আসুন অংশুমালী হৃদয় খুঁড়ে

আরণ্যক বসু
কবিতা, প্রবন্ধ
Bengali
আসুন অংশুমালী হৃদয় খুঁড়ে

সাজানো সংসার থেকে উঠে আসে কবিতা-অক্ষর;
বিশ্বাস করুন, আমি খুঁজে পাই বাঁচার ঠিকানা,
হারানো সভ্যতা ডাকে না-লেখা কাব্যের ভাঙা ঘাটে
রূপসী বাংলা হয়ে শঙ্খচিল মেলে দেয় ডানা

প্রথমে বলি কেন কবিতা পড়ি

বিশ্বাস করুন আমি রবীন্দ্রনাথের ‘ছিন্নপত্র’-র ছেঁড়া পাতা হয়ে বলতেই পারতাম ‘কবিতা আমার বহুকালের প্রেয়সী’।

কিন্তু প্রত্যেক একক ব্যক্তির মতোই আমারও যে একটা নিজস্ব গল্প আছে। তখন আমি রথিঠাকুরের মতোই স্বপ্নময় বালক বয়সে। এক বৃষ্টি-বৃষ্টি ছায়া ঘনাইছে আষাঢ় সন্ধ্যায় হারমোনিয়াম এর কাছে সংগীতশিল্পী মায়ের গলায় শুনেছিলাম বৃষ্টির গান –  ওগো সাঁওতালি ছেলে…

অন্তিম জুন মাসের সেই ভেজা ভেজা সন্ধ্যায় পাশের ঘরে আমার বাবা তখন পড়ছিলেন বিশ্বকবির সোনারতরীর ওই জায়গাটা –  শ্রাবণ গগন ঘিরে, ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে, শূন্য নদীর তীরে রহিনু পড়ি।

হঠাৎ দেখি মা গান থামিয়ে বাবার ভাঙা ভাঙা গলায় অচর্চিত আবৃত্তি শুনছে অবাক হয়ে! সেই অবাক ছোটবেলায় আমি তখন সবে অপাপবিদ্ধ সঙ্গীত সাধনা সা –  ধ্বনিতে মাত্র। তবু, ওগো সাঁওতালি ছেলের আশ্চর্য  দুলুনি থেকে যেন মুহূর্তেই চলে গেলাম সেই গ্রামীণ নদীর ধারে এবং সেটা বাবা ও রবীন্দ্র কবিতার হাত ধরেই। আমি জাস্ট পাগল হয়ে গেলাম। উঠে গিয়ে বাবাকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন শুরু করলাম, বাবা তারপর কী হল? সোনার তরী চলে যাওয়ার পরে সেই মানুষটা কী করলো? বাবা, শূন্য নদীর তীর মানে কী? ব্যস, আমার সঙ্গীত সাধনার সেখানেই ইতি। আমার আপাদমস্তক কবিতার জগতে সেখানেই অনুপ্রবেশ। সেইখানেই, কবিতার কোন এক শরণার্থী শিবিরে আমার ঠাঁই হল রবীন্দ্রনাথের কবিতার সামনে। আমি সেখান থেকেও চলে গেলাম আমার জন্মের ৭০-৮০ বছর আগে শান্তিনিকেতনের গাছের ছায়ায়, কবিতার ক্লাসে। সেখান থেকে ফিরব ফিরব করেও আজও আমার আর ফেরা হয়নি। এ তো গেল গান থেকে কবিতায় এসে পড়ার মুহূর্তের বর্ণনা; তারপরে তো শুধু স্কুলে একটার পর একটা ক্লাস টপকাতে টপকাতে ক্রমশ সুকান্তকে খুঁজে পাওয়া, ক্রমশ কবিতার কাছে জানু পেতে বসা, কবিতার কাছে স্বীকার করা – জানো কবিতা, আমার তো ঈশ্বর নেই, আমার ধর্মই তুমি!

