অয়ন

আলপনা তালুকদার
গল্প
অয়ন

মিলা হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে ছবিটার দিকে। একদিকে তীব্র ভয়, অন্যদিকে সন্দেহ, অবিশ্বাস। একটা লোক একটি ব্রিজের উপর থেকে নীচে নদীর পানির দিকে তাকিয়ে আছে। চারপাশটা অন্ধকার। কিন্তু কালো হলেও নদীর ঢেউগুলো খুব স্পষ্ট। অয়ন নদীর সেই পানির দিকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বলল, “আম্মু এখানে আছে।”

মিলা খাতাটা টেবিলের উপর ছুঁড়ে ফেলে দিল। যেন ওটা একটা ভয়ঙ্কর বিষধর সাপ। তারপর অয়নকে জড়িয়ে ধরে দ্রুত পাশের ঘরে চলে গেল। সে আতঙ্কে কাঁপছে। তার শ্বাস পড়ছে দ্রুত। কোন কোন মানুষ আগেই পরিস্থিতি অনুমান করতে পারে। তাদের সিক্সথ সেন্স প্রখর। অয়নেরও কি তাই? মিলা অয়নকে বুকের সাথে জাপটে ধরে রাখলো অনেকক্ষণ। তারপর ওকে খাটে বসিয়ে দিল।

– আম্মু ওখানে আছে, তোমাকে কে বলল?

– কেউ বলেনি। আমি জানি।

– আম্মুকে কে ওখানে নিয়ে গেছে?

– জানিনা।

– ঐ লোকটা কে?

– জানিনা।

– আম্মু নদীতে থাকবে কেন? আম্মুতো সাঁতার জানে।

অয়ন মাথা নীচু করে চুপ করে থাকে। তার বয়স ছয়। সে একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ক্লাস ওয়ানে পড়ে। গত পনেরো দিন সে স্কুলে যায়নি। সে সারাক্ষণ মিলার কাছে থাকে। এক মুহুর্তের জন্যও মিলাকে ছাড়তে চায়না। তার বাবার কাছেও যেতে চায়না। অথচ সে বাবাকেই বেশী ভালবাসতো। অয়নের হঠাৎ এমন বদলে যাওয়ার কারণ মিলা বুঝতে পারেনা। মায়ের শোকে এমন হয়েছে কি? এখন তো তার বাবাকেই বেশী কাছে পেতে চাওয়ার কথা।

– মিলা, একটু চা করো। রাকিব এসেছে।

বরাবরের মত অয়ন ছুটে গেলনা। সে মিলার হাত ধরে আছে। বাবাকে কি সে ভয় পায়? কেন পায়? সে কি কিছু দেখেছে?

মিলা ড্রইংরুমে গেলনা। মায়ের হুকুমে সে গেল রান্নাঘরে। পিছে পিছে অয়ন। মিলা চায়ের পানি চাপিয়ে ফ্রিজ খুলে দই আর সন্দেশ বের করলো। রাকিব মিষ্টির চেয়ে ঝাল বেশী পছন্দ করে। মিলা গতকাল আলুর চপ বানিয়ে বক্সে করে রেখে দিয়েছিল। সেগুলো বের করলো। শুধু তেলে ভাজলেই হবে। একটু নুডুলস ও করবে। অয়নও পছন্দ করে। টেবিলে নাস্তা সাজিয়ে রাকিবকে ডাকলো মিলা।

– কোন খবর আছে দুলাভাই?

রাকিবের মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মাথা নাড়লো।

– কাল আপনি বাসায় থাকছেন তো?

– হ্যাঁ, কেন?

– আমি যাব। বাসাটা পরিষ্কার করেও আসবো, আর আপার একটা শাড়ী নেব। পরশু আমার এক বান্ধবীর জন্মদিন। তাই। অয়নের কিছু জামাকাপড় আর বইখাতাগুলোও আনতে হবে।

– ওকে। কখন যাবে বল। আমি গাড়ী নিয়ে আসবো।

– না না। গাড়ী লাগবে না। আমরা অটোতে চলে যাব। কেমন?

