আমাদের তখন সুনীলে পেয়েছে

হামিম কামাল
গল্প, পডকাস্ট, প্রবন্ধ
Bengali
আমাদের তখন সুনীলে পেয়েছে

আমাদের তখন সুনীলে পেয়েছে।

শ্রীমান সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের স্থান আমাদের কাছে বরাবরই অনেক ওপরে। আমাদের ইঁচড়ে পাকামোর গুরু ছিলেন যারা, সুনীলও তাঁদের একজন- এখানেই খানিকটা অসুবিধা হয়েছিল। ওই বয়সে এঁচড়েই পাকা ক’রে তোলার মতো যেসব বই মানুষ হাতে নেয়, পরিণত বয়েসে ওই বইগুলো হাতে আর উঠতে চায় না। এতে করে, যে রহস্যরসটা পরিণত বয়সে পাওয়ার কথা ছিল তাতে বাধা পড়ার কাজটা ভালোই সমাধা হয়।

আমাদের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। এতো ছোটবেলায় ‘সেই সময়’ হাতে এসেছিল যে নবকুমারের ওপর কোনো মায়াই জন্মালো না। কিন্তু, অস্বীকার করবো না, নাম মনে না-পড়া কোনো এক ললিতার শরীর থেকে গামছা খুলে পড়ল বলে- এ সম্ভাবনায় মন বেশি পুলকিত হয়েছিল। এখন দুঃখ হয়। তবে হ্যাঁ, বিন্দুবাসিনীর মৃত্যু আমাকে গভীরভাবে আচ্ছন্ন করেছিল।

বড় হওয়ার পর সুনীল যখন আমার হাতে উঠলেন তখন তিনি আর নেই। সুনীলদা- বলে যে ঝাঁপিয়ে পড়ব তাঁর বুকে সে উপায় আর না রেখে তিনি বিভূতিতে পরিণত হয়েছেন।

প্রবন্ধটি লেখকের স্বকণ্ঠে এখানে শুনুন

সুনীল মারা গেছেন ২০১৩ সালে। আগের বছর আমি স্নাতক শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়েছি। সুতরাং শরীরে, বয়েসে বড় হয়েছি তারও অনেক আগে, অবধারিত। এরপরও আমি ‘বড় হওয়ার পর’ কথাটা ব্যবহার করলাম যেন এই এক সূত্রে জানিয়ে দিতে পারি, কোন সময়টাকে আমি আমার বড় হওয়ার সময় বলে গণ্য করছি।

যখন আমি লেখালেখিই করব বলে পুরোপুরি মনস্থির করে ফেলেছি, ২০১৩ সালে, তখনই সময়টাকে আমি ‘বড় হওয়া-সময়’ বলে গণ্য করে ফ্রেমবন্দি করে নিয়েছি। নিজের কাজের পৃথিবী সেই প্রথম আর সেই শেষ- আমি চিনেছিলাম।

একদিন বন্ধু রিশাদ বাসায় এসে জানাল, তার মন খুব খারাপ। পারিপার্শ্বিকতা নিয়ে, লেখালেখি নিয়ে। জানতে চাইল, এমন কোনো বইয়ের সন্ধান দিতে পারি কিনা যেটা তার সব দুঃখ ভুলিয়ে দেবে?

ওর মন খারাপের কারণটা আমি জানতাম। এমন একজন অগ্রজ মানুষের কাছ থেকে সে তীব্র মানসিক আঘাত পেয়েছিল, যার ওপর তার ভালোবাসা না হলেও আশা ছিল অনেক। আর তার এই আঘাত পাওয়ার পেছনে আমারও হাত রয়েছে। ওকে বিষণ্ন  বিপন্ন দেখলে আমি নিজের ভেতর অপরাধ বোধ করতাম।

আমি বললাম, মন ভালো তো আসলে খুবই আপেক্ষিক ব্যাপার। এখন মন ভালো হলে পর মুহূর্তে আরো খারাপও হয়ে যেতে পারে। কারণ ফাঁদ চতুর্দিকেই। কিন্তু একটা কাজ তুমি করতে পারো। এই মন খারাপকে অন্য কোনো মন খারাপ দিয়ে প্রতিস্থাপিত করে দেখতে পারো। এটা ভালো কাজ দেয়।

মন খারাপ হলে আমরা বাতিঘরে গিয়ে বই দেখতাম। সন্ধ্যায় দুজনে গিয়ে মৌমাছির মতো এই বইয়ে ওই বইয়ে উড়ছি, হঠাৎ চোখে পড়ল সুনীলের কোণটা। একটা বই সেখান থেকে জ¦লজ¦লে চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। রিশাদকে যে দুঃখ দিয়ে দুঃখ প্রতিস্থাপনের কথা বলেছিলাম, সে দিক থেকে এ বইয়ের তুলনা মেলা কঠিন।

মানুষ ভাষিক জীব। তাই তার আসল আশ্রয়টা ভাষার কাছেই। এটা যারা জেনেছে- তারা যা জানার তা জেনে ফেলেছ। এখনও যারা জানেনি, তাদের খুঁজে বের করে জানিয়ে দেওয়াটা একটা দায়।

