আমেরিকান সমাজে বিবাহ ও নারী-পুরুষ সম্পর্ক

নাজিম উদ্দিন
প্রবন্ধ
আমেরিকান সমাজে বিবাহ ও নারী-পুরুষ সম্পর্ক

বছর দশেক আগে আমি যখন প্রথম আমেরিকায় গ্রাজুয়েট স্টুডেন্ট হিসেবে পড়তে আসি তখন নতুন দেশে সবকিছুর ব্যাপারে প্রচন্ড আগ্রহ ছিল। সে সময়  শাদা (ককেশিয়ান) ছেলে বন্ধুদের কাছে আমেরিকান মেয়েদের ব্যাপারেও জানতে চাইতাম। আমেরিকান গ্রাজুয়েট স্টুডেন্টরা দেখতাম বেশির ভাগ একা থাকে, গার্লফ্রেন্ড নেই, সে ব্যাপারে আগ্রহও তেমন নেই। আমি জানতে চাইলে তারা বলত,এমনিতেই বেশ ভাল আছে। এনাফ বয়ফ্রেন্ড-গার্লফ্রেন্ড করা  হয়েছে এখন থেকে তারা সিরিয়াস সম্পর্কে জড়াতে চায়, তবে তার আগে তাদেরকে গ্রাজুয়েশান মানে পাশ করে স্কুল থেকে বের হতে হবে।

আমেরিকাতে বেশির ভাগ ছেলে-মেয়েরা  হাইস্কুল সুইট হার্টকে বিয়ে করে ফেলে। বিশেষ করে যারা ব্যাচেলর ডিগ্রি পর্যন্ত পড়ে  প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার পাঠ চুকায় তারা এর বেশি পড়াশোনা করতে চায় না, তাড়াতাড়ি সংসার জীবনে প্রবেশ করে। আর যারা হাইস্কুল পাশ করেই কর্মজীবনে ঢুকে পড়ে তাদের পরিচিতির গন্ডী থাকে আরো ছোট, তারা হাইস্কুলের পরিচিত মেয়েটিকে বিয়ে করে। উচ্চশিক্ষার জন্য যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করে তাদেরকে বিয়ের ব্যাপারটা পিছিয়ে রাখতে হয়, বড়জোর পড়াশোনার সময়টা গার্লফ্রেন্ডের সাথে থাকা যায়, এ সময় তারা পূর্ণাঙ্গ পারিবারিক জীবন, বিয়ে, সন্তান ইত্যাদি ব্যাপারে জড়ায় না। বেশির ভাগের জন্য সেটা সম্ভবও হয় না, কারন গ্রাজুয়েট ছাত্রের যে বেতন তাতে আমেরিকান লাইফ স্ট্যান্ডার্ডে একা চলাই মুশকিল, সেখানে পরিবারের কথা তারা ভাবতেই পারে না।

আজকাল দেশে-বিদেশে সব জায়গাতেই বিয়েতে প্রচুর খরচ,জীবনের সর্বত্র নিয়ম মেনে চলা আমেরিকান সমাজে  বিয়ের অনুষ্ঠান করার জন্য অনেক পরিকল্পনা দরকার হয়। তারপরে সঠিক পার্টনার না হলে কিছুদিনের মধ্যে ‘লাইফ হেল’ হয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে। অনেকের আবার এসব ব্যাপারে একেবারে নিজস্ব অভিজ্ঞতা আছে। কেউ যখন নিজে ‘ব্রোকেন ফ্যামিলি’তে বড় হয় তখন পারিবারিক জীবন শুরু করার ব্যাপারে তাদের মধ্যে একটা ভয় কাজ করে। না জানি তার সংসারও তার বাবা-মায়ের মত ভেঙে যায়। ফলে প্রেম করলেও সহজে কেউ বিয়ের পিঁড়িতে বসতে চায় না। বিশেষ করে ছেলেরা ভাবে সারাজীবন মেয়েটাকে  ‘এলিমনি’ দিয়ে যাবার চেয়ে বিয়ের ব্যাপারে ধৈর্য্য ধরা ভাল।