বলেই সে অয়নের দিকে তাকিয়ে হাসলো। অয়নও যেতে রাজী হলো।

মিলা অয়নের মুখে চামচ দিয়ে নুডুলস তুলে দিচ্ছিল। তখন মিলার মা এসে অয়নের পাশের চেয়ারে বসলেন। তার মুখ গম্ভীর । তিনি প্রায় সারাক্ষণই কাঁদছেন। এই বয়সে মেয়ের এভাবে উধাও হয়ে যাওয়ার শক উনি নিতে পারছেন না।

 – কোন খবর পাওয়া গেলনা, না বাবা?

রাকিব মাথা নীচু করে থাকে। চায়ের কাপটা তার হাতে ধরা।

– রাতদিন আল্লাহকে ডাকছি। আমার মেয়েটাকে ফিরিয়ে দাও, ফিরিয়ে দাও…

মিলার মা আবার কাঁদতে লাগলেন। বয়স্ক মানুষের এই এক দোষ। কথায় কথায় কান্না! কাঁদবেনাইবা কেন? তার বড় মেয়ে শিলা হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে গেছে। আজ পনেরোদিন হয়ে গেল। কোথায় গেছে, কি হয়েছে, কেউ জানেনা। পুলিশও কোন সুরাহা করতে পারেনি। হাসপাতাল, ক্লিনিক, মর্গ – কোথাও নেই। পেপারে বিজ্ঞাপনও দেয়া হয়েছে। কোন খবর নেই।

আধা ঘণ্টার পথ। মিলা প্রায়ই আসতো এ বাড়ীতে। আজ শিলার বাসায় ঢুকতেই রাকিবের মুখটা খুশীতে একটু বেশীই ভরে গেল।

– এসো এসো। তুমি এলে বাড়ীটার চেহারাই বদলে যায়! সেজন্যই বলি, তুমি যে বাড়ীতে যাবে, সে বাড়ি আলো হয়ে যাবে! তোমার আপাও তাই বলতো।

মিলা জানে, রাকিব তাকে খুবই পছন্দ করে। মিলার কোন আবদার সে কখনও ফেলেনা। অবশ্য পছন্দ না করার কোন কারণ নেই। মিলা সুন্দরী, বুদ্ধিমতী, সংসারী। যতবারই সে এ বাসায় এসেছে, ততবারই ঘরবাড়ি গোছগাছ করে দিয়ে গেছে। শিলা অতটা গোছানো নয়। তাই মাঝে মাঝে মিলা কাজের মেয়েদেরকে সাথে নিয়ে পুরো বাড়ী, কিচেন, টয়লেট, এমন কি, ছাদও পরিষ্কার করে। নোংরা কাপড়, ঘরের পর্দা, তোয়ালে, সব ধুয়ে দেয়। টবে গাছ লাগায়। বাগান পরিষ্কার করে। বিয়ের প্রথমদিকে রাকিব প্রায়ই বলতো, “আগে দেখা হলে আমি তোমাকেই বিয়ে করতাম।”

মিলার রান্নাও পছন্দ করে রাকিব। মিলার হাতের ছোট মাছের ভাজি, ইলিশ পোলাও আর কাচ্চি বিরিয়ানী রাকিবের খুব পছন্দ। আগে মিলা এলে রাকিব প্রচুর বাজার করতো। মিলার সৌজন্যে শিলা, অয়নকে নিয়ে বেড়াতে যেত, রেস্টুরেন্টে খেতে যেত, মিলাকে এটা সেটা কিনে দিত। মাঝে মাঝে শিলাকে টাকাও দিত, মিলার পছন্দমত কিছু কিনে দেবার জন্য। মিলাও রাকিবকে পছন্দ করে। কোটিপতি বাবার ছেলে রাকিব। সুদর্শন, শিক্ষিত। ইলেকট্রনিক্সের বিরাট দোকান আছে ওর। যথেষ্ট ভদ্র ছেলে রাকিব। তার বাবা-মা মারা গেছেন। দুই বোন বিদেশে থাকে।

