আইনস্টাইনের আই কিউ

সুদীপ ঘোষাল
প্রবন্ধ
Bengali
আইনস্টাইনের আই কিউ

 

 

আইনস্টাইন জন্মের পর থেকে দশবছর বয়স অবধি কথা বলতে পারতেন না। তাঁর পিতামাতা ভাবতেন, হয়ত আমাদের ভাগ্যে এক জড়ভরত সন্তানই আছে। দশ বছর বয়সেও তিনি নানা গ্রন্থের নানা বিষয় পিতামাতার কাছে কানে শুনতেন। তাঁর বন্ধুবান্ধররা তাঁর কাছে এলে ইশারায় কথা বলার চেষ্টা করতেন। কালক্রমে এই সন্তানই পৃথিবীর নানা বিষয়ে বিস্ময়কর আলোকপাত করেন।আইনস্টাইনের মৃত্যুর পর তার মস্তিষ্ক অপারেশন করে দেখে, তার আইকিউ নির্ধারণ করার চেষ্টা হয়েছিল। বিজ্ঞানের এক আশ্চর্য বিস্ময় তাঁর দীর্ঘ গবেষণার সফর।তাঁর মস্তিষ্কের ঘিলু সংরক্ষিত আছে আন্তর্জাতিক গবেষণাগারে। তাঁর সমগ্র জীবন এক বিস্ময়ে ভরা বাস্তব জীবনের উদাহরণ। ছেলেবেলা থেকে তাঁর অন্তিমজীবন আমাদের অনুকরণীয় আদর্শ। তাঁর প্রতি পদক্ষেপ ছিল বুদ্ধিমত্তায় ভরা। তাঁকে জানতে হলে জ্ঞান সাগরে ডুব দিতে হয়, তবু তাঁর তল পাওয়া অসম্ভবই রয়ে যায়। তবু জানতে ইচ্ছে হয় তাঁর সমগ্র জীবন। শৈশবে তিন বছর বয়স পর্যন্ত আ্যলবার্ট কথা বলতে শেখেননি। ৯-১০ বছর বয়সেও তিনি কিছুটা থেমে থেমে কথা বলতেন। এতে পরিবারের লোকেরা যথেষ্ট চিন্তাগ্রস্ত হয়েছিলেন। তারা ভেবেছিলেন হয়তো আলবার্ট বড় হয়ে জড়বুদ্ধিসম্পন্ন হবে। তা ছাড়া আলবার্ট ছিলেন খুব শান্তশিষ্ট লাজুক। অন্য সমবয়সীদের থেকে আলাদা। খেলাধুলা, দৌড়ঝাঁপ তিনি বিশেষ পছন্দ করতেন না। ছেলেবেলায় অনেক সময় বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে সৈন্যরা কুচকাওয়াজ করে বাজনা বাজিয়ে শোভাযাত্রা করে যেত। অন্য ছেলেরা এ দৃশ্য দেখার জন্য রাস্তার ধারে জমায়েত হতো। কোনো ছেলেই বাদ যেত না। এর ব্যতিক্রম ছিলেন আলবার্ট। পরবর্তীকালে এ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘সৈন্যদের কাজ হুকুমে যুদ্ধ করা। আর হুকুম তামিল করতে গিয়ে যুদ্ধে সাহসিকতা প্রমাণ করা। দেশপ্রেমের নামে যুদ্ধ করাকে আমি ঘৃণা করি।’তাঁর বন্ধু আশরাফ অনেক বড় বিজ্ঞানী। তাঁর জন্ম হয়েছিল ১৮৭৯ সালে জার্মানির মিউনিখ শহরে। অথচ এই বিজ্ঞানীর ছেলেবেলা ছিল একেবারেই সাদাসিধে এবং সম্ভাবনাহীন। কেউ তখন ভাবতেও পারেনি এই আলাভোলা ছেলেটিই বড় হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হবেন। এমনকি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় যে পুরস্কার, নোবেল প্রাইজ সেটাও তিনি পাবেন বিজ্ঞানের একটি থিওরি আবিষ্কার করে। আইনস্টাইন সর্বপ্রথম আলোচনায় আসেন একটি নিবন্ধ লিখে। নিবন্ধের বিষয় আপেক্ষিকতাবাদ। অথচ ভেবে দেখ, আত্মভোলা, বেখেয়ালি এই বিজ্ঞানির বয়স তখন মাত্র বিশ। সেই জন্মের পর থেকেই কিন্তু তিনি আত্মমগ্ন থাকতে ভালোবাসতেন। অহেতুক কিছু বলা একেবারেই ছিল স্বভাববিরুদ্ধ। একটা ঘটনা বলছি শোনো-আইনস্টাইন সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে, তিনি কথা বলতে শুরু করেন দেরিতে; চার বছর বয়সে। পড়তে শেখেন আরও পরে; সাত বছর বয়সে। তিন পেড়িয়ে চারে এসেও তিনি যখন কথা বলছিলেন না তখন বাবা-মা খুব চিন্তায় পড়ে গেলেন। এক রাতে তাদের দুশ্চিন্তার অবসান ঘটল। খাবার টেবিলে আইনস্টাইন হঠাৎ বলে উঠলেন, স্যুপটা খুব গরম!আইনস্টাইনের মুখে কথা শুনে উপস্থিত সবাই খুব অবাক হয়ে জানতে চাইলেন, এতদিন তুমি কথা বলোনি কেন?আইনস্টাইন উত্তর দিলেন, এতদিন তো সব ঠিক মতই চলছিল।এবার ভেবে দেখ, সেই ছেলেবেলাতেই কতটা ভাবুক প্রকৃতির ছিলেন তিনি। অথচ তার এই স্বভাবটিকেই মানুষ অন্য চোখে দেখত। একবার তো ক্লাসটিচার তার বিরুদ্ধে মন্তব্যই করে ফেললেন, এ বোকা ছেলেকে দিয়ে কিছু হবে না। আসলে ঘটনা হয়েছিল কী বলি, আইনস্টাইন ছেলেবেলায় খুব শান্ত স্বভাবের ছিলেন। ক্লাসে স্যার কিছু জানতে চাইলে অনেক ভেবে উত্তর দিতেন। চট করে কিছু বলতে পারতেন না। ভাবতে গিয়ে দেরী তো হতোই, উপরন্তু তোতলামির কারণে কথা আটকে যেত। ফলে সহপাঠী, শিক্ষকদের কাছে তিনি প্রায়ই হাসির পাত্র হতেন। এসব কারণে ক্লাসটিচার একদিন বলেই ফেললেন, ছেলেটি আস্ত বোকা! ওকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না।