তাছাড়া  অল্পবয়সে যৌনজীবন শুরু করায় গ্রাজুয়েট লাইফে এসে মেয়েদের প্রতি তাদের আগ্রহে ভাটা পড়ে। আমেরিকান ছেলে-মেয়েদের গড়ে ষোল-সতের বছরের দিকে যৌন অভিজ্ঞতা হয়, ফলে ছাব্বিশ-সাতাশ বছর বয়সে গ্রাজুয়েট স্কুলে আসার আগে তাদের এক ইনিংস শেষ হয়ে যায়। যে এরমধ্যে বিয়ে-শাদী না করে সময়টা পার করে দেয় তার ক্ষেত্রে ৩০ থেকে ৪৫ এমনকী পঞ্চাশ বছর পর্যন্ত যেকোন এক সময় সন্তান নেয়ার জন্য, ‘ফ্যামিলি রেইজ’ করার জন্য বিয়ে করতে দেখা যায়।  অনেকে আরো পরে অনেক বয়সে বিয়ে করে, টাকা-পয়সা থাকার কারনে তারা বেশি বয়সে অল্পবয়সী সুন্দরী মেয়েদের বিয়ে করে, যাদেরকে ‘শুগার ড্যাডি’ নামে ব্যঙ্গ করা হয়।

মেয়েদের ব্যাপারে আমাদের আগ্রহ দেখে তখন আমার ককেশিয়ান বন্ধুরা একটু আশ্চর্য হতো যে ২৫ বছর পার হয়ে গেছে এখনও এত ‘সেক্স’ কেন? ওদের তো জানা নেই আমরা কী রকম রক্ষণশীল সমাজে বড় হয়েছি। ‘ফর্টি ইয়ারস ওল্ড ভার্জিন’ ওদের দেশে মজার বিষয়, এ নিয়ে সিনেমা বানানো হয়। কিন্তু বাংলাদেশে সেটা রূঢ় সত্য, বিয়ের আগে চল্লিশ বছর বয়স হলেও ছেলেটির ভার্জিন হবার সম্ভাবনা বেশি। যাই হোক মেয়েদের ব্যাপারে পিএইচডি স্টুডেন্টদের মতামত ভাল ছিল না। এ সময়টা অনেকে আবার নারীবিদ্বেষী হয়ে যায়। তারা আমাকে বলল, মেয়েরা শুধু তোমার ওয়ালেটটা চায়, এখানে প্রেম-ভালবাসা কিছু না। কারো ক্ষেত্রে পছন্দের মেয়েটি দেখা যাচ্ছে অপেক্ষা করতে চাচ্ছে না, গ্রাজুয়েট স্কুলের অনিশ্চিত জীবন মেনে নিতে চায় না। তারা এখনই প্রতিষ্ঠিত ছেলে চায়, ‘পুওর গ্রাজুয়েট স্টুডেন্ট’ বাপের আদুরে মেয়ের ম্যানিকিউর, পেডিকিউরের পয়সাই জোগাড় করতে পারবে না। তাই এত কিছু বিসর্জন দিয়ে তারা পড়ে থাকতে চায় না। আরেকটা ব্যাপার হলো সুন্দরী, ভাল বংশের মেয়েটা স্কুলে থাকতেই নানাজনের নজরে পড়ে ফলে তারা আগে থেকেই বুকড হয়ে যায়। এ নিয়ে একটা মজার কথা চালু আছে। আমেরিকার বড় শহরে পার্কিং খুঁজে পাওয়া খুব ঝক্কি, বেশিরভাগ সময় ভাল স্পটগুলোতে কেউ না কেউ আগে থেকে এসে পার্ক করে ফেলে, আর যেগুলো ফাঁকা থাকে সেগুলো দেখা যায় প্রতিবন্ধীদের জন্য। পারমিট ছাড়া প্রতিবন্ধীদের স্পটে গাড়ী পার্ক করলে বেশ বড় অংকের জরিমানা গুনতে হবে। গাড়ীর পার্কিং এর সাথে তুলনা করে একইভাবে মেয়েদের নিয়ে ছেলেদের মধ্যে একটা কথা চালু আছে, “অল দ্য গুড ওয়ানস আর টেইকেন, অর লেফট  ফর দ্য ডিজএবলড পিপল।” মানে হলো,ভাল মেয়েগুলো আগেই বুকড হয়ে গেছে আর যেগুলো বাকী আছে সেগুলো ডিজএবলড শুগার ড্যাডিদের জন্য। ফলে তুমি যদি দেরী কর তাহলে তোমাকে পার্কিং স্পট এর মত অনেকক্ষণ খুঁজতে হবে, তারপরে জা পাবে তাতেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে। পার্কিং খুঁজতে খুঁজতে হয়রান হয়ে কোন রকমে গাড়ী পার্ক করার জায়গা পেয়ে মানুষ যেমন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে তেমনি বিয়ে করতে পেরে একটা স্বস্তি আসে। বিয়েতে দেরী হয়ে গেলে ছেলেদের বেশিরভাগ তাই আর এনিয়ে হা-হুতাশ বা তাড়াহুড়ো করে না, ধীরে-সুস্থে টাকা-পয়সা জমিয়ে বিয়ে করে।

