আমার কোনো কষ্ট নেই (শেষ পর্ব)

দীলতাজ রহমান
গল্প, ধারাবাহিক
Bengali
আমার কোনো কষ্ট নেই (শেষ পর্ব)

খুব সকালে উঠে নূপুর এজাজুলের জন্যে ভাত রাঁধলো। নতুন করে ডিম ভাজলো। মুরগি জবাই করে খাবার রেডি হতেই সে এজাজুলকে ঘুম থেকে ডেকে তুললো। এজাজুল উঠে বসতেই নূপুর বললো, ‘খাবার রেডি! প্রত্থম বাসটা য্যেন ধরতি পারেন সেই মতোন রওনা দেন!’

আমি আজই যাবো তোকে কে বললো? আজ হাটবার, হাটে যাবো। তোদের জন্য বেশি করে সদাই কিনবো। সব থেকে বড় মাছটা আজ আমিই কিনবো! তাছাড়া কাল-পরশু আমার ছুটি! এ দু’দিন আমি বাড়িতেই থাকবো। এই ঘরখানা থাক। দক্ষিণের পোতায় বড় করে একখানা ঘর করে দেবো। তার জন্য মিস্ত্রি ডেকে হিসাব নিতে হবে!

তা অ্যলি আমি যাই? যেদিকে দু’চোখ যায়! নূপুরের কথার ধরন শুনে হীম হয়ে আসে এজাজুলের বুকের গহনে। কোথাও। একটু পরে বিছানা ছেড়ে উঠে পরে আরো পরে বুঝতে পারলো, কারো চোখে সে আর চোখ রাখতে পারছে না। আশৈশব চরে বেড়ানোর ভিটেটুকুতে নিজেকে হঠাৎই বৈরী মনে হয় তার। অপুর চোখেও সন্ত্রাস! এ গাঁয়ের অক্সিজেন মুহূর্তেই তার কাছে ফুরিয়ে আসছে। শেকড়শুদ্ধ উপড়ে যেতে চাইছে তার মাটি। এজাজুল ভেবেছিলো সে দীর্ঘদিন পরে এসেছে, আবার কবে আসবে। দু’দিন থেকে গ্রামটা ঘুরে সবাইকে দেখে যাবে। আগামীকাল পরশু সাপ্তাহিক ছুটি।

মাকড়সার জালের এত ক্ষীণ ভেবেছিলো যে বন্ধন, তা ছিন্ন করে তবেই সে বুঝলো, ছিন্ন করা যায় না। শুধু উপড়ে আসা যায়। তার মনে হচ্ছে এখন গ্রামই যেন তাকে তাড়িয়ে দিচ্ছে।

দ্রুত মুখ ধুয়ে এসে শার্ট-প্যান্ট পরে নিলো এজাজুল। হুরমত মোল্লা মসজিদ থেকে নামাজ পড়ে এসে এজাজুলকে ও অবস্থায় দেখে জিজ্ঞেস করলো, এতো সকালে কোহানে যাবা?

আমি চলে যাচ্ছি চাচা!

ক্যান? হুরমত মোল্লার অস্তিত্বজোড়া প্রশ্ন।

ঢাকায় আমার জরুরি কাজ আছে।

আবার কবে আসফা? কোনো কতাই তো অল্যো না? চিঠি-পত্তরেরও ঠিকভাবে উত্তর দেও না? গ্রামের মানুষ তোমারে একজারা দেখতিও তো পারলো না!

আমি যাই চাচা!

চাচা হুরমত মোল্লাকে নির্মমভাবে হতাশ করে দিয়ে, হনহন করে নেমে গেলো এজাজুল। কুয়াশা এমন ঘন ছিলো সেদিন ভোরে, মনে হলো এজাজুল ধোঁয়ার কু-লিতে ঢুকে পড়েছে। কারো দৃষ্টি তা ভেদ করতে পারছে না। তাকে আরো একটু দেখতে হুরমত মোল্লা আলো হাতড়ে ফিরছে এজাজুলের ছাড়াও নিজের শৈশবের চোখে। অপুর চোখও আলোর অমোঘ আশায় লক্ষভ্রষ্ট, সম্মুখে। কিন্তু নূপুরের চোখ স্থির! আলো খোঁজার প্রয়াসহীন তার চোখের সবটুকু কুয়াশা গতরাতেই ছেঁকে তুলে নিয়ে গেছে এজাজুল। সবুজ ঘাসের ওপর জগদ্দল পাথরের মতো যে প্রতিদিন শুষে নিয়েছে তার জীবন থেকে নতুন সূর্যের আলো! যাকে বড় করে তুলতে তাকে স্থিত হতে হয়েছে সংসারের শেকড় ধরে থেকে। বন্দি প্রজাপতির মতো হৃদয়ের খাঁচা খুলে কখনো দেখা হয়নি দিগন্তের রঙধনু।

হুরমত মোল্লার বিমূঢ় অবস্থা কাটতে কদিন সময় লেগেছিলো। তারপর একদিন দুপুরে খেতে বসে নূপুরকে জিজ্ঞেস করলো, ‘গ্রামের মানুষ খালি জানতি চায়, মাইয়্যার বিয়া কবে? এজাজুল কী কইয়া গেলো? আচমকা এমন আইসা চইলা যাওয়ার কারণডা কী? তোর কাছে এসব কথা জানতি আমার শরম নাগে, তোর মা নাই কারেই বা কই!’

পড়ন্ত বেলায় দুপুরের খাবার খেতে বসে ভাতের নলাটি মুখের কাছ থেকে ফিরিয়ে নিতে নিতে নূপুর বললো, উনি তোমার মাইয়ারে বিয়ার পয়গাম নিয়েই আইছিলো, আমি মানা কইরা দিছি!

অসময়ে বিরাট একটা ঢোক গিলতে হুরমত মোল্লার দু’চোখ বেরিয়ে আসার দশা। সে সেই অবস্থায় বললো, ‘ক্যা?’

তার মতো শিক্ষিত, বড় অফিসারের স্ত্রী অওয়ার কী যোগ্যতা আমার আছে? আমি কী তার বান্দি অইয়া থাকপো? তোমার ভাতের ঋণ তুলতি?