কিন্তু আইনস্টাইনের মা এসব কথা মোটেই বিশ্বাস করতেন না। উল্টো সবাইকে শুনিয়ে বলতেন, তোমরা দেখে নিও ও বড় হলে অধ্যাপক হবে। অনেক নাম করবে। পরে মায়ের কথাই সত্য প্রমাণিত হয়েছিল। আইনস্টাইন বড় হয়ে অধ্যাপক তো বটেই, অনেক বড় বিজ্ঞানী হয়েছিলেন। ভাগ্যিস মা তখন আইনস্টাইনের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। আসলে মায়েরা তো এমনই হয়, তাই না? ছেলে একটু ভাবুক তাতে কী? সে বন্ধুদের সঙ্গে মারামারি তো দূরের কথা দুষ্টুমি পর্যন্ত করত না। সে থাকত তার মতো। তাই দেখে সবাই তাকে অন্যরকম বোকা ভাবত। কিন্তু আইনস্টাইন কিন্তু মোটেও বোকা ছিলেন না। তিনি ছেলেবেলা থেকেই ছিলেন কৌতূহলী। হেরম্যান আইনস্টাইন ছিলেন আইনস্টাইনের বাবা। তিনি একবার ছেলেকে উপহার হিসেবে একটা কম্পাস কিনে দিলেন। কম্পাস পেয়ে বালক আইনস্টাইন সারাক্ষণ শুধু সেটা নিয়েই মেতে থাকেন। হঠাৎ তিনি লক্ষ্য করলেন, আরে! কম্পাসের কাটা কেবল একদিকেই ঘুরে যাচ্ছে, কোনো অবস্থাতেই কাটা অন্যদিকে ফেরানো যাচ্ছে না কেন? আইনস্টাইন বাবার কাছে এর কারণ জানতে চাইলেন। বাবা ছেলের কৌতূহলী মনের পরিচয় পেয়ে খুব খুশি হলেন। তিনি আইনস্টাইনকে এর কারণ ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে বললেন। ছোটবেলার এই কৌতূহলই আইনস্টাইনকে বিজ্ঞানী করে গড়ে তুলেছিল। তাই তো হওয়ার কথা। তুমি যদি কোনো কিছু দেখে সে বিষয়ে জানতে না চাও তাহলে শিখবে কীভাবে? সে জন্যই তো বড়দের কাছে প্রশ্ন করে জেনে নিতে হয়। ছোটবেলায় আইনস্টাইনের ইচ্ছা ছিল আলোর রথে চড়বেন। আলো নিয়ে তিনি সব সময় ভাবতেন। ক্লাসে বসে সূর্যের আলো, বাড়িতে বৈদ্যুতিক আলো নিয়ে ভাবতে গিয়ে অনেকবার বড়দের বকুনিও তাকে শুনতে হয়েছে। ১৪ বছর বয়সে আলোর রথে চড়ার বৈজ্ঞানিক পন্থা নিয়ে তিনি ভাবতে শুরু করেন। আপেক্ষিক তত্ত্ব তৈরির সময় এই ভাবনাই তাকে সবচেয়ে বেশি আলোড়িত করেছে। অনেক বড় হয়েও কিন্তু তার মাথা থেকে আলোর রথে চড়ার এই ভূত যায়নি। একদিন হয়েছে কী শোনো-আইনস্টাইনের স্কুল একেবারেও ভালো লাগত না। কিন্তু কী আর করা! মায়ের আদেশ স্কুলে যেতেই হবে। তাই বাধ্য হয়ে স্কুলে যাওয়া। মা বলেছে, বড় হয়ে অধ্যাপক হতে হবে, তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও পড়াশোনা করা। কিন্তু করলে কী হবে, ক্লাসে গিয়ে শেষ বেঞ্চে দেয়ালের কোণে চুপচাপ বসে থাকতেন। একদিন সূর্যের আলো জানালার কাঁচ ভেদ করে কীভাবে ক্লাসের ভেতর আসছে একমনে এ নিয়ে ভাবছিলেন। হঠাৎ স্যার তাকে দাঁড় করিয়ে পড়া জিজ্ঞেস করলেন। অমনোযোগী থাকায় আইনস্টাইন উত্তর দিতে পারলেন না। স্যার তাকে শাস্তিস্বরূপ হল রুমে পাঠিয়ে দিলেন। হল রুম ছিল বেশ বড় এবং ঠাণ্ডা। আইনস্টাইনের কিন্তু জায়গাটা বেশ পছন্দ হলো। ক্লাস থেকে বের করে দেয়ায় তিনি বরং খুশিই হলেন। কারণ সেখানে বসে তিনি অন্তত নিরিবিলি নিজের মতো করে ভাবতে পারবেন।ক্লাস, স্যারের তিরস্কার, সহপাঠীদের বিদ্রুপ- সব ভুলে আইনস্টাইন সেই ঠাণ্ডা হল রুমে বসে সূর্যের আলো নিয়ে ভাবতে ভাবতেই ক্লাসের সময়টুকু পার করে দিলেন।
শৈশবে সংগীতের প্রতি আইনস্টাইনের প্রবল আগ্রহ দেখে তাঁর মা তাকে একটি বেহালা কিনে দেন, যেটি তিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত শয্যাপাশে রাখেন। আইনস্টাইন বলেছিলেন, ‘ছয় বছর বয়সে আমি হাতে বেহালা তুলে নিই। ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত একটানা বেহালা বাজানোর শিক্ষা চলে। খুব ভালো লেগে গেল মোৎসার্টকে। দেখলাম, শিক্ষক যা শেখাতে এত দিন এত চেষ্টা করেছেন, এখন তা আমি অনায়াসে আয়ত্ত করতে পেরেছি। তখনই উপলব্ধি করলাম, কর্তব্যপরায়ণতা নয়, ভালোবাসাই হলো সবচেয়ে বড় শিক্ষক।’ছোটবেলায় যখনই কেউ অঙ্কে ভালো করে বা বিজ্ঞানে তার প্রতিভা দেখায়, তখনই তাকে বলা হয় খুদে আইনস্টাইন। আরেকটু বড় হলে, বিশেষ করে হাইস্কুলে বা কলেজে একইভাবে বলা হয় তরুণ আইনস্টাইন। কেবল এ দেশেই নয়, সারা বিশ্বের বেশির ভাগ মা-বাবাই তাঁদের সন্তানদের আইনস্টাইন বানাতে চান!কেন? জবাবটা সোজা–বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন বিশ্ব, সময় ও স্থান সম্পর্কে মানুষের হাজার বছরের ধারণাকে পাল্টে দিয়েছেন। সময়ের সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং মনে করেন, কোনো একদিন আসবে, যেদিন সময়ের কিংবা দুনিয়ার সম্পূর্ণ ইতিহাস লিখে ফেলা যাবে চার পৃষ্ঠায়, আর তার তিন পৃষ্ঠা জুড়ে থাকবে কেবল আইনস্টাইনের নাম! কাজেই সব মা-বাবা যদি তাঁদের সন্তানকে আইনস্টাইন বানাতে চান, তাদের কি দোষ দেওয়া যায়?

নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর আইনস্টাইন যখন সুইডেনের গোথেনবার্গে বক্তৃতা দিলেন, তখন পত্রিকায় এক বিজ্ঞান গবেষক বললেন, ‘এখানে দুই-একজন বাদে অন্য কেউ আসলে বোঝেননি আইনস্টাইনের “থিওরি অব রিলেটিভিটি”। তবে এটা বুঝতে পারছি, তিনি নতুন এক বিষয়ের দরজা খুলছেন মাত্র।’ আইনস্টাইন প্রথমবার আমেরিকায় যাওয়ার পর তার বন্ধুকে এক চিঠিতে আক্ষেপ করে লিখেছিলেন, ‘থিওরি অব রিলেটিভিটি নিয়ে আমি ১৫ বছর কাজ করেছি, মানুষ তা ১৫ সেকেন্ডে বুঝতে চায়। সবাই আমাকে দেখতে আসে। মনে হয় আমি চিড়িয়াখানার কোন জিরাফ।’ থিওরি অব রিলেটিভিটির জন্য আইনস্টাইন নোবেল পাননি, আবার এই কাজের জন্যই তিনি পৃথিবীতে বিখ্যাত হয়েছেন।পাবলিকের যন্ত্রণায় তিনি শেষ পর্যন্ত মানুষকে থিওরি অব রিলেটিভিটি বোঝাতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘তুমি যদি কোনো মেয়ের সঙ্গে এক ঘণ্টা বসে থাকো, তাহলে তোমার মনে হয়, তুমি তার সঙ্গে এক মিনিট ছিলে, অন্যদিকে চুলার ওপর এক মিনিট বসে থাকলে মনে হয়, এক ঘণ্টা বসে আছ। আমাদের কাছেও থিওরি অব রিলেটিভিটি নারী আর চুলাতে গিয়েই ঠেকেছে।’বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া অবস্থায় আলবার্ট আইনস্টাইন হতাশায় পড়ে একবার পিতাকে চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘আমার জন্ম না হওয়াই হয়তো ভালো ছিল।’ বিখ্যাত হওয়ার পর আইনস্টাইন নিজেকে কখনো জিনিয়াস বলেননি, তবে অন্যদের থেকে বেশি কল্পনা করার শক্তি তাঁর আছে, তা স্বীকার করতেন।আইনস্টাইনের এক সহকর্মী একদিন তাঁর টেলিফোন নম্বরটা চাইলেন। আইনস্টাইন তখন একটি টেলিফোন বই খুঁজে বের করলেন এবং সেই বই থেকে তাঁর নিজের নম্বরটা খুঁজতে লাগলেন।অহেতুক কিছু বলা একেবারেই ছিল স্বভাববিরুদ্ধ। একটা ঘটনা বলছি শোনো-আইনস্টাইন সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে, তিনি কথা বলতে শুরু করেন দেরিতে; চার বছর বয়সে। পড়তে শেখেন আরও পরে; সাত বছর বয়সে। তিন পেড়িয়ে চারে এসেও তিনি যখন কথা বলছিলেন না তখন বাবা-মা খুব চিন্তায় পড়ে গেলেন। এক রাতে তাদের দুশ্চিন্তার অবসান ঘটল। খাবার টেবিলে আইনস্টাইন হঠাৎ বলে উঠলেন, স্যুপটা খুব গরম!আইনস্টাইনের মুখে কথা শুনে উপস্থিত সবাই খুব অবাক হয়ে জানতে চাইলেন, এতদিন তুমি কথা বলোনি কেন?আইনস্টাইন উত্তর দিলেন, এতদিন তো সব ঠিক মতই চলছিল।এবার ভেবে দেখ, সেই ছেলেবেলাতেই কতটা ভাবুক প্রকৃতির ছিলেন তিনি। অথচ তার এই স্বভাবটিকেই মানুষ অন্য চোখে দেখত। একবার তো ক্লাসটিচার তার বিরুদ্ধে মন্তব্যই করে ফেললেন, এ বোকা ছেলেকে দিয়ে কিছু হবে না। আসলে ঘটনা হয়েছিল কী বলি, আইনস্টাইন ছেলেবেলায় খুব শান্ত স্বভাবের ছিলেন। ক্লাসে স্যার কিছু জানতে চাইলে অনেক ভেবে উত্তর দিতেন। চট করে কিছু বলতে পারতেন না। ভাবতে গিয়ে দেরী তো হতোই, উপরন্তু তোতলামির কারণে কথা আটকে যেত। ফলে সহপাঠী, শিক্ষকদের কাছে তিনি প্রায়ই হাসির পাত্র হতেন। এসব কারণে ক্লাসটিচার একদিন বলেই ফেললেন, ছেলেটি আস্ত বোকা! ওকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না।কিন্তু আইনস্টাইনের মা এসব কথা মোটেই বিশ্বাস করতেন না। উল্টো সবাইকে শুনিয়ে বলতেন, তোমরা দেখে নিও ও বড় হলে অধ্যাপক হবে। অনেক নাম করবে। পরে মায়ের কথাই সত্য প্রমাণিত হয়েছিল। আইনস্টাইন বড় হয়ে অধ্যাপক তো বটেই, অনেক বড় বিজ্ঞানী হয়েছিলেন। ভাগ্যিস মা তখন আইনস্টাইনের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। আসলে মায়েরা তো এমনই হয়, তাই না? ছেলে একটু ভাবুক তাতে কী? সে বন্ধুদের সঙ্গে মারামারি তো দূরের কথা দুষ্টুমি পর্যন্ত করত না। সে থাকত তার মতো। তাই দেখে সবাই তাকে অন্যরকম বোকা ভাবত। কিন্তু আইনস্টাইন কিন্তু মোটেও বোকা ছিলেন না। তিনি ছেলেবেলা থেকেই ছিলেন কৌতূহলী। হেরম্যান আইনস্টাইন ছিলেন আইনস্টাইনের বাবা। তিনি একবার ছেলেকে উপহার হিসেবে একটা কম্পাস কিনে দিলেন। কম্পাস পেয়ে বালক আইনস্টাইন সারাক্ষণ শুধু সেটা নিয়েই মেতে থাকেন। হঠাৎ তিনি লক্ষ্য করলেন, আরে! কম্পাসের কাটা কেবল একদিকেই ঘুরে যাচ্ছে, কোনো অবস্থাতেই কাটা অন্যদিকে ফেরানো যাচ্ছে না কেন? আইনস্টাইন বাবার কাছে এর কারণ জানতে চাইলেন। বাবা ছেলের কৌতূহলী মনের পরিচয় পেয়ে খুব খুশি হলেন। তিনি আইনস্টাইনকে এর কারণ ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে বললেন। ছোটবেলার এই কৌতূহলই আইনস্টাইনকে বিজ্ঞানী করে গড়ে তুলেছিল। তাই তো হওয়ার কথা। তুমি যদি কোনো কিছু দেখে সে বিষয়ে জানতে না চাও তাহলে শিখবে কীভাবে? সে জন্যই তো বড়দের কাছে প্রশ্ন করে জেনে নিতে হয়। ছোটবেলায় আইনস্টাইনের ইচ্ছা ছিল আলোর রথে চড়বেন। আলো নিয়ে তিনি সব সময় ভাবতেন। ক্লাসে বসে সূর্যের আলো, বাড়িতে বৈদ্যুতিক আলো নিয়ে ভাবতে গিয়ে অনেকবার বড়দের বকুনিও তাকে শুনতে হয়েছে। ১৪ বছর বয়সে আলোর রথে চড়ার বৈজ্ঞানিক পন্থা নিয়ে তিনি ভাবতে শুরু করেন। আপেক্ষিক তত্ত্ব তৈরির সময় এই ভাবনাই তাকে সবচেয়ে বেশি আলোড়িত করেছে। অনেক বড় হয়েও কিন্তু তার মাথা থেকে আলোর রথে চড়ার এই ভূত যায়নি। একদিন হয়েছে কী শোনো-আইনস্টাইনের স্কুল একেবারেও ভালো লাগত না। কিন্তু কী আর করা! মায়ের আদেশ স্কুলে যেতেই হবে। তাই বাধ্য হয়ে স্কুলে যাওয়া। মা বলেছে, বড় হয়ে অধ্যাপক হতে হবে, তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও পড়াশোনা করা। কিন্তু করলে কী হবে, ক্লাসে গিয়ে শেষ বেঞ্চে দেয়ালের কোণে চুপচাপ বসে থাকতেন। একদিন সূর্যের আলো জানালার কাঁচ ভেদ করে কীভাবে ক্লাসের ভেতর আসছে একমনে এ নিয়ে ভাবছিলেন। হঠাৎ স্যার তাকে দাঁড় করিয়ে পড়া জিজ্ঞেস করলেন। অমনোযোগী থাকায় আইনস্টাইন উত্তর দিতে পারলেন না। স্যার তাকে শাস্তিস্বরূপ হল রুমে পাঠিয়ে দিলেন। হল রুম ছিল বেশ বড় এবং ঠাণ্ডা। আইনস্টাইনের কিন্তু জায়গাটা বেশ পছন্দ হলো। ক্লাস থেকে বের করে দেয়ায় তিনি বরং খুশিই হলেন। কারণ সেখানে বসে তিনি অন্তত নিরিবিলি নিজের মতো করে ভাবতে পারবেন।ক্লাস, স্যারের তিরস্কার, সহপাঠীদের বিদ্রুপ- সব ভুলে আইনস্টাইন সেই ঠাণ্ডা হল রুমে বসে সূর্যের আলো নিয়ে ভাবতে ভাবতেই ক্লাসের সময়টুকু পার করে দিলেন। এই ভাবনাটাই ছিল তার গবেষণা। আর এই গবেষণা করেই তিনি আবিষ্কার করেছিলেন আপেক্ষিক তত্ত্ব।