বইটা বের করে আর্তের হাতে তুলে দিয়ে বললাম, ‘নাও। এটা প’ড়ো। বিশেষ করে আজ রাতের জন্য এটা তোমার বিশেষ দরকার।’

বইটার নাম- ছবির দেশে কবিতার দেশে।

আমাদের বন্ধু সুহানও বেশ মানসিক সংকটের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল। নিজ মনের কাছ থেকে তো আর পালানো যায় না। তাই মনটাকে সাথে করেই পালাতে চাইছিল কোথাও। হঠাৎ শুনতে পেলাম, ওর ইউরোপের ভিসা মেলার অনুকূল কিছু সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। উচ্ছ্বাসের বানে হাবুডুবু খেতে থাকলাম। সুহানের যাওয়া মানে তো আমাদেরই যাওয়া! পার্থক্য কী।

ও ঠিক করেছিল পূর্ব-পশ্চিম একটা সমন্বয়ের পাশাপাশি বলকান অঞ্চলটা ভালো করে দেখে আসবে। ফ্যাসিবাদির পেছনে কদমতলায় আমাদের এক অস্থায়ী সভায় তাকে আগাম ‘বলকানফেরত ঔপন্যাসিক’ উপাধি দেওয়া হলো। ভ্রমণ শুরুর যদিও তখনও অন্তত মাসখানেক বাকি।

এরপর ক’দিন ইউরোপীয় সাহিত্য আর দর্শনের দৌড়, রাজনৈতিকতার বিচিত্র বুদবুদ আর মনমানসের রঙরঙিন লেখচিত্র এঁকে আমাদের দিন কাটতে থাকল। এসবকে ছাপিয়ে ইউরোপের পথেঘাটে শ্যামাঙ্গ বঙ্গসন্তান সুহানের কোনো হেমাঙ্গ স্বর্ণকেশীর সঙ্গে ভাবজটিল সম্পর্ককুসুম ফোটে কিনা- তা নিয়েও আমাদের ভাবনা লতা বাড়ায়। এতোদিন কেবল ভূগোল বইয়ের পাতায় পাতায় হাওয়া খেলানো যে ওয়ারশ, বুদাপেস্ট, বার্লিন, প্যারিস, বুখারেস্ট, দুব্রভনিক- ওসব আমাদের মুখে খইয়ের মতো ফুটতে থাকল।

কথায় কথায় উঠেছিল- পূর্ব ইউরোপের সেইসব রহস্যময় দেশে আমাদের স্বপ্নকল্পনার সমাজতন্ত্রের বেদনাদায়ক অসম্মান ও অন্তর্ধান প্রসঙ্গ। আর সেই সূত্র ধরেই চলে এলো সুনীল গাঙ্গুলীর ‘ইতিহাসের স্বপ্নভঙ্গের’ নাম।

সুনীলে-পাওয়া সেই সময়টায় পরপর আমরা সবাই; কেউ আমার মতো প্রথমবার, আর কেউ দ্বিতীয়বারের মতো; পড়ে ফেললাম সেই বই।

২.

খিলগাঁও ফুটবল মাঠের দক্ষিণ সদর দিয়ে ঢোকার মুখে হাতের বাঁয়ে থাকা একটা একচালা ঘরের পাকা সিড়ি আমাদের অসংখ্য হাইউ-আউটের একটা। সেখানে বসে আছি দুই ভালোমানুষ, হঠাৎ রিশাদ জিজ্ঞেস করে বসল, মস্কো আর প্যারিসের ভেতর যে কোনো একটাকে যাওয়ার জন্যে বেছে নিদে বললে কোনটাকে নেবে?

বললাম, ‘প্যারিস।’

‘বার্লিন আর মস্কোর ভেতর?’

‘বার্লিন।’

রিশাদ বলল, ‘প্রথম প্রশ্নের বেলায় আমিও প্যারিস নিতাম। কিন্তু দ্বিতীয়টায় মস্কো। মিলল না।’

বললাম, ‘এরপর যদি বলতে মস্কো না বুখারেস্ট- তখনও বুখারেস্ট বলতাম।’

‘কেন? কী কারণ?’

‘কারণটা কি তোমার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে? আমার নিজের কাছে এই কারণে এটা বলা সঙ্গত- তা জানি। স্বল্পবুদ্ধির ভাবপ্রবণ মানুষ, তাই হয়ত।

তুমি মস্কোর সঙ্গে যে যে নামগুলো বললে সেগুলোর তুলনায় মস্কো যেন আমার অনেক বেশি চেনা।

সোভিয়েত প্রকাশনার প্রতিষ্ঠান রাদুগা থেকে মুক্তি পাওয়া অবিশ্বাস্য সুন্দর বইগুলো আমার হাতে কৈশোরে না এসে, এসেছিল প্রথম তারুণ্যে। অনেক দেরি হয়ে যেতে পারত। কে জানে, হয়ত হয়েছেও এবং কোনো এক সংকটময় মুহূর্তে তা প্রকাশ পাবে। যাহোক,যা-ই পেয়েছি তাতেই সই, দুঃখ বাড়িয়ে কী লাভ। বলতে চাই, এই পাওয়ার পর মস্কো, সেন্ট পিটার্সবার্গ কিংবা কিয়েভের অলিগলি আমার চিনতে বাকি থাকল না। নীপার, দনের অববাহিকা আমাকে স্বপ্নে টেনেছে, আমি হেঁটে গেছি মাইলের পর মাইল হাঁটিয়েছে।

