আধখোলা দরজা

শুভদীপ সরকার
কবিতা, প্রবন্ধ
Bengali
আধখোলা দরজা

মনের গহনে সুপ্রথিত অনুভূতিপ্রবণ ভাবাবেগই হল কবিতার আঁতুড়ঘর। সহজাত প্রবৃত্তি ও তাড়নাবোধ থেকেই কবি হাতে তুলে নেন কলম, সৃষ্টি হয় এক স্বতঃস্ফূর্ত প্রণোদনা; যা ব্যাকরণের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত, ‘আর্ট ইন ফর্ম’ এর যূপকাষ্ঠে নয় বলিপ্রদত্ত। প্রকৃতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ পুরোহিত ওয়ার্ডসওয়ার্থ তাই তো নির্দ্ধিধায় বলতে পারেন, ‘কবিতা হল মনের শক্তিশালী অনুভূতির স্বতঃস্ফূর্ত প্রবাহ। এর উৎস একাকিত্বে উৎসারিত আবেগের স্মৃতিচারণায়’।

এখন প্রশ্ন হল, সত্যিই কি কবিতার কোনো একরৈখিক সংজ্ঞা হয়? না। কবিতা তাই যা মুগ্ধ করবে পাঠককে তার সূক্ষ্ম অপরিমেয়তায়। কল্পনাপ্রসূত চিন্তা-চেতনার মননশীল চিত্রকল্পে প্রতিভাস হয় কাব্য। রবার্ট ফ্রস্টের কথায় ‘কবিতা আসলে পারফরমেন্স ইন ওয়ার্ডস’।

সত্যিই তো, কবির মননে জন্ম নেওয়া দৃশ্যগত অভূতপূর্ব নতুনত্বের নান্দনিক উপস্থাপনাই হল কবিতা। তা কখনও কি পূর্বনির্ধারিত হতে পারে? সেইজন্যই তো প্রাণের কবি বলে ওঠেন,

“জাগিছে অন্তরীক্ষে হৃদয়স্পন্দন
চক্রে পিষ্ট আঁধারের বক্ষ-ফাটা তারার ক্রন্দন।”

পড়তে পড়তে পাঠকের আরো গভীরে যাওয়ার প্রবল বাসনা সৃষ্টি করাই কবির মোক্ষ, সংবেদনশীলতার আত্মপ্রকাশেই যার যথার্থ স্ফূরণ। বাচনের অদ্বয় উপহারে যে কাব্যিক দৃশ্যপট রচিত হয়, তা তো বাঁধনছাড়া; বোধের প্রেক্ষিত সেখানে মুখ্য। কল্পরাজ্যে বল্গাহীন বিচরণই হয়ে ওঠে কবির মৃগতৃষ্ণিকা। তাই তো সুভাষ মুখোপাধ্যায় এত নিঃসংকোচ,

“দুর্ঘটনার সম্ভাবনাকে বাঁধবে না কেউ?
ফসলের এই পাকা বুকে আহা, বন্যার ঢেউ!
দস্যুর স্রোত বাঁধবার আগে সংহতি চাই
জাপপুষ্পকে জ্বলে ক্যান্টন, জ্বলে সাংহাই। “

এই প্রসঙ্গে অবধারিতভাবে উঠে আসে কবিতা বোঝার প্রেক্ষিত। আচ্ছা, কেন বলুন তো কবিতা বুঝতেই হবে? অবচেতনে যা ভাবায়, তার প্রকাশকে কি মাপা যায় যুক্তিতর্কের কষ্টিপাথরে? কবিতা তো অনুভবের বিষয়, আধখোলা দরজার মতো। যে যার নিজের মত ভেবে নিক না কাব্যের মানে। থাকুক না কবি ও পাঠকের ভাবনার স্বাধীনতা! ‘কুবলা খান’-এর অসংলগ্নতা নিয়ে ক্রিটিকের রাতের ঘুম নষ্ট হোক, সাদার ওপর কালোর দাগে পলি পড়ুক, আফিমের ঘোর কেটে গেলে স্তব্ধ হোক না কোলরিজের হাত, কিন্তু ‘জ্যানাডু’ থেকে যাবে অবিনশ্বর হয়ে পাঠকের মনে। এই কারণেই তো ফরাসি বঁদলেয়ার কবিতাকেই কবিতার শেষকথা বলেছেন। কোনো পূর্বনির্ধারিত পটভূমিকায় কবিতা লেখা সম্ভব নয়। জীবনের অমলিন হাসি-কান্না, প্রেম-বিরহ, সুখ-দুঃখই কবিতার উপজীব্য। যেখানে প্রত্যেকটি শব্দই হয়ে ওঠে একেকটি শৈল্পিক আধার। স্বনির্মিতির ভাবোন্মাদনায় যেখানে কবি প্রতিনিয়ত পুনরাবিষ্কার করেন নিজেকে, সেখানেই তো কাব্যের সার্থকতা। কবি হবেন সৃজনশীল স্বেচ্ছাচারী, তবেই তো নবারুণ ভট্টাচার্যের বলিষ্ঠ বিবেক দৃপ্তকণ্ঠে বলবে,

“পাতালে করেছি পাতার সঙ্গে সন্ধি
ঝড়ের সঙ্গে হাত-পা বাঁধা হাতকড়ায়
ভেবেছ জীবন ভিডিও ক্যাসেটে বন্দি
দ্যাখো না রক্ত কতদূর আরো গড়ায়
হয়ত হাঁটছি নৈরাজ্যের পথেই
দুপাশে ফুঁসছে ক্রুদ্ধ সাগর অথৈ।”