বাসের কন্ডাক্টর টিকেট চাইলে তিনি খুবই বিব্রতবোধ করলেন। এ পকেট সে পকেট হাতড়ে কোথাও টিকেট পেলেন না। কন্ডাক্টর তাঁকে বিব্রত হতে দেখে বললেন, ‘ঠিক আছে, আপনাকে আর ব্যস্ত হতে হবে না। টিকেটটা কোথাও পড়ে গেছে হয়তো।’এ কথা শুনে আইনস্টাইন বিচলিত হয়ে বললেন, ‘আরে না, বলছ কি তুমি! টিকেট না পেলে আমি হোটেলে ফিরব কী করে? টিকেটের উল্টো পাশে হোটেলের নাম-ঠিকানা লেখা ছিল যে।এক বক্তৃতা সভায় আইনস্টাইনকে একনজর দেখানোর জন্য বাবা তাঁর ছেলেশিশুকে উঁচু করে ধরলেন আইনস্টাইনের সামনে। শিশুটি তখন তারস্বরে কাঁদছে। বৃদ্ধ আইনস্টাইন শিশুটির গাল টিপে দিয়ে বললেন, ‘এত বছর বয়সের মধ্যে একমাত্র তুমিই অকপটে আমার সম্পর্কে মনের ভাব প্রকাশ করলে। ধন্যবাদ।’

