আমাদের নতিপোতা গ্রামের ইতিহাস

হাবিব আনিসুর রহমান
গল্প
Bengali
আমাদের নতিপোতা গ্রামের ইতিহাস

সে সময় একবার ভয়ার্ত চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে অঝোর ধারায় কাঁদে নতিপোতা গ্রামের মানুষগুলো। রোদ ঝলসানো শুকনো উঠোনে অর্ধউলঙ্গ মানুষের দল ঘড়ার পর ঘড়া উপুড় করে জল ঢালে। সেই জলে নারী-পুরুষের দল গড়াগড়ি খায়। নদী থেকে আনা জল দিয়ে ভিজিয়ে দেয় সবার শরীর। একজন আর একজনের শরীরে কাদার ক্ষীর ছুড়ে দেয়। সমস্বরে জল ভিক্ষা চায় জগতপিতা ঈশ্বরের কাছে। আজও নতিপোতা গ্রামের মানুষগুলো আকাশে বাতাসে সেই সমবেত সঙ্গীতধ্বনি শুনতে পায়। এক বাড়ির উঠোন থেকে আর এক বাড়ির উঠোনে উদ্বাহু নৃত্য আর সেই সমবেত প্রার্থনা সঙ্গীত-

ওই মেঘেতে জল আচে
জল দিতে হবে হে,
আমরা চাষী জমি চষি
জল দিতে হবে হে,
জল না দিলে বাঁচবো না হে
জল দিতে হবে হে,
ওই মেঘেতে জল আচে…

সেই কাদাক্ষীরের মাধ্যমে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা আর দাবি জানায় তার সৃষ্ট মানুষ। জল দরকার জল। খরার আগুনে ফসল পুড়ে যাবার আলামত। সেই প্রার্থনার দুদিন পর এক বিকেলে আকাশে ধূসর কালো মেঘের কু-লি ভেসে এলো কোথা থেকে। নতিপোতার সমস্ত ভীত সন্ত্রস্ত মানুষগুলো অবাক বিস্ময়ে চেয়ে থাকে সেদিকে। ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসে বিষণ্ন দুঃখী মানুষের দল। ঈশ্বর, হে ঈশ্বর, জগতপিতা, এই মেঘ উড়িয়ে নিও না। এই মেঘের জল দিয়ে আমাদের সকল শস্যক্ষেত নদী পুকুর ঘরবাড়ি জলাশয় ভরিয়ে দাও। ঈশ্বর, হে ঈশ্বর! মানুষের কোনো কথা কি শুনতে পায় ঈশ্বর? কেউ বলতে পারেনা। তবুও বড়ো বড়ো বৃষ্টির ফোঁটা যখন শুকনো মাটিতে বিঁধে যেতে লাগলো তখন মানুষগুলো আনন্দে আত্মহারা। ছেলে বুড়ো-শিশু-যুবা-নারী সবাই সেই বৃষ্টির জলে স্নাত হয়। সবার মুখেই তৃপ্তির চিহ্ন, এ যেন এক ধরনের বিজয়। বয়োবৃদ্ধ যোসেফ হালদার লাঠি হাতে সবার মাঝে এসে গর্বভরে বলে- কাদাক্ষীর না কৈল্লি কি এই জল নাইমতু, জগতপিতার কাছে কাঁদাকাটি কৈল্লি তিনিকি মানুষকে ফেরান রে বেকুবের দল। সে দু’হাত দু’পাশে প্রসারিত করে বলে- দেক দেক কতো জল। তার দিকে তাকিয়ে সবাই হাসে, পাগলের মতো ছোটাছুটি করে।

সেবার সেই বৃষ্টিতে নতিপোতার মানুষগুলো প্রচ- খরার হাত থেকে রেহাই পেয়েছিলো। তারা জানতো খরা মানে ফসল পুড়ে যাওয়া। ফসল পুড়ে যাওয়া মানে খাবারের আকাল, ভাতের আকাল। না খেতে পেয়ে মরে যাওয়। তবে মরে যাবার আগে একবার যেতে হতো ঐ সুদখোর মহাজনদের কাছে। জমি বন্ধক দিয়ে ধান চাল কেনার টাকা আনতে। যোসেফ হালদারের ছেলে পিতর হালদার গির্জার প্রাচীরের ধার ঘেঁষে হাঁটছিলো আর উথার পাথাল ভাবছিলো, সেই পুরেনো দিনের কথা।

মেহেরপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে সোজা দক্ষিণে। কাঁচা একটা রাস্তা। প্যাচপ্যাচে কাদা। গরুর গাড়ি, সাইকেল, পায়ে হাঁটা মানুষ। সোজা দক্ষিণে ন’মাইল দূরত্ব। দেখবেন আকাশে মেঘ আর বাতাস লুটোপুটি খায়। যাচ্ছেন দক্ষিণে। পাশে চিকন ভৈরব। কালো পানির শরীর। হু হু বাতাস, দুপাশে শুধুই সবুজ রং। একটা ছোট্ট পাতা। এতো রং প্রজাপতির পাখায় তাও পাবেন। এই রাস্তা ধরেই আমাদের নতিপোতা। যেখানে আছে পিতর হালদার। আছে তার স্ত্রী কন্যা পুত্র। আর চাষাভুষো সব মানুষ। একটু ইতিহাস জানবেন, শুনবেন। নিম্নবর্গীয় মানুষ। ক্ষতি কী? অচ্ছুৎ নয় এরা।

