আমাদের বড় আপা

সানিয়া আজাদ
গল্প
Bengali
আমাদের বড় আপা

রাত দেড়টায় বড় ননাসের ফোন – দীপা, আলম কোথায়? ওর ফোনতো বন্ধ। নূরে আলমকে সকলেই নূর নামে ডাকে। একমাত্র বড় ননাসই আলম নামে ডাকে। আলম নাম শুনলেই ১নং পঁচা সাবানের কথা মনে আসে। নাকে কেমন যেন সোডা সোডা গন্ধ পাই। এতো রাতে আপার ফোন শুনে অবাক হওয়ার কথা কিন্তু অবাক হইনি। গত এক বছরে গা সওয়া হয়ে গিয়েছে। তবে বিরক্ত হয়েছি ভীষণ। আপাকে বললাম – এতো রাতে কোথায় থাকবে? নাক ডাকছে।

– কী? শাক বাঁচছে?

নেট ওর্য়াকের গ-গোলে কী শুনতে কী শুনল! বললাম, না আপা, এতো রাতে শাকটাক বাছাবাছিতে আমরা নেই। নাক ডাকছে – নোজ কলিং।

বিরক্তি নিয়ে নূরকে ধাক্কা দিতেই বিকট নাক ডাকা একটু থামিয়ে পাশ ফিরে আবার শুরু করলো। পরের ধাক্কায় জেগে ফোন নিয়ে হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে আপার অভিযোগের বিরাট র্ফদ শুনতে পেলাম।

দুলাভাই গত সপ্তাহে ইন্ডিয়া থেকে এলো। সকল শপিং ভিডিও কলে আপার গাইড লাইনে হয়েছে। বাসায় আসার পর সবই আপার হাতে দিল, আপা একে একে সব বুঝে নিল। এই পর্যন্ত সব ঠিক ছিল। সমস্যা হচ্ছে, একটা লাগেজ আজ আবিষ্কার করছে গেস্ট রুমের খাটের তলা থেকে। আপার ভাষ্যমতে ওখানে ওটা লুকানো অবস্থায় ছিল। পাসওয়ার্ড জানা না থাকায় বটি, ছুরি, কাঁচি দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তালা খোলে আপার চক্ষু কপালে! ইন্ডিয়া থেকে ফেরত আনা দুলাভাইয়ের অব্যবহৃত কাপড়চোপড়ের নীচে দারুণ গর্জিয়াস এক প্যাকেট। প্যাকেট খোলে বের করলেন মনোরম এক টিস্যু কাতান, সেই সাথে আনস্টিচ এক সেট সালোয়ার কামিজের কাপড়ও। সেই ঘটনা শুনে নূর বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলো, মাঝ রাতে এই কাহিনী! তো সমস্যা কোথায়? তোমার কী ধারণা শাড়ির সাথে জামাটা রেডিমেড হওয়া উচিত ছিল? আপা ধমকে বললেন, এইজন্যই তোকে গাধা বলি। তোর জন্ম মরুভূমিতে হওয়া উচিত ছিল। আরব শেখের মালসামাল পিঠে বহন করার বদলে বেডরুমে এসির নীচে খাটে শুয়ে আছিস। গাধা কোথাকার…

আসলে বড় আপা এমনই। আপার কা-কারখানা দেখলে তিলকে তাল করার প্রবাদটি প্র্যাকটিকেল প্রয়োগ মনে হবে। তাছাড়া আপার ভয়াবহ ঘটনাগুলো সবসময় মাঝরাতেই শুরু হয়। আমরা এতে অভ্যস্ত।