শিলার ঘরে ঢুকতেই মিলার বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠলো। পুরো বাড়ীতে ছড়িয়ে আছে তার বোনের স্মৃতি। সবকিছু তেমনি আছে। শুধু শিলা নেই। তবে ঘরবাড়ি খুবই নোংরা আর অগোছালো হয়ে আছে। বাড়ির গিন্নী না থাকলে যা হয় আর কি। সে হালিমাকে নিয়ে ঘর গোছাতে শুরু করলো। যদিও ঘর গোছানো তার আসল উদ্দেশ্য নয়। হালিমা এ বাড়িতে আছে প্রায় সাত বছর। শিলার বিয়ের পর ওদের গ্রামের বাড়ি থেকে ওকে এনে দিয়েছিল মিলার মা। হালিমা বিধবা। তার একটাই মেয়ে। মেয়ের বিয়ে দেবার পর থেকে হালিমা এবাড়িতে আছে।

– বাড়ীডা শ্মশান হয়া গেছে গো ছোড আম্মা।

– খালা, ঐদিন সকালে আপা কোথায় যাবে বলেছিল?

–  বাজারে। শাড়ী পইরা কইলো, বাজার যামু। ব্যস।

– ঐদিন দুলাভায়ের সাথে কোন ঝগড়া হয়েছিল?

– না না। দু’জনা একসাথে নাস্তা করলো। তারপর সাবে দোকানে গেল। তার খানিক বাদে আম্মায় বাইরে গেল। কোন বাহাস তো হয় নাই।

এই গল্প এর আগে মিলা বার দশেক শুনেছে। তবু বার বার একই কথা জিজ্ঞেস করে। যদি হালিমা নতুন কিছু বলে, সেই আশায়।

মিলা শিলার আলমারীর ভিতরে তাকালো। থরে থরে সাজানো শিলার শাড়ী, জিনিসপত্র। মিলা গাঢ় বেগুনী রঙের জামদানি শাড়ীটা বের করে নিল।

– এই একটাই নেব। আপনি আলমারী বন্ধ করে দিন।

– কেন? আরো নাও। এসব তো এখন তোমারই। আমি এসব দিয়ে কি করব?

মিলা আর কিছুই নিলনা। পরের দিন সকালে মিলা বসে আছে থানায়। ওসি শামীম মিলার খালাতো ভাই। সে ব্যস্ত মানুষ। মোবাইলটা কান থেকে নামিয়ে টেবিলের উপরে রেখে সে মিলার দিকে তাকালো।

– ছোট বাচ্চার একটা ছবিকে তুমি এত সিরিয়াসলি কেন নিচ্ছ?

– কারণ এর আগেও অয়নের আঁকা ছবি সত্যি হয়েছে অনেকবার।

– যেমন?

– একবার অয়ন একটা ভাঙ্গাচোরা বেবী সাইকেলের ছবি আঁকলো। সাইকেলে রক্তের দাগ। তার তিনদিন পর অয়নের বন্ধু সামি রাস্তায় সাইকেল চালাতে গিয়ে ট্রাকের নীচে চাপা পড়ে মারা গেল।

– তাতে কি প্রমাণ হয়? ছোট বাচ্চা সাইকেলের ছবি আঁকতেই পারে।

– তা পারে। কিন্তু ঐ সাইকেলটা সামির ছিল।

– কিভাবে বুঝলে?

– সাইকেলের হ্যান্ডেলে একটা নীল এ্যাংরি বার্ডের চাবিরিং ঝোলানো ছিল। ওটা আমি সামির সাইকেলে অনেকবার দেখেছি।

একটু অবাক হয়ে ওসি সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো। সে বোধহয় মিলার সন্দেহকে বিশ্বাস করতে চাইছে।

– আরেকবার অয়ন একটা ছবি আঁকলো। একটা কুঁড়ে ঘর আগুনে পুড়ছে। আমি বললাল, এটা কার ঘর? অয়ন বলল, সাবুদের। সাবু আমার দাদাবাড়ীতে কাজ করে। সেবার ঈদে অয়ন গেছিল। তখন সাবুর সাথে খুব ঘুরেছে। আমি যেদিন ছবিটা দেখি, তার ক’দিন পরে সাবুদের বাড়ীতে আগুন লেগে সব পুড়ে যায়। আর একবার…