এক পার্টিতে আইনস্টাইনকে চিনতে না পেরে এক তরুণী জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি কী করেন?’ আইনস্টাইন বললেন, ‘আমি পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র।’ তরুণী অবাক, ‘কী! এই বয়সে আপনি এখনো ছাত্র? আমি তো গত বছর পড়াশোনার পাট চুকিয়ে ফেলেছি।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আইনস্টাইন যখন বিজ্ঞান ছেড়ে প্রায় নির্বাসিত জীবন-যাপন করছিলেন, তখন হিটলারপন্থী ১০০ জন অধ্যাপক একটি বই প্রকাশ করেন। যার বিষয়বস্তু ছিল আপেক্ষিক তত্ত্বের বিরোধিতা। আইনস্টাইন ব্যাপারটি জেনে মন্তব্য করেন, ‘আমার তত্ত্ব ভুল প্রমাণ করার জন্য একজন অধ্যাপকই তো যথেষ্ট ছিল।’আইনস্টাইনের ‘থিওরি অব রিলেটিভিটি’ তত্ত্ব আবিষ্কারের পর সেই সময়ে অল্প কয়েকজন বিজ্ঞানী শুধু বুঝতে পেরেছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই আবিষ্কারের ফলেই তাঁর জনপ্রিয়তা সর্বস্তরে পৌঁছে যায়। এক চুরুট কোম্পানি তো তাদের চুরুটের নামই ‘রিলেটিভিটি চুরুট’ রেখে দেয়। সে সময় এক সাংবাদিক আইনস্টাইনকে প্রশ্ন করলেন, ‘আচ্ছা বলুন তো, থিওরি অব রিলেটিভিটি নিয়ে চারদিকে এত আলোচনা হচ্ছে কেন?’আইনস্টাইন মৃদু হেসে উত্তর দিলেন, ‘মানুষ ফ্যাশন পছন্দ করে। আর এ বছরের ফ্যাশন হলো থিওরি অব রিলেটিভিটি। তাই এ নিয়ে এত আলোচনা।’ হাস্যরসপ্রিয় আইনস্টাইন তার যুগান্তকারী আপেক্ষিক তত্ত্বের আবিষ্কার নিয়ে কৌতুক করে বলেছিলেন, আমার আপেক্ষিক তত্ত্ব সত্যি প্রমাণিত হয়েছে। এবার জার্মানি বলবে আমি জার্মান আর ফরাসিরা বলবে আমি বিশ্ব নাগরিক। কিন্তু যদি তত্ত্বটি মিথ্যা হতো, তাহলে ফরাসিরা বলত আমি জার্মান, আর জার্মানরা বলত আমি ইহুদি।
কথিত আছে আইনস্টাইন একবার তার স্ত্রীকে বলেছিলেন তুমি খুব মোটা হয়ে যাচ্ছ, আমার সঙ্গে গবেষণাগারে থাকবে আমি যতক্ষণ ঘুমাবো ততক্ষণ ঘুমাবে। মাত্র তিন ঘন্টা তিনি ঘুমোতেন। তারপরে ক্রমান্বয়ে তার স্ত্রী তার সঙ্গে থাকাতে লাগলেন এবং দু’বছর পরে তার স্ত্রী ও কন্যা যখন বাজার থেকে ফিরছেন তখন দু’জনকেই সমবয়সী মনে হচ্ছিল। ঘুমিয়ে সময় নষ্ট করার বিরোধী ছিলেন তিনি।
আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্বের জটিলতা এবং দুর্বোধ্যতা নিয়েও কিছু মজার কাহিনী আছে। একদিন এক তরুণী তার প্রেমিকের সঙ্গে গির্জার যাজকের পরিচয় করিয়ে দিল। পরদিন যাজক ওই মেয়েটিকে বললেন, তোমার প্রেমিককে আমার সব দিক থেকেই ভালো লেগেছে শুধু একটি বিষয় ছাড়া।আইনস্টাইন বেশি প্রভাবিত হয়েছিলেন দার্শনিক আর্নস্ট ম্যাক-এর চিন্তায়। ম্যাক বিশ্বাস করতেন বিশ্ব অপরিবর্তনীয়। ওই মতের শরিক না-হলে প্রসারণশীল ব্রহ্মাণ্ড, এবং সেই সুবাদে কোনও এক মাহেন্দ্রক্ষণে বিশ্বের জন্মের কথাও প্রথম বলতে পারতেন তিনি। ব্রহ্মাণ্ড যদি ক্রমাগত প্রসারিত হয়ে চলে, তবে সুদূর অতীতে কোনও এক দিন তা নিশ্চয়ই সংকুচিত অবস্থায় ছিল। ছিল বিন্দুবৎ। সেই দশা থেকে শুরু হয়েছিল প্রসারণ। তো তখন জন্ম হয়েছিল এই বিশ্বের। হ্যাঁ, এ দাবি বড় বেশি ধর্ম-ঘেঁষা। যেন ওই ঈশ্বরের ইচ্ছাক্রমে ব্রহ্মাণ্ডের জন্ম। বিজ্ঞানী হিসেবে ও দাবি মানতে চাননি আইনস্টাইন। দাবি হোক না ধর্ম-ঘেঁষা, বিজ্ঞানের গণনায় যদি তার সমর্থন মেলে, তবে তা মানায় আপত্তি করা ভুল কাজ। সে ভুল করলেন আইনস্টাইন।

