আমার সিনেমা

শাহীদ লোটাস
কবিতা
Bengali
আমার সিনেমা

ঘড়ি

মাঝরাতে ঘুম ভেঙ্গে গেলে শুনতে পাই
কার যেন হেটে চলার শব্দ
চারদিক নির্জন শুনশান,
জনমানবের কোন শব্দ নেই
নেই চলাচল।
তারপরেও যেন তার পা এগিয়ে আসছে ক্রমশ …
কান পেতে শুনি সেই আস-ছেতো আসছেই,
প্রতি মূহুর্ত্যে সে এগিয়ে আসছে কাছে।
সে থামে না কিছুতেই ,
এক ধারার গতি নিয়ে সে হাঁটছে
কাছে আসছে,
কাছে আসছেই…।

কখনো কখনো এমন হয় আমাদের,
আমরা বুঝতেই পারি না এটা কিসের শব্দ,
কিন্তু খেয়াল করলেই বুঝতে পারি,
সময় নিরূপক যন্ত্রের টিক টিক শব্দ এ।

সত্যি বলতে এই কি আমাদের আসল জানা?
এ কি সত্যিই তার পায়ের শব্দ নয় যাকে ধারনা করে ভয় পাই?
যে সামান্য ক্ষণ পরেই আমাদের মৃত্যুতে নিয়ে যাবে?
এ কি আমাদের আয়ুর পদধ্বনি নয়?
যে আমার নির্দিষ্ট আয়ুর পথে হাটার সহ যাত্রী!
রাস্তা ফুরলেই এই টিক টিক শব্দ থেমে যাবে।

আমরা আরো একটু খেয়াল করলে বুঝতে পারি
আমাদের হৃদপিণ্ড আর এই ঘড়ির কাটা
একেই অন্যের পায়ে পা মিলিয়েই হাঁটছে।

ইতিহাস

নিষ্পাপ মুখগুলো ধীরে ধীরে পাপী হয়ে যায়!
পিরামিড উকি দিয়ে দেখে সাগরের নীল আকাশ
হেমন্তের ফুল বাতাসে ছড়িয়েছে মুকুলের ঘ্রাণ,
ফেরাউন নুমরুদ বসে রয় একা অন্ধকারে!
মক্কা মদিনায় বেহেস্তের ধুলোবালি কাফনে ঝরায়ে খেলা করে
উট দুম্বা আমাদের সাদা গাভী কেমন অন্ধকারে হেটে চলে একা,
দিক্বিদিক পর্বত সমান অরণ্যে।

আমরা এমনি কত রাত্রির শীত কাটিয়েছি বসন্ত মায়ায়
কুড়ে ঘরে বসে, তোমার নীল চোখে রুপালী ঠোটে।
ঢাল তলোয়ারে নবী রসুল দরবেশ নিয়ে চলে
হেটে চলি আমরাও রূপালী ঢেউয়ে মরু সাগরে
জল বুকে তৃষ্ণাহীন,
পাগড়ী পরা মুসাফির তাকিয়ে রয় আমরাও মুসাফির হয়ে।

গাজি কালুর রক্তাভ চোখ দেখে ফেলি একবার
আবার তাকাবো বলে ফিরে তাকাই
মেহনতি চাষার দল বিড়ি হাতে টলমল চোখে
তাকিয়ে রয় দুরে,
লণ্ঠন জলে আপন মনে,

পিপীলিকার দল মরে রয় ঋতুর ঘুমন্ত খোপে।

মা

ঔষধ তুমি কি জাদুগর ঈশ্বরের ইচ্ছা?
জনবহুল মৃত্যুর ফুলের দল?
পাপ-নিরাময় বিষাদের বিবরণ?
মা কষ্ট পায়,
মরমে সে কাঁদে,
ঘর অন্ধকার!
সন্ধ্যাব্যাপী শয্যায় আছে মা ঈশ্বর-বন্দনা
হৃদয়ের দার খোলে কাঁদে শৈশব আমার।

বেলা চলে যায় …
নাহার নাহার বলে ঢেকে ছিল যে মায়েরেই মতন
সেও চলে গেছে বহু দিন হলো।
নদী জল হাওর খেলা করে কাঁদে বহুদূর,
মসজিদের মিনার থেকে কে ঢাকে আজ?
মুমূর্ষু আবদার যেতে চাই না,
তবোও যেতে হবে সব ছেড়ে।