এইতো মাস দুয়েক আগের কথা।

রাত সাড়ে তিনটায় নূরের মোবাইলে ফোন – আমার সর্বনাশ হয়ে গেছেরে..আমি শেষ, বলেই এক নিঃশ্বাসে হাজার শব্দ ডেলিভারি দিতে লাগলেন। ওপাশ থেকে সর্বনাশ শব্দের পর বাংলা শব্দ আর কিছুই বুঝা যায়নি। ভাওভাও আওআও ধরণের শব্দ শুনে কিছুই বুঝতে না পেরে ঘুম ঘুম চোখে নূর জিজ্ঞেস করল, আপা, তুমি কুকুরের ডাক প্র্যাক্টিস করছ নাকি? আপা রেগে গিয়ে বিকট শব্দে ওয়াওওয়াও করে কী যেন বোঝাতে চাইলেন। নূর হেসে বলল – আপা, মাথা ঠান্ডা করে হিব্রু ভাষা ছেড়ে সহজ বাংলায় বলো আসল ঘটনা কী। কমফোর্ট ফিল করলে ইংরেজীতেও বলতে পারো। কিন্তু যে ভাষায় বলছ, তাতে কিছুই অনুবাদ করতে পারছিনা। আপা ফোঁপাতে ফোঁপাতে বললেন – আমার কপাল পুড়লো রে! তোর দুলাভাই আমেরিকায় গিয়ে বিয়ে করে ফেলেছে।

– কী করেছে?

– বিয়েরে বিয়ে বিয়ে।

নূর আমি দুজনেই হতভম্ব! বলে কী? কনফারেন্সে যোগ দিতে গিয়ে কেউ বিয়ে করে ফেলে? তাও হাফডজন সরকারী আমলা একসাথে গিয়ে! এমন অবিশ্বাস্য কা- দুলাভাই ঘটাবে এটা বিশ্বাস করার কোন কারণই নেই। এই বয়সে আমেরিকায় বিয়ে করে পেট্রোল পাম্পে ফোরম্যানের চাকরী করার লোক সে নয়। দুলাভাইয়ের ব্যাপারে আপা তিলকে তাল নয়, এইবার চালকুমড়া বানিয়ে ফেলেছে। কী শুনতে কী শুনেছে বা দেখেছে কে জানে?

নূর বলল, আপা ঘটনাতো তাহলে অতি শুভ। দুলাভাইয়ের গ্রীণ কার্ড পেতে সহজ হবে। এরপর তোমার ইমিগ্রেশনের জন্য এপ্লিকেশন করবে। বুড়ো বয়সে আমেরিকার নাগরিক হয়ে হাফপ্যান্ট পরে কুত্তার চেইন হাতে বিকেলে হাঁটতে বেরুবে। এতো মহা সুখের কথা! এতে কান্নাকাটির কী হল? আগে বল আপা, মেয়েটি শেতাঙ্গী না কৃষ্ণাঙ্গী? একটু ভেবে দেখ, কৃষ্ণাঙ্গী সতীনের পাশে তোমাকে কেমন হুরপরীর মতো লাগবে। তোমার রূপচর্চা এতোদিনে কাজে লাগল বলে! তুমি অযথাই দুলাভাইয়ের ওপর গোস্বা করছ।

এই শুনে আপা রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ধমকে উঠলেন – আমার লগে ইয়ার্কি করস? আমারে তুই বিয়াইন পাইছস? এক থাবড়া দিয়া তুর বান্দরামি ছুটাইয়া হালামু। বুঝলাম, আপা ভয়ানক রেগে গিয়েছে। ভাষাজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। এই বয়সে স্বামী দ্বিতীয় বিবাহ করলে কোন্ স্ত্রীরই-বা মাথা ঠিক থাকে!

আপা ডুকরে কেঁদে বললেন, আমি এখন মুখ দেখাবো কী করে? মেয়েদের বিয়ের বয়সে নিজেই কুকাম করে বসে আছে। বলেই আবার হাউহাউ করে কেঁদে ওঠলেন। নূর বলল, ঘটনার জাস্টিফিকেশন কী? তুমি কী করে ব্যাপারটা জানলে?

– ভিডিওকলে দেখেছি।

– বলো কী? দুলাভাই বিয়ে করে বাসরঘরে লাইভে ছিল?