প্রসার্যমাণ বিশ্বের ধারণায় পৌঁছনোর মূলে অনেকের গবেষণা। আর তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য এক জন। জর্জ লেমাইত্রে। জন্মসূত্রে বেলজিয়ান। পেশায় পাদ্রি। আবার জ্যোতির্বিজ্ঞানীও। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে আমেরিকায় ভেস্টো স্লিফার লক্ষ করেন, ব্রহ্মাণ্ডে গ্যালাক্সিগুলো একটা আর একটার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। ওই পর্যবেক্ষণে উৎসাহিত হয়ে ব্রাসেলস শহর থেকে প্রকাশিত এক জার্নালে ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে এক পেপার লেখেন লেমাইত্রে। তাতে আইনস্টাইনেরই আবিষ্কৃত জেনারেল রিলেটিভিটির ফর্মুলা কাজে লাগিয়ে প্রমাণ করেন, মহাবিশ্ব ফুলেফেঁপে বড় হচ্ছে। ওই বছর ব্রাসেলস শহরে পদার্থবিদ্যার সম্মেলন। যোগ দিতে এলেন আইনস্টাইন। তাঁর সঙ্গে দেখা করলেন লেমাইত্রে। জানালেন নিজের গণনালব্ধ ফলের কথা। শুনে আইনস্টাইনের মন্তব্য: ‘‘আপনার গণনা নির্ভুল, তবে ফিজিক্সের জ্ঞান বিচ্ছিরি।’’

রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, তাঁর মধ্যে আমি এক বিশ্বকবির দর্শন পেয়েছি। আর আইনস্টাইন বলেছিলেন,টেগোর ইস এ বিগ সায়েন্টিস্ট। মহামানবের আদর্শগত মত সমচিন্তক হয়।

প্রকাশিত নথিপত্রে ভাঙছে ভাবমূর্তি। প্রতিভাত হচ্ছেন রক্তমাংসের আইনস্টাইন। নিষ্ঠাবান গবেষক, সমাজ-সচেতন নাগরিক, জেদি এবং একরোখা পুরুষ। আর অবশ্যই, বহুগামী প্রেমিক। নতুন তথ্যে আলোকিত এই আইনস্টাইনকে তাঁর বইতে আইজাকসন তুলে ধরেছিলেন কিছুটা। ন্যাশনাল জিয়োগ্রাফিকের সিরিয়ালে মিলেছে ওই বিজ্ঞানীর ঝলক।

আর তাতে চটেছেন অনেকে। প্রশ্ন উঠেছে মোক্ষম। আইনস্টাইন স্মরণীয় কিসে? নিশ্চয়ই বিজ্ঞানে। তা হলে তা পিছনে রেখে ব্যক্তিজীবন টানা কেন? হ্যাঁ, এটা ঠিক যে, সেক্রেটারির সঙ্গে আইনস্টাইনের মাখামাখিটা জানতেন তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী এলসা। বেচারি সে কারণে ছেড়ে যাননি তাঁকে। কিন্তু, ও সব নাকি তুচ্ছ ব্যাপার। না দেখালেও চলত।

অতএব, বিতর্ক। চলত, না চলত না? আশ্চর্য, বিতর্কে যোগদানকারীরা কিন্তু এক বারও ভেবে দেখছেন না সিরিয়াল-নির্মাতাদের অভিপ্রায়। কী দেখাতে চাইছিলেন ওঁরা? আইনস্টাইনের দুনিয়া-বদলানো আবিষ্কার নিয়ে তো ডকুমেন্টারি আছে শয়ে শয়ে। আর একটা রিলেটিভিটির প্রাইমার বানানো তো উদ্দেশ্য ছিল না সিরিয়ালের। নির্মাতারা যে চাইছিলেন দর্শকদের রক্তমাংসের আইনস্টাইন উপহার দিতে। তা হলে?

ব্যক্তি আইনস্টাইনের মতো গবেষক আইনস্টাইনকেও এখন দেখা হচ্ছে ভিন্ন আলোয়। হ্যাঁ, একার চেষ্টায় বিশ্ববীক্ষায় যে পরিবর্তন এনেছিলেন তিনি, বিজ্ঞানে তার নজির আর নেই। তিনি জিনিয়াসদের জিনিয়াস। কিন্তু তাঁকে অতিমানব ভাবা ভুল। গবেষণায় ভুল যে তাঁরও হত। হ্যাঁ, ভুল। সে সব ভুলের কথা এ লেখায়। তাঁর এক বিখ্যাত ভুলের শতবার্ষিকী এ বছর।

১৯১৭। জেনারেল রিলেটিভিটি থিয়োরি আবিষ্কার করা হয়ে গিয়েছে এক বছরেরও বেশি আগে। তার ফর্মুলার দিকে তাকিয়ে খুশি হলেন না আইনস্টাইন। যদিও সে ফর্মুলার আবিষ্কর্তা স্বয়ং তিনি। নিজের উদ্ভাবনে অসন্তুষ্টি? আসলে জেনারেল রিলেটিভিটি হল মহাকর্ষ বা গ্র্যাভিটি ব্যাখ্যার থিয়োরি। আর সে ব্যাখ্যা আইজাক নিউটনকে নস্যাৎ করে। নিউটনের তত্ত্বে গ্র্যাভিটি হল দু’টো বস্তুর মধ্যে পারস্পরিক আকর্ষণ বল। আর তার ফলে বস্তু দু’টোর চলার পথের পরিবর্তন। আইনস্টাইন-উদ্ভাবিত জেনারেল রিলেটিভিটিতে গ্র্যাভিটি কোনও আকর্ষণ বলই নয়। তা বরং অন্য ব্যাপার। কী? আইনস্টাইনের গণিত দেখাল, কোনও জায়গায় বস্তু থাকলে সে বস্তু তার চারপাশের শূন্যস্থানকে দুমড়ে-মুচড়ে দেয়। সে দোমড়ানো জায়গার মধ্যে অন্য বস্তু এসে পড়লে, তার চলার পথ বেঁকে যায়। স্পেস নিজে দোমড়ানো, তাই দ্বিতীয় বস্তুর চলার পথ বাঁকা। কতটা পদার্থ চারপাশের স্পেসকে কী পরিমাণ দোমড়াবে, তা বলে দেয় জেনারেল রিলেটিভিটির ফর্মুলা।

তো সেই ফর্মুলার দিকে তাকিয়ে অস্বস্তির কারণ আছে বইকী। গোটা ব্রহ্মাণ্ডের ক্ষেত্রে ওই ফর্মুলা কাজে লাগালে যে বিপদ! পদার্থ থাকলে স্পেস দোমড়াবে। ব্রহ্মাণ্ড জুড়ে এত পদার্থ। তা হলে তাদের প্রভাবে ব্রহ্মাণ্ডের আয়তন তো সংকুচিত বা প্রসারিত হওয়ার কথা। বিশ্ব স্থিতিশীল হওয়ার কথা নয়। অথচ অ-স্থির বিশ্ব আইনস্টাইনের মন মানতে চায় না। আর তিনি তা মানেনই বা কী করে, ব্রহ্মাণ্ডের সংকোচন বা প্রসারণের কোনও চিহ্নই যে তখনও জ্যোতির্বিজ্ঞানের কোনও পরীক্ষায় ধরা পড়েনি। কী করা যায়?

