আহ্বান 

মহুয়া মল্লিক
গল্প
Bengali
আহ্বান 

গাছের ছবিটা রমিতা প্রথম দেখে ভোরাইয়ের ল্যাপটপ স্ক্রীণে। মেয়েকে কফি দিতে এসে ছবিটা দেখে কেমন সম্মোহিতের মত মেয়ের চেয়ারের পিছনে এসে দাঁড়ায়। যতই পা টিপে টিপে আসুক ভোরাই ঠিক টের পেয়েছে মায়ের উপস্থিতি। স্ক্রীণ থেকে চোখ সরিয়ে সে ধীরে ধীরে পিছন ফেরে। রমিতার দিকে পলক না ফেলে তাকিয়ে থাকে ঠিকই, কিন্তু রমিতা টের পায় মেয়ের চোখের অনন্ত শূন্যতা।

“কীরে কী হয়েছে?” কফির কাপ টেবিলের উপর নামিয়ে রেখে ভোরাইকে ঝাঁকায় রমিতা। কাজ হয়। মুহূর্তে ভোরাই স্বাভাবিক।

বাপির ইমেল বাউন্স করেছে তাই ছবিগুলো আমাকে মেল করেছে প্রশান্ত কাকু। রমিতা কপালের ঘাম মুছে ছবিটার দিকে তাকায়। কেমন গা শিরশির করে ওঠে। প্রাচীন এক গাছের গুঁড়ি, যেন শতাব্দীর জমাট অন্ধকার মেখে দাঁড়িয়ে আছে। বিশাল গুঁড়িটাকেই প্রশান্তদা ফোকাস করেছে কেবল। ওপরের দিকে শাখা প্রশাখা পাতা কিছুই দেখা যাচ্ছেনা। গুঁড়ি দেখে কী গাছ চেনা যায়! প্রশান্তদার যত সব উদ্ভট সাবজেক্ট নিয়ে কাজ!

কিন্তু ভোরাইয়ের ইমেল আইডি পেল কি করে? ভ্রূ কুঁচকে যায় রমিতার। নিশ্চয় কোনও এক সময় অংশুই দিয়ে রেখেছে। সত্যি অংশুর যে কবে কান্ডজ্ঞান হবে! মেয়েটা বড় হচ্ছে সে খেয়াল নেই!

চোরা চোখে আরেক বার ছবিটার দিকে তাকাল রমিতা। গুঁড়িটা ঠিক আর পাঁচটা গাছের গুঁড়ির মত স্বাভাবিক না, কেমন জিওম্যাট্রিক প্যাটার্নের। রমিতার কেন যেন মনে হচ্ছে গুঁড়িটার দু’প্রান্ত এখুনি এগিয়ে এসে পরস্পরের সঙ্গে জুড়ে গিয়ে একটা গোপন কুঠুরী তৈরী করে ফেলবে। আলোহীন, হাওয়া-বাতাসহীন একটা কুঠুরী। কোনোক্রমে সেখানে কেউ আটকে গেলে দম আটকে ছটফট করতে করতে মরে যাবে।

“মা, ও মা কী কষ্ট হচ্ছে? এরকম করছ কেন?”

চেয়ারটা ধরে টাল সামলায় রমিতা। ভোরাই দেখে এত অল্প সময়ের মধ্যেই ঘেমে নেয়ে গেছে মা। সে টেবিলের উপর থেকে জলের বোতলটা তুলে মায়ের দিকে এগিয়ে দেয়। ঢকঢক করে অর্ধেক বোতল জল খেয়ে ধাতস্ত হয় রমিতা। আঁচল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে ভোরাইয়ের দিকে তাকায়। মেয়ের চোখে আঁতিপাঁতি করে কি যেন খুঁজতে থাকে।

 আশ্চর্য!

কী আশ্চর্য? সত্যি কথা বললেই চিৎকার করে থামাবে আমায়? তুমি জানো না লোকটা আঠারো থেকে আটষট্টি কারুকে ছাড়েনা? তাকে কিনা…

“আরে দূর বাবা, আমি কেন দিতে যাব? আর আমাকে তো কালকে পাঠিয়েছে ছবিগুলো। ওর সঙ্গে কথাও হয়েছে। অবশ্য সবই কাজের কথা। এর মধ্যে ভোরাই আসবে কেন?