সময়টা? ধরুন বর্তমান- ঊনিশশো চুয়াত্তর খৃস্টাব্দ।

নাম? পিটার হালদার তবে লোকে বরে পিতর। বয়স? দুই কুড়ি চার। চাষযোগ্য জমির পরিমাণ? পৈত্রিকসূত্রে পাওয়া দশকাঠা। আর? ঐ ভিটে-মাটি। এসবে সংসার চলে? না। তাহলে? জোতদারদের বাড়ি মুনিষ খাটি। পুঁজি? এই শক্ত শরীরটা। তুমি কি জানো এ অঞ্চলে ফসল ভালো হয় না? আজ্ঞে তাও জানি। তার ওপর আরও খবর আছে জানো? আজ্ঞে জানি দূর দেশে বন্যা হয়েচে। চালের দাম? বাড়চে, বাড়বে। কাজকর্ম আছে? শাওন মাস, কাজ নেই, কে দেবে কাজ?

তবুও পিতর হালদারকে দেখা যায় জোতদার মাইকেল বিশ্বাসের বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে সে হাঁক ডাক দেয়- জ্যাঠা বাড়ি আচো গো? ও জ্যাঠা। বৃদ্ধ মাইকেল বিশ্বাস তার টিনের আটচালা ঘর থেকে বেরিয়ে উঠোনে এসে মুখোমুখি হয় পিতর হালদারের। তার হাতে হুঁকো। মাইকেল বিশ্বাস বলে-

‘ও পিতর, কি চাস বাবা?’

‘জ্যাঠা, তুমার একেনেতো গায়ে গতরে খাঁটি, কিচু কাজ দাও জ্যাঠা?’

মাইকেল বিশ্বাস ঘুরে দাঁড়ায়। উঠোন থেকে ঘরের উঁচু বারান্দায় গিয়ে কাঠের চেয়ারটাতে বসে। হুঁকোয় টান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে বলে, ‘শাওন মাস কিসের কাজ দবো বল্, কাজতো নেই, তুই অন্য কুতাও দেক্।

‘জ্যাঠা কি সব শুনচি, বন্যা হয়িচি বলে উত্তুরে, চালের দাম বলে আরও বাড়বি!’

‘হ্যাঁ, লোকের মুকে মুকে এসব শুনচি, ঈশ্বর জানে কি হবে।’

পিতরের শরীরে মোষের মতো বল। নতিপোতা গ্রমে কাজের সময়ে তার মতো মানুষের সদর সবচেয়ে বেশি। সবাই তাকে চায়। তার চাহিদা অন্য মুনিষদের চেয়ে বেশি। কিন্তু তাতে কী? শাওন মাস কাজের বড্ড অভাব। ঘরে বউ, এক মেয়ে আর ছোট দুই ছেলে। পাঁচখানা পেট। যে ধান ঘরে আছে তা খুব জোর একমাস যাবে। তখন সামনের ফসল না ওঠা পর্যন্ত উপবাসী হওয়া যাবে না। সেজন্যেই সে কাজ খুঁজে বেড়ায় লোকের দুয়োরে। বড়ো আশা করে এসেছিল এখানে। পিতর ফিরে যাচ্ছিলো। বাড়ির ভেতর থেকে মাইকেল গিন্নী বেরিয়ে এসে বললো- শোন্ পিতর, পুকুরের ওপাড়ের বেড়াটা ভুতোনদের গরুতে ভেইঙি শেষ করিচে, তুই কাল ভোরে এইসি ঝাড় থেইকি বাঁশ কেইটি বেড়া বেঁইদি দিবি, লোকের গরু-ছাগলে পুকুর পাড় নষ্ট করচি। পিতরের কাছে মাইকেল গিন্নীর কথাগুলো অমৃতের সমান মনে হলো। সে বশংবদ মানব সন্তানের মতো হাত দুটো জোড় করে বলে- ‘হবে, হবে, জেঠিমা কাল ভোরে আমি চলি আসবু, একুন তবে যাই।’

পরদিন ভোরবেলা পিতর তার ধারালো দা হাতে নিয়ে মাইকেল বিশ্বাসের বাড়ির দিকে হেঁটে যায়। বাঁশঝাড়টা পুকুরের একটু দূরে পশ্চিমে। পিতর সেদিকে হাঁটে। ওকে দেখে ঝটপট উঠে দাঁড়ায় বাঁশঝাড়ের নিচে বসে থাকা মা-মেয়েরা। ওরা ওখানে পায়খানা করতে বসেছে। বড্ড লজ্জা লাগে পিতরের। নতিপোতা গ্রামে দু’একঘর শিক্ষিত মানুষ ছাড়া কারো বাড়িতে পায়খানা নেই। সবাই মাঠের ভেতর বাঁশঝাড়ের নিচে পায়খানা করে। পিতর ওর দাটা মাথার ওপর তুলে ধরে একটু দূরে সরে গিয়ে একটা বিড়ি ধরায়। ওদেরকে বুঝিয়ে দেয় সে বাঁশ কাটবে, কাজ করবে।