আমাদের ঘর নেই,
অথচ ঘরে ঘরে মৃত্যুর মিছিল
উচ্ছিষ্ট মমতায় ভালো বাসে স্বজন
ফুটফুটে দিনের আলো চিরতা ও নীম পাতা তৃষ্ণা মেটায়
দারে দারে বিশ হয়ে দেখা দেয় মহা মানব ও ঈশ্বরের দেবতা।
মৃত্যু আসে! ভয় পাই! মা ভয় পায়!
আমাকে বড় ভালো বাসে, আমরাও ভয় পাই।
ঝরে যেতে যেতে চেয়ে রয় ঘুমন্ত সন্ধ্যায়,
চেয়ে দেখি পৃথিবী নীরব
শূন্যতায় বেদনারা নিয়ে আসে মায়ের আচল,
আকাশে ছড়ায় নীল বেদনার ঘুমন্ত শরীর।
আজ শূন্যতায় চেয়ে রই ভয় কাতর মায়ের চোখে,
অশ্রু বেহুলা বাদক
নীরবে কাঁদে জ্বলন্ত উনুনের হারি
ফেনার ফুটন্ত আওয়াজ রাতের বিছানা বালিশ
মায়ের বুকে ঘুমিয়ে থাকা আশ্রয় রাত!
শক্তি ফুরিয়ে যায়,
দুলো দুলো কাপে শরীর ও হাড়,
বাক্সবন্দি সন্ধ্যা তীরে স্নানরতো ফোটা ফোটা জল,
আজ আর নেই!
আমি বড় হয়েছি মায়ের বিদায় বেলায়।

হতাশা

প্রতিটি সকাল হসপিটালের বেটে শুয়ে
দেখি প্রতীক্ষার আলো বিষাদে রাঙ্গা।
প্রতিটি রাতের বাতাস মনে হয়
ঘুমরে কাদা কেবিনের নির্জনতা।
আমি প্রতি দিন নির্ঘুম রই!
আমি প্রতি মুহূর্ত মৃত্যুর বাহনে বয়ো চলা নাবিক দেখি
দেখি মৃত্যুর কান্নায় বাতাস ভারি হওয়া শ্বাস
আমাকে ছোয়ে যায়।
আমি তাকিয়ে থাকি অচেনা স্বজনের দিকে!
তাদের চোখে অশ্রু শুকিয়ে গেছে
পরিশ্রান্ত শান্ত নির্ঘুম চোখে মমতা ও ক্লান্তি
আরো আছে হারিয়ে ফেলা নতুন বিষাদ।
এখানে মৃত্যু অথবা জীবনের সূচনা
এখানে হাসি অথবা কান্নার রুল।
এখানে তুমি অথবা আমার
নিজেকে হারানোর সময়।

এখানে সাদা কাফন পড়ে পায়চারী করে
জীবনের দেবদূত।
ওরা পাথর নয় আবার যেন তাই,
আবার যেন খুব আপন আবার যেন খুব পর।
তবোও তাদের দিকেই চেয়ে আছ তুমি আমি আমরা সবাই।
একি ঈশ্বরের রূপ?
আড়ালে থেকে নিয়ে যায় যে থাকে নিশ্চুপ।

সুগন্ধ পতন

প্রেমের মতই বেদনারা গতি নিয়ে মনস্তাপ জাগায়,
স্বপ্ন ও মৃত্যুতে কি এক বিবশ কল্পনা আমার,
ভাবনায় কি যে এক প্রতীক্ষা!
কি যে এক শৈশবের স্মৃতি কঙ্কাল হয়ে আসে একাকী!
লালসা দমন অথবা চক্ষু
অতি-দ্রুতবেগ আমাকে নিয়ে যাচ্ছে নক্ষত্র পথে!
মানবীয় সুন্দর ও কুৎসিত মানুষের মতো মানুষ সে.
নারী ও মায়ায়।
প্রাকৃতিক বিচ্ছেদে এখানে কতশত শান্ত পাহাড়
জেগে আছে কতশত সমমান মস্ত পাহাড়ি প্রহরীর,
এখানে কতশত অবরোধের উদার জীবনকাল
ধীরে ধীরে কাছে আসে।
এখানে নেই পরিবারেরে প্রধান কলঙ্ক ও ঘরের দোষ
যে গৃহ পালিত করে রেখে ছিলো এতকাল
রেখেছিলো গৃহ পালিত জীবন
সেও আজ নেই
আবার আছে যেন বিদায়ী সবাই।