মধ্য কৈশোরে, যখন একাধটু বুঝতে শিখছি তখনো পরিবারের কল্যাণে যে ‘কমিউনিস্ট’ শব্দটাকে আমার সমস্ত সারল্য দিয়ে ঘৃণা করতাম, যৌবনে সেটাই হয়ে উঠল মধুর এক কাল্পনিক বন্ধুর নাম, যে বন্ধুর মতো আমি হতে চাইতাম। মার্কসকে কোনো এক অগ্রজ ভাই একবার ডেকেছিলেন- শেষ নবী। শিহরিত হয়েছিলাম। ইসলাম ধর্মানুসারীরা শেষ নবী বলে মুহম্মদকে মানেন। ধর্মবিশ্বাসের কথা এখানে আসছে না, আসছে জীবন-দর্শনের প্রসঙ্গ। যুগের যে নতুন মানুষটি নতুন কথা বলছে, অন্য মানুষকে তার নতুন তাত্ত্বিকতায় অভ্যস্ত করাতে চাইছে, তাকে অপরাপর মানুষ সবসময় বিশেষত্ব দিয়ে ঋণ শোধ করল। দৃষ্টিভঙ্গির এই অঞ্চলে দাঁড়িয়ে মার্কসকে শেষ নবী বলে ভাইটি তার মনের ভাবকে আমার মনে ঠিকভাবে বিম্বিত করতে পেরেছিলেন।

অবশ্য আমার শিহরণও একটু সহজেই জাগে। অনেকের মতো আয়াসপাথুরে মানুষ আমি হতে পারলাম না অনেক করে চেয়েও।

তো, আমার সেই মনপ্রিয় মতবাদের প্রথম প্রায়োগিক পুণ্যভূমি যে মা-রাশিয়ার শহর মস্কো আমার কাছে নিজের শহর হয়ে উঠেছিল। তার তুলনায় প্যারিস বার্লিন ভিয়েনাই হয়ে থাকল অচেনা শহর এবং আমার মন হয়ে উঠল তাদের অভিজ্ঞতার আকাঙ্ক্ষী।

এ কথা সে কথায় আমরা সুনীলের প্রসঙ্গে এসে পড়ি, কারণ তিনি একপ্রকার ব্রহ্মচারিই ছিলেন। তাকে খুঁজে পেতে গিয়ে হাঁটতে থাকি তারই বইয়ের পাতায় পাতায়। আর অনুভব করি, নানা দেশের সমাজদ্বন্দ্বকে স্পর্শ করছেন সুনীল। আক্রান্ত না হয়ে কেবল অনুভব করেছেন আর অনুভূতির কথা জানিয়েছেন।

এই অনাক্রান্ত এবং পরাক্রান্ত সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ঠিক সময়ে ঠিক জায়গায় থাকবেন ব’লে পৌঁছে গেলেন বার্লিন, যখন পুব দিক থেকে পশ্চিমের দেয়ালে অনবরত হাতুড়ির ঘা পড়ছে। ধনতান্ত্রিক বিশ্বে প্রবেশ করতে চাইছে সমাজতান্ত্রিক বিশে^র ব্যাকুল সব মানুষ। সময়কে হয়ত এগোতে গিয়েই পেছাতে হচ্ছিল সেদিন।

২০১২ সালের দিকে ঢাকার জাতীয় চিত্রশালায় এক রুশ আলোকচিত্রীর প্রদর্শনী ছিল। সেখানকার একটা ছবি খুব ভালো লেগেছিল আমার। এলোমেলো বিছানায় একজোড়া রুশ দম্পতি মুখোমুখি হয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। নারীর স্ফীত উদর বলে দিচ্ছে তিনি গর্ভবতি এবং শিশু ভূমিষ্ট হওয়ার দিনটিও খুব দূরে নয়। যখন ভাবছিলাম, পারিবারিক মাহাত্ম্যের বাইরে শিল্পী এখানে আর কী দেখাতে চাইছেন, তখন একপাশের লেখাটা চোখে পড়ল। সেখানে যা লেখা ছিল তা তো আজ ছয় বছর পর হুবহু মনে নেই। ভাবটাই মনে আছে কেবল। যেন লেখা ছিল- সোভিয়েত বিশ্বের শেষ প্রজন্মের দুই সন্তান ঘুমিয়ে আছে। আর পৃথিবীর আলো দেখার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে পরবর্তী যুগের প্রথম প্রজন্ম, সোভিয়েত ইউনিয়ন যার কাছে কেবলই ইতিহাস।

লেখাটায় একটা বিষণ্নতার আবহ যেন ছিল, অথবা আমিই তা কল্পনা করে নিয়েছিলাম। আলোকচিত্রীর নামটা মনে করতে পারছি না। খুব সম্ভব তিনি একজন নারী- যতদূর মনে পড়ছে।