বাঁশ কেটে পুকুরের পাড়ে এসে কাজে লেগে যায় পিতর। মাইকেল বিশ্বাস আর তার গিন্নী জানে পিতর কখনো কাজে ফাঁকি দেবে না। তার এই সততা আর গায়ের জোর এসব কারণে এ বাড়িতেই ও কাজ পায় বেশি। দুপুর বেলা মলিনার হাতে সরষের তেল আর পেঁয়াজ দিয়ে মাখা মুড়ি আর বদনাতে খাবার জল পাঠিয়ে দেয় মাইকেল গিন্নী। হাত মুখ ধুয়ে মুড়ি খেতে খেতে মলিনার সাথে একটু সুখ-দুঃখের গল্প করে পিতর। মলিনার স্বামী বেঁচে নেই, বিধবা। সে মাইকেল বিশ্বাসের বাড়ির বাঁধা কাজের লোক। পেটেভাতে খাটে, বছরে বেতন দশ টাকা। মলিনার একটা দশ বছরের ছেলে আছে। সে সিজার মণ্ডলের বড়িতে পেটেভাতে রাখালের কাজ করে, বেতন নেই। মলিনা বলে- ‘বুজলি দাদা, আইজ কদিন ধরি শুনচি দেশে আকাল হতি পারে।’ পিতর মুড়ি চিবোতে চিবোতে উত্তর দেয়- ‘হ্যাঁগো দিদি, আমিও তাই শুনচি, মনডা ভালো নেই। থাকবি কি কইরি, ঘরে যেটুকু ধান আচে তা চলবি আর কটা দিন।’

সন্ধ্যের আগে গামছা পরে পুকুরে স্নান করে পিতর। দুটো ডুব দিয়ে গা-হাত-পা কচলায়। বেড়া বাঁধা বড্ড শক্ত কাজ। বাঁশের কঞ্চিতে দু’জায়গাতে কেটে গেছে। কাজ শেষ করতে পারেনি। আরও দু’দিন লেগে যাবে। পুকুর পাড়ে উঠে গামছার ওপর ওর কাপড়টা জড়িয়ে দেয়। তারপর গামছা বের করে পানিটা চিপে ওঠা দিয়ে শরীর মোছে। মাইকেল বিশ্বাসের উঠোনে গিয়ে বসে। কলার পাতায় ওকে ভাত তুলে দেয় মলিনা। আউশের ঢেঁকি ছাঁটা চালের লাল গরম ভাপ ওঠা ভাত, একটু লবণ, বেগুনের চচ্চড়ি আর কলাইয়ের ডাল দিয়ে যত্ন করে ভাত খায় পিতর। হাত ধুয়ে কলার পাতায় থাকা অবশিষ্ট ভাতটা গামছায় জড়িয়ে নেয়। মাইকেল গিন্নী ওকে কাঠাতে ধান মেপে দেয়। ধান আর কলার পাতায় বাঁধা ভাত নিয়ে দ্রুত বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকে পিতর।

