আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে জার্নি বাই লাইফ

শাহনাজ পারভীন
গল্প
Bengali
আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে জার্নি বাই লাইফ

 

হঠাৎই ঝুম বৃষ্টিতে ঘন কালো অন্ধকারে ছেয়ে গেলো চারপাশ। বৃষ্টিটা শুরু হয়েছিল হঠাৎ করেই। ঝকঝকে আকাশ দেখতে না দেখতেই
প্রেমিকার মতো মুহূর্তেই পাল্টে গেলো। মুখ গোমড়া করে পাল্টে ফেললো তার রং। শ্রাবণের আকাশকে শায়লা কোনোকালেও বিশ্বাস করে না, তাই বলে আষাঢ়ের আকাশ! সে তো এতকাল এতটা অবিশ্বস্ত ছিল না।

এবার অবশ্য সবকিছুতেই অন্য রকম। নির্ভেজাল আবহাওয়া। চারিদিকে নিবিড় ধ্যানমগ্ন প্রকৃতি। আষাঢ় আসতে না আসতেই চারিদিকে থইথই মাঠঘাট। দীর্ঘ দিন কোভিডের কারণে মানুষ ঘরে বন্দি। বলতে গেলে প্রকৃতির ওপর অত্যাচার বন্ধ। অকারণ বৃক্ষ কর্তন থেকে রক্ষা পেয়েছে পৃথিবী। পলিথিনের বর্জ্য মুক্ত পরিচ্ছন্ন
রাস্তাঘাট।
ঝকঝকে আকাশ, তকতকে সবুজ, এক অনাবিল অকৃত্রিম সৌন্দর্যে মোড়া বাংলাদেশ। তাই এই বছর আগের সময়ের চেয়ে বৃষ্টি বেশি হবে এটাই বিশেষজ্ঞদের অভিমত। এ বছর শীতও বেশি ছিল। পৃথিবীর ওজন স্তর আগের তুলনায় অনেকটাই স্থিতিশীল।

শায়লা একজন শিক্ষক এবং স্মার্ট সিটিজেন। সব বিষয়েই তার গভীর প্রজ্ঞা। কি সমাজ, কি সংসার, রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, সাহিত্য, প্রকৃতি সব বিষয়েই তার জানাশোনা ঈর্ষনীয় পর্যায়ে। সম্প্রতি তিঁনি নতুন একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যক্ষ হিসেবে
যোগদান করেছেন। তাঁর যোগদান করার পর
আজ প্রথম বারের মতো জুম অ্যাপসের
মাধ্যমে মাউশি’র
মিটিং অনুষ্ঠিত হবে। সে এই মেইল পেয়েছে আজ সকালেই। কলেজে যাবার প্রস্তুতি নিতে নিতেই সে এ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় ফোন গুলো সেরে নেয়। ২০২২ খ্রিস্টাব্দের
উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদেরকে পরিবর্তিত সংক্ষিপ্ত সিলেবাস অনুযায়ী অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হবে।
প্রতি সপ্তাহে একটি করে
অ্যাসাইনমেন্টের মাধ্যমে দেশব্যাপী শিক্ষার্থীদেরকে সম্পৃক্তকরণের বিষয়ে মাউশি কতৃপক্ষ
অধ্যক্ষগণের সাথে এই জুম মিটিং আয়োজন করেছে।
মিটিং শুরু হবে বেলা সাড়ে বারটায়। মিটিং
শেষের কোন সময় নির্ধারণ নেই। কলেজ যাবার সময়
শায়লা একটু ভারী টিফিন নিয়ে নেয়। যদি খুব বেশি দেরি হয়, তাহলে লাঞ্চের কাজ করবে সেটা।
,,,,,,,,
যাই হোক, কলেজে যেতে যেতে ভিজে গেলো এক প্রস্থ। সকালেও ভিজেছিল এক প্রস্থ। প্রতিদিন সকালে সে এক ঘন্টা হাঁটে। সকালের ঝকঝকে আকাশ দেখেই সে আজও ছাতাবিহীন হাঁটতে বেরিয়েছিল। কিন্তু দুটো পাক দিতে না দিতেই ওর কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঝমঝম বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে গেলো। একটু অপ্রস্তুত লাগছিলো, কিন্তু খারাপ লাগে নি। রাস্তায় তেমন লোক ছিল না। আজ বেরোতে বেরোতে বেশ খানিকটা দেরিই হয়েছিলো তার। হাঁটার এলাকাটা ফাঁকা।
তাছাড়া তখনও সে হাঁটতে হাঁটতে অফিসের
বাকি ফোন গুলো করছিল। তাই আর আকাশকে ওভাবে বুঝতে পারে নি।