‘ইতিহাসের স্বপ্নভঙ্গের’ শুরুতেই বার্লিন যাপন করেন সুনীল। ধনী পশ্চিম জার্মানির দাওয়ায় তখন গরিব আত্মীয় পূর্ব জার্মানি গিয়ে উঠেছে। তার মুখচোখের ভীত, হীনমন্য ভাবটা নিজেকেও পীড়া দিচ্ছে বলে একটা সাবেকি আদর্শবাদী অহমও ফুটিয়ে তুলে ওটাকে ব্যালেন্স করতে চাইছে।

সুনীল ভাঙা প্রাচির পেরিয়ে পশ্চিম থেকে পুবে গিয়ে দেখলেন কমিউনিস্ট পার্টির বিরাট মিছিল হচ্ছে। প্রাচির ভাঙার বিপক্ষে সে মিছিল। নিরাসক্ত চোখে দেখছে মানুষ। সিংহভাগের মনে আজ তাদের জন্যে অনুকূল কোনো স্পন্দন নেই।

তবু তো একটা মিছিল বেরিয়েছে সেখানে। আর রাশিয়ায়? ইয়ানাইয়েভের সেই দুর্বল ধোঁয়াটে অভ্যুত্থানে গর্বাচেভের পতনের পর ইয়েলিৎসিন নিজেও ছিলেন শঙ্কায়। হঠাৎ সেই শঙ্কা কাটিয়ে ইয়ানাইয়েভের এর অভ্যুত্থান অস্বীকার করে এসে যখন বললেন- আর নয়, তার কিছুক্ষণের মধ্যে লাখ লাখ লোক জমে গেল। জমে যে গেল তাকে কিন্তু আর ‘কী করে যেন’ বলে অসংজ্ঞায়িত রাখার উপায় নেই। যখন সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের সবচাইতে শক্তিমতি দুর্গের পতন এভাবে ঘটল, এতো সহজে, বিনা রক্তপাতে, তখন কোথাও একটা লোকও নাকি রুখে দাঁড়াল না। তার বেলা?

এর পেছনে হীনমন্যতা নাকি সন্তোষ- নিশ্চিত জানি না। মানুষের কোনো কাজকে কেবল একটা কোনো উদ্দেশের লেজে বেঁধে দেওয়া যায় না। হয়ত দুটোই লোকের মনে ভিন্ন অনুপাত রেখে কাজ করে থাকবে। শেষ কথা বলার তো আর অধিকার নেই যেহেতু আমি রাশিয়ায় ওই সময়টা যাপন করিনি। সুনীলও কোনো শেষ কথা বলেননি।

সেই ঘটনার পর তৃতীয় দশকের পায়ে এসে আমি আর রিশাদ তো খিলগাঁয়ের আলো আঁধারি ছড়ানো রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে সুনীলকেই মিমিক করছিলাম। বলছিলাম, বার্লিন দেয়ালের পশ্চিম অংশে গান, কবিতা, লেখা, আঁকা কত কত আবেগ লেপ্টে আছে। পুবের অংশে? কিছুই নেই। ঠিক উল্টোটাই কি হওয়ার কথা ছিল না? কথা তো কত কিছুই থাকে। এই পুবদিকের দেয়ালের কাছে যারা ছিল তাদের আর ঠিক মানুষ বলা যেত না। প্রশিক্ষিত খুনে। ওরা থাকলে কোনো শ্বাপদের দরকার হয় না। তবু শ্বাপদও ছিল। শেকলছাড়া হিং¯্র কুকুর তেরছা দৌড়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে কত পলাতক মানুষের ওপর। মানুষগুলো তো ওই দেয়ালের কাছেই তো ঘেঁষতে পারত না। ছবি আঁকবে, গান কবিতা লিখবে কারা? রাষ্ট্রের বড় বড় ছবি আঁকিয়ে, গান কবিতা লিখিয়েরাও তো গুম আর আত্মহত্যার তালিকা দীর্ঘ করে চলেছে।

কথার কথা বলছি, ঠিক এর উল্টোটাই কি হওয়ার কথা ছিল না দেয়ালের এপার ওপার?

লেনিনগ্রাদে হোটেলের লবিতে মধ্যবিত্ত ঘরের তরুণীরা জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যদি শরীর বিকিয়ে ক্ষুধার আধার জোটে এ আশায়। ইতিহাসের যে কোনো মোড়বদলের পর ওই সমস্ত সমাজদেশের লোকদের অবস্থা খানিক টালমাটাল থাকে, এটা অনিবার্য অস্বাভাবিকতা। কিন্তু এর ভেতর দিয়েও পূর্বাপর অনুমান করে নেওয়া যায়, সূত্র থাকে। সেই সূত্রটাই থেকেই মিলে গেল যে ভেতরটা কতখানি ফাঁকা হয়ে ছিল। এবং এ দৃশ্য সমাজতান্ত্রিক উত্থানপর্বের সেই সর্বজয়ী নগরী লেনিনগ্রাদের।

কেজিবি সদরদপ্তরের সামনে দিয়ে কেউ হেঁটে যাওয়ারও নাকি সাহস করতো না। উঠতে অবরোধ, বসতে অবরোধ, অবরোধ লেখায়, পড়ায়, দেখায়। কথার কথা বলছি- যদি উল্টোটা হতো?

