আব্বু তুমি কাঁদতেছো যে…

শিমুল সালাহ্উদ্দিন
কবিতা
Bengali
আব্বু তুমি কাঁদতেছো যে…

 

সমাপতন

লুটিয়ে পড়ার আগে তিনি মেয়েদের কথা মনে করে বিষাদ গিলেছিলেন,

লুটিয়ে পড়ার আগে তিনি বিস্ফোরিত চোখে দেখেছিলেন, তারই লোকেরা
তাঁর দিকে তাক করে আছে বন্দুক

লুটিয়ে পড়ার ঘণ্টাকয়েক আগেই তিনি বিভুঁইয়ে থাকা মেয়েদের সাথে কথা
বলেছিলেন টেলিফোনে…

বঙ্গবন্ধু, লুটিয়ে পড়ার আগে দুই কন্যার
কথা মনে করে কেঁদে উঠেছিলেন কী না আমরা আজ আর জানি না!

একরামুল বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি করতেন, লুটিয়ে পড়ার আগে তিনিও
কন্যাদের কথা মনে করে ডুকরে কেঁদে উঠেছিলেন, তার রেকর্ড আমরা শুনেছি।

প্রধানমন্ত্রীজি, এই কবিতায় আপনি নিজেকে কোথাও খুঁজে পাচ্ছেন?

নাকি, আমাদের বাবা, বাবা নয়
নাকি, আমাদের মা, মা নয়
নাকি, আমাদের ছেলে, ছেলে নয়

নাকি, প্রিয় প্রধানমন্ত্রীজি, আমরা মারা গেলে সেটাকে মৃত্যুই বলে না?

 

প্রসঙ্গ: একরামুল ও বন্দুকযুদ্ধ

আজকে তুমি অডিও শুনলা
কালকে ভিডিও দেখবা
পরশু লাইভ— নিজের হত্যাকাণ্ড
তখনো মনে পড়বে না তোমার
এই অবাধ হত্যাযজ্ঞ দেখেও
কিছুই বলোনি তুমি
অডিও শুনতে হবে ব’লে, স্ক্রল
করে করে চ’লে গিয়েছিলে
ফানি ভিডিওসে…
আর ঘরের শিশুটির হাতে
তুলে দিয়েছিলে সেই ভিডিও-গেইমস
যেখানে ইচ্ছামতোন গুলি করে করে
মানুষ মেরে ফেলা যায়…

 

চিঠি

চরাচরময় ঘাতক পাখির ডাক
তোমা-যাতনারা আমাকে ডোবাক—
ভাবনার
সড়কে সড়কে পাতা মগ্ন সরোবরে—
টের পাও?
আমার লাশের চুমু তোমার অধরে, স্বরে!

 

খাঁদের প্রান্তে দাঁড়িয়ে

‘‘আর তারা বলে চলে এটাই এটাই শেষ গান
অথচ চেনেনি ওরা আমাদের, তুমি দেখো
এটিই শেষ গান
যদি আমরাই কেবল শেষ গান হতে দিই!”
(From DANCER IN THE DARK by LARS VON TRIER)

জবাই হওয়ার কিংবা গুলিবিদ্ধ হওয়ার আগে প্রায় পশুর মতো বিপর্যস্ত মানুষের সামনে ক’টি পথই-বা খোলা থাকে! পিঠটান পলায়ন কিংবা উন্মত্ত আক্রমণ ছাড়া? প্রায় পশুদের মতো বিপর্যস্ত উন্মন মানুষের হাতে অস্ত্রই প্রয়োজন, তখন। অন্তত নিজের রক্ত দেখতে পাবার সাহস, ঘাড় ঘুরিয়ে মুরোদ যাচাই আর স্পৃহা প্রয়োজন; দেখবার নিজের গোরস্থান।

অপজনপদে হামলায় কুণ্ডদেবস্থান।
চারপাশে মাস্তান, বাকের ভাইয়ের চাবির রিং ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে
গায় ‘তেরে লাল দোপাট্টে মল্মল কাহুজি’র মতো
‘এই আমাদের আস্তানা; আমরা হোথার মাস্তানা…’
মাথায় কালো ফেট্টি