তুই আমারে জানাইয়া মানা হুরবি না?

বিয়া অতো আমার, আমি তোমারে জানাবো ক্যান?

আমি এতোগুলান টাকা নষ্ট হরছি…!

তোমার টাকা নষ্ট অলো কই? বরং কেউরে তুমি লেহাপড়া শিখাইছো, মানুষ করছো! সেরা একটা মানুষ যারে কয়!

সিইডা কি বিনা স্বার্থে করছিলাম?

এইডাই তুমি কী শুনোলে বাবা, তোমার ভিতরে তা অলি লোভ ছেলো। আমার মা না অয় অতো কিছু বোঝে নাই! তুমার কথা তুমি তুলেনেও বাবা! এটুকু অহংকার আমার রাখো! চোখ শুকনো রাখো, বাবা, কথা কও? জায়নামাজের মতো খেজুর পাতার ছোট একটি পাটি পেতে বসেছে তিনজন। সবাই ওরা কাছাকছি বসা। নূপুর তার বাবার মরণাপন্ন অবস্থা দেখে ভয়ার্ত কণ্ঠেই ডেকে বললো, বাবা, মনে করো না তুমি বিনা স্বার্থেই কেউরে মানুষ করছো! মনে করো না বাবা? দেখবা বাবা, কী শান্তি তাতে!

নারে নূপুর, তোর কথায় আমার সন্দেহ অচ্ছে। ও-ই তোরে মানা করে দিয়া গ্যাছে। বলে, হুরমত মোল্লা খটখটে চোখে তাকালো মেয়ের দিকে।

সিইডা কী খুব ভালো অতো বাবা? সে সুযোগ তোমার মাইয়া দেয় নাই তার বাপের পুষ্যিরে!

এহন গ্রামের মানুষরি আমি কী কই? এক গরে তোরা বড় অইছিস?’

ক্যান কবা, একজনেরে আল্লার ওয়াস্তে মানুষ করছো। বরং বুকডা ফুলাইয়া কবা। আর একঘরে বড় অইছি তো অইছে কী? আমি ময়-মুরব্বি ছাড়া বড় অইছি না কি? নিজিরে মাটিতে মিশানের জন্যে এত অ-চিন্তা মনে আইনো না, কলাম!

এজাজুলডা এমন নেমকহারাম! তোর মার কপাল বালো যে এইগুনো তার দেহা নাগে নাই।

বাবা একজনেরে চাইড্যা ভাত খাওয়ালিই, একটু লেহা-পড়ার খরচ দিলিই তার জীবনডা তোমার অইয়ে গেলো না। জীবন বিক্রি অয় না বাবা! আর আমিও অনেকদিন থেইকা ভাবতিছিলাম, আমার মা-বাবার করুণায় যে পুরুষ, মানুষ অইছে, সে আমার মাথায় রাখার যুগ্যি অতি পারে না। আমারতে ভালো অন্য কারো হলি হোক!’

আমার এহোন শ্যাষ অবস্থা…।

এজাজুল আমার যে চোখ খুইলা দিয়া গেছে বাবা, সেই চোখ খোলা মাইয়াগে বিয়া আর অয় না! সেই চোখ দিয়া অগো মতো মানষিরে ফেন খাওয়া কুত্তার মতো মনে হয়। তয় বিয়াডা আর কার সাথে দিবা? তা নাইলে আমারে লেহাপড়া যেটুকু শিহ্যাইছো, ভুল করছো!

তোরে নিয়ে যে আমার এহন বড় ভয়রে মা! শরীরে জোর থাকলি না অয় অচেনা কোনোহানে চইলা যাইতাম! আর কোনোহানতে যে তোর বিয়্যার প্রস্তাবও আসফে না…।

আমার জন্যি তুমি অইরম ভাইবো না তো বাবা! আমি একলা চলার জন্যি আগে থেইকাই প্রস্তুত বাবা। এ গাঁয়ে তোমার মাইয়া বুক ফুলাইয়্যা থাকপে তার বাপের নামের জোরেই!’

আমার সয়-সম্পত্তি যেটুকু আছে, তোর! আমি তোর নাইগা ওর মতো শিক্ষিত ছাওয়াল কিনা আনবো, দেহিস।

আমার কপালে সুখ থাকলে তো আমার মা বাঁইচা থাকত। আমিও আজ এজাজুলের মতো একজন অতাম। এইটুকু ছাড়া আমার আর কোনো কষ্ট নাই। তুমি আছো, অপু আছে, এই সুহির বিতরে ডাইকা ডাইকা আমারে তুমি আর কষ্ট চিনাইও না তো।

প্লেটে ভাত পড়েছিলো। নূপুর কখন উঠে এসেছিলো তার বাবার সঙ্গে বারান্দায়। অপুটা তখন থেকেই বেয়াড়া হয়ে উঠছিলো। একটা জেদীভাব তেজস্বী করে তুলেছিলো তাকে। তাইতো একদিন নিজের বাপকেই তেড়ে গিয়েছিলো খেজুরগাছ কাটা ছেনি নিয়ে। বলেছিলো, ‘গাড়লআর যদি আমার খালার দিকি অমোন কইর‌্যা তাকাবি, বিয়া করতি চাবি, তো দুই ফালা কইরা ফেলাবো, হুরমত মোল্লা সেদিনই বুঝেছিলো তার বাহুর জোর ক্ষয়ে গেলেও তা আবার জমে উঠছে তার ঘরে, তারই উত্তরসূরির হাতে।

তমিজ আলী সেই যে শ্বশুরবাড়ি ছেড়েছে আর আসেনি। ক’দিন যেতেই হুরমত মোল্লা জানতে পারলো, তাকে খবর পাঠানো হয়েছেতার জামাই বিয়ে করে আবার সংসারী হয়েছে। বউটা এবার পেয়েছে আরো ভালো ঘরের। আরো সুন্দর। অপুকে যেন সে নিজে গিয়ে দিয়ে আসে। তার নতুন মেয়েটাকেও দেখতে আসে। সময় করে যেন তার সে মেয়েটাকে নাইওর আনে।

