অ্যানি সেক্সটনের সেরা কবিতার অনুবাদ

সোনালী চক্রবর্তী
অনুবাদ, কবিতা
Bengali
অ্যানি সেক্সটনের সেরা কবিতার অনুবাদ

অভিজাত অথচ অসুস্থ শৈশব কোন নারীর প্রথমে বিষাদ, তারপর কবিত্বে উত্তরণ আর পরিশেষে অবশ্যম্ভাবী আত্মহননের কোন সূত্র হতে পারে কিনা, এই বিতর্কে যার নাম সবসময় উঠে আসবে তিনি অ্যানি সেক্সটন। ধনী ব্যবসায়ীর একমাত্র সুন্দরী কন্যা অ্যানির জন্ম ম্যাসাচুটেসটসে ১৯২৮ সালে। ছোটবেলায় তিনি একমাত্র অবিবাহিত পিসিকেই পেয়েছিলেন সঙ্গী হিসাবে। ঊনিশবছর বয়সে তাঁর বিবাহ হয় এলফ্রেড কায়োর সঙ্গে। যখন কায়ো কোরিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যাস্ত, অ্যানি ফ্যাশন মডেল হিসাবে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। ১৯৫৩ এবং ও ১৯৫৫ সালে তিনি দুটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেন। প্রথম সন্তানের জন্মের পর থেকেই দুরারোগ্য হতাশায় আক্রান্ত হন যা মাত্র ৪৬ বছর বয়সে তাঁর আত্মহত্যার মধ্যে দিয়ে নিষ্কৃতিলাভ করে। মানসিক চিকিৎসালয়ে চিকিৎসা চলাকালীন ব্যাক্তিগত মনোবিদের পরামর্শে তাঁর কবিতা লিখতে আসা। ১৯৫৭ সালে বস্টনের লেখকগোষ্ঠীতে যোগ দিয়ে অ্যানি সমসাময়িক রবার্ট লওয়েল ও সিলভিয়া প্লাথের ঘনিষ্ট হয়ে ওঠেন। ১৯৬০ সালে তাঁর প্রথম কবিতার বই প্রকাশিত হয় ‘To Bedlam and Part Way Back’, ১৯৬৬ সালে তাঁর লেখা ‘Live or Die’ পুলিটজার পুরস্কার পায়। তাঁর জীবদ্দশায় তিনি অসামান্য জনপ্রিয়তা লাভ করেন এবং অগণিত সম্মানের অধিকারী হন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ফ্রস্ট ফেলোশিপ, লেভিসন প্রাইজ, আমেরিকান একাডেমি ফেলোশিপ, হাভার্ড সম্মান ইত্যাদি। যদিও তাঁর কবিতা অত্যাধিক ব্যাক্তিজীবনের প্রতি কেন্দ্রীকতায় আচ্ছন্ন বলে সমালোচিত হয়েছে কিন্তু নারীবাদ তথা বৈপ্লবিকতার উন্মেষে কবিতার জগতে সেক্সটনের নাম অনস্বীকার্য মাত্রাতেই উত্তীর্ণ।

অ্যানি সেক্সটন

* তার দেহকোষের জলাভূমি

(প্রাচীন আরবে কোন এক উপজাতির উপাস্য দেবীকে বলি উৎসর্গের আপাত উদ্দ্যেশ্যে মৃত পিতার পাশে তার যুবতী কন্যাকে জীবন্ত কবর দেওয়ার প্রথা প্রচলিত ছিলো)

Harold Feldman
“Children of the Desert”
(Psychoanalysis and psychoanalytic Review, Fall 1958)