এবারে একটু অন্য কথা বলি – আমরা জানি যে কবিতার তিনটে ভুবন, প্রথম ভুবনে একজন মানুষ বিশ্বসংসার থেকে নিজেকে সরিয়ে খাতার পাতায় মাথা কুটে মরছে শব্দ ভিক্ষা করে, নিজস্ব ভাবনায় ভাবনায়। শেষ পর্যন্ত কিছু একটা লেখা হয়। সেই একক মানুষটা কিছুটা ঘোরের মধ্যে বারবার পড়েন সেই সৃষ্টির আনকাট ডায়মন্ডকে, তারপর একদিন একটি পরিপূর্ণ কবিতা হয়ে সেটা পৌঁছে যায় কোন পত্রিকার দপ্তরে। কখনো ফিরে আসে, বাতিল হয়, আবার ছাপাও হয়। ছাপা হলে সে কবিতা একটা অন্যরকম হাসিতে ঝিকিয়ে ওঠে। কবির অসহায় আঙ্গুলের ফাঁক গলে সেই কবিতা ঘরে ঘরে পৌঁছে যায় সাধারণ পাঠকের কাছে। কোনো গ্রীষ্ণ দুপুরে অথবা চাঁদ ঝরা মাঝরাতে হয়তো সেই কবিতা পাঠক মনকে পাগল করে দেয়, পাঠক ভাবে, কবিতার কথাগুলো তো আমার ভাবনায় ছিল! কবি জানলেন কী করে? এবং এখানেই রচিত হলো কবিতার দ্বিতীয় ভুবন। কবিতা তখন আর কবির একার সম্পত্তি নয়। সে তখন পাঠকের বুকের বাঁদিকের জোছনা-হৃদয় ছুঁয়ে বসে গেছে। আসুন, ভাবনাটাকে এবার আরেকটু উসকে দিই। ধরা যাক, সেই পাঠকের কণ্ঠস্বরটি খুব ভালো নয়, অর্থাৎ সে কবিতাটাকে পাগলের মতো অনেক মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে চাইলেও কণ্ঠস্বরের কারণে সে আটকে গেল, তখন তার নিজস্ব ফোন থেকে সেই আশ্চর্য কবিতার ছবি তুলে পাঠিয়ে দিল তার কোনো বাচিক শিল্পী বন্ধুকে। এই বাচিকশিল্পী বন্ধুটি, তার সুশিক্ষিত ও চর্চিত কন্ঠস্বরের মাধ্যমে মাইক্রোফোনের সামনে যেন স্বপ্ন-বাস্তবের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে গেল একশ, তিনশ, পাঁচশ, হাজার মানুষের সামনে। সেই কবিতা যেন মুহূর্তের মধ্যেই ম্যাক্সিম গোর্কি মা-য়ের ইশতেহার হয়ে কানের ভিতর দিয়ে শ্রোতার হৃদয়ের মধ্যে ঢুকে পড়ল।

প্রিয় অংশুমালী, এই হলো কবিতার তৃতীয় ভুবন। এই প্রসঙ্গে একটা ছোট্ট অভিজ্ঞতার কথা বলি –  তাহলেই বোঝানো যাবে কবিতা কিভাবে মানুষকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়! তখন আমার একুশ বছর বোধহয়, একজন ৬৮ বছরের প্রৌঢ় সাম্যবাদী মানুষ ভাঙা সাইকেল নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা আড়িয়াদহ দক্ষিণেশ্বর চষে আমার বাড়ি খুঁজে বার করেছিলেন। তার পকেট থেকে বেরিয়ে ছিল দেশ পত্রিকার একটা ছেঁড়া পাতার ছিন্নতম অংশ। যেখানে একটি কবিতার কয়েকটি লাইন ধ্রুব তারার মত জ্বলজ্বল করছিল, লাইনগুলো কি জানেন – প্রতিশ্রুতি শীতের চাদর, প্রতিশ্রুতি ভাঙ্গা চালে খড়, প্রতিশ্রুতি সাদা ভাত, ভাতে দুধ, দুধে ঘন সর, প্রতিশ্রুতি চেতনা স্তরে স্তরে সপ্তসিন্ধু জলের মর্মর…. ব্যস, ছেঁড়া ঠোঙার অংশ ঐটুকুই দেখাচ্ছিল কবিতার, যেন বর্ষা ভেজা ছাতিমের ডালের আড়ালে একটুকরো শ্রাবণ পূর্ণিমার চাঁদ! আমার সৌভাগ্য কবিতাটি আমি তাকে খুঁজে দিতে পেরেছিলাম আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহর দেশ পত্রিকার পাতা থেকে। পূর্ণেন্দু পত্রীর অবিস্মরণীয় – হে সময় অশ্বারোহী হও। জানিনা, কোটি টাকা পেলে মানুষের মুখের অবস্থা কেমন হয়, শুধু দেখেছিলাম ৭০ ছুঁই ছুঁই সেই মানুষটার দশদিগন্ত উদ্ভাসিত মুখ।