ডেভিড সরকারের দোকানের পাশে যে বিরাট বাঁশের মাচাটা আছে,  সন্ধ্যেবেলা ওখানে গল্পে মশগুল থাকে নতিপোতার মানুষেরা। ওখানেই দেশের সর্বশেষ খবরটা পাওয়া যায়। মাঝে মাঝে সিজার মণ্ডল ওখানে রেডিও আনে। খবর শোনায়। ডেভিডের বাবা আন্দ্রিয় সরকার। সেই বৃটিশ আমলের আট ক্লাস পাশ করা লোক। পৃথিবীর তাবৎ সংবাদ আর জ্ঞান আছে ওর ভেতর। সেই সর্বশেষ খবরের ব্যাখ্যা শোনায় মাচার শ্রোতাদের। মাচার পাশ দিয়ে যেতে যেতে দাঁড়িয়ে পড়ে পিতর হালদার। ও গরিব মুনিষ খাটা লোক, মাচার ওপর বসার অধিকার ওর নেই। একপাশে দাঁড়িয়ে ও গল্প শোনে। দেশের হালচাল বোঝার চেষ্টা করে। আন্দ্রিয় সরকার বলে চলেছে- ‘বুঝলি বাপু, আমার বয়েস তকুন ঐ ধরো তিরিশ বচর হবে, যুদ্ধ বাঁধলু জাপান জার্মানদের সাতে ঐ বিটিশদের। যুদ্ধ চলচিতো চলচি, থামার কুনু নামগন্দ নেই, শালার ঐ হিটলার, সেকি যাতা লোক, বিটশদের একেবারে পাগল কইরি দিলু, বুজলি বাপু, ঐ জাপানিরা একদম ঘরের কাচে চইলি আসলু, এই বার্মায়। ইংরেজ সৈনু সব চাল ডাল কিনি নিইলু ওই বাজার থেইকি। তারপর মাটির তলায় পুঁতি রাখলু। ওদের সৈনুরা খাবে, আর লড়াই করবি ঐ জাপানেিদর সাতে, বুজলি বাপু, তারপর যা হবার তাই হলু। শুরু হয়ি গেল আকাল। সেই তেরশ পঞ্চাশ সাল’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো আন্দ্রিয় সরকার। তারপর আবার শুরু করে ‘বোজো, আইজ থেইকি সেই একত্রিশ বচর আগে। ওদিকি জাপান জার্মান বিটিশ যুদ্ধ করি মরে আর বাংলার মানুষ মরে ভাতে, খেতি না পেয়ি মরি যায়, বুজলি বাপুরা, একমুটু ভাতের জন্যি হাহাকার, রাস্তাঘাটে গোরা সৈনুরা মেয়িছেলি নিয়ি ফুত্তি করে। সারাদেশে দুর্ভিক্ক, মহামারী। নিচে মানুষ মরে আর ওপরে শকুন ওড়ে। লাশ শিয়াল কুকুরে খায়। কে একজন প্রশ্ন করে ‘তুমি যে আকালের কতা বলচু, তারও পিরায় দুশো বচর আগে নকি আরো বড়ো আকাল হয়িছিলু?’ আন্দ্রিয় সরকার নড়ে চড়ে বসে বলে- ‘শুনবা সেসব দুঃখীর কতা, শোনো  শুনবা?’ প্রশ্নকর্তা নিজেকে গৌরবান্বিত মনে করে, সে বলে ‘অবশ্যই শুনবু, তুমি সব খুইলি বলো।’ আন্দ্রিয় সরকার গলা পরিষ্কার করে খুক খুক করে কেশে নেয়, তারপর শুরু করে- ‘এসব সব বইয়ি পড়া, বুজলি বাপুরা, বুজলি। ঐ ইংরেজ কোম্পানী, বেশি দূর না একেন থেকি মাত্র বিশ কোরোশ হবে, ঐ মুর্শিদাবাদ, বাংলা সাল এগারশো ছিয়াত্তুর বুজলি বাপুরা পরপর দু’বচর খরা গেল, মটি ফেটি সব চৌচির কুতাও একফুটা জল নেই, সব হাহাকার, ফসল হবে কি কইরি, ঘরে খাবার নেই অথচ কোম্পানীর নায়েব গোমস্তারা খাজনা তোলে, খাজনা। যা হবার তাই হইলু দুর্ভিক্ক তো নয় মহাদুর্ভিক্ক। এসব বইয়ি পড়া, লিকা আচে ছিয়াত্তরের মন্বন্তর। রাস্তাঘাটে মানুষির লাশ, লাশের গন্দে মুর্শিদাবাদে থাকাই মুশকিল, সরকারের লোক ঐ ডোম, বুজলি বাপুরা, ডোমেরা লাশ তুলতি পারেনা গায়ে বল নেই, উরাও মরি পড়ি থাকে রাস্তায়। যারা বেঁইচি থাকে ওদের খাবার কিচু নেই, জ্যান্ত মানুষ শুদু বাঁচার জন্যি মরা মানুষের মাংস খায়। হায় ইশ্বর হায়, বাঁচার জন্যি মানুষ কিনা করে! তাই বলি কোম্পানী কিন্তু খাজনা উটানো বন্দ করিনি। যারা কুনু রকমে বেঁইচে ছিলু তাদের ওপর অত্যাচার করি খাজনা তুলিচে ঐ শালার কোম্পানী। বুজলি বাপুরা, দুর্ভিক্কর সাতে সাতে দেকা দিলু কলেরা, বসন্ত এসব রোগ। চারিদিকি মহামারীর কষ্ট, বড়ো কষ্ট মানুষের, এসব লিকা আচে বইয়ি।’ এসব দুঃখ কষ্টের কথা শুনতে ভালো লাগে না পিতরের। সে দ্রুত বাড়ির দিকে হাঁটা দেয়।

রাতের বেলা লম্পটা একপাশে রেখে কাঁথার ওপর বসে পিতর। ওপাশে ঘুমোচ্ছে ওর মেয়ে অঞ্জলী, ছেলে যোহন আর রবিন। স্ত্রীকে কাছে ডেকে পিতর বলে – ‘খুকির মা, দেশের ভাবসাব ভালো ঠেইকচি নারে। উত্তুুরে বন্যা হইয়িচে, গুদামে নাকি ধান চাল নেই, বিদেশ থেইকি বলে খাবার আসবিনা, মাচার লোকেরা সব আকালের গল্প করচি।’ ভয়ার্ত দুটো চোখে স্বামীর দিকে তাকায়- ‘তাইলি কি আকাল হবেগো?’ পিতর বলে- ‘শোন্ খুকির মা যেটুকু ধান ঘরে আচে উটাতে হাত দিবিনি। আমি মাটে-ঘাটে, লোকের বাড়ি-বাড়ি মুনিষ খাটবু ধান চাল যা পাবো ওগুনু খাবো।’ পুনরায় স্ত্রীকে সাবধান করে পিতর- ‘ঘরের ধানে কিন্তু হাত দিবিনি, বুজিচি?’

