আমি অনন্যা

চৈতালী মুখার্জী
কবিতা
Bengali
আমি অনন্যা

আমি অনন্যা

আমি সয়ে যাই তাই অভ্যাস যাতনার,
মনে দাগ কাটেনা বেদনা।
আমি নীরব তাই নীরবতা আমার গহনা?
বাতাসও তো বিদ্রোহ করে!
গর্জে ওঠে তো আকাশ!
পাহাড়ে ফাটল ধরে,
সমুদ্র তুফান ওঠায়।
আমার বুকে হালের ঘায়ে লক্ষ্য যাতনা।
আমার রক্তের দাগ! আমার রুদ্ধ কণ্ঠের বাক!
নিস্তব্ধতায় হারিয়ে,
তোমাদের উল্লাস।
পেট ভরে তবু মন ভরেনা।
আমি সয়ে যেতে পারি তাই,
আমার সয়ে যাওয়া স্বভাবিক ছন্দের দ্যোতনা।
আমার হৃদয়ে কোলাহল শুধু,
চাপা পড়ে যাওয়া কান্না।
আমি পান করি অশ্রু তাই,
হাজার আলোক বর্ষ হতে অশ্রুই শুধু পাওনা।
আমি কেঁপে উঠি কখনও,যখন
ভার হয় দুর্ভর,
ক্ষণিক ক্ষলনে,তবু মনে প্রাণে,
ভালোবাসা,মমতা,স্নেহ,করুনা।
আমি নিষ্ঠূর অগ্নিদহনে দাবানল
দিতে পারিনা
দাবানলে আমি জ্বলে পুড়ে কালো
তবু আপন স্বরূপে, চেতন অবচেতনে
প্রেমের ধর্মে,
আমি অনন্যা, আমি অপরাজিতা
তাই শত বলিদানে, রক্তক্ষরণে,
লুকাই আমার কান্না।

 

উৎসর্গ

তোমার সেবায় উৎস্বর্গ করো আমায়,
তোমার পূজায় দাও বলি আমার অস্তিত্ব।
আমার সুখ,দুখ দিয়ে জলাঞ্জলি,
আমায় তোমার চরনে বিলাই।
আমাকে গ্রহণ করো তোমার জগৎ সেবায়।
পূর্ন করো আমার জীবন তোমার অমৃত সাগরে।
আমি চাইনা মুক্তি,  দিও শক্তি।
তোমার দেওয়া ভার বহিবার।
আমায় বাঁধো আরও আরও শক্ত করে বন্ধনে তোমার।
জগতের অশ্রু মোচনে যদি ঝড়ে অশ্রু আমার!
দেবো সে গঙ্গাজল তোমার পায়ে।
তোমার পুজার থালায়।
হে মোর জননী, আমার পরিপূর্নতা তোমার জগৎ সেবায়।
তোমার বিশ্বযজ্ঞে পূন্যার্ঘরূপে উৎস্বর্গ করো আমায়।
দাও অভয়, দাও আশ্রয় তোমার পদতলে।

হরপ্পা মহেঞ্জোদরো

আজ বড় ভয় হয় জানো,
প্রতিমুহূর্তে মনে হয় মানবসভ্যতা ধ্বংসের মুখে
এক পা এক পা অগ্রসর হচ্ছে!
আবার বোধহয় শুরু হবে শেষ থেকে!
আবার আর এক হরপ্পা মহেঞ্জোদরো।
কালচক্রে ধুলায় বিলীন তখন আমরা সবাই,
আমাদের কান্না,হাসি, খুশি, আশাগুলো,
পাওয়া নাপাওয়াগুলো, সব চাওয়াগুলো বাতাসে মিশে যাবে|
কান পাতলে হয়তো শোনা যাবে দীর্ঘশ্বাস!
আবার নুতন শুরু
ধীরে ধীরে বিকাশ সভ্যতার!
তারপর আবিষ্কৃত হবে হরপ্পা মহেঞ্জোদরো আবার।
নুতন করে লেখা হবে ইতিহাস।
বিবর্তিত হতে থাকবে সভ্যতা পৃথিবীর,
নূতনভাবে,নুতনধারায়।
তারপর যেই চেতনা বুদ্ধির উদয়!
যখনি জৈবিক প্রয়োজনে একটা আড়াল,
একটা গন্ডী!
সভ্যতার বিকাশ তখন আবার।
বড় হতে হতে সে গন্ডী পরিবর্তিত সীমারেখায়।
লড়াই নিজের অধিকারের,
স্বার্থপরতা মাথা চাঁড়া দেবে আবার!
শিক্ষার সাথে অশিক্ষা
যখনি মাত দেবে নিশ্চিত মৃত্যুকে,
বসাবে নিজেকে ঈশ্বরের আসনে!
শুরু হবে মৃত্যুর খেলা।
একে অপরকে দেবে গরল শুধু!
বিষে ভরে উঠবে পৃথিবীটা আবার!
আধুনিকতার প্রদূষণে,
আরো আরো আরো চাই!
লোভের পাহাড়ে মৃত্যুর হাতছানি!
আড়ালে স্মিত হাসি, তার কটাক্ষ।
নিমেষে শেষ সব।
দুহাত জুড়ে প্রার্থনা শুধু তাঁর কাছে রক্ষার!
তবু যে বড় দেরি হয়ে গেছে।
অসহ্য তাঁর প্রিয় ধরিত্রীর পাপের ভার,
শোনিত ধারা বুকে,
তাই তাঁর সৃষ্টির ধ্বংসে সে মাতে আবার,
শিশু ভোলানাথ।

