আমার দু’চোখজুড়ে স্বপ্ন

তৌহিদ জামান
ছোটগল্প
Bengali
আমার দু’চোখজুড়ে স্বপ্ন

পরিচয়ের প্রথমদিনেই বেশ সহজ হয়ে গেছিল মেয়েটি।
চোখ দুটো চক চক করছিল, উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল। আর মেধাবী বলে যে শব্দটি প্রচলিত; পুরোটাই ছিল গোটা মুখায়বে।

অনার্সে তার সাবজেক্ট ফিজিকস!
তার মানে শুধু মেধাবী বললে চলবে না, পরিশ্রমীও বলতে হবে কোনো প্রকার হেজিটেশন ছাড়াই।

আমরা তখন ছাত্ররাজনীতি করি; সাম্যের গান গাই।

ছাত্রঅধিকার আদায়ে রাজপথ সরগরম করি। দাবি আদায়ের স্লোগানে স্লোগানে ভরে দিই সদ্য রঙ করা শহরের দেয়ালগুলো।

নবাগত মেয়েটি আমাদের সংগঠনেরই কর্মী। থাকতো ভিন জেলার একটি সরকারি কলেজে। কী যেন একটা কারণে কলেজ পরিবর্তন করে আমাদের কলেজে ভর্তি হয়।

আমি দেখেছি, তার কাজলকালো চোখ। তার সেই চোখে ছিল দিনবদলের গান! দুচোখ জুড়ে স্বপ্ন ঝিকিমিকি!

বাড়ি থেকে মাসশেষে খাই-খরচা দেওয়ার মতো পরিস্থিতি ছিল না বাবার, মায়ের। সেকারণে টিউশনি ছিল বাধ্যতামূলক; থাকতো অল্প খরচের ছাত্রীমেসে।

কতদিন পার হয়েছে, কখনো তার মুখে  শুনিনি, জানো আজ আমার অমুক এসেছিল!

প্রভাবশালী এই সরকারি কলেজের ছেলেমেয়েরা সবসময় হালসময়ের পোশাক পরতো। ঠিক রাজধানীর ছেলেমেয়েদের স্টাইলে। কিন্তু মেয়েটি খুব সিম্পল! একদম সাদামাটা ছিল তার পোশাক। কিন্তু, মুখায়ব বিশাল তীক্ষ্ণ!

মিছিলের অগ্রগামী সৈনিক মেয়েটি। পাঠ্যসূচির বাইরের পড়াশুনা আরও বেশি।

শ্রেণিসংগ্রামের চেতনায় শাণিত! ডিবেটে তার সঙ্গে পেরে উঠা ছিল দায়। বিশেষ করে আমার মতো আপাদমস্তক মূর্খের তো বটেই।

পরীক্ষার জন্যে কিছুদিন পার্টি অফিসের আড্ডায় বালুসম উপস্থিতি তার। আমরা মেনে নিই; পড়াশুনা ইজ ফার্স্ট!

পরীক্ষাশেষে ফের সরব উপস্থিতি। আড্ডার আলোচনায় আমি তার নির্বাক স্রোতা! গুণমুগ্ধ ভক্ত যাকে বলে।

আমার মতো ভক্তকে কিছুটা প্রশ্রয় দিতে কার্পণ্য করেনি মোটেও! উস্তাদ জ্ঞান করে দীক্ষা নিতে যাই তার কাছে।

অফিসে একটু লেট করেই আসে সেদিন। হাতে ঠোঙাভর্তি তেলেভাজা আর জিলাপি। বাইরে যারা দাঁড়িয়েছিল, তাদের সকলকে ডেকে আনার দায়িত্ব দেয় আমাকে।

আমি কারণ জিজ্ঞাসা না করেই হুকুম তামিলে এগিয়ে যাই। খাবার সবার হাতে হাতে পৌঁছে যাওয়ার পর হেতু প্রকাশিত হয়।

অনার্সে চমক দেখিয়েছে সে। প্রথম শ্রেণি।

আমি বিগলিত হই! খুশিতে চোখের কোণে দু’ফোটা অশ্রু জমে ওঠে।

তার এই দুর্দান্ত ভক্তকে সেও যে খুব পছন্দ করতো এতোটা জানা ছিল না। জানার কথাও না।

কিন্তু মেসে যাওয়ার আগে, আমাকে ফিসফিস করে বলে- আমার সাথে যাবে?

