আরো কিছু আমার যা 

বদরুদ্দোজা শেখু
কবিতা
Bengali
আরো কিছু আমার যা 

আরো কিছু আমার যা 

আরো কিছু আমার যা কাজ
আমাকে শেষ করতে দাও ।

শুধু সুস্থ নীরোগ হ’য়ে বেঁচে থাকার
আনুষঙ্গিক অনেক উপসর্গ এসে ঘিরে ধরে প্রতিদিন
পরজীবি আগাছার মতো , তোমরা সবাই শুধু সারাক্ষণ
মেতে থাকো গ্রাসাচ্ছাদনের
গলগ্রহ উপলক্ষ্য নিয়ে ,
গৃহপালিত স্বপ্নের পরিপাটী আয়োজন আর তদারকে ,
মেতে থাকো , মেতে থাকি আমিও সর্বদা ;
আমিও কখনো
সামান্য কাজের জন্য যত্রতত্র হন্যে হ’য়ে ধর্ণা দিই ,দৈনিক বাজারে
ক্রমশঃই অগ্নিমূল্য তেল নুন তরিতরকারির কঠোর
করুণার গন্ধ শুঁকি, পূজোর হাওয়ায়
উধাও কেরোসিনের জন্য হন্তদন্ত ছোটাছুটি করি
কালো বাজারের ক্রূর দরজার কাছে , সাংসারিক ক্রিয়াকর্ম
যথাসাধ্য সৎপথে সম্পন্ন করার চেষ্টা করি অবিরত
যদিও তা সম্ভব হয়না বস্তুতঃপক্ষে প্রায়শঃ ।
অথচ কেবল প্রাত্যহিক কর্তব্য ছাড়াও স্বার্থাতিগ আরো কিছু কাজ
দাবী করে গণ্ডীবদ্ধ জীবন এবং সমান্তরাল সমাজ । সেই প্রেরণায়
বঙ্গজ বিহ্বল মনে ভাষার সৈকত-ভূমে বিশুদ্ধ শিল্পের
নুড়ি কুড়ানোর মতো শব্দের উপলখণ্ড নাড়িচাড়ি ব্যগ্র সারাক্ষণ ,
( দেখি গৌড়বঙ্গ দাক্ষিণাত্য দশক শতক জুড়ে লোকভাষার গতির অভিনব রূপান্তর ,
বস্তুতঃ আদর্শ কিছু লোকভাষা জন্ম নেবে কিনা কোনোদিন
অনুমান করার দুর্বিনীত আগ্রহ পোষণ করিনা ।) ভাবুকের চোখ
দিয়ে দেখি পার্থিব পরিমণ্ডল পরিস্ফূট অপার্থিব ক্রিয়াকর্ম ,
লোকাচার-অধ্যুষিত বৈষয়িক বিবর্তন ,পরস্পর -বিরোধী বহুল
মতবাদ কবলিত সামাজিক সমৃদ্ধি ও অবক্ষয় , ক্লিষ্ট অধ্যাবসায়-প্রসূত
বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি, আশঙ্কা আর তা উত্তরণের প্রয়াস ।
ঘটনা -প্রসঙ্গ পরম্পরা মানসিক প্রতিক্রিয়া
ব্যক্ত করার প্রয়াসে
শান্তি-শান্তি প্রেম-প্রেম শব্দের নর্দমা ঘাঁটি কিছু
পরিচ্ছন্ন পৃথিবীর পটভূমি পাওয়ার আশায়
এবং সমস্যা-জর্জরিত জীবনের জলছবি
সাঁটি অস্থাবর অস্তিত্ত্বের ফ্রেমে । এ জীবনে
শূককীট থেকে প্রজাপতি হওয়ার মতো আশ্চর্য কিছুই
ঘটবে না জানি ,অথবা ব্যধিগ্রস্ত পৃথিবীকে বদলে’ দিতে পারবো না
দৈবের নিয়মে , তবু যেন মনে হয়
কেবল বৃষ্টি ঝরানোই তো সমস্ত মেঘের কাজ নয় , কোনো কোনো মেঘ
আকাশকে নিসর্গকে সৌন্দর্যে সাজায়
ক্ষণভঙ্গুর শিল্পের অলৌকিক মহিমার পোঁচে , কিছু কিছু
মানুষের মন হ’য়ে উঠে উজ্জীবিত ,
মুগ্ধ , কল্পনা-প্রবণ ; অথবা যেমন
কোনো কোনো পাখি স্বভাবেই গান গায় , বিদগ্ধ ব্যক্তির কাছে তা-ই
সুন্দরের সংকীর্তন হ’য়ে উঠে ।