ছেলেটা চল্লিশ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারে, মেয়েটা কিন্তু পারেনা। বায়োলজিক্যালি সে পারে না। ফলে তাকে হয় নতুন পার্টনার বেছে নিতে হয়, অথবা ছেলেটাকে বেশি পছন্দ করে ফেললে ছেলেটার সাথে ‘লিভ টুগেদার’ করে গরীবী হালতে থাকতে হয়। বেশিরভাগই সেটা করে না, বিবর্তনবাদ তাকে করতে দেয় না। ছেলেটাকে পছন্দ করা থেকে শুরু করে ভবিষ্যতে সন্তান নেয়া, সে সন্তানের নিরাপত্তা, তার নিজের নিরাপত্তা  ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মেয়েটাকে ভাবতে হয়। মেয়েদের অবচেতনে সেটা সবসময় কাজ করে, এজন্য তাকে অনেক হিসেব-নিকেষ করতে হয়। বায়োলজিক্যালি বলতে গেলে আগেকার দিন হলে মেয়েটা শক্ত-সমর্থ, পেশীবহুল,লম্বা শিকারী বা চাষীকে পছন্দ করত, যে তাকে এবং তার অনাগত সন্তানকে নিরাপত্তা দিতে পারবে। আজকে এর সব কিছু পরিবর্তন হয়ে গেছে, জৈবিকভাবে, জীনগতভাবে প্রাধান্য পাওয়া লম্বা,পেশীবহুল,শক্ত-সমর্থ লোকটার চেয়ে এখন যার পয়সা আছে এমন লোকটা চিকন, দূর্বল হলেও সেই বিজয়ী হবে। টকা-পয়সা, বংশ পরিচয় ছাড়া লম্বা,পেশীবহুল লোকটা বড়জোর সৈনিক,  গার্ড বা বাউন্সার হতে পারবে। আধুনিক বিবর্তনে তার স্থান অনেক নীচে, টাকা থাকলে পেশী ছাড়াও নিরাপত্তা মিলবে, লম্বা না হয়েও সে সুবিধা ভোগ করতে পারবে। তাই মেয়েরা টাকাওয়ালা মানুষটাকে বেছে নেয়, তাই অনেক সময় যুবক প্রেমিককে ছেড়ে শুগার ড্যাডিতেও তাদের আপত্তি থাকে না।