– কিন্তু মিলা, আমি পুরা কেসটা খুব ভালো করে স্টাডি করেছি। শিলা আপুর মোবাইল ফোন বন্ধ হয়ে যায় মার্কেটে। তখন রাকিব ভায়ের ফোনের লোকেশন ছিল ওনার দোকান। কর্মচারীরা বলেছে, উনি প্রায় পুরো সময়ই দোকানেই ছিলেন। তাছাড়া খুনের কোন না কোন মোটিভ তো থাকতে হবে। শিলা আপুর সাথে তার কোন ঝামেলা নাই। আমি তার ফোনের কল লিস্ট চেক করেছি। কোথাও কোন গোলমাল নাই। কোন মেয়েঘটিত কারণও পাইনি। রাকিব ভাই শিলা আপুকে কেন খুন করবে?

মিলা মাথা নীচু করে খুব আস্তে আস্তে বলল, “আপু আলমারীর চাবি বাসায় রেখে কখনো বাইরে যায়না। কাল আমি আপুর আলমারীর চাবিটা দুলাভায়ের হাতে দেখেছি।”

– শুধু একটা চাবির কারণে কাউকে খুনী সাব্যস্ত করা যায়না। আরো শক্ত প্রমাণ লাগে। ভালো হতো যদি আপুর ফোনটা পাওয়া যেত। ফোন লোকেশন ট্রেস করে আপুকে বের করা যেত। মুশকিল হলো, ফোনটা এখনও বন্ধ। ঐদিন সকালে শেষবার আপু কথা বলেছে খালাম্মার সাথে। আপুর ফোনের কললিস্টে কোন আননোউন নাম্বার নেই।

মিলা ভাবছে। সে বুঝে গেছে, যেকোন ভাবে একটা সূত্র তাকেই বের করতে হবে। আর কেউ করবে না। কিন্তু কিভাবে? মিলা ছবিটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। জায়গাটা চিনতে পারছে না। শুধু একটা জিনিস বুঝতে পারছে, লোকটা রাকিব। কারণ লোকটার গলায় একটা আঁচিলের মত দেখা যাচ্ছে। রাকিবের গলায়ও ওরকম একটা আঁচিল আছে।

মিলা আরেকটু হলেই প্রায় বমি করে দিচ্ছিল। সে দ্বিতীয়বার লাশটার দিকে তাকাতে পারেনি। শিলার বয়সী একটা মেয়ের গলাকাটা লাশ। মর্গের ট্রে টেনে বের করে লোকটা বলল, “মাথা নাই। হাত-পা কাপড় দেখে যদি চিনতে পারেন।”

মিলা এক পলক দেখেই বুঝেছে, ওটা শিলার লাশ না। শিলা ধবধবে ফর্সা। বাম হাতের নখ বড়। মাঝারী স্বাস্থ্য। এ মহিলা মোটা, শ্যামলা। কাজের মেয়ে টাইপ ছাপা প্রিন্টের সুতী শাড়ী পরা। শিলা জীবনেও এরকম শাড়ী কখনও পরেনি। মিলা মর্গের সামনে দাঁড়ানো পুলিশটাকে বলল, “এটা আপা নয়। পানিতে ডুবে মরা কোন লাশ কি আপনারা পেয়েছেন?'”

– নাতো ম্যাডাম। কেন বলুন তো! আপনার বোন কি পানিতে ডুবে মরেছে?