পৃথিবীতে যতগুলো আনন্দের কাজ আছে, তারমধ্যে বৃষ্টিতে ভেজা তার প্রিয় একটি আনন্দ। খুশি। আর সে ভেজাটা যদি সময়মতো হয়, তাহলে আনন্দও হয় পরিপূর্ণ। তাই আষাঢ়ের প্রথম সকালে হঠাৎ বৃষ্টিতে ভিজে যেতে তার ভীষণ ভালো লাগছিলো।

কি মনে করে কলেজে যাবার আগে কলেজে সংরক্ষিত রাখার জন্য
এক প্রস্থ কাপড়ও ঢুকিয়ে নেয় তার ব্যাগে। বলা তো যায় না, যদি কখনও এমন হয় যে, যেতে যেতে ভিজে গেলো! তখন অফিসে ভেজা কাপড়ে! হায় হায়।

কলেজ বন্ধ বিধায় কলেজের বাস চলছে না এখন। কথা ছিল সে কলেজের বাসেই যাতায়াত করবে। ঠিক সাড়ে নয়টায় তাকে বাসার গেট থেকে উঠিয়ে নেবে। কিন্তু দফায় দফায় প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় বাস চলাচলও বন্ধ। আপাততঃ তাঁর স্বামী সহিদের সাথে যাতায়াত করে সে। সহিদ তাকে কলেজে নামিয়ে দিয়ে তার চেম্বারে যায়। জোহরের নামাজ পড়ে ফেরার পথে তাকে নিয়ে আসে আবার। এই বাঁধা ধরা রুটিনেই চলছিল ঠিকঠাক। কিন্তু আষাঢ়স্য প্রথম দিবসেই সবকিছু পাল্টে যায় যেনো! কালীদাস কোথা থেকে মেঘ টেনে আনে। কৃষ্ণের বাঁশি বাজে থেকে থেকে আজ! আহা!

মিটিং আয়োজন করেছে অধ্যক্ষের কার্যালয়ে। অধ্যক্ষের ল্যাপটপ কম্পিউটারটা ব্যবহারের অভাবে
নষ্ট হয়ে পড়েছিল দীর্ঘদিন। সম্প্রতি নতুন উইন্ডোজ দিয়েছে। আজ সেটা নিয়েই বসবে বলে টেবিলে সেটআপ করেছে।
,,,,,,,
শায়লা এখানে যোগদান করবার পরই কলেজটির আদল ঢেলে সাজাবার চেষ্টা করছে। কলেজে ওয়াইফাই লাইন লাগানো হয়েছে, কেনা হয়েছে স্ক্যানার মেশিন। এগুলো যেন এর আগে স্বপ্নেরও অতীত ছিল এখানে। শহরতলীর কলেজ হবার সুবাদে ছোট খাটো যে কোন কাজেই অফিসের লোকজন শহরে ছুটতো। সে বাবদ সেদিনকার ছুটি এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত টুপাইস জুটতো। এখন কলেজ থেকেই সব কাজ করা যায়। শিক্ষকরা খুব খুশি, কেউ কেউ অখুশিও ভীষণ। তা তে শায়লার কিছু এসে যায় না। ডিজিটাল সময়ে দেশের সাথে তাল মিলিয়ে
সব কিছুই ডিজিটাল হবে। থাকবে হাতের মুঠোয়। আপগ্রেড।

শায়লা নিজেও সব সময় সংগ্রামী।
দেশের সেরা ইউনিভার্সিটি থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি নেবার পরও থেমে যায় নি সে। এমফিল, পিএইচডি করেছে চাকরিরত অবস্থায়। সংগ্রাম কাকে বলে, সে চিনেছে কড়ায়, গণ্ডায়। অতএব এ সব তো নস্যি তার কাছে।
মিটিং শুরু হবার পাঁচ মিনিট আগে হঠাৎ
বিদ্যুৎ চলে গেলো। কখন আসবে ঠিক নেই। গ্রামে এই একটা সমস্যা এখনো প্রকট। ভাইসপ্রিন্সিপালসহ কলিগরা সব চুপসে গেলো। হাফ ছেড়ে বাঁচলো যেন অফিস। যাক, করোনার দিন। এইসব ঝামেলার দরকার কি? অফিস তালা মারতে পারলেই তাদের ছুটি। আসলে দীর্ঘদিন অফিসে না এসে, কাজ না করে তাদের গিটে গিটে জং ধরে গেছে।