ছেলেটি যখন মেয়ে পছন্দ করতে যায় তখন সে তার  সৌন্দর্য্য দেখে, জৈবিকভাবে পুরুষ প্রজাতির সদস্য হিসেবে তার ‘বায়োলজিক্যাল ড্রাইভ’ হলো যত বেশি সংখ্যক জায়গায় সম্ভব ততো জায়গায় তার বীজ ছড়িয়ে দেয়া। ‘ফুলের বনে যারে দেখি তারে লাগে ভালো’ টাইপ অবস্থা। কিন্তু সামাজিক নানা নিয়ম-নীতির কারনে তাকে যৌনাঙ্গ হেফাজতে রাখতে হয়, সমাজে প্রচলিত ট্যাবু, যৌন নিয়ম-নীতি মেনে চলতে হয়। আজকাল বেশিরভাগ সমাজে মনোগ্যামি, কিন্তু সমাজে একই সাথে বহুবিবাহ এবং বহুগামিতাও চলে। প্রাণিজগতে মানুষ ভোদাই টাইপ প্রাণি, মাথাটা না থাকলে তার চার আনা পয়সাও মূল্য থাকত না। তো মানুষ পাখীকে অনুসরণ করে মনোগ্যামাস জীবন বেছে নেয়, কিন্তু সবাই তা করেনি। ক্ষমতাবান কেউ কেউ গরিলার যৌনজীবন বেছে নিয়ে হারেম গড়ে তোলে। আর সমাজের কিছু মানুষ শিম্পাঞ্জির মত বহুগামিতার পথ বেছে নেয়। কিন্তু যে সমাজে যেটা প্রচলিত আছে তার বাইরেরটা মানুষ মেনে নেয় না।

আমেরিকান সমাজে বয়ফ্রেন্ড-গার্লফ্রেন্ড সমাজ স্বীকৃত সম্পর্ক, এ সম্পর্ককে মোটামুটি স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মত বিবেচনা করা হয়। ছেলে-মেয়ে দুজনেই একে অপরকে তাদের বাবা-মা আত্মীয়-স্বজনের সাথে পরিচয় করায়। তারাও তাকে আত্মীয়ের মত মেনে নেয়, পছন্দ হলে ছেলে বা মেয়েটাকে বিয়ের জন্য তাগাদা দেয়। অনেক সময়  স্বাধীনচেতা বা নৈরাজ্যের রাজনীতির অনুসারী ছেলেটা বিয়ে করতে না চাইলে তাদের অন্তঃত সন্তান নিতে বলে। বিয়ে যে সবসময় করতে হবে সেটা ততোটা গুরুত্ব পূর্ণ নয়। কিছু ক্ষেত্রে ছেলে-মেয়ে বড় হলে তখন বাবা-মাকে ফরমালি বিয়ে করতে দেখা যায়। বিয়ের দলিলের চেয়ে সম্পর্কের আস্থাটা তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মেয়েটা যদিও যেকোন পরিস্থিতিতে বিয়ে না করার চেয়ে করাটাকেই বেশি মূল্য দেয়,কিন্তু পরিস্থিতি অনুকূল না হলে কী আর করা।

আমেরিকার মেয়েদের নিয়ে আমার আগ্রহ দেখে শাদা বন্ধুরা বলত, “ইউ ক্যান হ্যাভ দেম, রাইট। বাট মোস্ট অফ দেম হ্যাভ নাথিং টু অফার ইউ।”   পরে আমি দেখলাম আসলেই তাই, বেশিরভাগের ভূগোলের জ্ঞান সামান্য, বাংলাদেশ কোথায় এটা ব্যাখ্যা করতে অনেক সময় লাগে। শাদারা যেসব জায়গায় বাস করে ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, সাউথ আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা আর জাপান,দক্ষিণ কোরিয়া ছাড়া বাদ-বাকী দেশগুলো নিয়ে তাদের বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই, কিছু জানেও না। বেশির ভাগ আমেরিকানের জন্য সত্য হলো, আমেরিকা কোন দেশ আক্রমণ করলে তখন তারা সেদেশ সম্পর্কে সচেতন হয়, জানে। সে জানাটাও থাকে বায়াসড, কারন তারা তথ্য পায় বায়াসড ন্যাশনালিস্টিক মিডিয়ার কাছ থেকে। আবার ‘পলিটিক্যালি কারেক্ট’ থাকার চেষ্টারত জনগোষ্ঠী কোনভাবে সত্য জানলেও ভয়ে সেটা জনসমক্ষে প্রকাশ করে না।

