আমি এবং একটি ট্রায়াঙ্গল

হিমাদ্রী চৌধুরী
কবিতা
Bengali
আমি এবং একটি ট্রায়াঙ্গল

আমি এবং একটি ট্রায়াঙ্গল

আধো ঘুম আধো জাগরণে
দ্যাখি সিলভিয়া প্লাথ ডাকছে আমায়
মাথার ভিতর তার জ্বলন্ত উনুন

ব্যর্থ পঙক্তিমালা ছুঁড়ে ফ্যালি
ফ্লোরে বিছিয়ে আছে রক্তাক্ত কবিতার মানচিত্র

হাহাকার
ক্ষোভ
বিপ্লব

একজন নুসরাত, একজন তনু, একজন বিশ্বজিৎ
আমাকে পাহাড়া দিচ্ছে
তারা জানতে চায় — প্রাচীণ শ্লোকের ভিতর
ক্যানো ঘুমিয়ে আছে বাঙলাদেশ

জেব্রাক্রসিংয়ে মগজ পিষে যাওয়া বাসের চাকা ভেল পাল্টে আমাকে বিদ্রুপ ক’রে
অদক্ষ ড্রাইভার জাল সার্টিফিকেট নিয়ে চোখ রাঙায় ‘শালা পিইষ্যা দিমু এক্কেরে’

টেবিল থেকে টেবিলে পিতা দৌঁড়ান
ক’জোড়া জুতো গ্যালো হিসেব রাখিনি তার

পুটি মাছ, কই মাছ
শোল, গজার, বোয়াল, পাঙাশ…
[আকারের ভিন্নতায় বদলে যাচ্ছে নোটের শরীর ]

এখানে ন্যায্যতা এবং অধিকার প্রাপ্তিও আমাকে লজ্জিত ক’রে দ্যায়

আমি অজস্র চিৎকারের কথা বলি বলেই
আমি আপোষহীন চুক্তির কথা লিখি বলেই
আজরাইলের মতো আমার দিকে তাক হয়ে থাকে রাষ্ট্রের হালাল ক্ষুধার্ত স্নাইপার
যার বুলেটে খুনের বৈধতা ঘোষণা ক’রে মহামান্য আদালত

বৈধ জন্মের এই দেহ বেওয়ারিশ লাশ হবার যন্ত্রণা মেনে নিতে পারবেনা বলে নিজের ছায়ার থেকেও পালিয়ে বেড়ায়

আমি চাইনা কোন পাপী হাত আমার মুখ চে’পে ধরুক
আমি চাইনা কোন দাস আঙুল আমার হত্যার ফয়সালা লিখুক
(তাই) কবিতার প্লানচেটে ডেকেছিঃ

ঈশ্বর
ক্ষুদিরামের ফাঁসির দঁড়ি
সক্রেটিসের হেমলক
(এবং)
সিলভিয়া প্লাথ…

কেউ সাড়া দ্যায়নি, কেবল প্লাথ জ্বলন্ত উনুন নিয়ে দেখা দ্যায় আধো ঘুম আধো জাগরণে

চোখের সামনে একটি শাদা ক্যানভাস
ক্রমশ রক্তিম হচ্ছে, মার্বেলের মতো গড়িয়ে পড়ছে সূর্যোদয়

চিৎকার চিৎকার চমৎকার…
উজ্জ্বল হচ্ছে একটি ট্রায়াঙ্গল
যার শীর্ষ বিন্দুতে আত্মহত্যার রূপরেখা
পাশাপাশি দুই বিন্দু তে নেচে বেড়ায় দাসত্ব আর শেকল!

 

নারী প্রসঙ্গে

রাত্রির আয়নায় নিজেকে খুলিনি আমি
বুঝিনি আঁধারের ঔজ্জ্বল্য, তীব্র নোনতা ঘ্রাণ
হঠাৎ ঢেউ ভাঙার মতো হরহর করে ভেঙে পড়েনি শাদা লাভা

তবুও স্বপ্নে কেউ আসে, জানালা খুলে দ্যায়
দ্যাখি একটু একটু ক’রে খসে পড়ছে মেঘ
ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে অধর, সাদা জেলীর মতো লোভনীয় লালা

চিবুক বে’য়ে নেমে যায় পাহাড়ি ঢল, নিতম্বে ভেসে উঠে শিকারের নকশা, অশ্বমেধের ঘোড়া
জলের বিছানায় হাসদের জলকেলি

নাভীমূল হ’তে উঠে আসে আফিম, বিকানোর আহবান
সেখানে হাবুডুবু খায় অসংখ্য অপরিচিত চোখ
গোপন বাসনার খেলাঘর
য্যানো শতাব্দীর পর শতাব্দী ডুবে আছে ওই মধুমুখে

বক্ষের মাঝে আবির্ভূত চোরা ঝড়, কম্পমান রিক্টার স্কেল
অতর্কিত হামলার প্রস্তুতি নেয় হাত, ঘন পাইন বনের মতো নিস্তব্ধতা নে’মে আসে চোখে

অপূর্ব বিস্ময়ে অবশ হয়ে যাই, উদোম আকাশ বুঝিয়ে দ্যায় নীলিমা আর মল্লারে যোগরেখা, নৈতিক সমীকরণ

নদী আর নারীর পাঠে জেনেছিঃ

“নদীই নারী, নারীই খরস্রোতা নদী
নদী একটি ফুল, অজস্র ফুলে একটি নারী”

 

অস্বীকার

মৈথুন পর্বে জেগে ওঠেন কোন ঈশ্বর?
আমি তাকে চিনিনা, বুঝিনা তার ব্যাকরণ
অসীম ক্ষমতা তার — চোখ রাঙান (অ)কারণ বাঁকে!