–এই হাফিজ শোন, কম্পিউটারটা এক পাশে সরিয়ে রাখো। মোবাইল স্টান্ডটা টেবিলে দাও। মোবাইলে মিটিং শুরু করবো। ড্যাটা কিনলাম। এমজিতেই চলবে আজকের মিটিং। বিদ্যুতের জন্য অপেক্ষায় থাকার
দরকার নেই।
প্রিন্সিপাল স্যারের কথা শুনে উপস্থিত টিচাররা একজন আরেকজন টিচারের মুখের দিকে তাকায়। উপস্থিত তাদের হা মুখে রা নাই। আশেপাশে মাছি থাকলে ঢুকে যেতো কিছু।

হাফিজ দ্রুত হাতে স্ট্যান্ড সেট করে। যথাসময়েই মিটিং শুরু হলো। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার। যশোর শহরের আর কোন কলেজকে সে দেখতে পারছে না কেন এখানে? কেউ কি ঢোকে নি? মাথার মধ্যে এইসব রেখেই সে মিটিংয়ে কথা বলে। তার কলেজের অনলাইন ক্লাস,
চলমান কার্যক্রম এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে তার সুচিন্তিত
পরামর্শে কতৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয় শায়লা। যদি দেশে করোনা পরিস্থিতির কোন উন্নতি না হয়, তবে পরবর্তী বছর
এই অ্যাসাইনমেন্টের আলোকে রেজাল্ট তৈরি হবে। সরকার অটোপাশ দিতে চায় না আর। সব মিলিয়ে
অন্যরকম এক ভালো লাগায় তার মনটা আনন্দে থইথই করে তাঁর। মিটিং এর আগেই সে উপস্থিত সকলের জন্য হালকা নাস্তার ব্যবস্থা করেছিলো। সব মিলিয়ে সবাই খুব খুশি।

মিটিং শেষে একটু আয়েশে তার ডানদিকের জানালার পাশের পুকুরটার দিকে চোখ দেয়। সেখানে চোখ পড়তেই তার মন আবারও আনন্দে নেচে ওঠে। পুকুরের পানিতে বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা পড়ে চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে
বড় বড় ঢেউয়ের স্রোত সৃষ্টি হচ্ছে। সে স্রোত তিরতির করে ছড়িয়ে যাচ্ছে সমস্ত পুকুরব্যাপী।
সমস্ত পুকুর যেন টগবগ করে ফুটছে। তাদের এতদিনের বিরহ যাতনা, তাদের শুকিয়ে যাওয়া দেহে শোষন করছে বৃষ্টির অমীয় পরশ।
বৃষ্টির জন্য নিরন্তর অপেক্ষায় তারা ক্লান্ত ছিলো যেন। এতদিন পর তাদেরকে কাছে পেয়ে এক
উষ্ণ অভ্যর্থনায় তাকে বরণ করে নিচ্ছে আনন্দ উল্লাসে।
এই দৃশ্য দেখতে দেখতে
অপার আনন্দে মনটা থইথই করে উঠলো। মনে প্রাণে তাদেরকে ডেকে উঠলো শায়লা।
— এসো, ঝমঝম করে এসো। কলকল করে এসো। ভিজিয়ে উর্বর করো পৃথিবী তোমার!
সেই
নৈসর্গিক
সৌন্দর্য দেখতে দেখতে ভুলেই গিয়েছিলো সে ঘড়িতে সময় বাড়ছে। শহিদ ফোন দিচ্ছে বারবার।
–আমি পাশের মসজিদে আছি। বৃষ্টি থামলে গেটে চলে এসো।
উহ! শান্তি! মাথা থেকে বড় বোঝা নেমে গেলো। ও যখন এসে গেছে, আর চিন্তা নেই কোনো!