আত্মসংবরণের হাসি উপহার দিয়ে,
তার পাশে শুয়ে পড়াটাই শুধু গুরুত্বপূর্ণ ছিলো,
আর ছিলো এক ভাঁজে জড়িয়ে,
কিছুক্ষণের জন্য বিশ্রাম নেওয়া।
যেন আমরা রেশম,
মায়ের চোখ থেকে অস্তে পাঠানোর জন্য নি:শব্দে নির্ধারিত।
গিরিগুহা বা খাদক অথবা
অন্তর্গত জঠরের মতো কৃষ্ণগহ্বরটা
আমাদের গিলে নিল।
আমি শ্বাস ধরে রেখেছিলাম,
আর বাবা সেখানে ছিলো।
তার বুড়ো আঙ্গুল,
তার তৈলাক্ত খুলি,
তার দাঁত,
শস্যক্ষেত বা শাবলের মতো গজানো চুল।
অদ্ভুত না হয়ে ওঠা অব্দি
আমি তার চামড়ার শেওলার সঙ্গে শুয়েছিলাম।
আমার বোনেরা কখনো জানতেই পারবে না,
আমি কীভাবে নিজের সঙ্গে কলহে জড়িয়ে পড়লাম,
এমন জাহির করলাম,
যেন ঈশ্বর কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না,
কীভাবে আমি বৃদ্ধ গাছ পাথরের মতো
বাবাকে আঁকড়ে ধরলাম।

গর্ভপাত

একজন চলে গেছে যার জন্মানো উচিৎ ছিলো।

তখন ভূমি সদ্য তার মুখ উন্মুক্ত করছিলো,
প্রতিটি মুকুলই তার গ্রন্থি থেকে স্ফীত হয়।
আমি জুতোটা পাল্টে নিয়ে দক্ষিণে ভিড় জমাতে বেরিয়ে পড়েছিলাম।

আশমানি পর্বত পেরিয়ে যাচ্ছিলাম,
যেখানে পেনসিলভানিয়া কচি চুল পরা কুঁজ তৈরি করেই চলেছে।
ঠিক যেন একটা ছবিতে আঁকা বিড়াল।

সমস্ত রাস্তাগুলো ডুবে ছিলো ধোপার পাটার মতো ধূসরতায়।
যেখানকার ভিতে যথার্থই শয়তানের ফাটল ধরেছে।
একটা কৃষ্ণাভ কোটর যার থেকে স্রোতের মত কয়লা বেরিয়ে এসেছে।

একজন চলে গেছে যার জন্মানো উচিৎ ছিলো।

দূর্বাগুলো পিঁয়াজগাছের মতো কর্কশ আর শক্তিশালী,
আর আমি ভীষণ সন্দেহে কখন মাটিটা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে,
আমি ভীষণ বিস্ময়ে কীভাবে নশ্বর কিছু প্রাণে বেঁচে থাকে।

পেনসিলভানিয়াতে আমার সঙ্গে একজন ছোট্ট-খাট্ট মানুষের দেখা হয়েছিলো,
কিন্তু সে তো রূপকথার সেই বিখ্যাত বামন রম্পলস্কিন না,
একেবারেই না,কোনওভাবেই নয়।
প্রেম থেকে যার সৃষ্টি,সে তার সম্পূর্ণটাই নিয়ে নিয়েছিলো।

উত্তরে ফেরার পথে,আকাশও শীর্ণকায়,তুচ্ছ হয়ে উঠেছিলো।
ঠিক যেমনভাবে একটা উঁচু জানলা কোনওদিকেই তাকিয়ে থাকেনা।
রাস্তাটা ছিলো একখণ্ড কাগজের মতো সমতল।

একজন চলে গেছে যার জন্মানো উচিৎ ছিলো।

অবশ্যই একটা মেয়েকে এইসব যুক্তি মৃত্যুহীন পরাজয়ের দিকে পথ দেখাবে অথবা জানিয়ে দেবে যা তুমি বোঝাতে চেয়েছিলে।

তুমি একটা ভয়ে পিছিয়ে যাওয়া মানুষ,
এই সেই সন্তান যাকে আমি রক্ত দিয়ে মুছে দিয়েছি।

 

শ্রেণীকক্ষে অন্ত্যেষ্টির গান

জনবিরল ক্লাসঘরে যেখানে তোমার অভিজাত মুখ আর তার উচ্চারণেরাই শেষ ও একমাত্র শব্দ,
তোমার সেই এলাকাতেই আমি এই ফুটন্ত প্রাণীটাকে খুঁজে পেলাম ।