পিতরের বউ ঘুমিয়ে গেলেও পিতর ঘুমাতে পারে না। সন্ধ্যায় মাচার ওপরে বসে আন্দ্রিয় সরকার যেসব গল্প করেছে, ওই গল্পের সাক্ষীতো সে নিজেও। সেই পঞ্চাশের দুর্ভিক্ষে ওর বয়েস তখন বারো তেরো বছর। বাবা গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে গিয়েছিল। দূরের এক শহরে যেখানে রেলস্টেশন ছিল। মুটের কাজ করে খেয়ে না খেয়ে বাবা পনর দিন পরপর শহর থেকে চাল ডাল নিয়ে আসতো। ওসব খেয়ে কোনোরকমে বেঁচে থাকতো ওরা। হঠাৎ একদিন বাবা এলো না। চিন্তাক্লিষ্ট মা ওর ভাইবোনদের বাঁচাতে চালের আটার সাথে সজনে শাক সিদ্ধ করতো লবণ দিয়ে। ওসব একদিন শেষ হলে বনে বাদাড়ে ওল কচু মাটির আলু খুঁজে আনতো ওরা, লবণ দিয়ে সিদ্ধ করে খেতো। হঠাৎ একদিন বাবা এসে হাজির কিছু টাকা আর চাল হাতে। বাবা  ফিরে এলো কিন্তু মা ততদিনে ক্ষুধায় ভয়ে হাড্ডিসার এক মানুষ। অসুস্থ হয়ে মারা গেলো মা। কিশোর বেলার সেই দুর্ভিক্ষের দাগটা মন থেকে মুছে ফেলতে পারে না পিতর। সেই দুর্ভিক্ষে পেটের খিদেয় সাহায্যের আশায় নতিপোতা গ্রামের সব হিন্দু-মুসলমান স্বধর্ম ত্যাগ করে খৃস্টান হয়ে গেল। ফাদার কিছু টাকা আর কাপড়চোপড় দিয়ে সমস্ত গ্রামবাসীকে খৃস্টান করে নিল। ওর বাবার নাম ছিল যীতেন্দ্র হালদার। ঐ হালদারটুকু রেখে ফাদার তাকে বানালেন যোসেফ হালদার। পিতরের নাম ছিল প্রহল্লাদ হালদার, লোকে বলতো পেল্লাদ হালদার, ও হয়ে গেল পিটার হালদার, লোকে পিটার উচ্চারণ করতে পারে না, বলে পিতর হালদার। এসব ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে যায় পিতর।

সেই কবে দেড়শ’ বছর আগে মেহেরপুরের দক্ষিণে এই অজপাগাড়াগাঁয়ে কাঁচারাস্তায় একহাঁটু কাদাপানি, কলেরা, বসন্ত, ম্যালেরিয়াকে মোকাবেলা কোরে খৃস্টানরা গড়ে তুলেছে মিশনপল্লী। আকাশ ছোঁয়া গম্বুজ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রোমান ক্যাথলিক চার্চ। স্থানীয় লোকেরা বলে গির্জাঘর বা গিজ্জিঘর। ওটাকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে মিশন হাসপাতাল, মিশন স্কুল, বৈথনিয়া বড়ি, ফাদারদের আবাস। প্রতিদিন সময় মেপে গির্জার ঘড়িতে ঘন্টা বাজে ঢং ঢং ঢং। একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় রাজাকাররা নতিপোতার মিশনপল্লী লুট করলো। ডাক্তার নার্স ফাদাররা সীমান্ত পার হয়ে পালিয়ে গেলো ভারতে। পিতরও তার বউ ছেলেমেয়েদের নিয়ে পালিয়ে গিয়ে ভারতের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছিলো। যুদ্ধের পর নতিপোতার মিশনারীদের অবস্থা এখন আর ভালো নেই। প্রায়ই সশস্ত্র ডাকাতি হয়। ওরা এখন চাটিবাটি গুটিয়ে দেশে ফিরে যেতে চায়। মাঝখান থেকে যীতেন্দ্র হলো যোসেফ, প্রহল্লাদ হলো পিটার, বোরহান হলো ব্রাউন, মতিউর হলো ম্যাথুস, জালাল হলো জর্জ। নিম্নবর্গীয় মানুষের ইতিহাস বুঝি এটাই। শোষণে শোষণে শুধু প্রাণই নাস্তানাবুদ হয় না, ওরা ধর্মও হারায়। কিন্তু মূল মানুষটা থাকে ঐ একই। জীবন পাল্টায় না, পাল্টায় নাম। ঘরে ভাত থাকে না, পরনে কাপড় থাকে না। বুকের ভেতর সবসময় নানারকম ভয় এসে বাসা বাঁধে।

পিতর হালদারকেও সবসময় ঐ একটা ভয়, একটা চাপ তাড়া করে ফেরে। কী হয়? কী হয়? সে চোখ কান খোলা রাখে সবসময়। এ পর্যন্ত সে যতটুকু খবর পেয়েছে তাতে তার সাহসী বা আনন্দিত হবার কিছুই খুঁজে পায় না। সে মহাজন জোতদারদের বাড়ির দুয়োরে ধর্না দেয় জ্যাঠা/জেঠিমা, কাকা/কাকীমা, দাদা/দিদি কাজ দাও কাজ। টাকা লাগবে না, পয়সাও চাই না, শুধু দুমুঠো ধান অথবা চাল দিও ওতেই হবে। ততদিনে শুরু হয়ে গেছে আকাল। পিতর হালদার বা নতিপোতার মানুষেরা জানে না বা জানতে পারবে না কখনো, কী করে রাজনীতির জটিল ফাঁদে লটকে গেছে তাদের জন্মভূমি। দেশের ভেতরে বন্যা, অব্যবস্থা, লোভ, চুরি, লুটপাট আর আন্তর্জতিক রাজনীতির মেরুকরণের প্রেক্ষাপটে ততদিনে পিতর হালদারদের জীবন চ্যাপ্টা হতে শুরু করেছে। আশ্বিন-কার্তিক মাসে এসে সর্বনাশা দুর্ভিক্ষ আঘাত হানে নতিপোতা গ্রামে।