শায়লা বৃষ্টি দেখে ডান জানালার পুকুরে। দীর্ঘদিন পর বৃষ্টির সাথে জলের অবাধ মিলনের। সে বৃষ্টি দেখে বামের জানালায় মাঠের সবুজে। ঘাসগুলো মাথা উঁচু করে বৃষ্টি শুষে নিচ্ছে তাদের শরীরে, দেহের অভ্যন্তরে। এরই মধ্যে এক দঙ্গল শিশু কিশোর জড়ো হয়েছে ফুটবল পায়ে পায়ে। তাদের চিৎকারে,
আনন্দ উল্লাসে ফেটে পড়ছে নিস্তব্ধ চারদিক। বৃষ্টির ফোঁটায় ফোঁটায়। নৈঃশব্দ্যের সৌন্দর্য সে যে সুখেরও অধিক! চোখ যায় সমুখে তাহার। দূর থেকে জোঁকের পিঠের মতো মসৃণ রাস্তায় সাপের মতো বৃষ্টির স্রোত বয়ে যাচ্ছে আঁকাবাঁকা। দুই একজন পথচারী ছাতা মাথায় সাইকেল চালাচ্ছে। হাঁটছে। নিরিবিলি, শান্ত ভঙ্গিতে।
হয়তো তাদের গন্তব্যও তারই মতো শহর অথবা গ্রামের ভেতরে খানিক!

দূরে কেউ কেউ ঘুনি, জাল হাতে বেরিয়ে গেছে এরই মধ্যে। বৃষ্টিতে মাছ ধরার উৎসব শুরু হবে।
মেহগনি, দেবদারু, মহুয়া, অশোক, বকুলের পাপড়ি মেলা ডালগুলি বুক চিতিয়ে ভিজছে। তাদের আর কোনো অভিযোগ নেই আজ। মাথা তুলে বলছে না কিছু। আশেপাশের কাউকেই মনোযোগ দেবার সময় নেই তাদের। সেও ভেজে মনে মনে। প্রাণে প্রাণে! আহা! কতদিন দেখি নি তাহারে!

যেমনটি হঠাৎ করে এসেছিলো সে, তেমনি বিদায়টাও হঠাৎ নিয়ে গেলো যেনো! শায়লা পায়ে পায়ে গেটে এসে দাঁড়ায়। ঘড়ির কাটারা দৌঁড়াচ্ছে। তাদের তো সময় নেই বৃষ্টি দেখার। মোটরসাইকেল চলতে শুরু করেছে। রাস্তার দু’পাশের ধুলোজমা ডালগুলো ধুয়ে মুছে সাফ। ঝকঝকে তকতকে সবুজ পাতারা। আর কোন মলিনতা নেই চোখে মুখে, মনে। আহা বৃষ্টি! তুমি কি মানুষগুলোকে এভাবে সাফ সুতর করে দিতে পারো না? তাদের আত্মার মলিনতা, অযথা কুটিলতা ধুয়ে মুছে পবিত্র আলোয় ভরাতে পারো না? দুপাশের নিসর্গ, নিস্পাপ সবুজ দেখতে দেখতে আবারও আকাশ দেখতে ভুলে যায় সে। তাই তো বৃষ্টি আবারও অভিমানে,
অভিযোগে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে তাহার উপর। সে চোখ মেলে দেখে, মেলায় তাহারে। মিলে যায় তার সনে তাঁরও অধিক।

–চলো ওখানে দাঁড়াই।
শহিদের কণ্ঠে সে বাস্তবে ফিরে আসে। সামনেই
নির্মাণাধীন একটি ফ্লাট। বেশ কয়েকটা ঘরের নিশানা সমেত
বিল্ডিংটি রাস্তার পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজছিল। শুধু ছাদ দেওয়া হয়েছে তাতে। সারি সারি ইট, কাঠ সাজানো। বালুর স্তুুপ মাঝে মাঝেই। দুটো কালো রংয়ের ছাগল নিশ্চিন্তে ঠাঁই নিয়েছে সেখানে। একজন চোখ বন্ধ করে আয়েশ করছে, আর একজন দাঁড়িয়ে প্রকৃতি দেখছে নির্ভাবনায়, অপলক।
–নাস্তা খেয়েছিলে?
–না।
–কেন?
–সময় পাই নি।
–মিটিং তো শেষ হয়েছে অনেক আগেই।
–হুম। বৃষ্টি দেখছিলাম।
–অনেক বড় কাজ মনে হচ্ছে?
–হু। তাই তো। আজ আষাঢ়স্য প্রথম দিবস। কালিদাসের মেঘ আকাশে আকাশে!
,,,,..
–খাবার বের করো। পানি আছে আমার কাছে। নিয়ে আসি।
–বারে! এখানে খাবো?
–কোন সমস্যা নেই। খেয়ে নাও। বৃষ্টি কখন থামবে বলা যায় না।
খাবারের কথা মনে করতেই পেটের ভিতর ক্ষুধা মোচড় দিয়ে উঠলো। নাস্তা নেবার কথা বলতেই
শহিদই টিফিন বাটিটা গুছিয়ে দিয়েছিলো। ছোট্ট একটা টিফিন বক্সে
দুটো পাতলা রুটি, একটি ডিম ওমলেট। শায়লা কায়দা করে তাদের পাশে একটি কলা শুইয়ে রেখেছিলো। বাটিটা খুলতেই মৌ মৌ ঘ্রাণ তার নাসিকাগ্র উন্মোচিত করে? ঘ্রাণের কীইবা এমন আছে এতে? কলার ঘ্রাণ এমন উদগ্র হতে পারে, ঠাণ্ডা রুটি, ডিম ওমলেট খাবারের এমন বাসনা জাগায় তা তার জানা ছিল না আগে।
সে শুধু এটুকু জানতো, সব সময় সর্বোৎকৃষ্ট খাবারটি খেতে হবে, সব সময় সর্বোত্তম বিছানায় ঘুমাতে হবে এবং সব সময় সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষদের সাথে মিশতে হবে।

