আয়নাঘর

বিধান জানা
কবিতা
Bengali
আয়নাঘর

আবাস

ক্ষণিকের জন্যও তোর ভাবনা ছাড়তে পারবোনা এই তোকে স্পষ্ট বলে রাখলুম । ছাড়তে যে পারিনা তা তুই জানিসও। যদি চিত্রল রথে দুটো স্বপ্নিল ডানা আঁকতে চাস, সে না হয় আঁকিস, যদি বেরিয়ে পড়িস মেঘের পিঠে সওয়ার হয়ে দিগন্ত ছুঁয়ে দেখতে তো মন্দ কি, যদি ভাবিস ঘষে মেজে ঝকঝকে করে দিবি জং ধরা চাঁদ, সে না হয় দিস । কিন্তু স্বপ্নেও যদি তুই গাঢ় স্বরে কিংবা খুব নিরুত্তাপ সহজ গলায়ও সাকিন জানতে চাস কোন মনসুর মিঞা কিংবা নীলকন্ঠ দাস কিংবা ধর লালন বৈরাগীর, আমি জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে যাই। আমি কি নিষিদ্ধ্ব নিবাস ? তুই, তুই তো সত্যি জানিস কোথায় আমার বাস, তোর চেয়ে বেশী কে জানে বল !

ভাঙা মন্দিরের চাতালটা পেরিয়ে লালমাটির রাস্তার পাশে কাঁচা পাকা গাছ আঁকা আছে, তার পিছনে সবুজ রঙীন মাঠ, কিছুটা দূরে ঘোলাটে জলের নদী নাচতে নাচতে চলে যাচ্ছে উচ্ছ্বল কিশোরীর মত, ডিঙি নৌকোয় চড়ে ক্ষণিক ঘুরেও আসা যায় যখন মন চাইবে তখনই, বাঁশের সাঁকো যেমন আছে তেমন না হয় থাক । তুই চেয়েছিস বলে নদীর অন্য পিঠে কাশের বন রেখেছি, নরম হাওয়া দোলে ঢেউয়ের মত। তার কিছুটা দূরে সেই টালির ঘরের ভিতর তুই স্বপ্নে প্রায়ই হেঁটে যাস। পাশেই তার একলা নিঝুম টোপা কুলের গাছ।

আমি তো স্বপ্নেও জেগে থাকি, যদি তুই ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে হারিয়ে যাওয়ার ভয় পাস !

আয়নাঘর

খেলার ছলে আয়নাঘরে ঢুকে দেখি সে এক আজব কান্ড
চারপাশে অসংখ্য প্রতিবিম্ব, আমারই
সমস্ত দিক থেকে শুধুই আমি ছড়িয়ে ছিটিয়ে
একটু যদি নড়ি, অসংখ্য আমি ঘুরে তাকায়, দ্যাখে
আমাকেই দ্যাখে
আমিও যত্ন করে তাকাই, খুঁটিয়ে দেখতে থাকি প্রতিটি আমিকে
কিছুক্ষণ দেখতে দেখতে কেমন যেন মনে হয়
আমার ছবির ভিতর কিছুটা যেন শূণ্য হয়ে আছে
বুঝলাম আমার সেই অংশটুকু প্রতিবিম্বে নেই
কিন্তু সে কোথায় গেল ?
আমার সেই আমিকে তো দেখতে পাচ্ছি না
যার চোখে লবণাক্ত মেঘ আড়মোড়া ভাঙে
যার হাতের গোলাপ ডানা মেলে গোধূলি হয়ে যায়
যে সমস্ত আয়না জুড়ে চেয়েছে উথাল পাথাল ঢেউ
অজস্র আমির মধ্যে খুঁজতে থাকি
কিন্তু কোথাও তাকে পাচ্ছিনা তো আমি
তবে কি সে তোমার কাছে অবাধ্য ঠোঁট জুড়ে
কোন নতুনতর ছবি আঁকছে এখন
না কি তোমার বুকে মুখ রেখে সে ঘুমোয় ?
আচ্ছা পাগল, আমার সাথেও এমন লুকোচুরি !

জ্বর

এমনটা কি ভালো, এমন হওয়া ?
এই সবকিছুতেই তোমায় দেখতে পাওয়া
সমস্ত ক্ষণ তোমার তরে জ্বর !

সুবর্ণরেখার মাঝে জেগে ওঠা পাথরে পাথরে শুই
ফুলডুংরির রোদ্দুরের সাথে ডানা মেলে উড়ি
কিন্তু সবখানেতেই তুমি এমন করে ছুঁয়ে থাকো !
শুকনো পাতার ঝুমুরে তোমার দীর্ঘ পায়ের স্বাদ
ফুল ফুটে আছে তোমার মুখের ছাঁদে
ঝর্ণাধারার উল্লাসেও তোমার নিভৃত স্নানের শব্দ মিশে থাকে

বুরুডি লেকের পথে যেতে যেতে
গাড়ির উইন্ডস্ক্রিনের বাইরে, কাছে বা দূরে
কিচ্ছুটি দেখতে পাইনি আমি
না জংগল, না জল, না পাহাড় না রোদের নূপুর
না উদাসী রেলপথ, না মন্দগামী মালগাড়িটির খয়েরি শরীর
সবখানেতেই তোমার আবেশ, তোমার অনুভব

এমনটা কি ভালো, এমন হওয়া ?
এই সবকিছুতেই তোমায় দেখতে পাওয়া
সমস্ত ক্ষণ তোমার তরে জ্বর !

যেতে হবে

যেতেই হবে ?

বেশ, যেতে যখন হবেই …… !

দিকে দিকে অভিযাত্রী ফেলে গেছে অতীত আকাশ
পান্থশালায় কত অভিমানী রাত
আশাহত অশ্বারোহী দূরন্ত ধূলোর মেঘে
এঁকেছিল ব্যর্থ প্রেম জং ধরা চাঁদ

পথিক নই তো আমি, পোড় খাওয়া নাবিকটিও নই
জলরেখা দিয়ে লিখি অনিকেত দেহ মন
স্মিত ঠোঁট, মৃদু গজদাঁত

মধুর শরৎ হাত পা ছড়িয়ে বসে কাশবনে
পাশে বসে গল্প করে মগ্ন খেয়াঘাট
ঘাসফড়িঙের বেশে ছুঁয়ে যায় দোতলার ছাত

ইজেলের বুকে পিঠে, নদীস্রোতে, আলতামিরায়
শস্যক্ষেতে, পক্ষী নীড়ে, দোতলার ঝুল বারান্দায়
ছায়াপথে, সদ্যোজাত নীহারিকা ফুলে

কত দূরে যেতে হবে ?
যাবো আমি, যেতে হবে বলেছো যখন
তুমি শুধু তুমিহীন স্থানবিন্দু নিজে খুঁজে দাও।

বিধান জানা। কবি। জন্ম ১৯৬৯, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলার তমলুকে (বর্তমানে পূর্ব মেদিনীপুর)। পেশাগত জীবনে তিনি সরকারি চাকুরে। গত দশবছর ধরে কবিতা লিখছেন।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

কবুতর

কবুতর

অগ্নিকাণ্ড আমার চৌহদ্দিতে ধ্বংসস্তুপের ভীড় পুনর্বার নুয়ে পড়া অতীতের তীর জীবনের মাঝপথে রেখে যায় সম্পর্কের…..