আমি আজ বলহীন!
সংক্রামক রোগ স্থায়ী বসতি করে
বেঁধেছে বাসা আমার আয়ু কালে
লক্ষ্মী কুসুম কুসুম ভালোবাসা
লাঙ্গলের ফলার মত বুক ছিঁড়ে বেদনা জাগায়
আঁধারিয়া এ প্রেম কষ্ট ও বিচ্ছেদে ভরপুর।
আমি দেখি বিরোধিতা যে করে উলঙ্গিনী
সেও আজ পাশে দাড়িয়ে আছে চুপ।
বেহেশত ও দোজখের ঋণমুক্ত তফশিলে সঙ্গীহীন
যে প্রতিদ্বন্দ্বী
এ এক তার যৌবনকাল।

আমি এত সব বুঝি না।
বুঝি না একান্তে কি করে সংযত হয়
কি করে ব্যস্ত হয় এত শত কফিন,
কি করে সংযত হয় আমার জীবন আর যৌবনকাল,

একটি শোক সংবাদ

একটি শোক সংবাদ,
একটি শোক সংবাদ,
ড্যাশ ড্যাশ নিবাসী,
ড্যাশ ড্যাশের বড় ছেলে,
ড্যাশ আজ রাত ডেস টায়,
ড্যাশ ড্যাশ ড্যাশতে ইন্তেকাল ফরমাইয়াছেন।
ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্নাইলাহির রাজিউন।
মরহুমের নামাযে জানাযা অদ্য বাদ ড্যাশ
তার নিজ বাস ভবনে অনুষ্ঠিত হবে।
উক্ত জানাজায় নামাযে উপস্থিত হয়ে
মরহুমের আত্মার মাগফেরাত কামনা করুন।

একটি শোক সংবাদ
একটি শোক সংবাদ…

ব্যস্ততম সকালে অথবা নির্জন দুপুরে
কখনো কখনো অন্ধকার রাতেও
শোকার্ত কণ্ঠে এমন শোক সংবাদ ছড়ায় মাইকে,
আঁটোতে অথবা রিক্সায়।
সে আশপাশের এলাকায় সবাইকে জানিয়ে দেয়ে
কারো মৃত্যুর খবর,
জানিয়ে দেয় কারো চিরবিদায়ের এই ব্যাপারটি।
আমরা তখন আফসোস করি,
কিছুটা শোকার্ত হই,
ভাবি মৃত্যু সবারেই হবে।

কিন্তু
তারপরেই সব ভুলে যাই আবার।
ভুলে যাই একদিন আমাদেরো মৃত্যু সংবাদ
এমনি ভাবে সবাইকে জানিয়ে দেওয়া হবে,
প্রচার করা হবে মাইকে অথবা অন্য কোন মাধ্যমে,
একটি শোক সংবাদ,
একটি শোক সংবাদ।

শ্রোতারা সেই শোক সংবাদ শুনে
শ্রোতাদের কারো কারো মায়া হবে তখন,
কেউ বা চিনতেও পারবেন আমাদের,
কেউ পারবেন না।
এক সময় তারাও আমাদের ভুলে যাবেন,
আমরা যেভাবে ভুলে যাই আমারদের সময়ে
মৃত্যু মানুষ গুলো কে।

তারপর তাদেরো মৃত্যু সংবাদ পৌঁছানো হবে,
পিচ-ডালা পথ অথবা মেঠো পথে
খুব মন্থর গতি নিয়ে রিক্সা অথবা অটোতে,
অথবা অন্য কোন মাধ্যমে,
তাদের সময়ের জীবিত মানুষ গুলো
শ্রোতা হয়ে শ্রবণ করেন তাদের চির বিদায়ের সেই সংবাদ।
এক সময় তারাও ভুলে যাবে তাদের।
তারপর আসবে তাদেরও পালা।
এভাবেই চলতেই থাকবে
চলতেই থাকবে, চলতেই থাকবে,
একটি শোক সংবাদ,
একটি শোক সংবাদ …

কবিবর

ক্ষুদ্রাকার কবিতা বলি আর পদ্যই বলি
সকল রচনা বালিকার দেহ মঙ্গলের স্নান রত ফোটা ফোটা জল!