– মুখ সামলে কথা বল। বাসরঘরে থাকবে কেন? মার্কেটে দেখেছি।

– কী করে কী হলো? তুমিতো সারাক্ষণ তাকে ভিডিও কলে শপিংয়ের ওপরই রাখ। এই ফাঁকে কনে পছন্দ থেকে বিয়ের শপিং, কাজী ডাকা কখন, কীভাবে করলো? বাপরে! এজন্যই লোকে বলে “আম্রিকা”! ডিজিটাল বটে!

– আলম, তুই ব্যাপারটা নিয়ে মজা করছিস। একবার আমার কথা ভাব। এই বয়সে স্বামী আমেরিকায় গিয়ে বিয়ে করে বউ নিয়ে জুতার মার্কেটে ঘুরছে, এটা কী করে মানি? বাচ্চারা জানলে কী হবে? এই বয়সে এমন কা-! তোর ভাগ্নিরা কী করে সমাজে মুখ দেখাবে? আমি এখন কী করি? বল কী…ই করি?

– আপা, আপাতত তুমি এসির টেম্পারেচার কমিয়ে আরাম করে ঘুম দাও। বিয়ের পর সব মেয়েরা কসমেটিক্স কিংবা গয়না কেনে। ওই মেয়ে জুতা কিনতে এলো? নিশ্চয় কোন ঘাপলা আছে। দেখি দুলাভাইয়ের সাথে কথা বলে জুতাওয়ালীর সাথে ডির্ভোসের কিছু করা যায় কী না। আমেরিকান নতুন জামাই, অত সহজে পার পাবে বলে মনে হয় না। দেশের জমিজমা বিক্রী করে কাবিনের টাকা পরিশোধ করতে হতে পারে। প্রয়োজনে তোমার গয়নায়ও হাত দিতে হতে পারে। তুমি তৈরী থেক। বারে বারে ঘু ঘু তুমি খেয়ে যাও ধান…..বলে ওপাশ থেকে আপাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ফোন কেটে দিল।

কথা শেষ হতে হলে হাই তুলতে তুলতে কাঁথা টেনে বললাম, নূর আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি বাচ্চাকাচ্চা নেব না। পাগলের সংখ্যা বৃদ্ধি করার ইচ্ছা আমার নেই। বলেই কাঁথার ভেতর গুটিশুটি মেরে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। সকালে উঠে দুলাভাইয়ের সাথে কথা বলে ব্যাপার জানতে হবে – একথা বলে নূরও শুয়ে পড়লো।

সকালে ঘুম ভাঙ্গলো উর্পযুপরি কলিং বেলের শব্দে। আপা বাসায় চলে এসেছে। রাতটা যে কী করে পার করেছে একমাত্র আল্লাহ্ই ভালো বলতে পারবে। কান্নাকাটি করে গলা ভেঙ্গে ফেলেছে। নূর বললো, আগে আদা চা খেয়ে গলা জোড়া লাগাও আপা। নইলে সতীনের সাথে ঝগড়া করবে কী করে? দেশে নেই যে ঝাড়ুপেটা করবে। ভালো কথা, ইংলিশে তোমার ঝগড়ার ভোকাবোলারী স্ট্রং আছেতো? বলে ফ্রেশ রুমে ঢুকে গেল। পেছন ফিরলে দেখতে পেত আপার চোখ দিয়ে আগুনের হলকা বেরুচ্ছে।

ঘন্টাখানিক পরে দুলাভাইয়ের ফোন। ফোন রিসিভ করে জানতে চাইলাম দুলাভাই ক্যামনে কী করলেন?

– কী ক্যামনে কী?

– শ্বেতাঙ্গী পটালেন কী করে?