১৯১৭ সালে ব্রহ্মাণ্ডকে স্থিতিশীল রাখার উপায় বের করলেন আইনস্টাইন। কল্পনা করলেন এমন এক বলের, যা রিলেটিভিটির দরুন ব্রহ্মাণ্ডকে দুমড়ে সংকুচিত হওয়া থেকে বাঁচাচ্ছে। অর্থাৎ, সে বল আকর্ষণের উলটো— বিকর্ষণ। তা ব্রহ্মাণ্ডকে প্রসারিত করতে চায়। স্পেস দুমড়ে সংকোচনের বিরুদ্ধে প্রসারণ। দুয়ে মিলে ব্যালান্স। ব্রহ্মাণ্ড স্থির। প্রসারণমুখী ওই বিকর্ষণ বলের নাম আইনস্টাইন দিলেন ‘কসমোলজিকাল কনস্ট্যান্ট’। ওই জিনিসটাকে রিলেটিভিটির ফর্মুলায় ঢুকিয়ে ফর্মুলাটাকেই পালটে ফেললেন আইনস্টাইন।

১৯২০-র দশকের শেষ ভাগ। জ্যোতির্বিজ্ঞান পরীক্ষা দিল নতুন খবর। ব্রহ্মাণ্ড হুহু করে প্রসারিত হচ্ছে। অর্থাৎ, তা অ-স্থির। আইনস্টাইনের মনে হল, মিছেই ব্যালান্সিং ফ্যাক্টরের কল্পনা করেছেন তিনি। রিলেটিভিটির ফর্মুলা থেকে সরিয়ে দিলেন কসমোলজিকাল কনস্ট্যান্ট। ভাবলেন, বড় ভুল হয়েছিল তাঁর।

না, তা হয়নি। ১৯৯৮ সালে দু’দল জ্যোতির্বিজ্ঞানী পরীক্ষা করে যা জেনেছেন, তা বিস্ময়কর। ওঁরা দেখেছেন, ব্রহ্মাণ্ড যে প্রসারিত হয়ে চলেছে তা শুধু নয়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রসারণের স্পিডও আবার বাড়াচ্ছে। আগে যে সময়ে ব্রহ্মাণ্ড আয়তনে বেড়েছে যতটা, এখন তা বাড়ছে তার চেয়ে বেশি। ভবিষ্যতে বাড়বে আরও বেশি।

আবিষ্কারে হইচই পড়েছিল চার দিকে। কৃতিত্বের জন্য ২০১১ সালে দু’দলের তিন বিজ্ঞানী পেয়েছেন ফিজিক্সের নোবেল প্রাইজ। তা হলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াল? কসমোলজিকাল কনস্ট্যান্ট-কে নিজের ভুল ভাবাই ভুল হয়েছিল আইনস্টাইনের!

বিশেষজ্ঞরা বলেন, আইনস্টাইন বেশি প্রভাবিত হয়েছিলেন দার্শনিক আর্নস্ট ম্যাক-এর চিন্তায়। ম্যাক বিশ্বাস করতেন বিশ্ব অপরিবর্তনীয়। ওই মতের শরিক না-হলে প্রসারণশীল ব্রহ্মাণ্ড, এবং সেই সুবাদে কোনও এক মাহেন্দ্রক্ষণে বিশ্বের জন্মের কথাও প্রথম বলতে পারতেন তিনি। ব্রহ্মাণ্ড যদি ক্রমাগত প্রসারিত হয়ে চলে, তবে সুদূর অতীতে কোনও এক দিন তা নিশ্চয়ই সংকুচিত অবস্থায় ছিল। ছিল বিন্দুবৎ। সেই দশা থেকে শুরু হয়েছিল প্রসারণ। তো তখন জন্ম হয়েছিল এই বিশ্বের। হ্যাঁ, এ দাবি বড় বেশি ধর্ম-ঘেঁষা। যেন ওই ঈশ্বরের ইচ্ছাক্রমে ব্রহ্মাণ্ডের জন্ম। বিজ্ঞানী হিসেবে ও দাবি মানতে চাননি আইনস্টাইন। দাবি হোক না ধর্ম-ঘেঁষা, বিজ্ঞানের গণনায় যদি তার সমর্থন মেলে, তবে তা মানায় আপত্তি করা ভুল কাজ। সে ভুল করলেন আইনস্টাইন।