কোথায় কিভাবে বেঁচে আছে মানুষ, পিতর কিভাবে বাঁচবে, বউ ছেলে মেয়েদের বাঁচাবে এসব ভেবে আতঙ্কে সময় কাটে তার। ঘরে খাবার, টাকা-পয়সা যা কিছু ছিল এর মধ্যেই সব শেষ। চালের দাম বাড়তে লাগলো লাফ মেরে মেরে। কাজ না পেয়ে যখন বিষণ্ন পিতর ঘরের দাওয়ায় এসে বসে মলিন মুখে, তখন মেয়ে অঞ্জলী এসে তার হাতে একটা সোনার নোলক তুলে দিয়ে বলে- ‘বাবা, মা বললু ইটা বেইচি ধান কিনি আনতি।’ মেয়ের মুখের দিকে তাকায় পিতর। মেয়েটা মাথা নত করে দাঁড়িয়ে। বিয়ের সময় পিতর ওই নোলকটা তার বউকে দিয়েছিল। কথা ছিল অঞ্জলীর বিয়ের সময় ওটা মেয়েকে দেবে। পিতর বলে- ‘থাক মা থাক, উটা রেইকি দিগা, আমি যাই দেকি কাজ পাই কিনা।’ ঘর তেকে বেরিয়ে আসে তার স্ত্রী, নোলকটা মেয়ের হাত থেকে নিয়ে স্বামীর হাতে তুলে দেয়। বলে- ‘আপনার দোহাই লাগে, উটা নিয়ি যান বিক্রি কইরি ধান কিনি আনেন, যান।’ এবার পিতর ওটা হাতে নিয়ে দ্রুত মাইকেল বিশ্বাসের বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকে। মাইকেল বিশ্বাস ওটা হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখে, বলে- ‘বিশ সের ধান দবো, তোর যদি পুষায় তো দিতি পারিস।’ পিতর ওটা হাতে নিয়ে পূর্ব পাড়ার জোতদার সিজার ম-লের বাড়িতে গিয়ে হাজির হয়। সবকিছু শুনে সিজার ম-ল বলে- ‘বড়ো কষ্টের দিন চলি এইলুরে পিতর, ওসব নোলক দিয়ি কী হবে বল?’ পিতর বিনয়ের সাথে বলে- ‘দাদা, ঘরে খাবার নেই, সের তিরিশেক ধান দাও, তাইলিই হবে, না খাওয়া মেইয়ি আর ছেইলিদের দিকি তাকাতি পারিনে।’ সিজার ম-ল বড্ড অবহেলার কণ্ঠে বলে- ‘রেইকি যা, বৈকেলে এইসি ধান নিয়ি যাস।’ পিতর বলতে যাচ্ছিলো- ধানটা এখনই মেপে দাও, বিকেল পর্যন্ত খিদে মানবে না। কিন্তু ভয়ে বলে না, পাছে আবার সিজার নোলকটা ফিরিয়ে দেয়। মাথা নত করে ফিরে যেতে উদ্যত পিতরকে পেছন থেকে ডাকে সিজার ম-ল – ‘দাঁড়া, ঘরে যকুন ধান চাল কিচুই নেই, ধান নিয়ি যা, তবে আবার তো আসতি হবে এই সিজারের কাছে, এবার ধান নিতি এলি তোর ভিটির দলিল নিয়ি আসিস।’

তিরিশ সের ধান। পাঁচ পাঁচটা পেট কদিন চলে? সিজার মণ্ডল হাঙরের মতো বিশাল হা করে আছে ঐ দশকাঠা আর ভিটে মাটির দলিলের জন্যে। সে মহাজন, জোতদার। তার গোলা ভরা ধান, সিন্দুক ভর্তি টাকা।  সিজারকে দলিল দেবার কথা না ভেবে পিতর ওল কচু মাটির আলু শাক সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে যায় ছেলে দুটোকে নিয়ে।