– আরে! তুমিও তোমার ননাসের মতো হলে দীপা? ফোনে বিশাল মেসেজ পাঠিয়ে ফোন অফ করে বসে আছে। শুনবেতো ঘটনা কী! আসলে তোমরা বোনেকে সাইক্রিয়াটিস্ট দেখাতে হবে। ঢাকায় এসে আমার প্রথম কাজই হলো ওকে সাইকো থেরাপি দেওয়া। পাশাপাশি তোমার বরকেও। এই বলে দুলাভাই কয়েকটি ছবি পাঠালেন। এক শ্বেতাঙ্গী দুলাভাই ও অপরিচিত একজনের মাঝে দাঁড়িয়ে দুইহাতে দুজনের কাঁধে হাত রেখে দ্যুতি ছড়াচ্ছে। ছবি পাঠিয়ে দুলাভাই বললেন, মেয়েটি তার বন্ধু আলতাফের ওয়াইফ ক্রিস্টিনা। গতবার যখন আমেরিকায় পরিবেশ বাঁচাও শীর্ষক সম্মেলনে এসেছিলাম, তখন পরিচয় হয়েছিল। ভীষণ মিশুক। ফেসবুকের কল্যাণে মাঝেমাঝে যোগাযোগ হতো। গতকাল তোমার আপা জুতা কেনার বায়না ধরলো। আসার সময় সূতলী কেটে পায়ের মাপ দিয়ে দিয়েছিল। সূতলী হাতে জুতার দোকান খোঁজতে খোঁজতে আমার জুতার সুকতলা উঠে যাওয়ার যোগাড়। জুতার মার্কেটে হঠাৎ ক্রিস্টিনার সাথে দেখা। আমায় দেখে দৌড়ে জড়িয়ে ধরে চুমু খায়। এটা এ দেশের কমন রীতি। বাহিরে আলতাফ দাঁড়ানো ছিলো। ক্রিস্টিনা বগলদাবা করে আলতাফের কাছে আমায় নিয়ে যায়। আমি ভিডিও কল অফ করতে করতে তোমার আপা যতটুকু দেখেছে তাতেই মাথা খারাপ অবস্থা। বিশাল মেসেজ পাঠিয়ে ফোন অফ করে বসে আছে। আলতাফের সাথে কথা বলানোর সুযোগই পেলাম না।

ঘটনা শুনে নূর আপাকে ডেকে বলল, এই নাও ফোন, কথা বলো। দুলাভাই জুতাওয়ালীকে তিন তালাক দিয়ে দিয়েছে। তোমার ভালোবাসা নাকি বিসর্জন দিতে পারবেনা – মোবাইল দিয়ে চলে আসতে আসতে শুনছিলাম…… বেশরম মেয়ে, পরপুরুষকে এমন করে জড়িয়ে ধরে? তুমিও যেমন! গলে যাচ্ছিলে যেন …. দেখলামতো …… হুম দেখলাম দেখলাম…….। তো এই হলেন আমাদের বড় আপা। এভাবেই তিলগুলো তাল হয়।

আজও নিশ্চয় তার ব্যতিক্রম নয়। সদ্য ঘুম ভাঙ্গার বিরক্তি নিয়ে এতো রাতে ফোন ধরে বিরাট অভিযোগের র্ফদ শুনতে হলো। সাথে গাধার উপমা শুনে চুপসে গিয়ে নূর বললো, এতো রাতে ফোনে এসব শুনাচ্ছ কেন? এখন শাড়ি, জামার সমস্যা কী সেটা বল।

আপা ফের ধমকে বলল, আরে গাধা সমস্যা হল শাড়ি, থ্রীপিসের কাপড় কার জন্য এনেছে সেটা জানতে হবে। আমার জন্য আনলে কী আর গেস্ট রুমের খাটের তলায় লুকিয়ে রাখতো?

– ঘুম জড়ানো কন্ঠে বিরক্তি নিয়ে নূর উত্তর দিলো, তোমার কী ধারণা? দুলাভাই আমায় জানিয়ে রোহিঙ্গা ভিজিটে গিয়েছে নাকি আমার মতামত নিয়ে এসব কিনেছে? দুলাভাইকে জিজ্ঞেস কর সে তোমার খাট রেখে ওই খাটের তলা বেছে নিলো কেন। এ তার ভারী অন্যায় । তুমি এমন কোন ভারী না যে খাট ভেঙ্গে লাগেজের ওপর পড়ে লাগেজ ভেঙ্গে ফেলবে। তুমি এক কাজ করো আপা, কাতান শাড়িটা দেখ তোমার গায়ে লাগে কী না। ওটা গায়ে দিয়ে একটা সেল্ফি তোলে ফেসবুকে আপলোড দাও। ক্যাপশনে লিখো – দেখতো বন্ধুরা আমাকে কেমন লাগছে? এখন প্লিজ ঘুমাতে দাও। নিজেও ঘুমাও।