কিন্তু হুরমত মোল্লা ভেঙেচুরে দাঁড়াতে না দাঁড়াতে, এক দুপুরে নতুন লুঙ্গি-পাজামা পরা, নতুন ছাতাখানা দাওয়ায় এসে বন্ধ করতে না করতেই, তমিজ আলী জানতে পারলো, অপু ঢাকায় গেছে ভালো একটা কলেজে ভর্তি হওয়ার আশায়। সময় কতটা গড়িয়ে গেছে তমিজ আলী এতদিন সে হিসাব রাখেনি। তার মতো মানুষের ছেলে স্কুল পাস করতে পারে? তাও এতটুকু বয়সে? এটা তার কেন, তার চৌদ্দগোষ্ঠীরও স্বপ্নের অগোচরে ছিলো।

স্বচ্ছল পিতার একমাত্র ছেলে ছিলো তমিজ আলী। লেখাপড়া সে কেন, তার পূর্বপুরুষদেরও শাখা-প্রশাখার কেউ জানতো না। তবে তমিজ আলী বউটা পেয়েছিলো লক্ষ্মী। লেখাপড়া শেখা। আচার-আচরণ ভব্য। এক-আধটু বাউ-ুলেপনা তমিজ আলীর রক্তেই ছিলো। কিন্তু পথ তাকে নামিয়েছিলো আরো পরে এসে। লোভটা জাঁকিয়ে ধরেছিলো আরো পরে। ছোটবোন চোখে আঙুল তুলে যখন শালীকে দেখালো। কিন্তু সব ভস্ম হতে হতেও কিসের যেন একটা অহংকার তছনছ করে দিচ্ছে তমিজ আলীর অন্ধচৈতন্যে জেগে ওঠা গ্লানি! নূপুরের দিকে ছলছল চোখে তাকিয়ে সে বলতে লাগলো, ‘এ শুদু তুমার জন্যি সম্ভব অইছে বোন!’

সেদিন বাড়ি ফিরে যাওয়ার আগে আবার তমিজ আলী তার মৃত-স্ত্রীর কবরটির ওপর বহুবছর পর হাতবুলিয়ে গেলো। যেতে যেতে নূপুরকে ডেকে বলে গেলো ‘অপুকে কইও আমি অরে নিতি আইছিলাম। অর নতুন মা কতিছে এতবড় বাড়িডা খালি খালি নাগে… ভয় পাই। যাক, তার যা দরকার য্যান আমার থেইকা নেয়। ও য্যান আর কষ্ট না করে। তাইলি তো আবার আমার বাকি জীবনও বিফল অইয়া যাবে। শশুরসাবেরেও কইও, তার নতুন মাইয়্যাডারে য্যান দেইহা আসে। বারান্দায় যেবাবে সে পইড়্যে আছে, আমার মন বুলতিছে চোক-কান সজাগ। জাইগে গুমানো মানুষগুনো বড় বয়ের অয়! আমি আর তারে কইয়ে গিলাম না।’

তমিজ আলীর প্রতিটি কথায় নূপুর শুধু মাথা নেড়েছিলো। কারণ তমিজ আলীকে তখনও তার ক্ষেপাটে মনে হচ্ছিলো। সুযোগ-সন্ধানী মানুষেরাই নিজের ভালোত্ব প্রমাণ করতে হেন কাজ নেই যা করতে পারে না। আর ‘সুস্থির বোধ’ ঘরের শিকেয় তোলা মেওয়া নয়, যে চোখ বন্ধ করে হাত ঢোকালেও নিশ্চিতভাবে তা হাতে উঠে আসবে! সুস্থিরতাকে সাধনায় স্পর্শ করতে হয়। তার মাহাত্ম্য ও প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে। তাছাড়া লোকটির প্রতি তার ভয়-ভক্তি-মায়া-দয়া এমনকি ঘেন্নার ছিটেফোঁটাও নেই। অপুর সূত্রেও তা খুঁজে পায়নি সে। জন্মাব্দি দেখা এই লোকটিকে বরাবর তার একইরকম মনে হয়েছে। তবে তার বাপকে যে সে ভয় পাচ্ছে, এতে তার নিজের সাহসটা আরো কিছু বাড়লো।

এজাজুল আসার দিনটিকে নূপুর আগেভাগে রান্না-বাড়া শেষ করে রেখেছে। ঢাকা থেকে ছয় ঘণ্টার পথ গোপালগঞ্জ। কখন রওনা দিয়ে কখন আসবে, সেরকম কিছু লেখা ছিলো না চিঠিতে এবং কোথায় এসে উঠবে তারা, তার আপন চাচা সালাম মোল্লার ঘরে কিনা, তাও সে জানে না। যদিও সালাম মোল্লার স্ত্রী, নতুন বউ বরণের আশায় নতুন কুলো কিনে, ধান দুর্বো দিয়ে সাজিয়ে রেখেছে। এ-বাড়ি ও-বাড়ি ঘুরে মেহেদি কাঁচা হলুদ যোগাড় করেছে। তার আয়োজন দেখে মনে হচ্ছে, ওরকম চিঠি তারাও পেয়েছে। তবু একখানা চিঠি যেহেতু তার বাবাকেও লেখা, তাই কোনো কিছু আর সে ভাবতে যায়নি।

হুরমত মোল্লা চারটে খেয়ে বাড়ি ছাড়তে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছিলো। কিন্তু মেয়ে তাকে বলছে, ‘একটা মানুষ তার গাঁয়ে ফিরা আসতিছে। আপনি তারে এতবড় কইরাা দেখতিছেন, ক্যান? সে যেই অউক। সংসার থাকলি কত মনুষ কতখানতেন আসে আর যায়। আপনে তারে আগেরতেন বেশি বাবতি যাবেন ক্যান? মেয়ের কথায় তখন হুরমত মোল্লার বিরক্তি ঝরতে থাকে। তবে মেয়েটিকে যে তার যমের মতো ভয়!

