গেছে গভীর বিচ্ছেদের আগুনে জ্বলে। পম্পেই নগরীর মতো জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিলো ভিতর, বাহির, দৃশ্যমান সকল ল্যান্ডস্কেপ। এতে নদী, নালা, পাহাড়, পর্বত কোনও ভেদাভেদ নেই, প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তি একই সমীকরণে ছুঁয়ে থাকে আমাকে। বিবর্ণ গাছেদের দুঃখগুলো নীরবে ঝরে স্রোতহীন নদীর কাছে। আমি মানুষের মতো হলেও আমার পাখি মন… উড়ছি শুধু…

কমলালেবু জানে খসে পড়ার কী মানে! পরাগায়নহীন জীবন থেমে গেছে কালো হেমন্তে, অন্ধকার নেমে আসছে, নিজেকে প্রশ্ন করে মিলিয়ে যাচ্ছি বিভ্রম বুকে নিয়ে। থেমে যাবার প্রাক্কালে একটু কড়া নাড়তেও পারতো সেই মুখ। শব্দরা ছুটি নিলো, ইশারাও ব্যর্থ, চোখ নিষ্ফলা তাকিয়ে দেখে অদৃষ্টের পথে, পাহাড়ের ক্লান্তিতে লিপিবদ্ধ ঝর্ণার নৃত্য।

এভাবেও হেরে যাওয়া যায়, মুখ জানে না থেমে যাবার কত রকমের অর্থ। সে কেবলই নির্বাক চোখে কবিতা বুনে, অসময়ের গান থেমেছে শুশ্রূষাহীন পাতাবাহারের মলিন শহরে…

 

বিচ্যুতি

খসে পড়া দেখি। শৈশবের রূপকথা।
কাল্পনিক ব্যবচ্ছেদ, উড্ডীন কথামালায়
দৌড়তে দৌড়তে ফিরে আসি ঘরে,

দিনের শুরুতে কিছু স্পর্শ থাকে গোপনে
বিবাদ লিখে রাখে একঘেয়ে জীবন,
ছুটিতে কাটাচ্ছি ব্যস্ততম দিন,

উড়ে যায় বিভ্রম ভরা স্বপ্ন নিয়ে
ডুবে যায় চাঁদ, নিজেকে আলিঙ্গন করে
উড়িয়ে দিচ্ছি অবাক শূন্যতায়

শুরুতে ঘড়ির কাটায় রাখি চোখ
মিনমিনে সময় উড়ে যায় ভ্রান্ত দিন
কেবল, চোখ মেলে দেখি খসে পড়া।

নীরবতা আঁকতে আঁকতে এড়িয়ে যাই
কোথাও উড়ে যায় পাখিদের মিছিল
নক্ষত্র খসা দেখে পেরুচ্ছে সময়।

ইমেল নাঈম। কবি। জন্ম ২৭ সেপ্টেম্বর ১৯৮৬। বসবাস চট্টগ্রাম শহরের হালিশহরে। পড়াশোনা: বিবিএ, এমবিএ শেষ করে বর্তমানে সিএ পড়ছেন। তার পাশাপাশি কর্পোরেট জবও করছেন। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা তিনটি। প্রকাশিত বইঃ দেয়ালের ও'প্রান্ত পেরিয়ে (২০১৫, চৈতন্য প্রকাশনী), দূরবীন চোখ (২০১৮, চৈতন্য প্রকাশনী), সুদূরে শূন্যস্থান (২০১৯, স্বরচিহ্ন প্রকাশনী)।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

হাল

হাল

সুখানুভূতি সুখানুভূতি মেরে এনেছে।মাল খাওয়ার পরে। এদিকে টাল খাচ্ছে হাওয়া।উড়ে যাচ্ছে আমপাতা।ইমামবড়ার ভক্তিপূর্ণ আবহাওয়া। আমরা…..