মিলা ঘন ঘন শিলার বাড়ী যাওয়া শুরু করলো। রাকিব দোকানে থাকাকালীন সে বেশী যায়। তন্ন তন্ন করে শিলার ঘর খোঁজে। কোথাও যদি কিছু একটা পেয়ে যায়। সে শিলার আলমারীর চাবীটা খুঁজছে। তার ধারণা, আলমারীটা খুললে হয়তো কিছু পেতেও পারে। কিন্তু চাবীটা সে পায়নি। রাকিব সবসময় চাবীটা নিজের কাছে রাখে। সাথে করে দোকানে নিয়ে যায়। ফলে সে চাবীটা নিতে পারছেনা কিছুতেই। শিলা রাতে চাবী রাখতো তার বালিশের তলায়। রাকিব কোথায় রাখে সে জানেনা।

ভার্সিটিতে পড়ার সময় শিলাকে একটি ছেলে খুব পছন্দ করতো। শিলার বিয়ের মাস দুই পরে একদিন ছেলেটা শিলাদের বাসায় এসেছিল। মিলা তাকে জানায় যে শিলা এখন আর এ বাড়িতে থাকেনা। স্বামীর সাথে থাকে। এ খবর শুনে ছেলেটা খুব বিমর্ষ মনে ফিরে যায়। হয়তো সে শিলাকে বিয়ে করতে চেয়েছিল। ছেলেটা নাকি কখনও কখনও শিলাকে ফোন করতো। শিলা কি ঐ ছেলেটার সাথে পালিয়েছে? না। শিলা তেমন মেয়ে নয়।

– দুলাভাই, শাড়ীটা তুলে রাখেন।

মিলা সেই বেগুনী জামদানীটা শিলার বেডরুমের বিছানায় রেখে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। সে শাড়ীটা পরার জন্য নেয়নি। রাকিবের কাছে শিলার আলমারীর চাবি আছে কিনা, তা জানার জন্য নিয়েছিল। শিলা বাজার থেকে উধাও হয়ে গেলে এই চাবিটাও উধাও হওয়ার কথা। তা হয়নি। অয়ন বিছানায় শুয়ে মোবাইলে গেম খেলছিল। একটু পরে অয়ন এসে মিলাকে জানালো, চাবিটা রাকিবের ল্যাপটপের ব্যাগের সাইড পকেটে আছে।

মিলা কফির মগ হাতে ঘরে ঢুকলো।

– অয়নকে কোথাও বেড়াতে নিয়ে যান। বেচারার মনটা ভালো হবে।

– তুমিও চল।

– না দুলাভাই। আমি বাসায় যাব। পরীক্ষার ডেট দিয়েছে। এ ক’দিন একদম পড়তে পারিনি। একটু না পড়লে ফেল করব। আমি অয়নকে রেডি করে দিচ্ছি। আপনি রেডি হন।

মিলা অতি সাবধানে খুব দ্রুত একটা সাবানের উপরে চাবির ছাপ নিয়ে নেয়। পরের দিন দুপুরে চাবি বানিয়ে নিয়ে যায় শিলার বাড়ি। হালিমাকে একশ’ টাকার একটা নোট দিয়ে হুইল পাওডার আনতে পাঠিয়ে আলমারী খোলে মিলা।

– তুমি ঠিক দেখেছ?

মিলা কাঁদছে। শামীমের মুখ গম্ভীর।

– জ্বি। আপুর গলার চেন, আংটি, দুল সবই আছে ব্যাগে। ওগুলো আপু সবসময় পরে থাকতো। আপুর মোবাইলটাও আছে।

– চাবিটা আমাকে দাও। আলমারীর কোথায় ব্যাগটা আছে?

– চাবি দেয়া ড্রয়ারে। ডানদিকে।

– ওকে। আমি দেখছি। তুমি যাও।

পরের দিন রাতে পুলিশ শিলার বাসায় গিয়ে রাকিবকে দিয়ে আলমারী খুলিয়ে শিলার সব জিনিস উদ্ধার করেছে। ওকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেছে। জিজ্ঞাসাবাদে রাকিব বলেছে, সকালে দোকানে যাবার সময় সে শিলাকে ঠিক বারটায় মার্কেটের সামনে থাকতে বলে। ইচ্ছে করে নিজের ফোনটা সে দোকানে রেখে আসে, যাতে ওর ফোন লোকেশন দোকান দেখায় এবং পুলিশ মনে করে যে, শিলা উধাও হওয়ার সময় সে দোকানেই ছিল।।