আমি বোধহয় কবিতা কেন পড়ি সেই প্রশ্নের ব্যক্তিগত অনুভূতিটা আগেই জানিয়ে ফেলেছি, তাহলে আসুন অংশুমালী, কবিতা কেন লিখি তার অকপট স্বীকারোক্তিটুকু শোনাই। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের প্রথম দিনের প্রথম সেশানে এককাট্টা আমাকে দেখতে পাই দুনিয়া হাতের মুঠোয় নেওয়া শ্রীকৃষ্ণের সামনে, না, আমি সেদিন কিছুতেই গান্ডীব তুলে ধরিনি –  শ্রীকৃষ্ণ

গীতা আবৃত্তি করে করে হয়রান হয়ে গিয়েছিলেন। হ্যাঁ, আমি সেই যুদ্ধহীন প্রান্তরে দিনশেষের কনে দেখা আলোতে বসে প্রথম কবিতা লিখেছিলাম। পৃথিবীর কোণে কোণে ধর্মযুদ্ধ, দু-দুটো বিশ্বযুদ্ধ, ১৯৪৩-এর মন্বন্তর, দাঙ্গার রক্ত, ভিয়েতনাম আর আরব গেরিলাদের অস্তিত্বের লড়াই, দাবানল থেকে বাঁচার জন্য আমাজনের অরণ্যের নীরব কান্নার সঙ্গী ছিলাম। আর্ভিং স্টোনের লাস্ট ফর লাইফ থেকে নাৎসী বাহিনীর নাকের ডগায় আত্মগোপন শেল্টারে কিশোরী অ্যানা ফ্রাঙ্কের ডায়েরির পাতায় পাতায় ছিলাম। এন্টনি কবিয়ালের ফরাস ডাঙা থেকে কৃত্তিবাস ওঝার ফুলিয়াতেও ছিলাম। নীলদর্পণ নাটকের দর্শক হিসেবে বসেছিলাম বিদ্যাসাগর মশাইয়ের পাশে। সেখান থেকে একশ বছর পেরিয়ে রবীন্দ্রসদন মঞ্চে টিনের তলোয়ার থেকে আকাডেমি অফ ফাইন আর্টসে কীর্তনখোলা, শেষ সাক্ষাৎকার আর লাল ঘাসে নীল ঘোড়া নাটকের দিকে অবাক তাকানোতে আর আন্তিগোনে নাটকের অন্তিম মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে ছিলাম। ইয়েস ছিলাম। বিশ্বাস করুন, আমি ভীষণভাবে ছিলাম সুভাষ মুখার্জির পদাতিক, অগ্নিকোণ, ছেলে গেছে বনে আর ২১ বছরের কবির ছাড়পত্র, অবাক পৃথিবী-তে। উত্তর বাংলার তীর-ধনুক তুলে ধরা ৫৯-৭০-এর গর্জনেও ছিলাম। আমি আকাশ মাটির ভ্রুসঙ্গমে কোন ঝড়ো বিকেলে শান্তিদেবের গলায় কৃষ্ণকলি শুনবো বলে একদিন বসে ছিলাম। খুঁজেছিলাম এরিক মারিয়া রেমার্কের অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্টের পাতা থেকে সাতচল্লিশ আর একাত্তরে ছিন্নমূল হয়ে দীর্ঘ হাঁটাপথে। রবীন্দ্রনাথের বলাকা-র থেকে রূপসী বাংলার কবির ধূসর পান্ডুলিপিতে। আমি উন্মাদের মতো আঁকড়ে ধরেছি ঝড়ের খেয়া আর শেষ লেখাকে। বিশ্বাস করুন, আমি কবি প্রেমেন্দ্র মিত্রের সাগর থেকে ফেরা আর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের দেখা হল ভালোবাসা বেদনায়, কালি, কলম, মন, হৃদয়, মেধা ডুবিয়ে দিয়ে জাগো জাগো সর্বহারা হয়ে গেছি। আমি পথশ্রমে ক্লান্ত ফা হিয়েন কে রেশম পথের গান শুনিয়ে ছিলাম, ক্লান্ত বিধ্বস্ত আলেকজান্ডারকে সিন্ধু নদ পার হবার জন্য হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলাম। আমি মাইকেল মধুসূদনের মেঘনাদবধ ও শূণ্য মদের বোতল থেকে ডানা মেলে দিয়ে ডিরোজিও স্যারের ক্লাসে হাজির হয়েছিলাম। ২৭ বছরের ধারাবাহিক নাট্যকর্মী জীবনের কোন একদিন, শো-এর শেষে বেথুয়াডহরির শূণ্য প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে, মাঝরাত কে সাক্ষী রেখে, কিছুটা দূরেই পলাশীর প্রান্তরের মাটি আঁকড়ে ধরে জিজ্ঞেস করেছিলাম – ওহে ক্লাইভের তরবারি তোমার গায়ে ভারতবর্ষের কতটা রক্ত লেগে আছে? আমি আমার কবিতার কল্পনায় আঁকা তিন নারীর – শ্যামলিমা, বনদেবী আর নীলতারা-কে নিয়ে গিয়েছিলাম তানসেন ও মহঃ রফির যুগলবন্দী শোনাতে। আমি শেখ মুজিবের ভাষণের মন্ত্রমুগ্ধ শ্রোতা হয়ে একটানা পড়ে গেছি শামসুর রাহমানের স্বাধীনতা তুমি আর শ্লোগান কবিতায়। আমি পয়লা সেপ্টেম্বরের বিশ্বশান্তি মিছিলকে লুটেরা তৈমুর লঙের বেলাগাম ঘোড়ার সামনে ব্যারিকেড করে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলাম। আমি বুদ্ধদেবের ক্ষমা সুন্দর শান্ত দৃষ্টি ও সুজাতার দেওয়া পায়েসের বাটির সামনে নতজানু শ্রদ্ধায় গেয়ে উঠেছিলাম হেমাঙ্গ বিশ্বাসের শঙ্খচিল আর সলিল চৌধুরীর ও আলোর পথযাত্রী।

