অহনা

ইভান অনিরুদ্ধ
গল্প
Bengali
অহনা

এইটা অহনাদের বাসা না?

আমার এই প্রশ্নে মধ্যবয়সী মহিলা কিছুটা বিরক্ত হলেন। তার মুখ দেখেই আমি বুঝতে পেরেছি। আপনি কোন অহনার কথা বলছেন? ভদ্র মহিলার গলায় কিছুটা ঝাঁজ ঝরে পড়লো। আমি মিনমিন করে উত্তর দিলাম, ফর্সা মতন, বাঁ গালে গোল তিল আছে। এইবার মহিলা একটা মুচকি হাসি দিলেন আমার কথা শুনে। আমি থতমত খেয়ে বললাম, আপনি কি চেনেন অহনাকে? ভদ্র মহিলা ঘাড় নেড়ে বললেন, না, আমি এই নামে কাউকে চিনি না। তবে আমার মেয়ের নামও অহনা। আমি ভদ্রতা করে বললাম, খুব সুন্দর নাম আপনার মেয়ের। তারপর একটু দম নিয়ে আবার বললাম, এই বাসায় অহনারা থাকতো। এই কোণার ঘরটা ছিল অহনার। তা আপনারা কতদিন হল আছেন এই বাসায়?

ভদ্র মহিলা এইবার তার হাতের ইশারায় আমাকে ঘরে যেতে বললেন। আমি ইতস্তত করছি দেখে তিনি আচমকা আমার হাত টেনে ভেতরে নিয়ে গেলেন। আমি খুব অবাক হলাম। প্রথম দেখায় কেউ কাউকে এভাবে হাত ধরে! জুতা খুলে আমি ঘরের ভেতর ঢুকলাম। ভদ্র মহিলা ফুল স্পীডে ফ্যান ছেড়ে দিয়ে বললেন, এগারো বছর হলো এই বাসায় আছি। আমি বুকের ভেতরে জমিয়ে রাখা কষ্টটা এমন ভাবে ছাড়লাম যাতে ফ্যানের বাতাসে তা ছড়িয়ে অহনার সেই কোণার ঘর অবধি যায়। ভদ্র মহিলা জল খাবার আনতে ভেতরে গেলেন। আমার খুব ইচ্ছে হচ্ছিলো অহনার ঘরটা ঘুরে দেখতে। কিন্তু পরক্ষণেই ইচ্ছেটাকে মেরে ফেললাম।

ট্রে ভর্তি পাকা আম আর শরবত এনে মহিলা আমার সামনে রাখলেন। তিনি শরবতের গেলাসটা আমার দিকে বাড়িয়ে বললেন, মনে হচ্ছে আপনাদের বিষয়টা অনেক বছর আগের, তাই না? আমি নীরবে মাথা নাড়লাম। ভদ্র মহিলা শাড়ির আঁচলে মুখটা মুছে ধীর গলায় আরেকবার বললেন, আসলে এতো বছর কেউ কারো জন্য অপেক্ষা করে না। আমি এক টুকরা আম মুখে দিয়ে বললাম, আপনি ঠিকই বলেছেন। এতো বছর কেউ অপেক্ষায় থাকে না, থাকা সম্ভবও নয়। নিজেকে একটা মিথ্যা প্রবোধ দেয়ার জন্যে মনে মনে বললাম, এতো বছর কেউ থাকে নাকি? ভদ্র মহিলা পাশের সোফায় বসলেন। তিনি খুব আগ্রহ নিয়ে বারবার আমার মুখের দিকে তাকাচ্ছেন। আমার খুব অস্বস্তি লাগছে। নিজেকে সহজ করার জন্য বললাম, বাসায় আর কে কে আছেন? তিনি মুচকি হেসে উত্তর দিলেন, আমি, আমার একমাত্র মেয়ে আর ব্দ্ধৃা মা। আপনার হাজবেন্ড? আমি আরেক টুকরা আম হাতে নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি মাথা নিচু করে রইলেন। তারপর আমার দিকে চেয়ে বললেন, তিন বছর আগে রোড এক্সিড্যান্টে মারা গেছেন। আর আমি এখানকার একটা প্রাইমারি স্কুলে টিচার হিসাবে আছি। আমি কী বলব বুঝতে পারছি না। তবু বললাম, সরি, আপনাকে এভাবে বিব্রত করার জন্য। এতোটুকু বলে চুপচাপ বসে রইলাম।