এজাজুল বাড়িতে এলো বেলা তিনটে নাগাদ। সঙ্গে তার আধুনিক ধবধবে গায়ের রং স্ত্রী। হুরমত মোল্লার মধ্যউঠোনে এসে থমকে দাঁড়ালো তারা। সঙ্গে পিঁপড়ের মতো সারবাঁধা গ্রামের পথ থেকে উঠে আসা নানান বয়সী কৌতূহলী মানুষ। অতবড় বাড়িটি ছেঁকেও এলো সবাই। শুধু এজাজুলের আপন চাচির দেখা পাওয়া দূরে থাক, তাদের কোনো সাড়া-শব্দ নেই বাড়িতেও। তাদের ছেলেমেয়ে, নাতি-পুতিদেরও কাউকেও দেখা গেলো না।

জমাট ভিড়ের মধ্যে উঠোনে ঠায় দাঁড়ানো দু’জন মানুষ। হুরমত মোল্লার বসার ধরনটি শেকড় গেড়ে বসার মতো। কেউ কেউ তার দায়িত্ব নিয়ে ফিসফাস করছে, কিন্তু তার কাছে ভিড়তে সাহসে কুলোচ্ছে না কারো। দৃশ্যটি চরম বেমানান হয়ে ওঠার আগেই নূপুর দৌড়ে এলো, ভিড় ঠেলে সে অর্ধেক ঘোমটার বউটির হাত ধরে উঁচু ভিটির ঘরের দিকে নিয়ে উপরে উঠতে সাহায্য করলো। এজাজুলও উঠে পড়লো ওদের সঙ্গে। নতুন বউকে নূপুর তার ফুলতোলা চাদরে বসতে দিয়ে, এজাজুলের আনা মিষ্টির প্যাকেট খুল তখনই তা সবার হাতে হাতে বিলিয়ে, সবাইকে বউয়ের জন্য দোয়া করতে বললো। কিন্তু নির্বোধ বর্ষীয়ানরা নির্লজ্জভাবে নূপুরের সঙ্গে বউটিকে তুলনা করে চললো। বেয়েপড়া মিষ্টির রসে হাত চাটতে চাটতেও তারা যেন অভিসম্পাত বর্ষে যাচ্ছে।

এ গেঁয়ো কানাঘুষায় বউটি উৎকর্ণ হলে এজাজুলের আজই রক্ষে ছিলো না। অবস্থা বেগতিক বুঝে নূপুর ঘর ফাঁকা করার ভান করে সবাইকে একসঙ্গে তাড়া দিয়ে দরজা ভেজিয়ে রাখলো। এজাজুল এ নিয়ে দ্বিতীয়বার নূপুরের দিকে তাকাতে পারছে না। তার এবারের ভয় আরো ভয়ঙ্কর। এ তার ক্ষমা পাওয়া নয়, এক যেন কোথাও তার জন্য অস্ত্র শান হচ্ছে।

খেতে খেতেও বউয়ের মুখে কথার তুবড়ি ছোটে। নূপুরের তাতে ভালোই লাগে। কথাই তো বড় শিল্প! এবং তা কেবল কারো কারো মুখে। তাছাড়া দ্বিধা-জড়তা চরিত্রের ত্রুটিমাত্র। লজ্জা কোনো কোনো ক্ষেত্রে মোহনীয় করে বটে। তা এখানে বউটির এমন কে-ই-বা আছে? দরজার ফাঁক গলিয়ে তবু ভেসে আসে‘নতুন বোর মুহি এ্যাত্তো কতা?’

এজাজুল আর তার স্ত্রীর বিশ্রামের জন্যে পাশের ঘর দেখিয়ে দেয়া হলো। এজাজুলের আগেও একাই এখানে থাকত। কদাচিৎ পুরুষমানুষ কেউ এসে পড়লে সেও এজাজুলের সঙ্গে থাকত। তাও তমিজ আলী ছাড়া আর কেই বা!

নূপুর একখানা রেকাবি ভর্তি করে এজাজুলের আনা মিষ্টি দক্ষিণ পাশের জানালার কাছে নিমগাছতলায় তার বাবার সামনে নিয়ে দিলো। হুরমত মোল্লা এতে টসটসে চোখ দু’টি বিস্ফোরিত করে তাকিয়ে থাকে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ তার মেয়েটির দিকে। মেয়ে তাকে কিছুটা আদেশের সুরেই বললো, খাও বাবা! খাও! কিছু কষ্ট না থাকলি মানুষ মানুষ অয় না! আমার এহন তাই মনে অয়! যেন খালি কলসি আর ভরা কলসির ব্যবধান!

এতটুকু আঙিনায় ভিড় এখন পাকানো নয়। কেউ কেউ আসছেএকটু দাঁড়াচ্ছে, যাচ্ছে। খেয়ে-পরে সচ্ছল, সরিষার তেলে চকচকে শরীর গতর সালাম মোল্লার পাকাপোক্ত ঘর থেকে হরদম তার কাঁশির শব্দে এজাজুলের দমফাটা অবস্থা। অথচ এ কাঁশি এজাজুল বাড়ি আশার আগে একবারও কেউ শোনেনি। মাঝখান থেকে উৎকণ্ঠার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ও ঘর, এ ঘর, আর নিজের ঘর যারা এখনো চলাচলে একত্র করে রেখেছে। তারপর সবগুলো এরা ভোঁতা বুদ্ধির মানুষ! কোপ ছাড়াও যে কাটে, এ মূর্খদের তা বোঝানো যাবে না। কী বলতে, কী যে বলে ফেলে তার স্ত্রীর সামনে! ভয়ে শিটিয়ে আছে এজাজুল।

নূপুর, তুমি দেখি খুব তত্ত্বকথা জানো? এজাজুলের পাশে শুয়ে থাকা তার স্ত্রী জুঁই বললো, নূপুর বারান্দায় উঠে এসেছে টের পেয়ে।

না, ভাবি জানি না কিছুই। হঠাৎ মুখ দিয়ে বের হলো। বাবাকে বলার জন্য বলা আর কি! একা একা থাকি বাবার সঙ্গে কত কথাই তো বলতে হয়!

