আজকাল  আমি 

বদরুদ্দোজা শেখু
কবিতা
Bengali
আজকাল  আমি 
আজকাল  আমি 
আজকাল আমি
যখন যেমন পারছি ইচ্ছামতো সময়ের সাথে থেকে যাচ্ছি
যাচ্ছি, আসছি
রাঁধছি
খাচ্ছি-দাচ্ছি , ঘুমোচ্ছি
জাগছি,
শুয়ে শুয়েই হাতঘড়িটায় দম দিচ্ছি
নিঃশব্দে দুঃস্বপ্নের রেস শুষে  নিচ্ছি,
দূরাগত গ্রামোফোন শুনছি
বাইরে যাওয়ার প্রহর গুণছি
মানসীর সাথে ঘরকন্নার কল্পনার রাজা-উজীর মারছি ,
ভাবছি ভাবছি ভাবছি
যখন যেমন পারছি ইচ্ছামতো সময়ের সাথে থেকে যাচ্ছি
কখনো কখনো শ্লথ হ’য়ে উঠে প্রস্তুতির দুর্ভার সময়,
ঘটে শুধু তালগোল পাকানো খেই হারানো  কল্পনার ক্ষয় ,
আজকাল এভাবেই আমি চলি ।
ডানা ঝাড়া দিয়ে উঠে নিভৃত রাতের কিছু কথার কুহলি ;
কতোবার কতো উদ্ভ্রান্ত রাত্রি এলো এই নিঃসঙ্গ জীবনে ,
লাগলো লেলিহান আগুন পার্থিব দেহের আড়াল মনের অপার্থিব বনে ,
অনুভূতির শোণিতে শোণিতে এলো রিরংসার বধির টঙ্কার ,
উন্মাদনার অবদমনের অন্তরাল বিশীর্ণ শঙ্কার
দীর্ঘশ্বাসে জনম জনম ঘুরে মরলো এক শিশুর ক্রন্দন ,
আলোড়ন তুলে গেল বুকে সেই বিদেহীর নিভৃত স্পন্দন
ধীরে ধীরে নিয়ে এলো ডজন হাজার লাখ নিরন্ন শিশুর নিষ্ফল কোহাহল ,
দ্বিধাগ্রস্ত হৃদয়টা হলো বারবার দুরপনেয় দুঃখের ঘোলাজল ;
প্রতীক্ষার স্বচ্ছ ভোরে ছেয়ে রয় সেই কুয়াশার আবিষ্ট বিষাদ ।
কামনার তাঁবেদার হ’য়ে উঠে তবু স্মৃতি-হননের দেহের জল্লাদ
অরোধ্য স্পৃহায় কভু , ক’রে যায় কাল্পনিক গণিকার খোঁজ ,
বুঝি না —- এ জৈবিক গরজ , না প্রেমের প্রবোধ, না নারীত্ত্ব হননের মৌজ ;
একদিকে আদর্শ অন্যদিকে কামনায় উভয়ের মানদণ্ড হারালাম ,
প্রতিদিন আমি এই মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ালাম ।
কখনো কখনো বুকে আসে উদ্দাম বিদ্রোহের ঢেউ —-
উদ্ভ্রান্ত হ’য়ে উঠে মনের সুন্দরবনে অন্ধদৃষ্টি দুরাশার ফেউ ,
ছিন্ন করি লজ্জাভয় , ভিন্ন করি ব্যবধান , দীর্ণ হয়না সঙ্কোচের সিঁড়ি ;
পূজার প্রেরণা ছেড়ে হই শুধু প্রেমের আবহমান নীরব ভিখিরি ।
অথচ আমাকে কখনো কেউ অশান্ত হ’তে দ্যাখেনি ।
এবং জানি, আমার জন্য কোনোদিন কোনো নারী চোখে তার লাজুক কাজল আঁকেনি ।
তবু, হর্দম নির্দয় নারীর সাথে ঘরকন্নার কল্পনার রাজা-উজীর মারছি
আজকাল এ ভাবেই আমি
যখন যেমন পারছি ইচ্ছামতো সময়ের সাথে থেকে যাচ্ছি
যাচ্ছি, আসছি
রাঁধছি
খাচ্ছি-দাচ্ছি , ঘুমোচ্ছি
জাগছি,
শুয়ে শুয়েই হাতঘড়িটায় দম দিচ্ছি
নিঃশব্দে দুঃস্বপ্নের রেস শুষে নিচ্ছি
দূরাগত গ্রামোফোন শুনছি
বাইরে যাওয়ার প্রহর গুণছি ,
ভাবছি ভাবছি ভাবছি – – –
বুঝতে যদি
নাঃ, আর কোনো বাসনা নেই ।
শূণ্য প’ড়ে থাক্  তস্তরি ,গেলাস ।
আরো হোক ব্যথা-ঘোলা বুকের কেলাস ;
দ্যাখো, ব্যর্থতার বৃষ্টি বুকে ঝরবেই ।
কথা দিতে পারবো না , আর ভিক্ষা করবো না প্রেম ;
ভগ্ন-আশা কদমের ফুল
ভেসে তো যাবেই , দূরে নিয়ে যাবে স্রোতের অকূল ;
যদি ভুলে কোনোদিন তুলে নেয় কোনো নিশাচর নাওয়ের হারেম ।
আমি তো শান্তই আছি, আহত লজ্জার জলপাই পাতায় ঢাকা প্রেমের পাথর,
জীবনের অপূর্ণতা,ক্ষুধা , নারী , মদ
জানি না তো কী বিপাকে কখন্ যে হ’য়ে উঠে কাব্যের রসদ ;
চৈত্রের দাহনে পাই শিরীষ ফুলের মতো আবেশী আতর ।
দ্যাখো :
রক্তাক্ত  হৃদয়ে বয় ক্ষিপ্ত-পেশী উদ্বাহু হাতের কলঙ্ক প্রখর ;
দারিদ্রের  দুর্বহ বোঝার সাথে নির্ভয় দাদন-খাটার
অন্ধকারে ধরো নি তো হাত , তাই ফুটে উঠে প্রায়শ্চিত্ত বুকের কাঁটার ।
তুমি যদি বুঝ্তে, বাল্মীকি হলো কেন একদিনের দস্যু রত্নাকর ।
দিগন্ত যায়না দেখা , দীঘল রাতের শেষ নয় যেন নিকট আভাস ।
নিরঞ্জনা নদীকূলে ঘুরে মরে ক্ষুদ্ধ মন উদ্বুদ্ধ বুদ্ধের প্রতীম ,
পাই না তো পরিত্রাণ , তাই ফুটে উঠে প্রায়শ্চিত্ত — হৃদয়ের একরাশ লজ্জার জাজিম ।
তুমি যদি বুঝতে, মহাকবি হলো কেন একদিনের মূর্খ  কালিদাস

বদরুদ্দোজা শেখু। কবি। জন্ম ১৯৫৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গরাজ্যের মুর্শিদাবাদ জেলার সাগরদিঘিতে। অভাব অনটনের মধ্যে তাঁর বেড়ে উঠা। প্রথাগত শিক্ষায় স্নাতকোত্তর। পেশায় অবসরপ্রাপ্ত রাজ্য সরকারি কর্মচারী, নেশায় কবিতা লেখালিখি। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ: অলৌকিক আত্মঘাত, দুঃস্বপ্নের নগরে নিভৃত নগ্ন, শব্দ ভেঙে...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