নতিপোতার মানুষেরা তখন বুঝে ফেলেছে এই ঘোর দুর্দিনে বেঁচে থাকার কোনো উপায় নেই। মানুষ নিশাচর হয়ে ওঠে। পূবপাড়ার মেয়েরা রাতের অন্ধকারে শরীর বেচতে শুরু করেছে। কেউ কেউ চুরি করা শুরু করেছে। রাতের বেলা মহাজন, জোতদারদের বাড়ির রান্নাঘরের চাল, ভাত এমনকি তরকারি পর্যন্ত নিয়ে যাচ্ছে। এমনি এক সময়ে রাতের বেলা হাতে ধারালো দা নিয়ে বের হয় পিতর হালদার। সিজার ম-লের বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়ে প্রাচীর টপকে। ধানের গোলার দিকে এগিয়ে যায় সে। দ্রুত ধারালো দা দিয়ে গোলার চালের দড়ি কেটে ফেলে, ওর শরীরে আগে মোষের মতো বল ছিলো, এখন আর তা নেই। তবুও সে গোলার চাল উঠিয়ে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করে। তখনই হাত থেকে দা টা পড়ে যায় বাঁশের ওপর। গোলা পাহারা দিচ্ছিলো সিজার মণ্ডল। সাথে সাথে তীব্র টর্চের আলো এসে পড়ে পিতরের শরীরে, লাফ মেরে নিচে নেমে পড়ে সে। দেখে পিছনে দাঁড়িয়ে সিজার মণ্ডল। ‘ছিঃ ছিঃ ছিঃ’ ঘৃণার সাথে উচ্চারণ সরে সিজার- ‘শেষ পর্যন্ত তুই, পিতর।’ পিতর জীবনে এই প্রথম একটা অপমানের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। সে কখনো ভাবেনি তাকে লোকের বাড়িতে চুরি করতে এসে ধরা পড়তে হবে। সে দুহাত জোর করে বলে- ‘দাদা মাপ করো, বউ-মেইয়ি-ছেইলি সব উপোস, তুমি শাস্তি দাও, শাস্তি।’ কেঁদে ফেলে পিতর। সিজার মণ্ডল বলে- ‘শাস্তি তোকে দোবো। কাল সকালে সদরে পুলিশের হাতে তুইলি দোবো, তোর জেল হবে তকুন বুজবি চুরি করার ঠ্যালা।’ পিতর ভয়ে কাঁপতে থাকে- ‘না না দাদা ও ওকাজটা তুমি কইরুনা, জেলে দিওনা, জেলে দিওনা’। ‘বেশ জেলে দোবোনা, তবে কাল সকালে ইশকুলের মাটে সকলের সামনে তোকে বেঁইদি সাত ঘা জুতুর বাড়ি দোবো, বলবু পিতর পাকা চোর’- সিজার ম-ল বলে। পিতর কাতর স্বরে দ্রুত বলে- ‘না না দাদা, না, বউ-মেইয়ি আর ছেইলিদের সামনে মাতাটা হেঁট হয়ি যাবে, ওর চেয়ি আমার মইরি যাওয়া অনেক ভালো।’ ফাঁদে ধরা পড়া পাখির মতো ছটফট করে পিতর। ওকে কথার প্যাঁচে বেঁধে ফেলে সিজার। জেল না সাত ঘা জুতুর বারি বল?’ ‘তুমি একেনেই আমাকে তুমার যা ইচ্ছা যতো ইচ্ছা জুতু মারো, জীবনে আর কখুনো আমি তোমার বাড়ি চুরি করতি আসবু না’- পিতর কাঁদতে থাকে।

সিজার মণ্ডল আবছা আলোয় পিতরের মুখের দিকে তাকায়, পিতর ভাবে কি করে পালাবে সে। কিন্তু হঠাৎ চোখ পড়ে যায় সিজার ম-লের হাতের দিকে। ধারালো দা টা এখন সিজারের দখলে। পিতর সহজে পার পাবে না বুঝে ফেলে সে। হঠাৎ সিজার বলে- ‘তোকে আমি ছেইড়ি দেবো, চাল দোবো, টাকা দোবো তুই বেঁইচি যাবি।’ পিতর ছটফট করে বলে- ‘দাও দাদা ছেইড়ি দাও, আগে ছেইড়ি দাও ওসব চাল টাকা দরকার নেই।’

নিশিজাগা প্রাচীন সেই পাখিটা ডাকে কুউব কুউব, একটা প্যাঁচা ডেকে ওঠে, দূরে কোথাও কুকুর কাঁদে। পিতরকে কাছে আসতে বলে সিজার; কানে কানে কিছু বলে। লাফ মেরে পিছিয়ে যায় পিতর- ‘না না, ছিঃ ছিঃ এসব কি বলুচ তুমি, তুমি কি পাগল।’ সিজার শক্ত গলায় বলে- আমি পাগল না ঠিকই বলচি বাড়ি যা চিন্তা কর, কেউ জানবি না তুই টাকা পাবি তোর পরিবারের সবাই বেঁইচি যাবে কাউকে না খেয়ি মরতি হবে না, শুধু তুই আর আমি ছাড়া কেউ জানবিনা।’

মাথাটা নত করে প্রাচীর টপকে চলে যায় পিতর হালদার। তার চোখ দিয়ে জল গড়ায়। কেউ দেখতে পায় না সে জল।

ঘরে ফিরতেই চমকে ওঠে পিতর। একি! তার বউ উঠোনে দাঁড়িয়ে! সে বলে ‘খুকির মা তুই একেনে! ঘুমুসনি হারে?’ তার স্ত্রী বলে- ‘এতো রাতে কুতায় গিয়েলেন?’ পিতর বলে- ‘আয় ঘরে আয় বলচি, আগে একটু জল দে খাই।’ ওর স্ত্রী ছোট্ট একটা বটিতে একটু খুদ ভাজা আর এক গ্লাস জল এনে ধরে স্বামীর সামনে। ঐ খুদ ভাজা দেখে কেঁদে ফেলে পিতর। বলে ‘কিরে ওটুকু খাসনি তুই?’ স্ত্রী জবাব দেয়- ‘খেয়িচি, আপনি খান।’ বাটিটা একপাশে রেখে শুধু জলটুকু ঢক ঢক করে খেয়ে নেয় পিতর। স্ত্রীকে স্বাভাবিক কণ্ঠে বলে- ‘খুকির মা তোর কাচে মিত্যি কতা বলবু না, গিয়েলাম ধান চুরি করতি।’ তার স্ত্রী অবাক হয়ে যায় বলে ‘হায় ইশ্বর, ধান চুরি, কুতায় কার বাড়ি।’ ‘সিজার ম-লের বাড়ি, ধরা পড়ি গেলাম। তো লোক ভালো বুজলি খুকির মা কিচু বলিনি, কিচু বলিনি’- মাথাটা নত করে কথাগুলো বলে পিতর। ওর স্ত্রী কাঁদে আর বলে- ‘আপনিতো চুরি করতি চান না, কাজ চান, কাজ না পেলি কি করবেন বাঁচতি হবে তো।’ পিতর আর ওর স্ত্রী দেখতে পায়না, পিছনে আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে ওদের মেয়ে অঞ্জলী।