তোমায় অবিন্যস্ত পেয়ে সে গোবরাটে জবরদখল চালাচ্ছিল,
অকাট্যভাবে বাসাও বেঁধে ফেলেছিলো,
যেন রাক্ষুসে এক ব্যাঙের বিরাট বড়ো পিণ্ড ।
তোমার পশমী পায়ের ব-দ্বীপের মধ্যে দিয়ে
আমাদের নিবিষ্টভাবে পরীক্ষা করছিলো ।

তা সত্বেও,তোমার চাতুরিকে আমার তারিফ করতেই হবে ।
তুমি অত্যন্ত শৃঙ্ক্ষলাপূর্ণভাবে মানসিক বিকারগ্রস্ত ।
আমরা আমাদের সাধারণ চেয়ারগুলোতে বসে থেকেই উসখুস করে উঠি ।
আর আমাদের প্রকৃত অবস্থাকে ফর্দে ফেলার ভান করি
তোমার বলিষ্ঠ ইন্দ্রজালের প্রভাবে ।
অথবা তোমার স্থূল,অন্ধ চোখেদের উপেক্ষা করি
বা সেই কুমারকে,
যাকে তুমি উদরস্থ করেছো বিগত দিনে,
যে ছিলো পন্ডিত,প্রবীণ,প্রাজ্ঞ ।

 

কুসুমিত চল্লিশা

আমি একটা পুত্রসন্তানের কথা চিন্তা করছিলাম,
জরায়ু তো কোন ঘড়ি নয়,
অথবা বাজতে থাকা কোন ঘন্টা,
কিন্তু জীবনের এগারোতম মাসে
শরীরের নির্ঘন্টে নভেম্বরের অনুভূতি এলো।
দিন দুয়েকের মধ্যে আমার জন্মদিন এসে পড়বে,
যেভাবে প্রতি জমির ফসল কেটে গোলাজাত করার সময়টা নির্দিষ্ট থাকে।
এইবার,আমার শিকার হলো মৃত্যু,
আর যা আমি চেয়েছি,
সেই রাতে তার দিকে ঝুঁকলাম।
বেশ,তবে তার কথাই বলা যাক,
জঠরের মধ্যে,সে সঙ্গেই ছিলো পুরোটা পথ।

আমি একটা পুত্রসন্তানের কথা চিন্তা করছিলাম।
তুমি কখনো অধিগত নও,
তোমার বীজ কখনো রোপণ বা উপড়ে ফেলা হয়নি।
অসংখ্য জননেন্দ্রিয়ের ভিড়ে তোমায় নিয়ে আমি ভীত হয়েছি।
তোমায় আমি নিজের চোখ উপহার দেবো না পুরুষটির?
তুমি ডেভিড আর সুসানের মধ্যে কোনটা হবে?
(যাদের কাহিনী শুনে এই দুটো নামকে আমি বেছেছি)
তোমার পিতারা যেরকম,তোমারও কি পুনরাবৃত্তি হওয়ারই সম্ভাবনা?
যার পায়ের মাংসপেশী মাইকেল এঞ্জেলোর ভাস্কর্য থেকে নেওয়া
আর হাতগুলো যুগোশ্লাভিয়ার।
যেন সেই দেশের দৃঢ়প্রতিজ্ঞ অসভ্য এক হালচাষি,
যেন জীবন নিয়ে ফুলে-ফেঁপে ওঠা উদ্বর্তিত কেউ-
এর পরেও সুসানের চোখ দিয়ে এই সবকিছু দেখতে পাওয়া কি সম্ভব?
তোমায় বাদ দিয়ে এই সমস্ত কিছু
দুটো দিনের রক্তে ভেসে গেছে।

আমি নিজেও তো অদীক্ষিত হিসেবেই সরে যাবো,
তৃতীয় কন্যাসন্তানকে তারা পরোয়া করবেনা।
আমার সন্তের পরবের দিনে আমার মৃত্যু আসবে,
নামদিবসে খারাপ কী আছে?
সবাই তো সূর্যেরই এক একটি ফেরেস্তামাত্র।

নারী,
নিজেরই চতুস্পার্শে এক উর্ণ বয়ন করে চলেছ,
এক সূক্ষ্ণ ও জটিল বিষ,
বৃশ্চিক,
বদ মাকড়সা,
মরণ।