নিজেদের ছোট গন্ডী, চার্চ ব্যবস্থা, স্থানীয় খেলা-ধুলা, জনজীবনের বাইরে অন্যান্য বিষয়ে আমেরিকানদের আগ্রহ খুবই কম। প্রথমত, এসব জানা তাদের জীবনে কোন প্রভাব ফেলে না, দ্বিতীয়ত, জাতিগত অহংকার। বিশ্বের সব জায়গা থেকে মানুষ দলে দলে আমেরিকায় আসছে, সুতরাং তাদেরকে কষ্ট করে জানার কোন প্রয়োজন নেই। তারা এখনও মনে করে আমেরিকা বিশ্বের সেরা দেশ, তা না হলে মানুষ কেন এখনও আসছে। তৃতীয়ত, পুঁজিবাদী সমাজে মানুষের অবসর সময় কম, তাকে সবসময় ডলারের পেছনে দৌড়াতে হয়। বিশেষ করে পুঁজিবাদের অভ্যন্তরীণ সমস্যার কারনে কয়েক বছর পরপর মন্দা এসে মানুষকে জেরবার করে ফেলে,তখন জীবনমানের অবনতি হয়। ফলে তাকে টিকে থাকার জন্য আগের চেয়ে আরো  বেশি পরিশ্রম করতে হয়। এত কিছু করে তার আর বেশি কিছু জানা হয় না,সময় থাকে না। তার উপরে মিডিয়া, হলিউড, সেলেব্রিটি, ফ্যান কালচার ইত্যাদি তাকে সারাক্ষণ ব্যস্ত রাখে। কাজের ফাঁকে সামান্য অবসরে সে এগুলোতে মগ্ন হয়ে থাকে। সে জানে ওয়াশিংটনে অনেক সমস্যা আছে, তার নিজের এলাকার কংগ্রেসম্যান এবং সিনেটরকে সেসব দায়িত্ব দিয়ে সে নিশ্চিত থাকতে চায়। বিশ্বব্যাপী ওয়াশিংটনের দ্বারা সংগঠিত অপরাধ, অত্যাচারকে সে তার চ্যারিটি দিয়ে পোষাতে চায়। তাই দেখা যায় উন্নত বিশ্বের নাগরিকদের মধ্যে আমেরিকানরা দান-খয়রাতে সারা দুনিয়ার শীর্ষে অবস্থান।

অনুন্নত বিশ্বের কারো প্রতি আমেরিকানদের আচরণ তাই চ্যারিটির, তাদের সব সময় তারা নীচু চোখে দেখে। নিজ দেশের অবস্থা ভাল না হলে বিদেশে সে দেশের নাগরিকদের অবস্থান কোনভাবেই ভাল হয় না। বিদেশের যেটুকু খবর  আমেরিকার সাধারণ নাগরিকের কাছে পৌঁছায় সেটা খুবই ভাসা-ভাসা এবং খারাপ খবর বিশেষ করে বন্যা,খরা,মহামারী, দূর্ভিক্ষ বা যুদ্ধের খবর। ফলে বেশির ভাগ দেশ সম্পর্কে তাদের জানা-শোনার পরিধি খুবই সামান্য। দেশ ছাড়া অন্যান্য বিষয়েও তাদের আগ্রহ মিনিমাম। তাই আমার বন্ধুদের কথাই সত্য মনে হয়, গড়পড়তা শাদা একটা মেয়ের আমাদের বিদেশীদের দেয়ার মত তেমন কিছু নেই। তাদের ক্ষুদ্র গন্ডীর মানুষ, গীর্জা, ধর্ম,বর্ণের বাইরে আমাদের যে একটা বিশাল জগত আছে এবং সেখানে হলিউড, আমেরিকান ফুটবল, বাস্কেটবল ছাড়া আরো অনেক কিছু আছে সেটা তারা জানে না, জানার চেষ্টাও করে না। তাই মেশার মত ছেলে বা মেয়ে সঙ্গী যার ভাল আন্ডারস্ট্যান্ডিং আছে এমন মানুষ দেশে যেমন কম, আমেরিকার ব্যাপারে বলা যায় সেখানে আরো অনেক কম। কর্পোরেট পুঁজিবাদের খপ্পরে পড়ে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠে, ভয় থেকে সে বেরোতে পারে না।