চার বছর আগে আমার বিয়ে হয়েছে। তোমার ভাই কিন্তু একবারও তোমার কথা আমাকে বলেনি। এবং এইটুকু সময়ে যা কিছু দেখেছি, তার কথার সবকিছুরই মিল খুঁজে পাচ্ছি না। তবু আমার দেখা সব কিছুর ভিতর তোমাকেই আমার কাছে শ্রেষ্ঠ মনে হচ্ছে।

তাই যদি হই ভাবি, তাতে আমার কোনো লাভ নেই। তাবে সে শ্রেষ্ঠত্বের বোধটুকু স্মৃতিতে রেখে দিবেন। সেটা একধরণের আলো, রেখে দিলে নিজেরই থাকে।

তুমি লেখা-পড়া করলে না কেন? হোগলার বেড়ার ওপার থেকে যেন কেউ তার আগুনের কু-লি বাতাস ছেঢ়েছে। আর বিক্ষিপ্ত সে আগুনে তলিয়ে না যেতেই, এ সুযোগ আঁকড়ে ধরে নূপুর। কারণ যাকে কোনোদিন আর ডেকে পাওয়া যাবে না গনগনে শিখাটির যাচিত অন্ধকারের মতো, সে-ই যখন সুযোগটি তৈরি করে দিয়েছে বলার, তখন সে বলেই চলে, লেখাপড়া করিনি কে বললো আপনাকে? ভাইজানের সব বই আমার পড়া। ওর সব অংক, ইংরেজি আমার একলা শেখা। এখনো শহরের লাইব্রেরি থেকে নানান ধরনের বই এনে আমি আর অপু পড়ি। আমার নানার কিছু বই আছে। নানা মারা গেলে আমি সেগুলো এনেছিলাম। দুর্লভ সে বইগুলোও তো পড়েছি। তবে স্কুলে শেষ সময় যাওয়া হয়নি। মা মারা গেলে সংসারে যে ভগ্নদশা শুরু হলো, বাবার একা ঘর-বার সামাল দেয়া সম্ভব ছিলো না। আমার মা’র হাতের হাঁস-মুরগি, ছাগলগুলো কে টিকিয়ে রাখতো? তাছাড়া হালের দু’টো বলদকেও আমাকে যত নিতে হতো। আর তিনজনের লেখাপড়া খরচ যোগানোরও বাবার সাধ্য ছিলো না। তবু অপুকে তো আমাকেই পড়াতে হয়!

‘হ্যাঁ ঠিকই বলেছো শহরেই তো কমটুকু মেয়েদের ভাগেই পড়ে…। আর তো গ্রাম! আমাদের মতো সুযোগ যারা পাচ্ছে তারা আর ক’জনই বা।’ জুঁইয়ের একচিলতে উক্তি।

চটপটে স্ত্রীর পাশে জড়সড় হয়ে আছে এজাজুল। এ অবস্থায় তার দম বন্ধ হয়ে আসার মতো। নূপুরের কাটা কাটা কথা শ্রাবণ মাসের বৃষ্টির মতো ঘাম ঝরাচ্ছে তার। হালের বলদ দু’টোকে পর্যন্ত সে তার প্রসঙ্গে নিয়ে এলো। মেয়েটিকে তার চাচির মতো সাদাসিধে বলে জানা ছিলো। কিন্তু এত ধার সে কবে পেলো! চার বছর হলো বিয়ে হয়েছে এজাজুলের। বউকে সে একবারও আনতে চায়নি দেশে। বিয়ের আগেই সে জুঁইকে বলেছিলো বাবা-মা কেউ নেই। বাবার সম্পত্তি ছিলো, সেই ফসলের দামে চাচা লেখাপড়া শিখিয়েছে। গ্রাম থেকে কেউ গেলেও এজাজুলের অফিসেই দেখা করে। ভুলেও বাসায় তোলে না কাউকে। গ্রামজুড়ে তাই এজাজুলের নামের চেয়ে বদনামই বেশি। আর নাম তো শুধু এইটুকু, এই গ্রামের আরো একটা ছেলে এমএ পাশ করলো। ভালো চাকরি পেলো। গ্রামের মুখ উজ্জ্বল হবে এই তো।

কিন্তু জুঁই মরিয়া হয়ে উঠেছে এখানে আসতে, না কি তাকে মরণ ফাঁদে ফেলতে নিয়তিই টেনে এনেছে তাকে। কে জানে। এজাজুলের মা এখনো আছে। এ ঘরে তার একগাদা ছেলেপুলে। এখন আর এ বাড়িতে আসেও না। সবার ধারণা, হয়তো এজাজুল বড় হয়ে তার মায়ের খোঁজ খবর রাখে। কিন্তু বউ যখন জানে তার মা-ও নেই। বাবার ভালো অবস্থা ছিলো…। গোমরে একসঙ্গে সবাইকে সে আটকে রেখেছে। অবস্থা বুঝেই নূপুরকে কথা বলতে হচ্ছে হিসাব করে করে।

জুঁই পাশের ঘর থেকে নেমে এলো নূপুরের কাছে। মেয়েটি জুঁইকে সব বিষয়ে কৌতূহলী করে তুলেছে। কী যেন আছে ওর মুখশ্রীতে। নাকি কোথায়? তন্নতন্ন করে খোঁজে জুঁই। কিন্তু ও চোখ তুলে তাকালে জুঁইয়ের সব কথা হারিয়ে যায়। মুখোমুখি দেখাতে সব প্রশ্ন ঠেকে থাকে। সবার সঙ্গে আঞ্চলিক ভাষায় কথা বললেও তার সঙ্গে কথা বলছে একেবারে শুদ্ধ উচ্চারণে। ওর পেটের বিদ্যের বহরে যে জুঁই অনেক খাটো হবে। ওর চেতনার কাছেও যে সে অনেক নিষ্প্রভ, একটুকু সময়ে সে তা স্পষ্ট করে বুঝে ফেলেছে। আচমকা নূপুর বলে ওঠে, ‘ভাবি আপনি কিন্তু আমার বাবার সঙ্গে কথা বলেননি! আমার বাবা একজন অসাধারণ মানুষ। আপনাকে এভাবে বলছি, কারণ আপনি তো শুধু শহুরে ঘষামাজা মানুষগুলো দেখেছেন, কিন্তু যে গুণগুলো না থাকলে একটা মানুষকে মানুষ বলা যায় না, আমার বাবা সেটুকুতে অন্তত পূর্ণ।’

