আমি সাবঅলটার্ন

সুবীর সরকার
কবিতা
Bengali
আমি সাবঅলটার্ন

আদর ও অপমানের কবিতা

লণ্ঠন নামিয়ে রাখা একটা হাট।
এখন সব উপেক্ষা করতে শিখে
গেছি
উপেক্ষা জড়িয়ে ধরে আর অপমান তো
আদরের মতো
ছোলা ও গুড় খেয়ে পালিয়ে গেছে অন্ধ
পাখিরা
কতবার মুদ্রণপ্রমাদ!
কতবার সাদা পাতায় ভূল
অংক।
শিস ভেঙে যাওয়া বলপেনে হিসেব লিখে
রাখি
কচুপাতায় চোখের জল।
একটিও লম্বা রেসের ঘোড়া খুঁজে পাচ্ছি
না

 

আমি সাবঅলটার্ন

আমি মাঠে মাঠে ফেলে এসেছি ভালোবাসা
ইঁদুরের গর্তে হাত ঢুকিয়ে বের করে আনতে
চাইছি হেমন্তের মাঠ
থেকে কুড়িয়ে আনা ধান।
আমি শহরের পথে গড়িয়ে দিতে থাকি ভাঙা
সাইকেল
অভিমান কিংবা বিষাদ
হাসি কিংবা মনখারাপ
সমস্তই বয়ে বেড়াতে বেড়াতে আজ আমি
জঙ্গল হারানো চিতাবাঘ
আমার কোনো প্রত্যাশা নেই
আমার কোনো আক্ষেপ নেই
আত্মহনন লিখে রাখবার মত কোন ডাইরিও
নেই
হাজার হাজার তীক্ষ্ণ ছুরি উড়ে আসছে আমার
দিকে
হাততালি এক ধরণের প্রসাধন
নদীপথে ধীরগতিতে এগিয়ে চলা নৌকোর
জীবন নিয়ে
একটা গাছপালার জনপদ খুঁজে বেড়াচ্ছি
আমি সেলিব্রিটি নই
আমি ভূগোল বইয়ের ৬৭ নং পাতার ভাঁজে
আটকে থাকা পিঁপড়ে
আমি সাবঅলটার্ন।
মাটির জীবন আর জলের জীবন নিয়ে
অনন্ত হাহাকার জাগাই

 

মুদ্রণপ্রমাদ

এই যে ভাষাপুল ডিঙিয়ে চলে যাচ্ছি আমরা
এই যে হবিগঞ্জে দেখে ফেলা সেই বাংলার
দাঁড়কাক
বিপন্ন আমার ভাষা।আজ লিলুয়া বাতাসে উড়ে
যায়।
কাঠের বন্দুক যদি শিরোনাম ভাবি
তবে মাঠে মাঠে জ্বলে উঠবে আগুন
আমাদের ভয়ভীতি নেই।পাগলের আলজিভ
থেকে
গড়িয়ে নামে লালা।
মেঘের দিকে তাকিয়ে থাকা ডাহুক পাখি
শুকিয়ে যাওয়া চোখে জল নেই
আপাতত মুদ্রণপ্রমাদের কথাই বরং ভাবা
যাক
মানুষ পালটে যাবে এটাই স্বাভাবিক
খোলা মাঠে আমরা নামিয়ে দেব গানের
আসর
হিরে বসানো নারীর চোখ,তাকাতে পারি
না
গ্যাস চেম্বারের মধ্যে ঢুকে পড়ছে আমার
দেশ
লোকদেবতার থানে ঢাক বাজে
আমি বেলুনসমেত ঢুকে পড়ি
ঘুড়ি ও লাটাই নিয়ে ঢুকে পড়ি
উড়তে শেখা পাখি আমাকে সাইলেন্স
চেনায়
কেউ কি কান্না মুছে দিতে পারো!
দ্যাখো, পুরোন সার্কাসের হলুদ বাঘ আবার
ফিরতে চাইছে
টানেলে টানেলে হিম ঢুকে পড়ছে
হলদিবাড়ির রাস্তায় শুয়ে থাকছে মস্ত
অজগর
জীবন তো কনসার্ট।
সুপুরির ছায়া জড়িয়ে কেবল
বাজে
আমি ঢিল ছুঁড়ে ফাটিয়ে দেব মাটির
কলসি
জলাধারের ছবি তুলে উপহার পাঠাবো প্রাক্তন
বান্ধবীকে
এই বা-হাতি খালের দেশ
এই গান ও বাথানের দেশ
কাঠের বন্ধুকের গায়ে শ্যাওলা জমলে খুঁজতে
শুরু করি
শিকারকাহিনী।
গোপন গানের মত তুমি ঢুকে পড়েছিলে
জীবনে
প্রলাপ হয়ে ছড়িয়ে পড়েছিলে দিক ও দিগরের
ভিতর
এখন হালকা জঙ্গলে গান শুনতে যাই
গণকবরের পাশে মুখোশ পরে হাঁটি
শিরদাঁড়ায় কেউ বুঝি মরণ ঢুকিয়ে
দিচ্ছে
প্রবেশ কিংবা প্রস্থানের এই জীবন
এখন অবসর ও অবসাদ একসাথেই
আসে
আমাদের নখে সহজ হয়ে ডুবে থাকা
ময়লা
সেদ্ধ ডিম থেকে খসিয়ে দেওয়া
কুসুম
করমর্দন ভালোবাসি কারণ আমার করতল
মসৃণ
ঘোর চলে গেলে ডেকে আনা হবে ঘোড়ার
গাড়ি
এই অনেক রোদের পৃথিবীতে প্লিজ
পাশ কাটিয়ে চলে যেওনা আর
তুমি।

বাঘবন

বকসা ফিডার রোডে তুমি রুমাল হারিয়ে ফেললে
আমি একটা লম্বা দাঁতের চিরুনি খুঁজে বেড়াতে
থাকি
আমাদের বাঘবন আছে
আমাদের শ্যাওলা বর্ণের লণ্ঠন আছে
পানিঝোরার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে বিকেল
আমরা মায়া ও ম্যাজিকের মাঝে গুঁজে দিতে থাকি
আত্মরক্ষা

সুবীর সরকার। কবি ও গদ্যকার। জন্ম ও বাস ভারতের পশ্চিমবঙ্গরাজ্যের কোচবিহার। তিনি মূলত নয়ের দশকে লিখতে আসা স্বতন্ত্র উচ্চারণের কবি ও গদ্যকার। এ পর্যন্ত তাঁর লেখা প্রায় ৩০টি বই প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত বই: কবিতার বই: 'যাপনচিত্র' (১৯৯৬), 'সাদা ঘোড়া ও লোকপুরণের...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

কবুতর

কবুতর

অগ্নিকাণ্ড আমার চৌহদ্দিতে ধ্বংসস্তুপের ভীড় পুনর্বার নুয়ে পড়া অতীতের তীর জীবনের মাঝপথে রেখে যায় সম্পর্কের…..