স্তালিনের নির্দেশে গুলাগ বানিয়ে সমাজতন্ত্রের পাঁচ কোটি ‘শত্রুকে’ খতম করা হলো। পোল্যান্ডের সেনারা মিত্র শক্তির সম্মতিতে যৎসামান্য অস্ত্র হাতে জার্মানদের রুখে দাঁড়াল। মিত্র শক্তির ভেতরকার বোঝাপড়ার কথা তো তাদের তখনও অজানা। পোল্যান্ডের মাটি সোভিয়েত ইউনিয়ন পাবে কি পাবে না তার হিল্লে হয়নি বলে, জার্মানদের রুখে দাঁড়ানো অংশটি পোলীয় সমাজতান্ত্রিক ফ্রণ্ট না হয়ে জাতীয়তাবাদী ‘হোম আর্মি’ বলে সহায়তার আশ্বাসে বিশ্বাস রেখে যুদ্ধ করতে আসা জ্যান্ত মানুষগুলোর কর্তিত লাশে রূপান্তরিত হয়ে যাওয়াটা ভিস্তুলা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে সোভিয়েত লাল ফৌজ কেবল দেখে গেল। এক পাও এগোল না। স্তালিনের নির্দেশ নেই। এ আদর্শের জন্যে পাভেল, বুনচুক, অক্সানারা প্রাণ দিয়েছে আমাকে বিশ্বাস করতে হবে?

রুমানিয়ার কোনো ঘরে অতিথি এলে নজরদারি, বিদেশি অতিথি এলে তো পুলিশি হয়রানি শুরু হয়ে যেত। কোনো নিকোলাই চাইসেস্কুর নামে কিছু বলা হলেই দেয়াল ভেঙে প্রবেশ করছে রক্ষীবাহিনী, মাটি ফুঁড়ে উদয় হচ্ছে রক্ষীবাহিনী- এসব কোনো কল্পছবি নয়।

একদিকে কেবল- অবরোধ, জনে জনে নজরদারি, সরকারি ভাঁড়ারের সামনে রেশনের জন্য লম্বা লাইন এবং শূন্য ভাঁড়ার; জন্ম নিচ্ছে ক্ষুধার্তের বিচিত্র কৌতুক; ঘড়ির দোকানে সাবান, তেল কিনতে জুতো, ডলার শপের কাচের আড়ালে মুখক ভেঙচে চলেছে কী আশ্চর্য পরিহাস; আর অপরদিকে কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগে চলছে বিচিত্র সমরাস্ত্রের গবেষণা, প্রদর্শনীর হাস্যকর প্রতিযোগিতার সেই শীতলযুদ্ধ, ফলাফল- শূন্য ট্যাঁক, ঋণ এবং ঋণের দায় মেটাতে দেশের মানুষের গ্রাস আটকে শস্যের উৎপাদিত পণ্যের বিদেশগমন।

ষাট গম্বুজ মসজিদ বেড়িয়ে যাওয়া টয়েনবি বলেছিলেন, সমাজতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শত্রু হবে জাতীয়তাবাদ; কেউ কানে তোলেনি। রাশিয়া চীনের সীমান্তে বাঁধল সংঘাত। সোভিয়েত রুশি ফৌজের দিকে এতো ঘৃণা নিয়ে তাকাবে হাঙ্গেরি টু জর্জিয়া- ওরা নিজেরাও কি কখনও ভেবেছিল? ইউক্রেন ভেবেছিল? জর্জিয়ার এক তরুণ ফিরে তাকিয়ে সুনীলকে বলছে- আপনারা বৃটিশদের অধীনে কাটিয়েছিলে দু’শ বছর, বলব- তবু ভালো ছিলেন, রুশি পশুদের অধীনে তো আর কাটাতে হয়নি! হায়, মহান রুশ সাহিত্যিকেরা কে কোথায়? কাফকা পড়তে দেওয়া হলো না- প্রশ্নটা জাতীয়তার এবং কুন্দেরা পরবাসী। তারও আগে? রবীন্দ্রনাথের রাশিয়ার চিঠির রুশবান্ধব অনেক প্রশংসা ছাপা হলো না ইংরেজিতে, সেটা জানতাম। কিন্তু রুশবান্ধব সমালোচনাগুলোও যে ছাপল না সোভিয়েত ইউনিয়ন তা তো জানতেও পারিনি। পাতার পর পাতা কাটা ‘রাশিয়ার চিঠি’ সোভিয়েত পিপলের হাতে হাতে পৌঁছেছে, রবীন্দ্রনাথ ওদের খুব প্রিয় কিনা! রচনাবলীর পাঁচশ কপি তো মুহূর্তে শেষ হয়ে যায়।

কেউ কিছু দেখতে পারে না। কেউ কিছু জানতে পারবে না, জানাতেও নয়।

হেগেল তালি দিয়ে বলছেন- এমনই তো হবে, বলেছিলাম।

মার্কস নিশ্চুপ। যেন পাথর হয়ে গেছেন।

এঙ্গেলস কাঁদছেন।

মাও? বন্দুকের নলটা তার যথেষ্ট পরিষ্কার। হেসে বললেন, তাকিয়ে দেখো আমার দেশ।

লেনিন? পলাতক।

ট্রটস্কি? চোখ মোছার রুমালটা তাঁর রক্তে ভেজা।

কাস্ত্রো? বলছেন, ইতিহাসের গতি বিচিত্র। নীরবতাই উত্তম জিঘাংসা।

বেশ তো। সুনীল ঘুরে এসে সব বললেন, শুনে আমরা পথে পথে হেঁটে বিশ্ব উদ্ধারকরা সব ভাবনার চাষ করছি মাথায় আর পেছন থেকে কিছু মটরসাইকেল কেবলই আমাদের পাশ কাটিয়ে সামনে গিয়ে ফিরে আসছে, একবার, দুবার, বারবার। সাসপেনশন! ওদের ঝুলন্ত হাতে ওটা কী- তা নিয়ে আমাদের কোনো কৌতূহল থাকা উচিৎ নয়।