আপা রেগে বললেন, আমার সাথে বিটলামি করিস? বার বার ভুলে যাস আমি তোর বড় বোন। তোর চেয়ে আমি আট বছরের বড়। এই বিপদে তোকে জানানোই আমার ভুল হয়েছে। অত কথা বুঝিনা, তুই তাড়াতাড়ি বাসায় আয়, আমার মাথা গরম। মাথা দিয়ে শিশ বেরুচ্ছে। আসুক বুড়ো, মজা দেখাবো। কাতান শাড়ি পরিয়ে দুই হাতে মেহেদী লাগিয়ে সারা রাত দাঁড় করিয়ে রাখবো। মেহেদী হাতে খাওয়া বাথরুম কী করে সারে দেখব। তলে তলে কোন মতলব নিয়ে ঘুরে আমি জানিনা মনে করেছিস? গোপনে বান্ধবীর জন্য শাড়ি? আমিও দেখে নেব কাকে সে কাতান শাড়ি পরায়!

নূর বললো, আপা মাথা গরম করো না, পানি ঢেলে শিশ নিভাও, ঘরে আগুন লেগে যেতে পারে। নিমতলী, বনানী ট্র্যাজেডির পর হয়তো ‘নাজমা লজ’ ট্র্যাজেডি অপেক্ষা করছে। এমনও হতে পারে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য তোমাকে বলেনি। সকাল হতে দাও। এসেই রহস্য ভেদ করবো।

ভাইবোনের কথা শেষ হয়েছে। নূর ওয়াশরুমে যাচ্ছে দেখে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কী এখনই আপার বাসায় দৌড়াবে শার্লক হোমস হওয়ার জন্য? জবাবে নূর কিছুই না বলে ওয়াশরুম থেকে ফিরে আ…ও, আ…ও করে হাই তুলে পাশ ফিরে নাক ডাকতে লাগলো। ভাইবোনের কা- দেখে অবাক না হয়ে পারা যায় না।

আপার বর নিতান্তই ভালো মানুষ। চিকিৎসা করাতে চেন্নাইতে গিয়ে সারাক্ষণ শপিং মলেই আপার ভিডিও কলে হাজিরা দিয়েছেন। দেশে ফিরে সকালেই কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছেন অফিসের কাজে রোহিঙ্গা পরিদর্শনে। নেটওয়ার্ক এর আওতায় নেই বলে দুলাভাইকে না পেয়ে এতো রাতে নূরকেই ফোনে ধরলো। এই বাড়িতে এসেছি প্রায় এক বছর হবে। এই এক বছরে ভাইবোনের বহু পাগলামি দেখেছি। তবে এইটুকু বুঝতে পেরেছি এমন পাগল আর মমতাময়ী মানুষ গোটা জীবনে এই একটিই দেখেছি। শ্বশুর শ্বাশুড়িহীন পরিবারে তিনিই মায়ের জায়গায়। সেই ননাসের এমন বিপদে কী আর বসে থাকা যায়?