কিন্তু সেটি কিভাবে সম্ভব? সব সময় কী এগুলো মেইনটেইন করা সম্ভব?
উত্তর হচ্ছে, হু সম্ভব। বেশি খিদে লাগিয়ে খেলে, যাই খাও না কেন, তাই হবে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুস্বাদু খাবার। তেমনি ক্লান্তিতে শ্রান্তিতে
চোখ যখন ঘুমে ঢুলুঢুলু করবে, তখন যেই বিছানায় ঘুমাতে যাও না কেন, চোখ জুড়ে ঘুম এসে তা হবে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিছানা।
তেমনি আমরা যখনই
যার সাথেই মিশি না কেন, সব সময়ই আমাদের সর্বোচ্চ সদ্বব্যবহার যদি করি, তাহলে তারাও তাদের সর্বোচ্চটা দেবার চেষ্টা করবে– এটাই হচ্ছে সর্বোত্তম মানুষের উপমা।

সত্যি! সর্বোত্তম খাবারটি খেয়ে কলাটির খোসা দুজনের মধ্যে ভাগ করে দেয় শায়লা। মুখের কাছে কলার খোসাটুকু পেয়ে দাঁড়ানো ছাগলটি প্রথমে তার কাছ ঘেঁষে দাড়ায়। অদূরে ঘুমন্ত ছাগলটিও তাড়াতাড়ি খাবারের গন্ধে জেগে ওঠে। তারপর আরও প্রত্যাশায়
দুজনেই তার পাশে এসে ঘুরঘুর করে। অথচ কতক্ষণ আগে যখন এখানে এসেছিলো তারা, কেউ তাদেরকে ভ্রুক্ষেপ করেনি। বরং যেন কিছুটা বিরক্তি দেখিয়েছিলো।
–কেন বাপু, এখানে কেন? আমাদের বিশ্রাম, ঘুম নষ্ট করতে আসা? আর এখন মাত্র অর্ধেক কলার খোসা পেয়েই তারা পাল্টে গেলো।

এরই মধ্যে স্থানীয় কয়েকটি কলেজ থেকে ফোন এলো। মাউশির নির্ধারিত মিটিং হয়েছে কি না? তারা কেউ ওই লিঙ্কে ঢুকতে পারে নি। সে কি করে ঢুকলো? কী কী সিদ্ধান্ত হলো? ইত্যাদি। ইত্যাদি।
–আমি ঢুকেছি। মিটিংয়ে কথাও বলেছি।
–আমরাও তাই ভাবছিলাম, আপনি ঢুকতে পারবেন নিশ্চয়ই। আপনার কাছ থেকে জেনে নিবো পরে। বাসায় যান।

আবারও হঠাৎ করে আকাশ পরিস্কার হয়ে এলো। তারা পথে বের হলো। ভেজা, শুকানো এভাবেই যখন বৃষ্টির সাথে লুকোচুরি করতে করতে দুজন বাড়ির গেটে পৌঁছালো, তখন আবারও এক প্রস্থ বৃষ্টিতে ভিজে শায়লা আনন্দে বলে উঠলো–ওহ! থ্যাংকস মাই গড!
আজ পরিপূর্ণ ভাবে উপভোগ করলাম আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে জার্নি বাই লাইফ।
ততক্ষণ ঘড়িতে চারটে বেজে ত্রিশ মিনিট ছুঁই ছুঁই।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..