তেমনি আমার কাজে কোনো কিছু নাই কি নিহিত ??

 

প্রেরণার দিগন্ত 

‘কখন্ ঘুমোবে ? মেলা রাত হ’লো ।’ বললো সে । বললাম , ‘ এই
হয়ে এলো , আরেকটু লিখি ,তাহলেই
চ্যাপটার শেষ হবে ; তুমি ততক্ষণ ঘুমোওগে’।

ক্লান্ত দীঘল হাই তুলে ঘুমোতে গেলো সে ।
একান্ত অনুভূতির শব্দের শৈবাল ঘাঁটি আমি ব’সে ব’সে ।
ঝরা পাতার শব্দের মতো
অগোচরে ঝ’রে যায় আয়ুর প্রহর , ইতস্ততঃ
মাথার উপর চকিত ছোঁ মেরে যায় চক্করচারী
চামচিকেগুলো ; বাঁশবনী বাতাসের রোদন-রূপসী সুর প্রণয়-পসারী
বহুদূর বিরহের মূর্ছনা ছড়িয়ে যায় করুণ উদাস , মায়াবী নিশীথিনীর
আঁচলের ছাঁট ছুঁয়ে’ যেন-বা গেয়েছিলাম কবে কোন্ খানে চর-উজানীর
মৌসুমী ঝড়ের রাতে স্বগত একদা কল্পনা-বিধুর
আগন্তুক যৌবনের হাহাকার ওইরূপ , দারচিনির মতো ভুরভুর নিকট-দূর
স্মৃতির নির্ঘণ্ট সব ক্রমশঃই খেইহারা হয়ে যায় , জীবনের আয়ুষ্কাল
বিন্দুহীন মাত্রাহীন হ’য়ে যায় অনাদি অনন্ত মহাকালের গহ্বরে যেন পরাস্ত প্রবাল ,
একা আসা একা যাওয়া , মাঝে শুধু আত্মীয়তার আবহমান আকর্ষ ,
প্রেমের প্রবহমান পসরা , রঙীন
পথ-চলার নীরবে বন্ধুত্বের বিবর্ণ বিচ্ছেদ ,বিজ্ঞাপনী গোলক-ধাঁধায় অন্তরীণ
হৃদয়-বৃত্তির খসড়া , আর ভালবাসার বন-বাদাড় চষা বিদিশার বিবর্তনে
সুখের মৌরসীপাট্টা পাওয়ার প্রয়াস পথের নির্জনে
সমুদ্র-গর্ভের বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো ক্রমশঃ নিমজ্জমান নিজের চোখেই ।
হায়রে , সুন্দর এ পৃথিবীতে জীবনের পরিণতি এই !

লণ্ঠনের স্তিমিত আলোয়
দৃষ্টির দরিদ্র-রেখা দেয়ালের কুক্ষি থেকে দিগন্তের পায়না নাগাল , দশা-সই
দীনতায় তবু লিখি , অধঃস্তন অস্তিত্ত্বের পূর্ণতার আয়োজন করি
জিজ্ঞাসার আবর্তমণ্ডলে—-যদি কোনোদিন জুটে জগতে আসার সার্থকতার সামান্য মাধুকরী
নিতান্ত দুর্লভ ; হুতোম প্যাঁচার বিকট শব্দের মতো ব্যঙ্গ করে বাস্তবের বাণিজ্যিক চোখ,
হাভাতের শিল্প-সুকৃতির চর্চা ? –আদর্শ চর্চার মতো হয়তো এও ঘাঁটছি নরক !
তবু এক অবখ্যাত রমণীর আত্মজের প্রতি প্রহরা-সঞ্জাত প্রার্থনার প্রতিধ্বনি কানে বাজে , মুখ-চাওয়া প্রেরণার
নতুন ইন্ধন পাই , মনের ময়ূর গেয়ে উঠে প্রত্যয়ের পথের পাঁচালী ,
হঠাৎ আমার চোখের সামনে সবুজ সোনালি
জীবনের উদ্ভাসন , –হিংসামত্ত পৃথিবীর উদ্বাস্তু হৃদয়ে মানবিক ইচ্ছার পুনর্বাসন ।।