সুনীল তো প্রথমে জার্মানি, জার্মানি থেকে হাঙ্গেরি, সেখান থেকে রুমানিয়া, তারপর পোল্যান্ড হয়ে দ্বিতীয়বার রাশিয়ায় এলেন; প্রথমবার এসেছিলেন সোভিয়েত আমল চলাকালে তাই দ্বিতীয়বারের আসাটা খুবই গুরুত্ববহ ছিল। এরপরও বলব- ক’জনের সঙ্গেই বা আর আলাপ হয়েছে, ক’টা ঘটনাই বা গিয়েছে জানা। না, অবিশ্বাসের যুক্তি দাঁড় করাতে এ কথা বলছি না আমি। সোভিয়েত ব্যবস্থা থেকে বার্লিনের দেয়াল যখন একেবারেই লৌকিক দীর্ঘশ্বাসের ঝাপটায় ভেঙে পড়ে তখন অবিশ্বাসের মুখ কিংবা যুক্তি কোনোটাই আমার কাছে নেই। বলতে চাইছি- এই অল্প ক’জনার ভর কিংবা ভারই তো বইতে পারছি না, সইতে পারছি না। তাহলে আরো আরো তথ্য এলে কী করে সামলে নিতাম?

এমন কেন হলো? স্পার্টাকাস, ও স্পার্টাকাস। কেন আমরা হেরে গেলাম?

যে সমাজব্যবস্থাকে পেতে মুষ্টিমেয় ধনিক ছাড়া প্রত্যেক শ্রেণি-পেশার কিশোর, তরুণ, বৃদ্ধ; কিশোরি, তরুণী, বৃদ্ধা; লেখক-শিল্পী বুদ্ধিজীবী, সামন্ত সৈনিকরা প্রাণ দিয়েছিলেন, সেই সমাজব্যবস্থার ব্যবস্থাপক নয় কেবল, বরং গোটা ব্যবস্থা থেকেই মুক্তি পেতে কেন ফের তাদেরকেই সংগ্রামী হয়ে উঠতে হয়েছিল? এই প্রতারিত মানুষগুলো বঞ্চনার পাথরে কপাল ঘষে অধিকারের জ্বিন বের করে এনেছিল কিন্তু কৈশোরে-তারুণ্যে গোর্কি শলোখভ অস্ত্রোভস্কির শিখিয়ে যাওয়া অধিকার আদায়ের লড়াই তো যেন আমার সঙ্গে অন্য সুরে কথা বলেছিল! পাতায় পাতায় তখন মানুষের যে স্বর শুনেছিলাম তা কি মিথ্যে ছিল? না, সেই স্বর মিথ্যে নয়। এই স্বর তো ধ্রুব। বরং যে দেয়ালে প্রতিফলিত হয়ে তা ফিরে আসে তা-ই বরং আলাদা।

৩.

সুনীলের জাদুকরী লেখার পাখায় চড়ে ব’সে রাশিয়া জার্মানিসহ পূর্ব ইউরোপের রাজপথ থেকে অলিগলি, উঠোন থেকে প্রান্তর ঘুরে আসার পর আমি আবার বঙ্গের মর্ত্যে নেমে এলাম।

সুনীল প্রশ্ন রেখেছিলেন- সমাজবিবর্তনের স্বাভাবিক ধারা মেনেই তো গণতন্ত্রের পর সমাজতন্ত্রেরই আসার কথা ছিল। কেন তা হলো না?

প্রসঙ্গে ঢোকার পথ করে দিতে আরো উদার হয়ে যদি বলি, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় ধনতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থার পরবর্তী ধাপে তো সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা আসার কথা ছিল। এসেছিল যখন, সমাজবিবর্তনের ধারা মেনেই তা এসেছে মনে করাই তো স্বাভাবিক। বিবর্তন কি তবে উল্টোপথে হাঁটল? সমাজতন্ত্র এসেও তবে ফিরে গেল কেন। হিসেবের ভুলটা ছিল কোথায়।

সুনীলের আক্ষেপের সঙ্গে আমার আক্ষেপ সমসুর হয়ে উঠল। কিন্তু জন্ম দিলো পৃথক কিছু মনকথার। কারণ ব্যক্তিগত বোঝাপড়ার স্বার্থে আমি আরো বেশ কিছু বিষয়ের আশ্রয় নিয়েছি।

পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো তো সুনীল বর্ণিত স্তর উৎরে আজ আরো বেশ খানিকটা পথ সামনে এগিয়েছে। তাঁকে নিয়ে যদি আজকের রাশিয়া, রুমানিয়া, পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, জার্মানির পূর্ব অংশ আবার ঘুরে আসা যেত তো একটা তুলনামূলক দৃশ্যজোড় তিনি নিশ্চয়ই আমাদের হাতে তুলে দিতে পারতেন। কিন্তু সেই সৌভাগ্য আমাদের ছেড়েছে। অবশ্য ইউরোপ সমাজবিবর্তনের খুঁতটাকে চিহ্নিত করতে পেরেই হয়ত সম্ভাব্য সৌভাগ্যের দিকে এগোচ্ছে। এটা অনুমান, আমি নিশ্চিত নই।

এটুকু নিশ্চিত- ওরা এখন পুঁজি জড়ো করছে।

শ্রীমান আহমাদ মোস্তফা কামালের উপন্যাস ‘নিরুদ্দেশ যাত্রার’ সজীব তার বিপ্লবাকাঙ্ক্ষী বন্ধু অপুর সঙ্গে আলাপে বলে উঠল, মানুষ দারিদ্র ভাগ করে নিতে চায় না। সে সম্পদের ভাগবাটোয়ারা চায়। সেই সম্পদ কোথায়। তাকে আগে জ’ড়ো করতে হবে। সমাজতন্ত্রের আগমনের আগে চাই পুঁজির বিকাশ। তা যখন হলো না, প্রবণতার স্বাভাবিকতা মেনে দারিদ্র ভাগের ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়বে। পড়েছেও।

সাবেক সোভিয়েতে অনেক দুঃখী কৌতুকীর একটি এমন- একদিন আমেরিকাই হবে সমাজতান্ত্রিক দেশ। আর রাশিয়া হবে ঘোর ধনতান্ত্রিক।

এবার ছোট্ট দুটো যাপনের কথা হোক যেগুলো এই কৌতুকের সঙ্গে অপ্রাসঙ্গিক নয়।

আমার পক্ষে যাচাইয়ের সুযোগ না হলেও শ্রীমান যতীন সরকারের একাধিক লেখায় পড়েছি- যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সময়ের তরুণ তরুণীদের ভেতর সমাজবাদ ক্রমশ প্রিয় হয়ে উঠছে। বেশ ক’বছর আগের কথা। এক অন্তর্জালিক সংবাদপত্রের আন্তর্জাতিক পাতাকে তুলে ধরতে আমাদের প্রিয় কল্লোল দা- শ্রীমান কল্লোল কর্মকারের নেতৃত্বে আমিসহ আরো বেশ ক’জন কম খাটিনি। তখন রাশিয়ার নতুন অলিগার্কীয় সমাজের ধনপালোয়ানদের ক্ষমতালেখ এঁকে এঁকে দুজনে কম কূটতর্ক করিনি, মনে আছে। যৎসামান্য পর্যবেক্ষণে অনুধাবন করেছি, রাজনীতি তথা এলিটিক্সের মতি বরাবরই কৌতুকের পথে ধাবমান।

রাখালদাস বন্দোপাধ্যায়ের লেখা ‘বাঙ্গালার ইতিহাসে’ পড়েছিলাম উপমহাদেশে যখন প্রস্তুর যুগ চলছে, মধ্য ইউরোপে তখন নব্য প্রস্তর যুগ। অর্থাৎ প্রজাতির ভিন্নতার মতো মানবসভ্যতার গতি প্রকৃতিও প্রমাণ করে একইসময়ে বিবর্তনের পৃথক অনেক ধারা চলমান। এটা চিরায়ত বাস্তবতা। ভারসাম্য বজায় রাখতে গিয়ে কাল এর-ওর পাতে কম বেশি ক’রে আসলে যৌক্তিক ভাতই বেটে চলেছে। অনুধাবন কঠিন হলেও ইতিহাসের বাঁকবদল থেকে আসা অনুসিদ্ধান্তগুলো তার পক্ষেই কথা বলে। পূর্ব ইউরোপ আর দূর প্রাচ্য-লাতিন আমেরিকার অনুঘটকগুলো তাই এক নয়।

বাংলাদেশের জন্মক্ষণেও সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা আনাড়ি হাতে চালু হয়েছিল। আর সমাজতান্ত্রিক যে কোনো ব্যবস্থা স্বৈরাচারের পক্ষে প্রতিকূল।

তাই হয় ব্যবস্থাপকদের চাপ সইতে না পেরে বদলে যেতে হয়, নয় রক্ত ও ক্ষমতার লোলুপ পা-ারা ব্যবস্থাটিকে ভেঙে ফেলে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দ্বিতীয়টি ঘটেছে।

ছোটবেলায় মায়ের মুখে শুনেছি, স্বাধীনতার পরপর একটা কথা শহরতলী-গ্রামে গঞ্জের লোকমুখে তারা বলতে শুনেছেন- ‘এক তরকারি এক ভাত, তার নাম হইলো মুজিববাদ।’ যে প্রেক্ষাপটে এ বাক্যের জন্ম হয়েছিল; ‘আমরা সবাই দারিদ্র ভাগ করে নেবো’ এ বাক্যও সদ্য স্বাধীন দেশটি সেই অভিন্ন বাসনাকাতর মানসপট উন্মোচন করে। এবং তা প্রথমটির চেয়ে আলাদা কি?