আর তখন
সাপের চোখের ভেতর দিয়ে

বুকের ভেতর আসনগাঁড়া বসে থাকা বেদম আমার সাঁই
হেচকা টানে দমের শানে মৃগেরনাভি পৈঠাপঞ্জি ঘেঁটে উচ্চারেণ
বংশীনদীর উল্টোঘাটে এক মৃণালে হরেক ফুল ফোটে

আমরা তখন নিন্দাবাজি, আমরা তখন
‘দূর হ, যাহ্ যা’-য় লিপ্ত ছিলাম, শুনতে পাইনি মোটে
ঘটছে এসব সত্ত্বার নাকি অতিজরুরী আফিম সংকটে…!

সেটা সঠিক কেউ জানেনা, কলজেপাশের বেদমসাঁইও।
হঠাৎ শুধু চেঁচিয়ে উঠলেন অন্ধকারের জলঘোলানো কল্জে-বিবর থেকে,
অন্তঃপুরের রক্তরণ থেকে : ‘বলতে পারো সু-সময়ের কোন সন্ধিক্ষণে
অন্ধকারের জলের স্বেদে সলতে জ্বলে মনে?’

আর তাছাড়া তখন, পাথর থেকে চুঁইয়ে পড়ছে ঘাম
হাজার মায়ের বিবস্ত্র চিৎকারে কালো–
নিশিযামে বাজে, বাজে অবিরাম, ইচ্ছালোক আলো–
মর্ত্যে হাজির ঈশ্বরকামী, হেলাফেলা খেলা অন্ধ খেলারাম।

প্রতিবাদ শুধু এই
এতদিন নম্র গলায় যেসব বলে ক’য়ে বুঝিয়ে এসেছি,
তাতে লুকোনো কিছুটা বারুদ, বিমূর্ত চিৎকার,
জীবনস্বপ্নরোদে জ্বলেছে কি জ্বলে-নাই!
তা বলে নাই, তা দেখে নাই, তা শুনে নাই কেউ, কানে।
শুধু আঁধারে জলের ইজেল চোখের মায়া, হাঁসের পায়ের ছাঁপ

বিষণ্নতার পড়ে থাকা দূর্বিপাক বানে।

এখনও তো গলার স্বর ওঠে না, কণ্ঠস্বর অবরুদ্ধ আমারই মাটিতে।

তাকে আমি উচ্চনাদে চড়াবো কিভাবে?
যদি চিৎকার করে উঠে অন্ধকার?
নিজের ভেতরের?

কিছুই না, কিছু না।

হৃৎপিণ্ড মাতাল মাইক্রোফোন একই ফিশফাঁশে বেজে ওঠে।

হয়তো দু’একফোঁটা রক্ত পড়বে, প্রতিবাদ শুধু এই, আর কিছু না। কলজেপাশের বেদমসাঁইকেও কিছুই বলবো না।

মঞ্চের মাঝখানে অট্টহাসিতে সকল দর্শক শ্রোতার চোখে কটাক্ষ-বিদ্রুপ ঢেলে দিয়ে
ভোঁ-দৌঁড় দিতে দিতে দেখে নেবো—

ধড়ের ওপর মুণ্ডুখানা আছে তো ঠিক?

    জায়গামাফিক?

কবির জুড়ে দেয়া সহপাঠ:
…“নগরের অভ্যন্তর থেকে অভ্যন্তরে পিয়ানোর চাবির জন্য আমরা এবার ছুটতে থাকি লাফিয়ে; বিক্রম ছায়ার মতো আবার অবিরল পিছনে– ঠিক যায়গায় পৌঁছে একটা ল্যাম্পোস্টের নিচে গোল আলোয় হাতড়াতে থাকি– চাবিটা পেয়ে যায়– আ, হাত দিতে তার চৌকো ও নরম আবার অনুভব করি; একটু ছড়ে গেছে–একটু অন্যকাজে ব্যবহৃত হয়েছে মনে হয় নইলে সেই চাবিটাই– এবার বিক্রমও সেটি স্পর্শ করে– মুঠোয় ধরে যা বোঝার বারবার বোঝে।…(আত্মক্রীড়া: লুক হিয়ার বিক্রম: সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়)