তাহলে? রমিতার কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে যায়। বিছানার এক প্রান্তে কাঠ হয়ে শুয়ে থাকে।

 ল্যাপটপ অফ করে অংশু এগিয়ে আসে। মোবাইলটা এগিয়ে দেয়। ছবিগুলো দেখ। মোট বারোটা ছবি। প্রশান্ত কিন্তু জিনিয়াস। ওর ছবি যেন কথা বলে। তুমিও তো ওর ছবির অন্ধ ভক্ত। এবারের সিরিজটা করছে “জঙ্গল কথা”। ভালো করে দেখ মিতা , আলো ছায়ার কী অসাধারণ কারুকাজ। পাতা, বাকল, শুকনো ফুল যেন কবিতার মত ছন্দময়। লোকটার একটু আধটু দোষ আছে ঠিকই কিন্তু এই গুণের জন্য সব ক্ষমা করা যায়, “কী বলো?”

রমিতা বারোটা ছবির মধ্যে ঐ ছবিটা না পেয়ে স্তব্ধ হয়ে যায়। ভোরাইকে বেছে বেছে ঐ ছবিটা পাঠালো কেন প্রশান্ত? ওর উদ্দেশ কী? কাল সকালে উঠে ভোরাইকে জেরা করতে হবে, প্রশান্ত কাকুর সঙ্গে তার কীসের এত মেলামেশা!

গা’টা কেমন ম্যাজম্যাজ করছে বুঝলে , পেপারটা ভাঁজ করে সোফার উপর ছুঁড়ে ফেলে অংশু বলে উঠল। রমিতা সাড়া দেয়না। আংশুর এসব কায়দা তার চেনা আছে। অফিস না যাওয়ার বাহানা। আর অংশু অফিস না যাওয়া মানে ভোরাইয়ের সঙ্গে কাজের কথা কিছুই হবেনা। কাল থেকে মনের মধ্যে কাঁটাটা বিঁধে আছে, না তোলা অবধি শান্তি নেই। মনে মনে চটে যায় রমিতা। নিজের ফোনটা তুলে নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপের ব্লক লিস্টে ঢুকল। বহুদিন ধরে অবহেলায় সরিয়ে রাখা নাম্বারটা আনব্লক করল। কিছুক্ষণ পরেই টুং করে একটা মেসেজ ঢুকল। যা ভেবেছে তাই। প্রশান্তর একটা গুড মর্নিং উইশ। রিড হওয়া মাত্রই দ্বিগুণ উৎসাহে দ্বিতীয় মেসেজটা পাঠিয়ে দিল। এতো সেই ভয়াবহ ছবিটা যেটা দেখে কাল ভোরাইয়ের ঘরে মাথাটা ঘুরে গিয়েছিল। ভোরাইয়ের চোখেও পলকের জন্য শূন্যতা দেখেছিল। ইচ্ছে করল এখুনি মেসেজটা ডিলিট করে দিতে। কিন্তু অজানা এক সম্মোহনে ছবিটার দিকে তাকিয়েই থাকে রমিতা জগৎ সংসার ভুলে। একসময় টের পেল গুঁড়িটা যেন নড়েচড়ে উঠল। শুষ্ক গুঁড়িটায় যেন প্রাণের সঞ্চার হয়েছে, মাংসল হাত পা ছড়িয়ে মোবাইলের স্ক্রীন ভেদ করে রমিতার কাছে চলে এসেছে …খুব কাছে। তাজা রক্তমাংস আর চেনা ঘামের গন্ধ রমিতাকে ঘিরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এখুনি যেন ঘিরে ধরবে ওকে। তারপর টেনে নেবে তার গোপন কুঠুরীতে।  দমবন্ধ করে মেরে ফেলবে তাকে। সভয়ে চোখ বন্ধ করে রমিতা।

টুং করে আবার একটা মেসেজ ঢোকে। কিছু ভাবলে রমি?

রমিতা চোখ খোলে। মোবাইলের থেকে চোখ তুলে সামনের শূন্য দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকে। আবার একটা মেসেজ ঢোকে। টুং করে একটা আওয়াজ, আবার একটা…। হাঁপাতে থাকে রমিতা।  টলতে টলতে উঠে দাঁড়ায়। ভোরাই আর অংশুকে একবার চোরা চোখে দেখে নিয়ে শোওয়ার ঘরে ঢুকে পরে। দ্রুত হাতে প্রশান্তকে টেক্সট করে, “প্লিজ তাজপুরের ঐ ছবিগুলো ভোরাইকে পাঠিও না। মেয়েটা বড্ড কোমল, স্বৈরিণী মায়ের এই রূপ মেনে নিতে পারবেনা। আমি আসছি প্রশান্তদা”।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..