বিশ্বাসী 

বন্ধুরা বলে :

তোমার ক্যামন্ সব কবিতায় যেন দুঃখের সুর ।
আমি বলি : ভাই ,
সুখ তো পাইনি , দুঃখ পেয়েছি , দুঃখই করি ভাঙচুর ,
তাই দিয়ে চাই গড়তে মনের অচিন্-পুরের
কোনো এক ইমারত ,
অথবা বধির বিপন্নতায় খুঁজে পেতে চাই মানবিক জনমত ।
যদি ভালো লাগে , যদি প্রাণ চায় ,তবে এসো এক সাথে
ভগ্ন আশার তরীটি ভাসাই দুঃখের দরিয়াতে ,
গন্তব্যের হদিস তো নাই , অজানা অচেনা পথ
আবিষ্কারের ব্রত নিয়ে দেখি—কেমন ভবিষ্যৎ ,
আমি আর চাই না ব্যর্থ হ’তে , মনে আছে বিশ্বাস :
একদিন স্বপ্নের ‘মেরিকায় পৌঁছে যাবেই মনের কলম্বাস ।।

 

চরখি 

 

সময়ের ঘুর্ণিতে
চরখির মতো আমি ঘুরছি

খাদ্যবস্ত্র বাসা
প্রেম পরকীয়া আশা ঢুঁড়ছি

কখনো হতোদ্যম
স্মৃতির সরণিগুলো খুঁড়ছি

স্বপ্নের দোলাচালে
খেয়ালে কি বেখেয়ালে উড়ছি

নিশুতি রাত্তির জেগে
ব্যর্থতা বিরহ দাহে পুড়ছি

কখনো বেদনা ঢেকে
বেতসপাতার মতো ঝুরছি

হৃদয়ের কথাগুলো
ছেঁড়াখোঁড়া শব্দ দিয়ে জুড়ছি

সময়ের ঘুর্ণিতে
খেলনা চরখির মতো ঘুরছি ।

কখনো বিদ্রোহ করে
বাসনার বেতো কেঁদো বাঘ —

কিছু না করতে পারো
আঁচড়াও আঁচড়াও দাগ

যাত্রার আনাচকানাচ
অনিত্য পথের ‘পরে,
ফুঁসে ফুঁসে বালুচরে
তাই ইতস্ততঃ আঁচাপাঁচা ছুঁড়ছি
জীবনের চরখিতে ঘুরছি

বদরুদ্দোজা শেখু। কবি। জন্ম ১৯৫৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গরাজ্যের মুর্শিদাবাদ জেলার সাগরদিঘিতে। অভাব অনটনের মধ্যে তাঁর বেড়ে উঠা। প্রথাগত শিক্ষায় স্নাতকোত্তর। পেশায় অবসরপ্রাপ্ত রাজ্য সরকারি কর্মচারী, নেশায় কবিতা লেখালিখি। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ: অলৌকিক আত্মঘাত, দুঃস্বপ্নের নগরে নিভৃত নগ্ন, শব্দ ভেঙে...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

যবনিকা

যবনিকা নিজের সঙ্গে অহরহ যে যুদ্ধ সেই যুদ্ধে আহত নিজের মন । তার ভেঙে গেছে…..

ধূসরে সবুজে

ধূসরে সবুজে

স্বতন্ত্রতা গনগনে আগুন নয় বরং পূর্ণিমার রাত বরাবর হেঁটে যায় ব্যথারা চোখে আলোর আমেজ নামে…..