শহর সম্পর্কে তোমার ধারণাটা বোধহয় স্পষ্ট নয়।

জীবনে সব পাওয়াই প্রায় আপনাদের হাতের মুঠোয় এসে ধরা দেয়। অন্য কোনো মানুষ সম্পর্কে যদি কোনো কষ্ট আপনারা পোষেণও, বেশিরভাগ সময়েই হয় তা শখ করে। আর আমাদের দেখতে দেখেতে শিখতে হয়। বড় জড়াজড়ির জীবন আমাদের! কারো কাছ থেকে কারো আড়াল নেই বললেই চলে। একজনের আঁচে তাই কেই-বা চায় অন্যজনকে পোড়াতে? আমাদের জীবন থেকে কষ্টের  বোধটুকুও তাই কাকের মতোই তাড়াতে হয়।

জুঁই কথা খুঁজে পায় না। এমনিতে পথের ক্লান্তিতে ছেয়ে আছে ওর চোখ। কিন্তু জড়ানো দৃষ্টিতে বিস্ময় ঢেলে তাও তা মেলে রাখে নূপুরের ওপর। বারান্দায় মোড়া পেতে দু’জন বসে আছে ওরা পাশাপাশি। অদূরে অর্ধেক বারান্দাজোড়া হুরমত মোল্লার বাপজানের আমলের চৌকিখানার’পর হুরমত মোল্লা কুণ্ডলি পাকিয়ে বসা। ঘোলা চোখ দু’টি বন্ধ করে সে বর্ণাঢ্য ভাঁজের মুখখানার ভার রেখেছে একত্রে দু-হাটুর উপর। জীর্ণ, অথচ ধবধবে পাঞ্জাবিটি তখনও নতুন বউয়ের সৌজন্যে খোলা হয়নি। তার সঙ্গে বউটির এখনো কোনো কথা হয়নি। তবে দু’জনের চোখে চোখ পড়েছে ক’বার, তাতেই ফুটে উঠেছে লাজুক আভা।

নীরবতা গুমোট হয়ে ওঠায়, নূপুর ঝড় ডাকার মতো প্রসঙ্গ টানে, ভাবি আমার একটা ভাগ্নে আছে, অপু। ও আজ বাড়ি থাকলে আপানাকে দেখে খুব খুশি হতো।

কোথায় গেছে? বিস্মিত প্রশ্ন জুঁইয়ের।

হুরমত মোল্লার চোখে অগ্নিবলয়ের মতো কীসের যেন বিচ্ছুরণ চমকাতে থাকে। ওভাবে সে নেমে এসে নূপুরের মাথায় হাত রাখে। নূপুরের দৃষ্টি এতে গুটিয়ে আসে প্রসন্নতায় নিজের ভেতরে। এ সময়ে কথা বলতে গেলে বাবার চেপে রাখা কান্নার বাঁধ ভেঙে একাকার হয়ে যাবে। হয়তো তার নিজেরও। তা ভেবে নূপুর গুটিয়েই থাকে। ওভাবেই দাঁড়িয়ে থেকে অনেকক্ষণ পর অন্ধচাতকের মতো মুখ খুললো হুরমত মোল্লা ‘অপু ঢাহারতে আইছ্যে। ও, ওগে বাড়িতি গিয়ে ওঠছে রে মা! ও ডাহার সবচে বালো কলেজে টিকে গেইছে। ওর এহন মেলা টাকার দরকার! ওয়ার বাপ টাকার যোগাড়ে ব্যস্ত। টাকা পালিই ও যাওয়ার পথে আমাগির সাতে দেখা করে যাবেনে। খবরডা পাইছি গত সপ্তাহে হাটে…। তোরে আর কইন্যাই! বালোই অইছে, আমার ভয় ছেলো শ্যাষে কিনা তমিজ আলী কয় ‘আমার ছাওয়্যালডারে পর হরে রাখলো।’ ভাবছিলাম তোরে নিয়ে খোশামুদ্ধি করে, একদিন ওয়ার নতূন মার আতে তুইলে দিয়ে আসফো। ছাওয়ালডা আমারে বড় বাঁচানি বাঁচাইছে রে মা।’

নূপুরের চোখ কোথায় যেন ছুটছেই। জুঁই তার দুর্বোধ্য প্রসঙ্গে হাঁপিয়ে ওঠে কূল-কিনারা খুঁজতে। ঘরের ভেতরে এজাজুলের ঘেমে নেয়ে একসা অবস্থা! সমস্ত পৃথিবী সংকুচিত হয়ে আসছে তার কাছে। দরজাটুকু পেরিয়ে এলে খোলা বাতাস। কিন্তু শেকড় ছাড়াতে পারে না তার পুরনো ভিত্তি থেকে। কারো কোনো কথা তার কানেও ঢুকছে না।

হুরমত মোল্লার তখন থেকে কথা থামেনি।…পরের আমানত ধরে  রাখতি নাই… ছাওয়ালডা এবাবে আমারে বাঁচালো…। আসামানের রং কাউয়ার ডিমের মতোন অইয়া ওটছে। ম্যাগ-বৃষ্টি আইসে পড়লি আর উপোয় নাই। নতুন বউডো বাড়ি আলো মাত্রর। বৃষ্টি আসফার আর সুমায় পালো না! মনে অচ্ছে একসঙ্গি আসমান ভাইঙে পড়বি। মষির মতোন সব ম্যাগ দিগ-দিগন্তি ধইরে ফেল্যাইছে দত্যির মতোন নাচনে…।

নূপুরের চোখের দৃষ্টি কোথায় গিয়ে ঝুলছে, শিক্ষিত-বুদ্ধিমতী জুঁই ত্রস্ত হয়ে খুঁজতে থাকে। অস্বাভাবিক এক দ্যুতি ঠিকরোতে থাকে নূপুরের চোখের মণিতে। জুঁই বুঝতে পারে তার মন কোথাও আঁতিপাঁতি করে কী খুঁজছে। সে কি মৃগনাভী হরিণের মতো কোনো বেদনা? নাকি ভোকাট্টা ঘুড়ির মতো কোনো সুখস্মৃতি খুঁজছে সে ভারি মেঘের সব পরত ফুঁড়ে! যার কোনোটির আভাসই পায়নি জুঁই জাগতিক সহজ সব প্রাপ্তি ছাপিয়ে!