সম্পর্কের ক্ষেত্রে ছেলে-মেয়ে সবাই  নিজের বর্ণের মানুষের সাথে আবদ্ধ হতে চায়। অসবর্ণে যাবার অনেক বাধা। শাদা ছেলেকে সহজে কালো মেয়ে বিয়ে করতে দেখা যায় না। শাদা কম্যুনিটিতে কালো মেয়েকে নিয়ে আসলে তাকে অনেক গঞ্জনা সহ্য করতে হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রতিবেশী শাদারা বাড়ি বিক্রি করে চলে যাবে। অন্য শাদা সে বাড়ি কিনতে চাইবে না। এলাকার প্রপার্টি ভ্যালু কমে যাবে। এভাবে এলাকা আস্তে আস্তে শাদাদের হারিয়ে কালো এবং অন্য বর্ণের মানুষে ভরে যাবে, যাকে বলে ‘হোয়াইট ফ্লাইট’। এজন্য শাদা ছেলেটা লাইফ পার্টনার বেছে নেয়ার ব্যাপারে খুব সচেতন থাকে। তাকে অনেক কিছু বিসর্জন দিতে হতে পারে, অনেক সময় বাবা-মা বর্ণবাদী হলে তাকে ত্যাজ্য পর্যন্ত করতে পারে। চাইনীজ মেয়েরা  শাদা ছেলেদের পছন্দের তালিকায় উপরে। চাইনীজদের সুবিধা হলো তারা ডিভোর্স করবে না, শাদা ছেলেটার সবকিছু মেনে নিবে। সবচেয়ে বড় আরেকটা সুবিধা হলো, চাইনীজ মেয়েদের ধর্ম নিয়ে কোন প্রেজুডিস নেই,ফলে তারা খুব সহযে ধর্মান্তরিত হয়ে খ্রিস্টান হয়ে যায়, সমাজের মূল ধারার সাথে মিশে যায়। বাদামী বা কালো মেয়েদের বেলায় সেটা অনেক জটিল, তারা সহজে এতকিছু ছাড় দেয় না। কালো বা বাদামী ছেলেটা যদি শাদা মেয়েকে বিয়ে করে বা লিভ টুগেদার করে তাহলে সেটা শাদা ছেলেটা কালো মেয়ে বিয়ে করে ঘরে আনার মত জঘন্য হয় না। মেয়েটা বিয়ে করে অন্যত্র সরে যায় ফলে বৃহত্তর শাদা সমাজ তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। মেয়েদের তেমন নিয়ন্ত্রণও করা যায় না।

শাদা-কালোর বাইরে ধর্মীয় পরিচয়ও বিয়ের সময় সিদ্ধান্ত নিতে খুবই প্রভাবশালী ভূমিকা নিয়ে থাকে। বিশেষ করে সামাজিক স্বীকৃতি এবং আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করতে বেশিরভাগ মানুষ বিয়ের সময় বেশি এডভেঞ্চারাস হতে চায় না। ইহুদি বা খ্রিস্টান ধর্মের অনুসারীরা তার নিজ নিজ ধর্মের নির্দিষ্ট গীর্জার অনুসারী কাউকে বিয়ে করলে আর্থিক ও সামাজিক ভাবে লাভবান হয়। তারপরেও শিক্ষিত মানুষেরা এসব বাধা মানে না,ফলে এ দু’ধর্মের অনুসারীদের মাঝে আন্তঃবৈবাহিক অনেক সম্পর্ক দেখা যায়।