কবিতা হল সেই প্রতিধ্বনি যা নাচতে বলে ছায়াকে। কবিই সেই হৃদয়হীন উদবাস্তু যার আঙ্গিক চেতনায় আত্মা সত্য। সেইজন্যই তো মননে নিঁখুত চিত্র আঁকেন গালিব-

“যে আর্তনাদ ঠোঁটে এলো না, সে বুকে দাগ কেটে বসে
যে জলবিন্দু নদীতে পৌঁছলো না তাকে মাটি শুষে নেয়।”

শেলীর ভরতপাখি(স্কাইলার্ক) হয়ে ওঠে নান্দনিক আত্মার স্বর্গীয় অভিব্যক্তি; জীবনের যন্ত্রণা ও আবেগের নিঃস্বতাকে ছাপিয়ে যাওয়ার মাধ্যম।

অনুরাগের ভাষাই হল কবিতা। এখানেই তো ছন্নছাড়া ফকির খুঁজে পান জীবনের মনোময়তা-

“অনুরাগ নইলে কি সাধন হয়
সে তো মুখের কথা নয়।” (লালন)

প্রেমিকার সঙ্গে নিবিড় একাত্মতার শ্রেষ্ঠ প্রক্ষেপণও তো কাব্যেই বেশী ভালো জমে।

“তোমার শ্বাসের সঙ্গে শ্বাস নেওয়া শিখেছি যেদিন
তোমার মুখের সঙ্গে মুখ নিতে নিতে
দেখেছি কিভাবে ধ্বংসস্তুপে
মাথা ঝাপটে আগুন লাগায়
ফুল ভর্তি ডাল।” (জয় গোস্বামী)।

অস্তিত্বের সংকটে, কষ্টকর উপলব্ধিতে জীবনের গদ্যরা যখন ছন্নছাড়া, তখনই ইন্দ্রিয় স্পন্দনে কবিতা আনে মুগ্ধতার আবেশ। ‘হলো মেন’- ফাঁপা মানুষও কাব্যে মাতে আখ্যানমূলক চিন্তন-প্রক্রিয়ায়।

কবিতা আসলে একটা মেটাফিজিকাল থট। এর রূপ ভাস্বর হয় অভিজ্ঞতা ও স্মৃতির ক্যানভাসে। কখনো তা হয়ে ওঠে প্রতিবাদের হাতিয়ার। রুদ্ররাগের দীপকতানে সুকান্ত গর্জে ওঠেন-

“শোন রে মালিক শোন, শোন রে মজুতদার
তোদের প্রাসাদে জমা হল কত মৃত মানুষের হাড়
হিসেব কি দিবি তার।
প্রিয়াকে আমার কেড়েছিস তোরা, ভেঙেছিস ঘরবাড়ি
সে কথা কি আমি জীবনে মরণে কখনও ভুলিতে পারি?
আদিম হিংস্র মানবিকতার আমি যদি কেউ হই
স্বজন হারানো শ্মশানে তোদের
চিতা আমি তুলবোই।”

আবার কখনো বিরহের বিশল্যকরণীও কবিতা –

“আমার হৃদয় ব্যথাতুর
আর তন্দ্রালু বিবশতা পীড়ন করছে আমার ইন্দ্রিয়
যেন আমি হেমলক পান করেছি।” (ওড টু নাইটিঙ্গেল- জন কিটস)

বিপ্লবের অঙ্গীকারও যে ঋজু হয় কবির মননে-

“লেনিন ভূমিষ্ঠ রক্তে, ক্লীবতার কাছে নেই ঋণ
বিপ্লব স্পন্দিত বুকে, মনে হয় আমিই লেনিন।” (সুকান্ত ভট্টাচার্য)

শ্রমিকের খতিয়ান রাখা থাকে রাশিবিজ্ঞানের শুষ্ক সংখ্যায়, কিন্তু শ্রমের মূল্য? দাবি যে সবচেয়ে দৃঢ় হয় কবিতায় –

“ছড়া যে বানিয়েছিল, কাঁথা বুনেছিল দ্রাবিড়
যে মেয়ে এসে গম বোনা শুরু করেছিল আর্যপুরুষের ক্ষেতে
যে লালন করেছিল শিশু
সে যদি শ্রমিক নয়, শ্রম কাকে বলে?” (মল্লিকা সেনগুপ্ত)।

পরিশেষে তাই থমাস হার্ডির কথা ধার নিয়ে বলতে হয়, ‘অন্তর্নিহিত আবেগকে ছন্দে প্রকাশ করাই কবিতা’। বোঝানোর দায় বা বিশ্লেষণের দ্বায়িত্ব কবির নয়। এলোমেলো ভাবনারা জন্ম নিক কাব্যে, যুক্তির জটাজালে, নিয়মের নৈতিকতায় নাই বা বাঁধলাম কবিকে। বসন্তের কোকিল কেশে কেশে যদি রক্ত তোলে সে কিসের বসন্ত!”।

শুভদীপ সরকার। কবি ও শিক্ষক। জন্ম ও বাস ভারতের পশ্চিমবঙ্গরাজ্যের কলকাতা। লেখাপড়া করেছেন কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে এম,এ এরপর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে করেছেন বি,এড।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