ফোন ভুল করে দোকানে ফেলে এসেছে বলে সে শিলার ফোন চেয়ে নেয়। তারপর এক কলিগকে জরুরী ফোন করার অভিনয় করে। তারপর ফোনটা বন্ধ করে দিয়ে পকেটে রাখে। শিলা বুঝতে পারেনি। আরেকটা নতুন প্লট কিনবে বলে প্লটটা দেখানোর কথা বলে শিলাকে গাড়ীতে তুলে নিয়ে আগে থেকে ঠিক করে রাখা নির্জন একটা জায়গায় নিয়ে যায়। আগে থেকেই গাড়ীতে রাখা কোকের বোতলে ঘুমের অষুধ মিশিয়ে রেখেছিল রাকিব। শিলা সেটা খাবার পর ঘুমিয়ে যায়। ফলে খুব সহজে গলায় রশি পেঁচিয়ে শিলাকে খুন করে সে। লাশটা খুব দ্রুত গাড়ীর ডিকিতে রেখে ত্রিপোলি দিয়ে ঢেকে রেখে ঐ গাড়ী নিয়েই দ্রুত দোকানে যায়।

একটার দিকে অয়নের স্কুল থেকে ফোন আসে। ওকে নিতে শিলা যায়নি। তখন সে মিলাকে ফোন করে জানায়, শিলার ফোন বন্ধ। অয়ন স্কুলে। সে নিতে যাচ্ছে। তারপর শিলাকে খোঁজার অভিনয় করতে থাকে। রাতে সে গ্যারেজে গিয়ে শিলার গলার চেন, আংটি, দুল খুলে নেয় যাতে ওগুলো দেখে কেউ শিলাকে চিনতে না পারে। শিলার মোবাইলসহ ওগুলো রাখে শিলার ব্যাগেই। পরে কোথাও ফেলে দেবে ভেবে সে ব্যাগ থেকে চাবি বের করে নিয়ে ব্যাগটা লুকিয়ে রাখে আলমারীতে। তারপর শিলাকে খোঁজার নাম করে গভীর রাতে শহরের বাইরে গিয়ে একটা ব্রিজের উপর থেকে শিলার লাশ ফেলে দেয় নদীতে। নদীতে অনেক স্রোত। ফলে রাকিব নিশ্চিত ছিল, শিলার লাশটা কেউ খুঁজে পাবেনা। পেলেও দু-তিনদিন পর গলে পচে যাবে। কেউ চিনতে পারবেনা।

শামীমের কাছে সব শুনে মিলার বিশ্বাস হচ্ছিল না। সে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। খুব কষ্টে শুধু উচ্চারণ করলো, “কেন খুন করেছে আপুকে? কি দোষ করেছিল আপু?”

– তোমার জন্য। তোমাকে বিয়ে করার জন্য।

– মানে?

– রাকিব ভাই নিশ্চিত ছিল, শিলা আপু না থাকলে অয়ন তোমার কাছে থাকবে। কারণ অয়ন তোমাকে খুবই পছন্দ করে। আর অয়নকে দেখার অজুহাতে সে তোমাকে বিয়ের প্রস্তাব দেবে। তুমি বা খালাম্মা তাতে অমত করবেনা, এটা সে জানতো। এজন্যই শিলা আপুকে খুন করেছে।

মিলা কাঁদছে। তার চোখের সামনে অয়নের গতরাতের আঁকা ছবিটা ভাসছে। সালোয়ার-কামিজ পরা একটি মেয়ে একটা ছোট ছেলের হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে। আর দূরে নদীর মধ্যে লাল সূর্যটা ডুবে যাচ্ছে।

আলপনা তালুকদার। ড. আকতার বানু আলপনা (আলপনা তালুকদার নামেই বেশি পরিচিত) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আই.ই.আর (শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউট) - এর একজন অধ্যাপক। তিনি এসএসসি-তে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল থেকে রাজশাহী বোর্ডে মানবিক বিভাগ থেকে মেয়েদের মধ্যে প্রথম ও সম্মিলিত মেধা তালিকায় অষ্টম...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..