কর্ণ

অন্ধকার রাত্রে ডাস্টবিনে পরে থাকা আজকের কর্ণ,
চিৎকারে বিদীর্ণ করছে পৃথিবী কঠিন আক্রোশে।
অমাবস্যার অন্ধকারে মুখ লুকিয়েছে চাঁদ,
বুভুক্ষু তৃষ্ণা একফোঁটা দুধের।
রাধা নেয়না তাকে কোলে তুলে,
অচ্ছুৎ সুতপুত্র নয় সে।
সে ভবিষ্যৎ, ভবিষ্যৎ কাঁদছে অন্ধকারে
প্রায় চিঁড়ে পৃথিবীর বুক, নিশ্চুপ পৃথিবী।
কোন কুমারী মায়ের না চাওয়া ধন সে!
অন্ধকারে চুরচুর সভ্যতার অস্তিত্বের জানান দেয় তার চিৎকার।
হাত জোড় করি রবীন্দ্রনাথ সরে দাঁড়াও।
তোমার কবিতার ছন্দের স্থানে আজ রক্তমাখা কাপড়ে বাস্তব।
আজও সুকান্ত বলে, ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়।
পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।
ক্ষমা কোর বিবেকানন্দ, তোমার বানী,
কষাঘাতে ঝরছে পৃথিবীর রক্ত।
মায়ের বুকের দুধ মাত্র একটু দূরে!
স্তনবৃন্তে পৌঁছয় না শিশুর মুখ!
কার অপরাধে?
শুধু নারীর লজ্জা? নারীর পাপ?
কেন পরিচয়হীন কর্ণ পৃথিবীর বুকে?
কেন যথেষ্ট নয় মাতৃত্বের পরিচয়?
কেন স্বাধীনতা নেই আপন শরীরে,
কাঙ্খিত পুরুষকে কামনার?
হে কর্ণ, তাই তো হতে হয় তোমায় লজ্জিত বারবার সুতপুত্র পরিচয়ে।
আজকের কর্ণ ছাড়ে হুঙ্কার।
নয় বাহুবলী সে, নয় তীক্ষ্ণ ধনুর্ধর।
সুদে আসলে উসুল করতে পাওনা তার,
করে সমাজকে ছারখার।
অযাচিত কর্ণ আবার জন্ম নেয় পৃথিবীর এখানে ওখানে।
নামহীন, পরিচয়হীন, অন্ধকারের ভয়ঙ্কর গুহায়।
শোনা যায় তার চিৎকার।

 

আমার মাতৃভাষা

আমি পেয়েছি আমার মাযের মুখে আমার মাতৃভাষা,
আমি পেয়েছি আমার দেশের বুকে আমার মাতৃভাষা,
আমি হেসেছি,কেঁদেছি,গেয়েছি সেতো আমার মাতৃভাষায়।
বেসেছি ভালো অনুভুতি টুকু সেই সে মাতৃভাষা।
মিলন সেতু তোমার আমার,
রবীন্দ্র, নজরুল,
এই ভাষাতেই গুল বাগিচায় গান গায় বুলবুল।
অতুলপ্রসাদ, দ্বিজেন্দ্র লাল, শরৎ, বঙ্কিম,
হৃদয়ে অফুরান আমার তোমার মাতৃভাষার ঋণ।
২১ শের ডাকে পথে পথে দিয়ে রক্তের অঞ্জলী,
আজও বাঙালী আমরা অজেয় বাংলায় কথা বলি।
জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপী গরিয়সী।
মাযের মতই মাতৃভাষা তোমায় ভালবাসি।

চৈতালী মুখোপাধ্যায় (কণা )। কবি, বাচিক ও সংগীতশিল্পী। জন্ম ৩০ শে আগস্ট ১৯৬৬ ভারতের পশ্চিমবঙ্গরাজ্যের কলকাতা। বর্তমান নিবাস মহারাষ্ট্রের নাগপুর। প্রকাশিত বই: 'সুবেদিতা' (কাব্যগ্রন্থ, ২০১৯)।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

কবুতর

কবুতর

অগ্নিকাণ্ড আমার চৌহদ্দিতে ধ্বংসস্তুপের ভীড় পুনর্বার নুয়ে পড়া অতীতের তীর জীবনের মাঝপথে রেখে যায় সম্পর্কের…..