বিশ্বাস করুন ১২ বছরের তপস্যা শেষে বল্মীক স্তুপ ভেঙ্গে বেরিয়ে আসা কমরেড রত্নাকরকে খাতা আর পেন উপহার দিয়েছিলাম এই আমি। আমার নিঃস্ব হাতে, আমার দীনতম দীনতায়, আমার কলা পাতায় দু’মুঠো গরম ভাত, দু হাতা ডাল, একদলা আলুভাতে ছাড়াও একটা ৩ টাকার পেন আর ১০ টাকার লেখার প্যাড কিন্তু রয়ে গেছে, যা দিয়ে অন্তত ৫০টা কবিতার ক্ষেপণাস্ত্র বানানো যায়; যা আমি অনায়াসেই ছুঁড়ে মারতে পারি যুদ্ধবাজ, দাঙ্গাবাজ, মানুষের রক্ত দেখা সন্ত্রাসবাদীদের লক্ষ্য করে।

প্রিয় অংশুমালী, এই হল বাংলা ভাষার ব্যর্থ কবি আরণ্যক বসুর কবিতা-কৈফিয়ৎ। মায়ের কসম বলছি, অন্যান্য যাই লিখি না কেন, যাই বলি না কেন, কবিতা লিখতে না পারলে আর রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে খালি গলায় সেই কবিতা মানুষের কাছে পৌঁছে না দিতে পারলে আমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারবোনা। বিশ্বাস করুন অংশুমালী, আমি কবিতা লিখতে না পারলে, কবিতা বলতে না পারলে, মরে যাব। কবিতার জন্য আমি হাজার মাইল হাঁটতে পারি।

আরণ্যক বসু। কবি, নাট্যকার ও বাচিকশিল্পী। জন্ম ও বাস ভারতের পশ্চিমবঙ্গরাজ্যের কলকাতায়। প্রকাশিত বই: মেঘ রোদ্দুর নীলাকাশ (প্রতিভাস), শোকসভার পরে এবং অন্যান্য নাটক (একাল), মেঘ চলেছে হলুদ পুকুর (প্রিতম প্রকাশন), ছায়াপথের কাছে ও অন্যান্য নাটক (উ,খন্ড), মন খারাপের ছেঁড়া পাতারা (প্রয়াগ...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

প্রতিভাস

প্রতিভাস

স্পষ্টতা অন্ধকারের মতো স্পষ্টতা আলোর মধ্যগগনে নেই। উত্তাপে ঝলসে যাওয়া চোখে শীতলপাটি বিছিয়ে দেয় রাত…..

চিঠি

ক্ষোভ রোদের দোকানি হয়ে, ছুঁয়ে গ্যাছি দূর পরবাস আলোর ক্রেতারা দেখে, শূন্য ঝুলি খালি সর্বনাশ।…..