শাদাদের মাঝে বিয়ের পাত্রী হিসেবে চিনা,কোরিয়ান মেয়েদের চাহিদা বেশি। এতে কয়েকটা বিষয় কাজ করে, প্রথমতঃ চিনদেশে ধর্মীয় শিক্ষা দেয়া হয় না, ফলে খুব সহজে তারা নতুন ধর্মে দীক্ষিত হতে পারে। দ্বিতীয়তঃ তাদের খাবার-দাবার বা সাংস্কৃতিক বিষয়গুলো নিয়েও কোন ধরনের প্রেজুডিস বা সংস্কার নেই, খুব সহজে তারা ভিন্ন কালচারকে আপন করে নিতে পারে। সেজন্য দেখা যায়  আমেরিকানরা যখন যেখানে যুদ্ধ করতে গেছে দেখা গেছে সেখান থেকে ফেরার পথে আমেরিকান সৈন্যরা বিয়ে করে ফিরছে, এটা কোরিয়া, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়ার ক্ষেত্রে দেখা গেছে। আফগান বা ইরাকী মেয়েদের তেমনভাবে বিয়ে করতে দেখা যায় নি। আমার মনে হয় ধর্মীয় পরিচয় এবং সাংস্কৃতিক ব্যবধান এক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে এসেছে।

বাঙালি অনেক ছেলে আছে যাদের শাদা মেয়ে পছন্দ। কিন্তু সব শাদা মেয়ে সমান না। শাদা মেয়েটি যদি মিনিমাম মধ্যবিত্ত ফ্যামিলি থেকেও আসে তাহলে সে শাদার বাইরে কারো সাথে সম্পর্ক করবে না। নিম্নবিত্ত বা মোটামুটি ধরনের পরিবার যাদের মধ্যে শিক্ষা-দীক্ষা কম, প্রান্তিক চাষি পরিবার থেকে উঠে আসা মেয়েরা হয়ত বিদেশি বাদামী ছেলের ব্যাপারে আগ্রহী হতে পারে। অথবা যে আগেই শাদা বাদে অন্য কারো সাথে সম্পর্ক করে ইতোমধ্যে বাজারদর কমিয়ে ফেলেছে। কারন তার কাছে চালচুলোহীন বিদেশী ইঞ্জিনিয়ার বা বিজ্ঞানী ছেলে আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। দেখা যাবে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা মেয়েটির পরিবার বা জানাশোনা মানুষের মধ্যে উচ্চশিক্ষিত নেই। বাদামী ছেলেটি তখন অনেক তার কাছে অনেক প্রসপেক্টিভ। ছেলেটি তার কম্যুনিটির যত উচ্চশিক্ষিত ডাক্তার, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, ব্যাংকারের সাথে মিশে গড়পড়তা শাদা মেয়েটি নিজের দেশে সেরকম মানুষদের সাথে মিশতে পারে না। তার উপর বাংগালির আতিথেয়তা আর শাদা প্রীতির কারনে তার সময় ভালোই কাটবে। ফলে মেয়ের জন্যে সেটা উইন-উইন সিচুয়েশান। অপরদিকে ছেলেটিকে আজীবন খাবার-দাবার, ভাষা, সংস্কৃতি ইত্যাদি নানা বিষয়ে ছাড় দিয়ে যেতে হবে।

ভালো এবং শিক্ষিত পরিবারের মেয়েও বাদামী ছেলের ব্যাপারে আগ্রহী হতে পারে কিন্তু সেক্ষত্রে ছেলেটিকে এক্সট্রা -অর্ডিনারী হতে হবে। মেয়েটির যাতে মনে হয় সে শাদা স্যাক্রিফাইস করে ভুল করেনি সবদিক দিয়ে তেমন ভাল হতে হবে।

প্রেমের ফাঁদ পাতা ভুবনে। কিন্তু স্বল্পবসনা মেয়েটিকে দেখে আহ্লাদিত হবার সময় তার চাহিদা, চরম ভোগবাদিতা, দুনিয়া সম্বন্ধে অজ্ঞতা, বর্ণবিদ্বেষ, পারিবারিক শিক্ষা ইত্যাদি বিষয় মাথায় থাকলে রোমান্টিকতার বারোটা বেজে যাবার কথা। শুধু শাদা হলেই যদি কাজ চলে তাহলে কোন সমস্যা নেই, সেরকম প্রচুর আছে।