এমনি কবিতা আয়ুর্বেদীয় চিকিৎসক লেখেন মেহনতি চাষার মতন
পাশে থাকে তার নগ্ন বালিকার সবুজ ঘ্রাণ।
কমবেশি কালিজিরা আমরা সবাই খাই পকেট থেকে মৌমাছিরা হারিয়ে গেলে
আবার স্বপ্ন অথবা সঙ্গমের পর লেখতে বসি বাইবেল, গীতা, কোরানের তাফসির,
এখানে কিছুই নেই পাখিদের চোখে লেখা আছে রোদেলা আকাশ, ঈশ্বরের বন্দনা,
আমি ঠিক ঠিক যুক্তি বিন্ধায় দার্শনিক হয়ে চলে যাই শিয়ালে ডাক শুনে ইস্টিশনে
ট্রেনে আসে ঘুমটা পড়া মাসি পিসি ও দিদি।

ফনি-মনসার বিকেল বেলায়
দেখি নাগ নাগিনী পাশে,
কোলে তার বিশ্ব মঙ্গল
সর্প জননী হাসে।

লেখতে লেখতে সিগারেটে টান দিয়ে ভাবি, আজ বোধহয় বৃষ্টি হবে!
এই বৃষ্টি আকাশ পানি আর মগজের মায়ায়,
বৃষ্টির সাতারে নিয়ে আসবো হিম ঘরে জেগে থাকা ফুটফুটে বিকেল।
নাহ বৃষ্টির মাঝে আনতে হবে শিয়ালের বিয়ে, তবেই না পাঠক
পুঁতো পুঁতো ভালোবাসায় আমাকে ঝরিয়ে ধরবেন।

পরিশেষে আমার কবিতা পরে পাঠক কিছু বুঝুক আর নাই বুঝুক
তার কেমন কেমন করতেই হবে, পাঠকের মেজাজ ও মাথা
কেমন কেমন না করলে আমার কবিতা কোন কবিতাই হল না।

আমার সিনেমা

সিনেমাগুলো পুরানো হয়ে গেছে খুব। সেইসব আর চলে না এখন।
যারা ছিলো আমাদের স্বপ্ন, যাদের পোশাকের মত পোশাক খুঁজে খুঁজে হয়রান হতাম এ দোকান থেকে সে দোকানে, সেই সব তারকাদের কেও কেও আর পৃথিবীতেই নেই,
যারা আছেন তারাও বয়সের ভারে নুইয়ে পড়েছে খুব, কেও অসুস্থ কেও বা বাসাতেই কাটায় সারাটা দিন। এই প্রজন্মের ছেলে মেয়েরা তাদের চিনতেই পারে না আর, চিনলেও মুখ টিপে হাসে। বিনোদনের জন্য যখন আমাদের সময়ের কিছু দেখতে বসি, কেও না কেও এসে বলে, এসব কি দেখ, এসব কি চলে নাকি আর, সেই মান্ধাতা আমলের ফালতু জিনিস।

আহারে আমার সময়!
কি দুরন্ত ছিলো সেই সব দিন, টিফিনের টাকা জমিয়ে ইশকুল ফাকি দিয়ে সিনেমায় দল বেদে যাওয়া, এক ছবি কয়েকবার দেখেও যেন মিনেটি পিপাসা, ছবির দৃশ্য চোখে ভাসতো দিনের পর দিন মুহূর্তের পর মুহূর্ত, সেই নিয়ে কত কত আড্ডা, কত কত আলাপন। সেই ছবির নায়কের মতো নিজেকে ভেবে কত কত বার হয়ে যাওয়া নায়ক, নায়িকাকে কল্পনায় এসে কতবার প্রেমে পড়েছি নিজেরেই অজান্তে।
আহারে আমার সময়!
পৃথিবী বুঝি এভাবেই ফুরিয়ে যায়, ফুরিয়ে যায় সব স্বপ্ন,
ফুরিয়ে যায় সব প্রিয় প্রিয় মুখ। প্রিয় ছবির প্রিয় আবেগ।