পিতরের বউ ছেলে মেয়েরা দুদিন কিছুই খেতে পায়নি। শুধু লবণ দিয়ে কচুর শাক সিদ্ধ। শরীরে শক্তি নেই কিছু করার। নিরব নিঝুম একটি রাত। সে রাতে ভাঙা কলসির মতো বিবর্ণ একটা চাঁদ লটকে ছিলো নতিপোতার আকাশে। দূরে কোথাও কুকুরের কান্নার শব্দ ভাসছিলো। পিতর হালদার ঘর থেকে বের হয় সঙ্গে তার মেয়ে অঞ্জলী। ত্রস্ত পায়ে ওরা দুজন হাঁটতে থাকে গির্জা ঘরের পিছন দিকে। চাঁদটাকে আড়াল করে আছে বিশাল গির্জাটা। ওপাশে মাঠ, ঝোপঝাড়, সিজার ম-লকে চেনা যায়না, একটা কালো মূর্তির মতো আবছা চাঁদের আলোতে সে অপেক্ষা করে থাকে ঝোপের আড়ালে। পিতর হালদার মেয়েকে সেদিকে যেতে বলে ইশারায়। সেদিকে যাবার আগে বাবার মুখের দিকে একবার তাকায় অঞ্জলী। দ্রুত চলে যায়।

নিজেকে ধরে রাখতে পারে না পিতর। মনটাকে সান্ত¦না দেয়, বলে- বাঁচতি হলি তো ভাত খেতি হবে, ভাত পাবো কুতায়, টাকা নেই টাকা, টাকা থাকলি চাল কিনা যায়। নুন কিনা যায়। কি সব বিড় বিড় করে বলে একাকী পিতর। সে কি পাগল হয়ে গেছে? একটু পরে সে দেখে ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে অঞ্জলী, দ্রুত দৌড়াতে থাকে বাড়ির দিকে। পিতরের দিকে এগিয়ে আসে সিজার ম-ল। সিজারের ছায়াটি ক্রমশ বড়ো হতে থাকে। পিতরের কাছে এসে বলে ‘শালা চোরের বাচ্চা চোর, তোকে জেলে দিয়াই ভালো কাজ ছিলু, ছেইড়ি দিয়ি খুব খারাপ কাজ করিচি। যতোসব ছেটো জাত।’ পিতর বিনয়ের সাথে বলে- ‘দাদা, রাগ করচু কেনে, আমার খুকি?’ তেড়ে আসে সিজার- ‘তোমার খুকি, কচি খুকি, আমার হাতে কামড়ি দিলু, এই দেকো রক্ত, বললু- না না না। আমি বলি- দু’পাঁচ মিনিটের ব্যাপার, একটু দাঁড়া। তানা দিলু দৌড়, কাল এই সুমায় এইখেনে নিয়ি আসবি ওকে, মনে থাকে যেনো, তানা হইলি তুমার কপালে ঐ জেলের ভাত আচে।’ রাগে ক্ষোভে ফেটে পড়ে সিজার ম-ল। একটু আগের আনন্দটা ব্যর্থ হয়ে যাওয়ায় সে হিংস্র হয়ে ওঠে। সে কোনো কথা না বলে পিতরের ওপর প্রচ- একটা মানসিক চাপ সৃষ্টি করে দ্রুত হাঁটতে থাকে সামনে। পিছনে দঁড়িয়ে থাকে পিতর হালদার।

এরপর কি হবে? কি করবে পিতর? সিজারের অপস্রিয়মান দেহটা চলে গেলেও পিতর দেখে ওর সামনে পিছনে দাঁড়িয়ে আছে একজন সিজার ম-ল। এমনকি ঐ গির্জার বিশাল গম্বুজ, সেখানেও দাঁড়িয়ে আছে সিজার। একটা কালো থাবা ক্রমশ এগিয়ে দেয় পিতরের শরীরের ওপর। পিতর না না না বলে চিৎকার করে একাকী। গির্জার দিকে মুখ করে বলে- হে ইশ্বর, শুধু দুটু ভাত আর কাপুড়ের আশায় আমার বাবা যীতেন্দ্র হালদার স্বধর্ম ত্যাগ করি, খ্রিস্টান হইলু, আমি পেল্লাদ হলাম পিতর। তো কি লাব হইলু, কি লাব হইলু?

হাবিব আনিসুর রহমান। গল্পকার, ঔপন্যাসিক। জন্ম মেহেরপুরে ৬ জানুয়ারি। বাবা এস এম হাবিবুর রহমান, মা বেগম আশরাফুন্নেসা। পড়াশোনা কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। চট্টগ্রাম কলেজে অধ্যাপনার মাধ্যমে পেশাজীবনের শুরু। প্রফেসর, অধ্যক্ষ হিসেবে অবসর নিয়েছেন। সাহিত্যে স্বীকৃতি স্বরুপ পেয়েছেন জীবননগর...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..