আমি সানন্দে রাজি হই!

দু’জন পথ ধরে এগুতে থাকি। কী ধরনের আলাপ চলছিল- মাথামুণ্ডুহীন। তার পছন্দ অপছন্দের তালিকার সঙ্গে আমারটার মিল-অমিলের সমীকরণই বেশি মনে হয়। হাঁটতে হাঁটতে কখন যে দু’জনের  দুটো হাতের সংযোগ একটি হাতে হয়ে যায়, মনে নেই!

আমরা হেঁটেছি, অনেক দূরে… খুব দূরে।

আজ রাতটা তার অন্যরকম রাত, কেননা আজকের দিনটা ছিল অন্যরকম দিন।

মেয়েটির সঙ্গে ঘণিষ্ঠতা বাড়ে; তার প্রশ্রয়েই। আমি তার চোখের প্রশংসা করি, সে আমার লেখার। আমি তার ঠোঁটের প্রশংসা করি, সে বলে- লিপস্টিক কিনে দিও!

আমি তার ঠোঁটে বেগুনিরঙা লিপস্টিক মেখে দেই; সে আমাকে বুকের মাঝে পিষ্ট করে…

প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষে পালিয়ে থাকতে হয়েছিল বেশকিছু সময়; মাস দেড়েক মত জেলখানাতেও।
তার সঙ্গে দেখা হয় না ছোট্ট এই শহরে। কত বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে যায় জেলহাজতে কত বন্ধু তাদের! মেয়েটি ভুলেও দেখতে যায়নি আমায়।

কারাগারের মিয়াসাহেব জিজ্ঞেস করে, আপনার কোনও বান্ধবী নেই?

আমি কষ্টটা চেপে বলি- থাকলে তো দেখায় আসতো!
বুকের ভেতর খা খা করে-
কেন্দ্রীয় কারাগারে সবার জন্যে দেখা করার লোক আসে; খোঁজ-খবর নেয় স্বজনদের। ফেরার সময় বিড়ি-সিগ্রেট-ফল-মিষ্টি-বিস্কুট-নয়া শার্ট-গেঞ্জি কিংবা নোট খাতা!
আমি আশা নিয়ে থাকি, হয়তো সে আসবে!

তাকে দেখি না, সেই চকচকে চোখ জোড়া কতকাল সামনে নেই!
একদিন মুক্তি;
অভিমান হয় খু উ ব
ইচ্ছে, নিজে যেচে যাবো না তার সঙ্গে দেখা করতে-
একদিন দুদিন করে দিন পার হয়। নাহ কোনো সাড়া নেই তার।

মাস্টার্সের রেজাল্ট হয়ে গেছে।

যে মেসে থাকতো, প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ সেই স্বপ্ন দেখানো চোখ জোড়াকে দেখতে যাই।

: উনি তো মাসখানেক আগে মেস ছেড়ে দিয়েছেন। এখন থেকে তিনি ঢাকায় থাকবেন- একনাগাড়ে বলে যান বাড়িমালিক।

এবারের শীতটা মনে হয় খুব বেশিই পড়ছে! পা থেকে শরীরের উপরে অংশ শীতল হয়ে যায়। এই সন্ধ্যেবেলায়  সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসছে- কোথা থেকে আসছে এতো কুয়াশা !!

কিছুই দেখা যাচ্ছে না- চশমার লেন্সটাও বুঝি পাল্টাতে হবে…

তৌহিদ জামান। লেখক ও সাংবাদিক। জন্ম, বাংলাদেশের যশোর জেলায় ১৯৭১ সালের ১৯ এপ্রিল। পড়াশুনো সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর। সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত রয়েছেন প্রায় ২০ বছর। সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থায় প্রকল্পভিত্তিক কাজ করেছেন। ছাত্রাবস্থায় প্রগতিশীল বাম ছাত্র সংগঠনের সক্রিয় কর্মী ছিলেন।...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

পটচিত্র

পটচিত্র

  সৌম দাদুর কাছে থাকতে ভালোবাসত। গ্রামের নাম পাঁচুন্দি।আশেপাশে প্রচুর গ্রাম।সবাই সকলের খবর রাখে।সৌমদীপ এখানকার…..