এইবার তিনি কিছুটা সহজ হয়ে বললেন- আপনাকে একটা কথা বলি। কিছু মনে করবেন না। আপনার চেহারার সাথে অহনার বাবার চেহারার দারুণ মিল রয়েছে। আর এটাই আপনার প্রতি আমাকে আগ্রহী করেছে। আপনাকে হাত ধরে সরাসরি ঘরের ভেতর এনে বসিয়েছি। আপনি আবার অন্যকিছু ভেবে বসবেন না যেন! আমি তাৎক্ষণিক বললাম- ছি, ছি, এসব কী বলছেন! অন্যকিছু ভাবতে যাবো কেন? এই পৃথিবীতে কত অদ্ভুত ঘটনা ঘটে! আমার সাথে আপনার পরিচয়টাও এরকম একটা অদ্ভুত ঘটনা। কথা শেষ হতেই তিনি আমার কাছ থেকে খানিকটা সময় চেয়ে ভেতরের ঘরে গেলেন। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে বললেন- মাকে গোসলের পানি দিয়ে এলাম। আজ আমি স্কুলে যাইনি। আমার মেয়ের শরীরটা ভালো না। এই গরমে-ঘামে কিছুটা কাশি হয়েছে। আমি তার কথায় বললাম- ডাক্তার দেখিয়েছেন? আর দু’একদিন দেখে তারপর ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো- তিনি আমার দিকে তাকিয়ে উত্তর দিলেন।

আপনার পরিচয়টা জানা হল না এখনো- ভদ্র মহিলা মুচকি হেসে বললেন। আমার জড়তা পুরোপুরি কেটে গেছে। আমি সহজ ভঙ্গিতে বললাম, আমার নাম আবির। এই শহরেই আমার ছেলেবেলা, কলেজ জীবন পার করেছি। আমার বাবা পোষ্ট অফিসে চাকরি করতেন। মা-বাবা দুজনেই গত হয়েছেন। এক ছোট বোন ছিল, সেও গত বছর স্বামীর সংসারে অসুস্থতায় ভূগে মারা গেছে। নিজে বিয়ে-শাদী করিনি। একটা প্রাইভেট ব্যাংকের চাকরি নিয়ে স্মৃতির শহর নেত্রকোনায় ফিরে এলাম আবার। যদিও পুরাতন বন্ধুদের সাথে আমার একেবারেই এখন আর যোগাযোগ নেই। গত দুই দিন হল এখানে এসেছি। একটা রেস্ট হাউজে থেকে অফিস করছি। এই পর্যন্ত বলে আমি থামলাম। দুপুর প্রায় গড়িয়ে যাচ্ছে তবু কেন জানি এই ভদ্র মহিলার সামনে থেকে উঠে পড়ার কোন তাড়া অনুভব করছি না। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, ভদ্র মহিলার মনের অবস্থাও আমার মতো। আমি চুলায় ডাল বসিয়ে রেখেছিলাম, এই বলে ভদ্র মহিলা এক দৌড়ে আবার ভিতরে চলে গেলেন। ফিরে এসে বললেন, দুপুরের ভাত খেয়ে তারপর যাবেন। আপনার সাথে যেহেতু একবার পরিচয় হয়েছে তাই আশা করি আমাদের আরও যোগাযোগ থাকবে। আমার নাম রেবেকা। আপনি আমাকে একজন বন্ধু ভাবতে পারেন। তার এই কথায় আমি খুব খুশি হলাম। আমি হেসে বললাম, এরকম উদার চিন্তা ভাবনার জন্য আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ।

দুই.

হাত-মুখ ধুয়ে রেবেকার বাসায় দুপুরের খাবার খাচ্ছি। টেবিলে তার মেয়ে অহনাও বসেছে। মেয়েটার চেহারা অবিকল মায়ের মতো, খুব মিষ্টি দেখতে। আমাকে প্রথম দেখাতেই খুব আপন করে নিয়েছে। আমাকে সে বেশ কয়েক বার বলেছে, আংকেল, আংকেল, তুমি আমার মাছের কাঁটা গুলো বেছে দাও। আমি আর রেবেকা তার কথায় খুব মজা পেলাম। খাবার টেবিলে রেবেকা আমাকে জিজ্ঞেস করলো, আচ্ছা, অহনার সাথে আপনার একটা সম্পর্ক ছিল। সেটা কেমন ছিল? আমি এক গ্লাস পানি খেয়ে উত্তর দিলাম, পুরাতন প্রেম, মনে করে লাভ কী! তবু বলেন, আমার খুব শুনতে ইচ্ছে করছে! রেবেকা এমন ভঙ্গিতে বলল কথাটা যে আমি বলতে বাধ্য হলাম।