আধুনিক সমাজে নারী-পুরুষ সম্পর্কেরও নানা ফরম্যাটে আছে, সেসব সম্পর্কের কথা না বললে নারী-পুরুষ সম্পর্কের আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। আমেরিকান সমাজে একটা অংশ এখন সমকামী। এদের মধ্যে আছে লেসবিয়ান, গে, বাই- সেক্স্যুয়াল, ট্রান্সজেন্ডার সংক্ষেপে এলজিবিটি। সমকামিতা এখন সমাজ স্বীকৃত সম্পর্ক। অনেক আন্দোলন সংগ্রাম করে তাদেরকে আজকের অবস্থানে পৌঁছাতে হয়েছে। সমকামীরা পরিবার, সমাজ, ধর্ম, বিদ্যালয়, কর্পোরেট এ ধরনের সকল প্রতিষ্ঠান থেকে বিরোধীতা এবং ঘৃণার স্বীকার হওয়ায় জগত সংসার সম্বন্ধে তাদের স্বচ্ছ ধারনা জন্মায়।  সমাজ সম্পর্কে তাদের খুবই ভিন্ন অভিজ্ঞতা হয় যেটা একজন অসমকামীর পক্ষে বুঝাটা খুবই কষ্টকর। যার কারনে গত কয়েক দশকে আমেরিকান সমাজে সমকামীরা সবচেয়ে বেশি প্রতিবাদী, নিজেরা যেহেতু বৈষম্যের স্বীকার তাই তারা সমাজের নানা অসংগতি নিয়ে সোচ্চার। গত কয়েক বছরে সমকামীদের মধ্য থেকে বেশ কয়েকজন হুইসেল ব্লোয়ার, নির্ভীক সাংবাদিক এবং একটিভিস্টের দেখা মিলেছে। বর্তমানে আমেরিকান সমাজের প্রগতিশীল জনগোষ্ঠির একটা বড় অংশ এখন সমকামী। সাহিত্য, সংস্কৃতি, চলচ্চিত্র সর্বত্র তাদের সরব উপস্থিতি, এসব শাখায় তারা নিজেদের জন্য একটা অবস্থান করে নিতে সক্ষম হয়েছে। পাবলিক লাইব্রেরিতে এলজিবিটি সাহিত্যের আলাদা কর্ণার স্থাপিত হয়েছে, চলচ্চিত্র উৎসবে সমকামী চলচ্চিত্র একটা আলাদা শাখা হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে নিয়েছে। আমেরিকার অনেক স্কুল, কলেজ, অফিস-আদালতে তৃতীয় লিঙ্গের অথবা সমকামী মানুষদের জন্যে আলাদা টয়লেট স্থাপনের ব্যবস্থা চলছে। মোট কথা সমকামীরা এখন সমাজে প্রতিষ্ঠিত, আমেরিকার প্রগতিশীল জনগোষ্ঠির অংশ হওয়ায় এবং দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার কারনে ওবামা সরকার সমকামী বিয়ে বৈধ করতে বাধ্য হয়। সম্পত্তির উত্তরাধিকার এবং সন্তান পালনে সমকামী দম্পত্তিদের এখন আর কোন বাধা নেই, এখন থেকে তারাও সমাজের অন্যান্য সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশানের মানুষদের মত একই সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবে।

নাজিম উদ্দিন, পিএইচডি। লেখক, বিজ্ঞানী ও সমাজ বিশ্লেষক।  জন্ম নারায়ণগঞ্জে, বেড়ে ওঠা লক্ষীপুর জেলার রামগঞ্জ উপজেলায়। পেশাগতসূত্রে বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কালিফোর্নিয়ায় বসবাস করছেন। তিনি অংশুমালী'র যুক্তরাষ্ট্র (USA) চ্যাপ্টারের সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। লেখাপড়া করেছেন ঢাকার নটরডেম কলেজে। এরপর করেছেন...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

মধ্য যুগের বাঙালী কবি দৌলত কাজীর আখ্যান কাব্য আধুনিক সাহিত্যেও প্রবহমান

  বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রথম ধর্মকে বাদ দিয়ে যিনি রক্ত মাংসের মানুষের আশা, আকাঙ্খা, সুখ,…..