ডাক্তার বাবা তাকে বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন তাঁর বন্ধুর ছেলে, ডাক্তার যোবায়েদের সঙ্গে। কিন্তু যোবায়েদকে জুঁইয়ের যতটা জিনিয়াস মনে হতো, ঠিক অর্থ-বিত্তবিলাসী জীবনযাপনে ততটা উচ্চাকাক্সক্ষী মনে হতো না। এজাজুলেরও ছিলো ওর ভাইয়ের সঙ্গে জানাশোনা। ঠিক বন্ধুর মতো না। কিন্তু সুমাইয়া খন্দকার ওরফে জুঁই যখন টের পেলো অর্থ-বিত্ত, বিলাসী জীবন যাপনে উচ্চাভিলাষী এজাজুল তার টানেই এ বাড়িতে আসে, তখনই সে জলের মতো গড়িয়ে গেলো তার দিকে।

বিষয়টি টের পেয়ে শঙ্কিত বড়ভাই, যোবায়েদকে জানাতেই সে বলেছিলো, ‘সহসা কুলপ্লাবী যে হতে চায়, তাকে ভাসতে দাও। যাকে বলে সরোবর! তবে তোমার বোনের যদি সময় থেকে থাকে, ওকে ভেবে দেখতে বলো এজাজুল ওকে না ওর নামের বাড়িটিকে বেশি চায়? কারণ ওরকম টোপ সে আরো পেতেছিলো বন্ধুবান্ধবের ভেতরে। কিন্তু নিজের সামঞ্জস্যহীন আচরণে তা ধোপে টেকেনি কোথাও।’ চার বছরের সংসার। কিন্তু যাকে নিয়ে সংসার, প্রতি সে যতই তার প্রতি মনোযোগী হয়েছে, ততই যেন তাকে অচেনা ঠেকেছে! লেখাপড়ায় জুঁই বরাবরের অলস। ইডেনে এম এ পড়তে পড়তে বিয়ে। তারপর আর লেখাপড়া ভালো লাগেনি। ততদিনে ও বুঝে গেছে এজাজুলের এত জোর নেই যে ওর ওপর কোনো ধরনের চাপ সৃষ্টি করে। সেটুকু পারলে অন্তত অনেক ঘাটতি পূরণ হয়ে যেত। তবে বাড়ির সঙ্গে ওর সম্পর্কটি সহজ হয়ে এসেছে। দাম্পত্য-জীবনে জটিলতা তাই হয়তো পরিহার হয়ে আছে।

নূপুরের দৃষ্টি কোথায় ভাসছে, ডুবছে, চমকাচ্ছেখুঁজতে-খুঁজতে নিজের দু’চোখের জ্যোতিও বুঝি তাতে দড়ির মতো জড়িয়ে ফেলে জুঁই। চোখের তারা তার ভাসতে থাকে ভেতরের জমাট অথৈ অন্ধকারে। তার নিজের সব কিছু ঢেকে যায় এতটুকু সময়ের পেক্ষাপটে। তাইতো অধীর হয়ে ওঠে সে, সহসা ভীষণ তীক্ষ্ণ স্বরে ডেকে ওঠে, ‘নূপুর! নূপুর। নূপুর, তোমার কী এমন কষ্ট হচ্ছে? আমাকে বলো! দু’হাতে সে পেঁচিয়ে রাখে নূপুরে দু’হাত। হুরমত মোল্লা তখনও চেষ্টা ও ব্যর্থতার সংঘাতে আচ্ছন্ন। … হাতির পালের মতো হিংস্র হয়ে ওঠা মেঘের পালের ভয়ে ভীতও বুঝি-বা।

কোন ছিঁটেফোটা নয়, আকাশ উপুড় হয়ে ঢেলে পড়লো বিকেল অতিক্রম করে ছুঁইছুঁই সন্ধ্যায়। নূপুর নখপালিশে রাঙানো জুঁইয়ের মোলায়েম দু’খানা হাত থেকে নিজের আলতো হাত দু’খানা ছাড়িয়ে নিতে নিতে মৃদু স্বরে শুধু বললো, ‘আমার কোনো কষ্ট নেই ভাবি! আমার কোনো কষ্ট নেই! বলেই, নেমে গেলো মধ্যউঠোনে। একেবারে মেহের-খুঁটির কাছে। আকাশের দিকে মুখ উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে নূপুর, যেন মেঘের কাছে মৃত্তিকার মতো প্রার্থনা করছে বেদনার্ত সমর্পণের। ওভাবেই ধীরে ধীরে ঘুরতে থাকে সে, যেখানে অনেকদিন বৃষ্টিতে এজাজুলের হাতের মধ্যে হাত রেখে শা শা ঘুরছে দু’জন। টলোমলো পায়ে অপুও এসে ভিড়েছে তাদের সঙ্গে। বারান্দা থেকে মা চিৎকার করে ভয় দেখিয়েছে মাথা ঘোরার। জ্বর আসার। কিন্তু কে শোনে কার কথা! ওরা নেমে চলে গেছে পুকুরে। বৃষ্টি পেলে পুকুরের পানি কেমন উষ্ণ হয়ে ওঠে। তারিয়ে তারিয়ে দলবেঁধে তাই ওরা শরীরে মেখেছে। প্রাণের মধ্যে আজও রয়ে গেছে যার গভীর সঞ্চার! কতদিন এমন বৃষ্টিতে ওরা চলে গেছে দূরে মাঠে। ফল কুড়োতে বাগানে। ফিরেছে ইচ্ছেমতো হিম, কাঁপানো নীলচে ঠোঁট নিয়ে। মা’র কথা শোনেনি কখনও।

হুরমত মোল্লা বারান্দায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করতে থাকে, নূপুর, নূপুর, নূপুররে…। একসময় তারও কণ্ঠ বুঁজে আসে। এজাজুল ঘরে পড়ে ভিজছে, যেখানে সে সরে দাঁড়ায়, বৃষ্টির ঝাপটা সেখানেই তাকে আগুনের জিহ্বার মতো লকলক করে চাটতে থাকে। পালানোর দরজাটা মিশে আছে অন্ধকারে।