ইতিহাসের এই প্রেক্ষাপটের বিষয়টা বেশ প্রহেলিকাময়। উত্তরসূরীদের চোখে তা প্রায়ই কুৎঝটিকায় আবৃত এক দূরের অবয়ব। যাকে নিয়ে কূট কিংবা কটুকথা বলে সহজেই দুটো হাততালি কুড়োনো যায় কারণ কালের ভ্রমণ সেরে ওই অবয়বের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে কুয়াশা সরিয়ে জলছলছল চোখের দিকে তাকাবে- বক্তা এবং শ্রোতা উভয়ের জন্যেই তা সমান কঠিন। কিন্তু যেহেতু ওই অবয়বটির উপস্থিতি অস্বীকারও করা যায় না, তাই পরের মুখের ঝাল খেয়ে স্বাদ প্রচার করা গেলেও ভাবনার জগতে আভিজাত্যের চিবুক খানিকটা উঁচু হয়। বক্তার বিপরীতে শ্রোতার হাততালিটা তারই কৃতজ্ঞতাবোধ থেকে আসে।

কালের রেখা ধরে সেই রহস্যময় অবয়বের ভ্রমণের ওই সাধ্য সামর্থ সবার কোথায়। সাধ্য কিছু কিছু করে কুড়িয়ে, জমিয়ে, পথ দেওয়ার শক্তি যাঁরা দিতে পারেন, তাঁদের একজনার দরজায় কড়া নাড়তে গিয়ে হঠাৎ মনে হলো- বিবর্তনের শর্ত কিন্তু লঙ্ঘিত হয়নি। কাল একটা নিরীক্ষা চালিয়েছে, প্রকৃতি যেমন নতুন প্রজাতির ক্ষেত্রে চালায়। ডারউইন তো বলেই গেছেন, যোগ্যতমের লড়াইয়ে শক্তিমত্তা কোনো মাপকাঠি নয়। পরিবেশ যার কাছে অনুকূল, শক্তিমানকেও সে পর্যদুস্ত করতে পারে। মানুষের এতো বড় মগজটা হয়েছে পরিবেশের আনুকূল্য তৈরির পক্ষে হয়েছে স্বয়ং অনুকূল। তাই কী ভূ-প্রকৃতি কী মানবসমাজ, দুটির ক্ষেত্রেই বিবর্তনের অনেকগুলো শর্ত আজ মানুষের মুখ চেয়ে আছে। এটা কিন্তু কোনো অহঙ্কারের বিষয় নয়। বরং এটা ঘুম কেড়ে নেওয়ার মতো এক দায়। সে কারণেই বুঝি বইটি লিখিত হওয়ার সময়ের সেই ঘুমহীন সুনীলের কাছে মনে হয়েছিল ইতিহাসের স্বপ্নভঙ্গ ঘটেছে। আসলে কি তাই? বরং এমনটাই হতে পারে, কোনো এক দক্ষ ক্রীড়াবিদ শক্তিসংগ্রহের জন্যেই নিজেকে খানিক পিছিয়ে নিয়েছেন।

আমার মন বরাবরই আশাবাদী। আশাবাদীর সঙ্গে প্রকৃতি যেমন আচরণই করুক না কেন, সে যদি বৈশিষ্ট্য ধরে রাখে, তো কেবল এক আশাবাদই খুঁজে পায়। যা সত্য তা হলো- এক আশার রথ ছাড়া অন্য কিছু আজ পর্যন্ত মানুষকে গন্তব্যে পৌঁছে দেয়নি।

তবে প্রকৃতির ওই সমস্ত খারাপ আচরণের ক্লেদ শরীর থেকে ঝরিয়ে দিতে হয়। না পারলে চলক শরীরটাই এমন ভারী হয়ে উঠবে যে চলন বলন সব বন্ধ হয়ে যাবে। ক্লেদ ঝরাতে চাই আনন্দে স্নান। মানুষ ভাষিক জীব। আনন্দের জন্যে তাই তাকে ভাষার আশ্রয় নিতে হয়। মানুষের ভাষা কিন্তু বাংলা বা ইংরেজি নয়। এগুলো হলো সাদা কথায় যা মুখের ভাষা তাকে ব্যক্ত করার শিল্পিত উপায় মাত্র। মানুষের ভাষা হলো- শিল্প। মুখের ভাষার প্রকাশ যেসব বর্ণমালায় ঘটে সেগুলোও তাই শিল্পের মতোই বিমূর্ত। মানুষ নিজ দায়ে ঠেকে থেকে তাতে অর্থ পশে নিয়েছে।

এখানটাতেই সকল সংকট উৎরে ভাষায় বাঁচার আনন্দসূত্র লুকোন। ওই সূত্রের অনেক আধারের একজন সুনীল- আমাকে বলতেই হবে। সুনীলে পাওয়া সময়ে যে বোঝাপড়ায় আমি, আমরা এসেছিলাম তা বজায় থাকবে বলেই মনে হয়।

হামিম কামাল। লেখক। জন্ম- ১৯৮৭ সালের ৯ অগাস্ট, ঢাকায়। আহসানুল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তড়িৎ প্রকৌশলে স্নাতক। প্রকাশিত গ্রন্থ- 'জঠর' (২০১৬), 'কারখানার বাঁশি' (২০১৮)।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..