কেন আমি আমার সমুদ্রে বাঁধ দেবো
প্রাগৈতিহাসিক তাড়নাকে চাপা দিয়ে কেন পেরুতে হবে খরস্রোতা জীবন

আমি এক ক্ষয়িষ্ণু মোমবাতি, আয়ুর সরলরেখায় ইজেরাজ চলমান
দোদুল্যমান তারের মাঝে ঝুলছে জোনাক
হঠাৎ ঝাটকায় সোজা অতীতের প্যাভিলিয়ন

আমাকে হাজার বছর বাঁচবার ক্ষমতা দেয়নি
বোহেমিয়ান সুর রপ্ত করার অধিকার দেননি
বিপরীত তীর্থে পরিব্রাজক হবার রায় দেননি

অথচ ক্ষুধা দিয়েছেন (অ)সভ্যতার সমান!

অথচ মৈথুন পর্বে তিনি আমাকে চোখ রাঙান, থামতে বলেন
তার ক্ষুধা — যেন আমি থেমে যাই
আমার ক্ষুধা — যেন তিনি ফিরে যান

মৈথুন পর্বে জেগে ওঠে যে ঈশ্বর, তাকে আমি চিনিনা, তাকে আমি ওই মুহূর্তে জানতে চাইনা।

 

কেঁদো না হে চক্ষু

কেঁদো না হে চক্ষু — বিবস্ত্র সভ্যতার আয়নার সম্মুখে
সময় এসেছে; দীর্ঘ(ই)কার ভুলে যাও

প্রচণ্ড শীতে কাঁপছে মানুষ, মা ও মাটি
আগুন জ্বলছে তবু আলোর অভাব
ফেরারি বসন্তের খোঁজে উঁড়ে গ্যাছে ঘুমপাখি

ভাবলেশহীন পৃথিবী আজ হত্যার মনুমেন্ট
রক্তের আলপনায় বিদায় নিয়েছে লক্ষ্মীর ভার
জন্মের আজন্ম পাপে ছয়লাব সবুজের লাশ
দানবের অর্গাজমে বন্ধ্যাত্ব চিনে নিচ্ছে গর্ভাশয়

সিরিয় শরণার্থী শিবির
ক্ষুধার্ত কঙ্গো, কংকালসার ইথিওপিয়া
বিধ্বস্ত জেরুজালেম, কট্টর হিন্দুস্তান
মৌলবাদী বাংলাদেশ
না খেয়ে মরছে মানুষ- মারছে ভীষণ সুখে

কেঁদো না হে চক্ষু – এই বিবস্ত্র সভ্যতার আয়নার সম্মুখে
ওই দ্যাখো ভাসছে আয়লান, কাঁদছে তাবরেজ আনসারি, অভিজিৎ রায়, বিশ্বজিৎয়ের রক্তমাখা শার্ট

প্রকাণ্ড শীতে জমে যাচ্ছে শোক, ক্ষোভের বাতাস
জ্বালো, নিজের হাড্ডি পুড়িয়ে আগুন জ্বালো
কথা বলো, হটিয়ে দাও কালো থাবা, পুড়িয়ে দাও খুনি হাত।

 

অমানুষ

বরং তোমরা হাত গুটিয়ে রেখো – যখন আমাকে কুপিয়ে হত্যা করা হবে
কোন কথা বলোনা, চুপিসারে মোবাইল খুলে
ভিডিও রেখো সেই হত্যার

ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরছে, ফালা ফালা হয়ে পড়ে আছে দেহ, তবুও তোমরা এগিয়ে এসো না
ওরা আমাকে মারছে, মারুক – তোমরা নিশ্চুপ থেকো
স্মার্টফোনে তোমাদের স্মার্ট হাতে আমার রক্তাক্ত লাশের ভিডিও রেখো, সঙ্গে দু’য়েকটি সেলফি না হলে তো জাত চলে যাবে – তাও তুলো

তারপর – ছড়িয়ে দিও সেই ভিডিও
সেই সাহসী ছবি; একটি লাশ এবং তুমি
ক্যাপশনে লিখো ‘আরেকটি হত্যা, নিন্দা জানাই’

ভার্চ্যুয়ালের এই যুগে প্রতিবাদ মানে — ফেসবুক!
ও বলেছে, আমারো বলতে হবে,
ও দিয়েছে, আমাকেও দিতে হবে:

‘এমনি শর্তে ভাইরাল হয়ে তুমি, সঙ্গী আমার লাশ!’

মত – বিরোধ; যুক্তি – পাল্টা যুক্তি
পক্ষ – বিপক্ষ; কাঁদা ছোড়াছুড়ি

ফলাফল, মন্তব্য –

“কবি মরেছে মানুষ তো মরেনি
আওয়ামী লীগ মরেছে বিএনপি তো মরেনি
বিএনপি মরেছে আওয়ামী লীগ তো মরেনি
হিন্দু মরেছে তো মুসলিম, মুসলিম মরেছো তো হিন্দু মরেনি”

কেবল, ভুলে যেও সবার রক্ত লাল
ভুলে যেও – তুমি মানুষ হতে পারোনি।

হিমাদ্রী চৌধুরী। কবি ও শিক্ষার্থী। জন্ম ও বাস বাংলাদেশের ঢাকায়। লেখাপড়া করছেন ইংরেজি সাহিত্যে। তিনি স্বপ্ন দেখেন পৃথিবী হবে ক্ষুধা ও বৈষম্যমুক্ত। তিনি বিশ্বাস করেন, ভুল বোধের প্রাচীর ভেঙে একদিন আলো আসবেই।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

ফেরা

ফেরা

ফেরা অনেক দিন আসিনি তোমার চোখের কোণে, বুকের পাশে, নিঃশ্বাসের চারপাশে। ভেবো না আমি পথ…..