সন্ধ্যা যেন পাঁজর ভেঙে ছত্রখান করে রাত নামিয়ে এনে দিয়েছে হুরমত মোল্লার চোখে। গোলানো কালি শুধু ঢেলে পড়েছে চাল বেয়ে। ভিজে চুপসে আছে সেও। সন্ধ্যাবাতির সময় পার হয়ে গেছে কখন! শ্মশানে বৃষ্টি নামার মতো সব অভিযোগ হুরমত মোল্লার উদ্বিগ্ন বুকের চিতায় নিভে আসতে আসতে, হঠাৎ তরল সোনা ছিটিয়ে পড়ার মতো চলকে উঠলো বিদ্যুৎ চমকানোর ঠা ঠা শব্দে।

আঁধার কেটে তাতেই চোখে এসে বিঁধলো উঠোনে জড়াজড়ি করে ভেজা একসঙ্গে দু’টি নারীমুর্তি। বয়সী বৃক্ষের মতো শেকড় ফুঁড়ে উঠে পড়ে সে। তারপর জড়ানো পায়ে হোঁচট খেতে খেতে, দু’টি দুর্বল বাহুতে একসঙ্গে জাপটে ধরে তাদের। সে ভুলে যায় কে তার বুকের ধন, পথের কাঁটা কে। ওইটুকু অন্ধকার, ওই ক’কদম পথ ভাঙার জোর হুরমত মোল্লাকে আবার যোজন যোজন পথের দিশায় ফিরিয়ে আনে। দু’জনকে দাওয়ায় একসঙ্গে গিয়ে সে জোরে ডেকে ওঠে‘এজাজুল, বউড্যারে দর!’

পরনের শাড়ি থেকে চুইয়ে পানি পড়ার মতো, দরজা হাতড়ে ঘরে ঢুকতেই নূপুরের মনেও ফিকে হয়ে আসে সব স্মৃতি-কাতরতা! শুধু মুষল বৃষ্টিই নয়, বাবা তাকে তুলে এনেছে তার হিরেকুচি ধুলোরাঙা শৈশব থেকে। সবুজ ঘাস-ফড়িং কৈশোর থেকে। নিষিদ্ধ স্পর্শের মাদকতায় ঘ্রাণস্পৃহা থেকে। দুর্গার মতো অপুকে নিয়ে তার নাটাই-ভরা মাঞ্জাসুতোর ঘুড়িস্বপ্ন থেকে তার মায়ের চোখের উৎকণ্ঠায় মমতার সেই আধার থেকেও। অরণ্যে লতার মতো যে তাকে জড়িয়ে রাখতো প্রাণে স্বপ্নের মতো নিবিড় করে। অপু তার বহুকালের ওপার থেকে ছুঠে আসা দেবশিশু। আতশি কাচের মতো যে তার সূর্যসারথি।

নিথর হয়ে আছে ক্রন্দসী। উঠোনে গাছ-গাছালির ফাঁক গলিয়ে অন্ধকারও মোলায়েম হয়ে উঠেছে, ধোয়া-ধবধবে আকাশের ছটায়। হুরমত মোল্লার মনে হয়, তার নিস্তব্ধ, বিবর্ণ ঘরখানা ভোরের রোদের মতো জ্বলছে, কেরোসিনের গনগনে প্রদীপ শিখাটি নিস্প্রভ করে দিয়ে, দুটি উজ্জ্বলতর নারীমূর্তিতে। নিজের মেয়েটিকে সহসা সে একাকার করে ফলে অন্য মেয়েটির মুখে। অথচ মুগ্ধতায় জুঁইয়ের বিস্ময় ধরে না নূপুরকে নিয়ে! এজাজুল যার কাছে মাত্র একখ- সীসার মতো। অথবা একটি কাঁচের গ্লাসে এক আঁজলা জলের মতো, শুধুই স্বচ্ছ, বোধগম্যতায় দীর্ণ…।

অমাবস্যার আকাশের তারার মতো চোখে তীব্র আলো জ্বেলে ঋতিপরায়ণা নূপুর নিমিষেই কেমন মেদুর আবহে আবার সেজে ওঠে অলকানন্দা, মেনকা হয়ে। অবদমিত যৌবনের স্থিত আভা ললাট জুড়ে তাতে ফুটিয়ে তোলে পদ্মশ্রী। আর তাতেই কেউ তার মধ্যে ভেসে থাকতে দেখে নিজের জন্য ভয়ঙ্কর অরিন্দম শক্তি! পৃথিবীতে যেন তার নিজের পথ বলে কিছু নেই। কাঁটাগুল্মে ঢেকে গেছে তার সব এই জীর্ণ খাঁচাটিতে এসে।

হুরমত মোল্লার তখনও কান এড়ায় না ঝোপ থেকে ঝিঁঝিঁ ডাকার শব্দটুকু পর্যন্ত। নিজের কাঁধে আগামীকালের লাঙ্গলের ফলার মতোই আবার চকচক করতে থাকে তার ঝিমিয়ে আসা নিথর দেহ-চৈতন্য।

দীলতাজ রহমান। কবি, লেখক ও গল্পকার। দীলতাজ রহমানের জন্ম ১৯৬১ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর গোপালগঞ্জ জেলার চন্দ্রদিঘলিয়া গ্রামে। মা রাহিলা বেগম। বাবা সূফী ভূইয়া মোহাম্মদ জহুরুল হক। ব্যক্তিগত জীবনে দীলতাজ আশিক, ফারহানা, ফারজানা ও আরিফ এই চার সন্তানের জননী। আর এদের...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

বালির বেহালা

বালির বেহালা

বুড়িমাসি বলেন,জীবনটা বালির ঘর গো।ঢেউ এলে ধুয়ে যায় জীবনের মায়া।তবু বড় ভালবাসা ওদের দাম্পত্যে।রোদের চাদরের…..

তদন্ত

তদন্ত

  এক ড্রইং রুমে বসে রয়েছে সদ্য কিশোর উত্তীর্ণ তরুণ গোয়েন্দা সজীব। সামনের টেবিলে ছড়িয়ে…..