ভোর হতে না হতেই দুজনে ছুটলাম আপার বাসায়। আপার চোখের নীচে কালি দেখে মনে হলো সারারাত ঘুমাননি। আমাদের দেখেই আপা কাঁদো কাঁদো মুখে বলতে লাগলেন, মানুষটাকে সারাজীবন বিশ্বাস করেছি। এক মুহূর্তেও মনে সন্দেহ আনিনি। এই তার প্রতিদান! আমি জিজ্ঞাসা করলাম, আপনার কী কাউকে সন্দেহ হয়? আপা দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বিছানায় এলিয়ে পড়লেন। অনেক কষ্ট করে আপাকে চা নাস্তা খাওয়ালাম। ভাগ্নী থাকে হোস্টেলে, ওকে কিছুই জানালাম না। আপা পাশের রুম থেকে শাড়ি নিয়ে আসলেন। নূর শাড়ি দেখে চোখ কপালে তুলে বললো, একেই বলে রুচিবোধ! দুলাভাই আসলেই বাঘের বাচ্চা। এমন গর্জিয়াস শাড়ি না হলে গিফট চলে? আপা আগুন গরম চোখে নূরের দিকে তাকালে ও চুপ হয়ে গেল। সত্যিই শাড়িটি খুবই সুন্দর।

নূর আপাকে জিজ্ঞেস করলো, তুমি কী দুলাভাইয়ের চলাফেরায় কোন পরিবর্তন দেখেছ? এই যেমন ঘন ঘন আয়নায় দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়ানো, হঠাৎ করে রূপর্চচা – এমন কোন লক্ষণ ইদানীং পেয়েছ? আপা হতাশ গলায় বললো, সাধে কী আর তোকে গাধা বলি! এমন স্টেডিয়ামের মতো মাথা নিয়ে চুল আঁড়াবে? আমিতো বলি সেলুনওয়ালাকে মাগনাই টাকাগুলো দিয়ে আসে। এমন সময় আপার ফোন বেজে ওঠলো। দুলাভাইয়ের নম্বর দেখে আপা নির্লিপ্ত হয়ে ফোনটা নূরকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, তুই কথা বল, আমার কথা বলার শক্তি নেই। ফোন রিসিভ করার পর দুলাভাই জানালেন সে এখনই প্লেনে ওঠবে, এয়ারপোর্টে যেন ড্রাইভারকে পাঠাই।

রাতে দুলাভাই বাসায় এলে আপার আলুথালু চেহারা দেখে ঘাবড়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো, একী? নূর-দীপাও বাসায়। তোমার আপার কী হয়েছে? আপা কিছুই না বলে হাউহাউ করে কেঁদে উঠলো, তুমি আমায় ফাঁকি দিলে? কী করে পারলে বলো কী করে পারলে? হতভম্ব দুলাভাই একবার আমাদের দিকে, একবার আপার দিকে তাকিয়ে কিছুই বুঝে ওঠতে না পেরে জানতে চাইলেন কী পারলাম আমি? সারাজীবনই জেনে এসেছি আমি কিছুই পারিনা। এখন বীর হলাম কী করে? আপা আরো জোরে কেঁদে ওঠলেন। এইবার দুলাভাই ধমকে ওঠলেন, ঘটনা কী খুলে বল। আমি শাড়ি আর আনস্টিচ জামার কাপড় চোখের সামনে ধরে জানতে চাইলাম এগুলো কার জন্য এনেছেন? দুলাভাই ঘটনা আঁচ করে হো হো করে হেসে বললেন, একেই বলে সন্দেহবাতিক নারীজাতি। এক সপ্তাহ পরেই নূর-দীপার বিবাহ বার্ষিকী। দীপার জন্য এনেছিলাম। ভেবেছিলাম ঘুরে এসে দেখাব। তোমাদর আপার যা স¦ভাব, সারপ্রাইজ আর সারপ্রাইজ থাকতো না। এখনতো দেখছি আমারই সারপ্রাইজ হওয়ার পালা।

দুলাভাইয়ের ব্যাখ্যা শুনে আপা চোখমুখ মুছে বললেন, এ্যাঁ, আমাকে একবারও বলবেনা? মানা করলে কী আর আমি বলতাম? আমি কত কী ভেবেছি! সকলেই এক সঙ্গে হো হো করে হেসে ওঠলো। হাসতে হাসতেই নূর বললো বিবাহটাতো আমিও করেছি। তাহলে আমার গিফট কোথায়? ওই আনস্টিচ জামাটিই কী তবে…

সানিয়া আজাদ। গল্পকার।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..