প্রসার্যমাণ বিশ্বের ধারণায় পৌঁছনোর মূলে অনেকের গবেষণা। আর তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য এক জন। জর্জ লেমাইত্রে। জন্মসূত্রে বেলজিয়ান। পেশায় পাদ্রি। আবার জ্যোতির্বিজ্ঞানীও। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে আমেরিকায় ভেস্টো স্লিফার লক্ষ করেন, ব্রহ্মাণ্ডে গ্যালাক্সিগুলো একটা আর একটার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। ওই পর্যবেক্ষণে উৎসাহিত হয়ে ব্রাসেলস শহর থেকে প্রকাশিত এক জার্নালে ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে এক পেপার লেখেন লেমাইত্রে। তাতে আইনস্টাইনেরই আবিষ্কৃত জেনারেল রিলেটিভিটির ফর্মুলা কাজে লাগিয়ে প্রমাণ করেন, মহাবিশ্ব ফুলেফেঁপে বড় হচ্ছে। ওই বছর ব্রাসেলস শহরে পদার্থবিদ্যার সম্মেলন। যোগ দিতে এলেন আইনস্টাইন। তাঁর সঙ্গে দেখা করলেন লেমাইত্রে। জানালেন নিজের গণনালব্ধ ফলের কথা। শুনে আইনস্টাইনের মন্তব্য: ‘‘আপনার গণনা নির্ভুল, তবে ফিজিক্সের জ্ঞান বিচ্ছিরি।’’
আইনস্টাইন ঘুমিয়ে সময় নষ্ট করতেন না। মাত্র দু থেকে তিনঘণ্টা রাতে ঘুমোতেন আর বাকি সময় গবেষণার কাজে ব্যয় করতেন। তার স্ত্রী মোটা ছিলেন। আইনস্টাইনের কথামত তিনিও রাতে কম ঘুুমোতে শুরু করলেন। এক বছর পরে তাঁর স্ত্রী সুন্দরী হয়ে উঠলেন। এক বিস্ময়কর রসিক মানুষ ছিলেন আইনস্টাইন। আলবার্ট আইনস্টাইন জার্মানির একজন নোবেল পুরস্কার বিজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী। তিনি ১৯২১ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর পুরস্কার লাভের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়, তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে বিশেষ অবদান এবং বিশেষত আলোক-তড়িৎ ক্রিয়া সম্পর্কীত গবেষণার জন্য। আইনস্টাইন পদার্থবিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রচুর গবেষণা করেছেন এবং নতুন উদ্ভাবন ও আবিষ্কারে তাঁর অবদান অনেক। ১৯৯৯ সালে টাইম সাময়িকী আইনস্টাইনকে “শতাব্দীর সেরা ব্যক্তি” হিসেবে ঘোষণা করে। এ ছাড়া বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানীদের একটি ভোট গ্রহণের মাধ্যমে জানা গেছে, তাঁকে প্রায় সবাই সর্বকালের সেরা পদার্থবিজ্ঞানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন।

আইনস্টাইনের শৈশব কেটেছে জার্মানিতে, কৈশোর ইতালি, যৌবন সুইৎজারল্যান্ডে, প্রৌঢ়ত্ব জার্মানি আর বার্ধক্য আমেরিকায়। এক বার জাপানে মানুষে টানা রিকশায় তাঁকে উঠতে বলা হলে, ব্যথিত হয়ে তিনি বলেন: ‘এক জন মানুষ পশুর মতো টানবে, আমি নির্বিকার চিত্তে বসে থাকব তা কী করে হয়’!

বহু অনুরোধ করেও ফল হয়নি। ওঠানো যায়নি রিকশায়। অহংকারী ছিলেন না, কিন্তু আত্মবিশ্বাসের অভাব ছিল না। জার্মানি শেষ বার ছাড়ার পর সে সময়কার একশো বিজ্ঞানী তাঁর তত্ত্ব ভুল বলে মহা হইচই শুরু করেন। আইনস্টাইন রাগ করলেন না, ব্যাপারটা সহজ ভাবেই নিলেন। অসম্ভব আত্মবিশ্বাস নিয়ে বললেন: ‘আরে এ সব কী, একশো জনের কি প্রয়োজন, মাত্র এক জন ভুল ধরিয়ে দিলেই তো হয়’।যুদ্ধকে আজীবন অন্তর দিয়ে ঘৃণা করে গেছেন এই মনীষী। তাঁর নিজের কথায়, “মানুষ হত্যা আমার কাছে নিদারণ বিরক্তিকর একটি ব্যাপার। আমার এই মনোভাব কোনও বিজ্ঞ চিন্তা থেকে আসেনি। এর মূলে রয়েছে ঘৃণা আর নিষ্ঠুরতার প্রতি আমার তীব্র বিদ্ধেষ।” আইনস্টাইন ছিলেন অসম্ভব জনপ্রিয়। একটা নমুনা এ রকম, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ চোদ্দো জন বিজ্ঞানীর নাম বিজ্ঞানীদের কাছ থেকে গোপন ভোটের মাধ্যমে চাওয়া হলে, বিভিন্ন নাম ওঠে এল। কিন্তু আইনস্টাইনের নাম কারও পছন্দ থেকে বাদ পড়ল না।

আইনস্টাইন বলেছিলেন, আলোর চেয়ে বেশি গতিতে আর কেউ ছোটে না এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে। শূন্যস্থানে আলো প্রতি সেকেন্ডে পাড়ি দেয় ২৯ কোটি ৯১ লাখ ৯২ হাজার ৪৫৮ মিটার। এর চেয়ে বেশি গতি পৃথিবীতে আর কারও নেই। আর এই দাবিই আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতা সূত্রের ভিত। বস্তুত এই গতিসীমার ওপরই দাঁড়িয়ে আছে গোটা পদার্থবিদ্যা অনেকখানি। তাঁর আপেক্ষিক তত্ত্ব খুব আলোড়ন তুললেও অনেকে সেটা বোঝে না। এটা বোঝানোর জন্য রসিকতা করে তিনি বলেছিলেন “তুমি যদি আগুনের পাশে ১ মিনিট বসে থাকো তা হলে মনে হবে ১ ঘন্টা ধরে বসে আছ, আর যদি একটি সুন্দরী মেয়ের পাশে ১ ঘন্টা বসে থাকো তা হলে মনে হবে মাত্র ১ মিনিট ধরে বসে আছি ,হা হা হা।

তথ্য ঋণ – বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গ্রন্থাবলী ও ইন্টারনেট,উইকিপিডিয়া ও মাননীয় গবেষকদের তথ্য থেকে প্রাপ্ত সংবাদ।

সুদীপ ঘোষাল নন্দন পাড়া খাজুরডিহি পূর্ব বর্ধমান ৭১৩১৫০ মো ৮৩৯১৮৩৫৯০০.

সুদীপ ঘোষাল। গল্পকার। জন্ম ভারতের পশ্চিমব্ঙ্গরাজ্যের কেতুগ্রামের পুরুলিয়া গ্রামে। প্রকাশিত বই: 'মিলনের পথে' (উপন্যাস)। এছাড়াও কয়েকটি গল্প ও কবিতার বই আছে।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

মধ্য যুগের বাঙালী কবি দৌলত কাজীর আখ্যান কাব্য আধুনিক সাহিত্যেও প্রবহমান

  বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রথম ধর্মকে বাদ দিয়ে যিনি রক্ত মাংসের মানুষের আশা, আকাঙ্খা, সুখ,…..