দুটো নামের ফেঁসো বাঁধা কব্জি আমার মৃত্যুর ঘোষনা করবে।
কাঁচুলির মতো রক্ত জড়িয়ে থাকবে ফুটে উঠতে,
একজন বামে আর অপরজন দক্ষিণে,
এই উষ্ণ ঘরটা রক্তের এলাকা,
দরজাগুলোর কব্জা খোলা রাখো।

দুটো দিন তোমার মৃত্যুর জন্য,
আর দুটো দিন আমার মৃত্যু না হওয়া অব্দি।

ভালবাসা… এক রক্তিম ব্যাধি,
বছরের পর বছর ডেভিড তুমি আমায় উন্মাদ করে রেখেছো।
ডেভিড না সুসান?ডেভিড,শুধুই ডেভিড।
পূর্ণ আর বিভ্রান্ত,রাতের অন্ধকারে হিস্ হিসে শব্দ শোনা যায়,
যার কখনো বয়স বাড়েনা।
বছরের পর বছর,
আমার গাজর,আমার বাঁধাকপি,
সমস্ত নারীর আগে আমি তোমায় অধিকারে নিতে পারতাম,
তোমার নাম নিয়ে,
তোমায় ‘আমার’ ডেকে।

 

সমগোত্রীয়া

আমি একট ভূতে পাওয়া ডাইনি,
এখন বাইরে চলে এসেছি,
হানা দিচ্ছি কালো হাওয়ায়,
রাত ক্রমশঃ আরও দু:সাহসী করে তুলছে,
অশুভ স্বপ্নের ফেরি করছি,
সরল গৃহস্থালি থেকে ঝাঁকি দিয়ে
তুলে নিয়েছি নিজেকে,
সাময়িক অব্যাহতির তাড়নায়।
আলোর পর আলো
একাকিত্বে ডুবিয়ে দেয়,
বারোটা আঙ্গুল,অস্থিরমতি।
এই জাতের মেয়েরা ঠিক মেয়ে নয়,
বাস্তবিকই,
আমি এই রকমের।

আমি অরণ্যের মধ্যে উষ্ণ কন্দর খুঁজে পেয়েছি,
তাদের ভরিয়ে দিয়েছি ধাতব তৈজস,
ভাস্কর্য আর মাচা দিয়ে।
যেখানে অনেক গোপন কুঠুরি,রেশম আর অসংখ্য জিনিষপত্র।
আমি কৃমিকীটদের সান্ধ্যভোজের ব্যবস্থা করেছি যতবার,
দুষ্টু পরীরা ঘ্যান ঘ্যান করতে করতে
সব শৃংখলাকে লন্ডভণ্ড করে দিয়েছে।
এই প্রজাতির মেয়েরা ভুল বোঝার শিকার হয়।
আমি এই রকমের।

ওহে চালক,আমি তোমার গাড়িতে পীড়িত হয়েছি।
যে যে গ্রামের পাশ দিয়ে তুমি গেছ,
আমার নগ্ন হাতগুলোকে তাদের দিকেই দুলিয়েছি।
শিখতে চেষ্টা করেছি শেষ উজ্জ্বল যাত্রাপথগুলোকে,বাঁচতে,
অথচ,তোমার আবেগ তখনও আমার উরু কামড়ে ধরে ছিলো,
আর তোমার আবর্তে আমার পাঁজরগুলো সশব্দে ভাঙছিলো।
এই ধরনের মেয়েরা মরে যেতে লজ্জা পায়না,
আমি এই রকমের।

সোনালী চক্রবর্তী। কবি, অনুবাদক ও সম্পাদক। জন্ম ভারতের বারাণসীর পীতাম্বর পুরায় আশির দশকের শেষ ভাগের মাঘী পূর্ণিমায়, সুনীল চন্দ্র চক্রবর্তী ও সবিতা চক্রবর্তীর একমাত্র সন্তান। বেড়ে ওঠা উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়ি, দার্জিলিং ও কার্শিয়াং মিলিয়ে। কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। ২০১৬ সালের...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