পয়গাম

আমার প্রিয় বন্ধুরা প্রিয় স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষী সবার ঠিক আমার সঙ্গেই মৃত্যুর পয়গাম এসে গেলো। এ খবর শুনে আমি আত্মহারা হয়ে গেলাম, খুশীতে আমার মন উতলা হয়ে উঠলো, মনে হলো আমরা সবাই মিলে যেন যাচ্ছি কোন এক নতুন দেশে, নতুন ভূখণ্ড আবিষ্কারের অভিপ্রায় নিয়ে আমাদের এই যাত্রা। আমরা সবাই এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও কোন দুঃখ নেই কারণ সেখানে আবার আমরা হাসবো খেলবো মার্কেটেও যাবো এখানকার মতো, আমরা একে অপরের সঙ্গে দেখা করবো, খোজ খবর রাখবো ঠিকঠাক, সেখানে আমারদের কোন রোগ শোক নেই, নেই খাদ্য বস্ত্র, বাসস্থানের তাগিদে প্রতিনিয়ত দুশ্চিন্তা আর হাড়ভাঙ্গা খাটুনির কাজ, সব এমনি এমনি আমরা পেয়ে যাবো ঠিকঠাক, তাই আমাদের গল্প করবার, সঙ্গম করবার, সরাব খাওয়ার অফুরন্ত সময় আছে সেখানে। আমাদের অফুরন্ত সময় আছে প্রিয় মানুষ গুলোর সঙ্গে আড্ডা দেবার। হঠাৎ আমার এই ভেবে খারাপ লাগলো বাকী যারা রয়ে যাবে তাদের কথা ভেবে, এক সঙ্গে যেতে পারলে অনেক ভালো হতো। মৃত্যুর পয়গাম আমার মনের কথা বুঝতে পেরে বলে উঠলো, ভাবনার কিছু নেই, বাকীরাও ধীরে ধীরে এসে যাবে তোমাদেরেই কাছে।

