আবরারের কাছে লেখা চিঠি ও অন্যান্য

বেনজীন খান
কবিতা
Bengali
আবরারের কাছে লেখা চিঠি ও অন্যান্য

অস্থির ‘আমি’

আদিতে ‘আমি’ (Being), হুকুম (order)—‘হও’!
অতঃপর ‘অস্তিত্ব’ (being), মহাকাল, মহাকাশ, গ্যালাক্সি কুল।
নক্ষত্র, পৃথিবী, পানি ও প্রাণ—
প্রাণী, মানুষ, বাবা ও ঔরস, মা ও গর্ভাশয়!
পুনরায় পৃথিবী তারপর অন্ধকার!
আবার মহাকাল, আবার মহাকাশ, আদি ও আমি!
এবার নেই, হুকুম ও হও;
নেই, বিপরীত গতি।
এ এক অশ্বডিম্ব গোল, বিশাল শূন্য!
কেবলই আছি ‘আমি’ শুধুই আমার জন্য
নিকষ আঁধারে ঢাকা প্রগাঢ় আলো…

 

ভাবাংদেশ

শূন্য সাগরে ভাসমান এক দ্বীপ
যেখানে স্বপ্ন দেখা নিষেধ, ছবি হারাম
জীবনের ধারণা মস্তিষ্কহীন দেহ
যেখানে চাকরের নির্দেশে মনিব চলে
অনুগত দাসেরা কেবল ছড়ি ঘোরায়
যেখানে দাফন নিষিদ্ধ, কান্না হারাম
লাশ নিলামে উঠলে বাবাকে হাসতে হয়
যেখানে স্বতীত্বের চে বন্ধুর ইজ্জত দামি
শকুন পাখি, হায়নার ছবি বাঁধানো হয়
এ এমন এক ব্যাকরণ—
যেখানে সবাই বলবে, ভূমিপুত্র ছাড়া
এখানে প্রতিশোধ চলে
হিংসার চাষ আর নিন্দার আবাদ হয়
চক্রান্ত এখানকার বিজ্ঞান
ষড়যন্ত্র এখানকার গবেষণা
এখানে কাঁকড়া, কুঁচে আর কচ্ছপ
উপাদেয় খাবার
এখানে প্রিয় পশু শূকর, গরু হারাম
এখানে কবুতরের চে কাকের কদর
এখানে খরগোশের চে ছুঁচো প্রিয়
এখানে স্থান নেই,
মেধার-জ্ঞানের-প্রেমের
গোলাপ, আতর আর ছবির…
এ এক শূন্য সাগরে ভাসমান দ্বীপ
কালো না নীল বোঝা মুশকিল
এ এক ভুতুড়ে আবাস
হতে পারে এর নাম, ভাবাংদেশ

 

চিঠি

আবরার!
আমার বাবা, আমার কলিজার টুকরা। তুমি অভিমান করেছ জানি! কতগুলো বুনো শুয়োর যখন তোমাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল, ঠেকাতে পারিনি বলে! তোমার শরীরে প্রতিটি আঘাতের শব্দ শুনতে পাইনি বলে! তোমার কাতর কন্ঠের বাবা ডাকে আমার কান ছিদ্র হয়ে যায়নি বলে!
বাবা আমার!
তুমি অভিমান করেছ! লাঠির আঘাতে আঘাতে তোমার শরীরের প্রতিটি শিরা উপশিরা যখন ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছিল তখনো তোমার মা কেমনে ঘুমিয়ে ছিল ভেবে!
বাবা!
আমাদের কাছে উত্তর নেই…
তবে এতটুকু বলব—-ওরা তোমার মুখ বন্ধ করতে পারেনি! পৃথিবীর সবকটি মিডিয়া আজ তোমার মুখ হয়ে গেছে। তোমার নিথর দেহের সামনে ১৭ কোটী জীবিতরা আজ অপরাধী হয়ে গেছে! আমি আর তোমার মা বোবা হয়ে গেছি!
আবরার, বাবা আমার!
২১ বছরের ছোট্ট জীবনে না চাইতেই তুমি দিয়েছ অনেক—-, তোমার জগতের সবচেয়ে ভালো রেজাল্ট গুলো।
আমার বাবা!
আজ তোমার মা আর আমি একটা জিনিস চাইব, শুধু একটা। বলো, দিবে? বলো-বলো…
আমাদের তোমার কাছে নিয়ে চলো! বড় ভারি এই পাথরচাপা বুক’টা আর বইতে পারছিনা!
আমাদের নিয়ে চলো, বাবা! আমাদের নিয়ে চলো…
তোমার অধম বাবা!

 

আর্তনাদ

আবরার ফাহাদ তুমি ঘুমাও, বাবা
তোমার মৃত্যুতেও যদি প্রতিশোধ না হয়
তবে যে প্রকৃতির অনেক সত্য
মিথ্যা হয়ে যাবে!
তোমার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে
আজ উদোম হয়ে গেছে
আমাদের স্বাধীনতা
আমাদের বাকস্বাধীনতা!
আবরার, তুমি ঘুমাও
তোমার ছোট্ট একটি স্ট্যাটাসের ওজন
বহন করতে পারে না যে দেশ
সে তোমার মাতৃভূমি নয়!
ত্রিশলক্ষ মানুষের শাহাদাতের বিনিময়ে
যে দেশ আমরা ক্রয় করেছিলাম
সে দেশ আজ বে-হাত হয়েছে
তোমার মৃত্যু এ আওয়াজ পৌঁছে দিয়েছে
উত্তর থেকে দক্ষিণ গোলার্ধে!
এই অপরিচিত দেশ
কেউ চিনে না, কেউ না
আবরার, তুমি ঘুমাও বাবা
বিষাক্ত বারুদ ফুঁসছে…

বেনজীন খান। দার্শনিক, লেখক ও প্রাচ্যসংঘের প্রতিষ্ঠাতা। জন্ম ৯ ডিসেম্বর ১৯৬৬, বাংলাদেশের যশোরে। লেখাপড়া করেছেন 'ইসলামের ইতিহাস ও সভ্যতা'য় স্নাতকোত্তর। তিনি মূলত রাজনীতিক। রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করেন তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব, ইতিহাস, দর্শন ও সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে। তাঁর প্রিয় সৃষ্টি ‘প্রাচ্যসংঘ্য’ বহুমাত্রিক জ্ঞানচর্চাকেন্দ্র।...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

কবুতর

কবুতর

অগ্নিকাণ্ড আমার চৌহদ্দিতে ধ্বংসস্তুপের ভীড় পুনর্বার নুয়ে পড়া অতীতের তীর জীবনের মাঝপথে রেখে যায় সম্পর্কের…..