স্কুল থেকে অহনার সাথে আমার সম্পর্ক ছিল। কলেজে উঠে সেই সম্পর্ক ভালোবাসায় পরিণত হল। সে ছিল অন্য ধর্মের । যদিও তার ফ্যামিলিতে আমাকে অহনার একজন ভালো বন্ধু আর সহপাঠী হিসাবেই জানতো। কিন্তু ক্রমশঃ আমরা একজন আরেকজনকে গভীর ভাবে ভালোবেসে ফেলেছিলাম। তারপর এই প্রেম, ভালোবাসার কথা কলেজের ক্যাম্পাস থেকে ছড়িয়ে অহনার বাবা মায়ের কানেও আসে। একটা মুসলমান ছেলের সাথে হিন্দু মেয়ের ভালোবাসার কাহিনী এরকম একটা গ্রাম্য মন-মানসিকতার মফস্বল শহরে কেউ ভালো ভাবে নেয়নি। চারদিকে একটা ছিঃ ছিঃ পড়ে গেল। আমি অবশ্য যেকোন মূল্যেই অহনাকে বিয়ে করতে রাজি ছিলাম। কিন্তু তার কাছে ধর্মের পরিচয়টা বড় হয়ে দেখা দিলো। সে তার পরিবারের দিকে চেয়ে আমাকে প্রত্যাখান করল। আমার সাথে সকল যোগাযোগ বন্ধ করে দিলো। কলেজে আসা ছেড়ে দিলো। তারপর একদিন শুনি অহনাকে কলকাতায় পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। এর কিছুদিন পর সেখানেই তার বিয়ে হয়। আমার কথায় রেবেকার ভাত খাওয়া বন্ধ হয়ে আছে, তা এতোক্ষণ খেয়াল করিনি। সে শাড়ির আঁচলে চোখ মুছে ভাতের প্লেটে হাত ধুয়ে উঠে পড়েছে। এই অবস্থায় আমার নিজেকে অপরাধী লাগছে। রেবেকা আমার পাশে এসে দাঁড়ালো। তারপর ধরা গলায় বললো, আপনিও ভুল মানুষকে ভালোবাসলেন, আমিও ভুল মানুষকে ভালোবাসলাম! যাকে ভালোবেসে ছিলাম তার সাথে সংসার করতে পারলাম না।

দুপুর পার হয়ে বিকেল হয়ে গেছে। আমি রেবেকার কাছ থেকে বিদায় নিলাম চলে আসবো বলে। নিজের কাছেই আজকের বিষয়টা খুব অবাক লাগছে। আমার হারিয়ে যাওয়া অহনাকে খুঁজতে এসে ছয় বছরের এক মিষ্টি মেয়ে অহনার মায়ের সাথে আমার দেখা হয়ে গেল। সেই রেবেকার ভেতরেও শূন্যতা, হাহাকার আর কিছু একটা না পাওয়ার অতৃপ্তি। জীবন কত অদ্ভুত তাই না! চলে আসবার সময় রেবেকা আমার হাত ধরে গাঢ় গলায় বললো, আবির, আমি তোমাকে আমার একাকীত্বের দূর্বিষহ জীবনযন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে পাশে চাই। তুমি আমাকে ফিরিয়ে দিবে না তো?
আমি এক পলক রেবেকার চোখের দিকে চেয়ে মাথা নিচু করে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম।

ইভান অনিরুদ্ধ। গল্পকার ও কবি। জন্মঃ ২৬ জানুয়ারি ১৯৭৮, আটপাড়া, নেত্রকোণা। উচ্চশিক্ষার পাঠ শেষ করে দীর্ঘদিন বিভিন্ন ঔষধ কোম্পানিতে চাকরি করেছেন। কর্মসূত্রে দীর্ঘ ছয়বছর দক্ষিণ কোরিয়ায় ছিলেন। ২০১৬ সালে দেশে ফিরে আসেন। বর্তমানে ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