মুমূর্ষু

আমার ফোনে কল এলো আমার খুব কাছের একজনের,
খোশগল্প করার পর সে আমাকে জানালো এই কথোপকথনেই তার সঙ্গে আমার শেষ কথোপকথন। আমি হেয়ালী ভাবে তাকে বললাম, ঠিক আছে। কারণ এমন রসিকতা আমাদের মাঝে হর হামেশাই হয়। সে কিছুটা শান্ত কিছুটা মলিন হয়ে বললো, সত্যিই এই কথোপকথনেই শেষ কথোপকথন আমাদেরে। তখন আমি চমকে যাই, প্রশ্ন করি কি বলছো এসব? সে তখন কাঁদছিলও কি না বুঝা গেলো না, কারণ আমি তাকে দেখতে পাচ্ছি না। সে বললো, সে মারা যাচ্ছে খুব দ্রুত, ডাক্তার বলেছে সর্বোচ্চ এক মাস আয়ু আছে তার। আমি তার কথা শুনে অট্টহাসিতে হাসতে লাগলাম, হাসি আমার কিছুতেই থামলো না খানিকটা সময়, হাসি কিছুটা কমিয়ে তাকে বললাম, মৃত্যুতে আবার মন খারাপ করার কিছু আছে নাকিরে বোকা? আমরা সবাই তো মৃত্যুর দিকেই যাচ্ছি, কেউ আগে কেউ পরে, এতে মন খারাপের কি আছে? বরং এটাই সব চেয়ে আনন্দের সংবাদ, যারা আমাদের ছেড়ে চলে গেছে পরলোকে তাদের সঙ্গে দেখা হবে এই ভেবে আনন্দিত হও! যাদের মৃত্যুতে আমরা কান্নায় ভেঙ্গে পরেছিলাম, মনে করেছিলাম তাদের ছাড়া আমাদের চলবেই না, তাদের কাছেই ফিরে যাচ্ছি এই ভেবে উল্লসিত হও। বলতে বলতে আমার হাসি আরো বহুগুণে বেরে গেলো তখন। আমার হাসি আর আমার কথা শুনো ওপার থেকে ওর কণ্ঠ কিছুটা স্পষ্ট হলো, কিছুটা সাহস পেলো যেন সে, মনে হলো আমার। ও কাঁপা কাঁপা স্বরে বললো, এসব কি বলো? তাই নাকি? আমি বললাম, সত্যি, সত্যি, সত্যি, আমি তাকে প্রশ্ন করলাম, তোমার দাদাজান দাদী-জান এখন তারা কোথায়? সে উত্তরে বললো, তারা তো বহু বছর আগেই মারা গেছে। আমি তখন তাকে আবারো প্রশ্ন করলাম, তোমার নানাজান নানীজান তারা এখন কোথায়? সে একটু বিরক্ত হয়ে আমাকে উত্তর দিলে, তারাও তো মারা গেছে সেই কবে। আমি তখন আবার তাকে প্রশ্ন করলাম, তোমার বাবা সেও কি মারা গেছে? সে উত্তরে বললো, না, বাবা আমার পাশেই আছেন। আমি তখন তাকে আবারো প্রশ্ন করলাম, তাহলে তোমার আম্মাও তোমার পাশে? সে বড় ব্যথা নিয়ে বললো, নাহ! বছর কয়েক হলো আম্মাও আমাকে ছেড়ে চলে গেছেন পরলোকে। আমি তখন তাকে বললাম, তাহলে তুমি কেন ভয় পাচ্ছ এত? তোমার মৃত্যু মানে-ইতো তাদের কাছে চলে যাওয়া, তুমি কি তাদের কাছে যেতে চাও না? তাদের সঙ্গে গল্প করতে চাও না আর? তখন সে বলে উঠলো, অবশ্যই, অবশ্যই চাই, তারা আমার আপনজন খুব কাছের মানুষ, আম্মাতো আমাকে ছাড়া কখনো খাবারেই খেতো না, দাদাজান আমাকে তার কাঁধে নিয়ে পাড়া বেড়িয়েছে কত, কিছু অপরাধ করলেই দাদী-জানের আচলে লুকিয়ে নিজেকে বাঁচিয়েছি বাবার পিটুনি থেকে। আমি তখন তাকে বললাম, সেই ভালোবাসার মানুষ গুলোর কাছে ফিরে যাবে তুমি, যেখানে আর কোন মৃত্যু নেই, মৃত্যুতে তুমি আর হারাবে না কখনো তাদের কাছ থেকে। তখন সে আমাকে বললো, তাহলে তুমিও চলো না, আমরা এক সঙ্গে থাকবো। আমি বললাম, আমি যদি যেতে পারতাম সেই কবেই তো চলে যেতাম পরলোকে, যখন আমার আম্মা পৃথিবী থেকে বিদায় নিলো, যখন প্রিয়তমা চলে গেলো জীবন থেকে, তখন মরে যেতে ইচ্ছে হয়েছে কতো, মৃত্যু মানেই পরিত্রাণ অথবা অন্য কিছু! আমার ডাক আসা অবধি আমাকে যে অপেক্ষা করতেই হবে। তখন সে কিছুটা ব্যস্ততা নিয়ে আমাকে বললো, টিক আছে, ঠিক আছে, তাহলে আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করবো, আচ্ছা আমি তাহলে এখন রাখি, আবার আমাদের কথা হবে পরলোকে, অনেক প্রস্তুতি বাকি আছে আমার, এই বলে সে ফোন কেটে দিলো।

শাহীদ লোটাস। বাংলা ভাষার লেখক, বাংলাদেশ-এর নেত্রকোনা জেলায় মোহনগঞ্জ থানায় ৩০ মে ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। বাংলাদেশ ও ভারতে শাহীদ লোটাস-এর বেশ কয়েকটি উপন্যাস, কাব্যগ্রন্থ ও প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। তিনি সমসাময়িক বিষয় নিয়ে লিখতে উৎসাহবোধ করেন।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

ফেরা

ফেরা

ফেরা অনেক দিন আসিনি তোমার চোখের কোণে, বুকের পাশে, নিঃশ্বাসের চারপাশে। ভেবো না আমি পথ…..