 

একরামুলের মা

প্রতিকার চেয়ে কার কাছে যাবে একরামুলের মা
সন্তানের মৃত্যুশোক শুধু মাত্র নয়, তার বুকে থাকা মৃত ছেলের অবমাননা
আজ মোছাতে পারে না চোখের পানি দিব্যি বেঁচে আছে যারা
তারা অপরাধ বোধে আজ নপুংসক, নিবীর্য স্থানু-লীন

ভবিষ্যত এসবের জবাব, দেবে, একদিন না একদিন

 

যেনোও জলের মধ্যে মাছ

এক নতুন সংবেদিতাকে বিদিতার ভাষা দিতে
ব্যক্তিগত অরণ্য আজও লুকিয়ে রেখেছি—

আমরা

এমন মডেল খুঁজছি, যাতে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বিভ্রম
ভেঙে পড়ে ঘোরলাগা ঝড়ের নদীর মতো

খুঁজছি এমন সাংস্কৃতিক পরিবেশ
যা দো-আঁশলা আর কলুষিত হতে বাধ্য

(যেমন,নিজের চারিদিকে নজর রেখে
আপনি জেনে অবাক হবেন কত কম মানুষ
অন্যের কথা গ্রহণ করে!)

আমরা

কেবল শ্রাব্যতার সামর্থ ব্যবহার করি
নিজের জুতসই জবাব তৈরি করবার জন্য
অথচ
নিজের করা ঘেঁউ ঘেঁউ
কেউ বুঝিনা, কেউ বুঝিনা নিজে…

অন্যরা যেনো অগভীর জলে আমাদের পা রেখে
চলার জন্য পাথর বসাচ্ছে, বসিয়েছে
আলাদা রঙিন টুকরো কাঁচের মতো বিচ্ছুরিত প্রতিটি মুহূর্ত

আমরা যেনও পাথর না জল কি বা কেমন
না জেনেই তার ওপর চালিয়ে দিয়েছি পা
পড়ে যেতে যেতে
আমরা সকলেই গুছিয়ে নিচ্ছি
নিজেদের পরিসর ও চৌহদ্দিগুলি
আর ব্যবহার করছি স্বতন্ত্রভাবে—

দেয়ালে লাগাচ্ছি পোস্টার, ইউনিক, হালকা নীল বা কমলা রঙ
ঘরগুলিতে সাজিয়ে রাখছি গেস্টতোষানো বিমুগ্ধ আসবাব—

রান্নাঘর। মিলনলীলা। বেডরুম। অফিস।
শাওয়ারের নীচে নগ্নগান।সিঁড়ি,চুম্বন ও বর্তুল।
তর্ক ও খেলা। নির্বাচন ও রোমান্স।

অথচ নিজেদের জন্য তৈরি করা নীল প্রশ্নাবলীতে
প্রশ্নচিহ্ন গায়েব,গুম করে দিয়ে ক্রুরহাসি হাসছি
তারার দিকে তাকিয়ে

কিন্তু আমরা কেউ
ইন্টেরিয়র ডিজাইনার কিংবা মন্ত্রসাধক
শিল্পী কিংবা কবি
শ্রমিক কিংবা বেশ্যা
সাংবাদিক কিংবা আমলা

                      নই

আমরা সকলেই নিজস্ব সরাইখানা ও মহানগরীর পথ…

শিমুল সালাহ্উদ্দিন। কবি, কথাসাহিত্যিক ও কলামিস্ট। জন্ম ১৭ অক্টোবর, ১৯৮৭, তুরাগ, ঢাকা। পেশায় ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের সিনিয়র ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট। দীর্ঘদিন পালন করেছেন ‘শিল্প, সংস্কৃতি ও বিনোদন’ বিভাগের বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃবিজ্ঞান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যায়ন বিভাগ থেকে প্রাতিষ্ঠানিক...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

ফেরা

ফেরা

ফেরা অনেক দিন আসিনি তোমার চোখের কোণে, বুকের পাশে, নিঃশ্বাসের চারপাশে। ভেবো না আমি পথ…..