ইতি আলো

সাবরিনা ফেরদৌস
ছোটগল্প
Bengali
ইতি আলো

‘ইতি আলো’- ব্যাস! আর কিছু মাথায় আসছে না! অথচ বুকে জমে আছে এক সমুদ্র কথা। সব লেখতে চাই আমি। সব। আমার উপন্যাস। আমার গল্প। হোক না সে নির্জীব সাধারণ মানের, তবুও লিখতে চাই।

নীম্নমধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে আমি। কথার পিঠে পদ্য আমার আসে না। আসলে ভালো হত। ওই যে যারা বিকেলবেলা নিয়ে পদ্য করে, সন্ধ্যার আকাশ নিয়ে পদ্য করে তাদের মতো! রোদ নিয়ে গানের কলি, পানি নিয়ে, কাশফুল নিয়ে কত সুন্দর সুন্দর গানের কলি তারা বলে! আমার আসে না। শুনি হয়তো… মনে থাকে না। ঠিকসময়ে ঠিককথাটা আসে না আমার বোলে। আমি খুব দরিদ্র এ ব্যপারে। আমাদের সংসারের মতো। শাকসব্জি হয়তো আসে, কিন্তু মাছ মাংস আসে না। আর আসলেও আসে চাষের তেলাপিয়া বা পঁচা পাঁচমিশালী।

কিন্তু ওদের আমার খুব ভালো লাগে দারিদ্র যাদের ছোঁয় না, যারা প্রায়ই নতুন কাপড় পরে। মাঝে মাঝে মীমদের বাসায় যাই। কীসুন্দর করে সাজানো নিজেদের অ্যাপার্টমেন্ট। সবার জন্য আলাদা আলাদা ঘর। কত্ত বড় বইয়ের আলমীরা। থরে থরে সাজানো বাংলা বই, ইংরেজি বই।

মীমের মা, বোন আমার সাথে মীমের মেলামেশা পছন্দ করে না জানি। কতবার ভেবেছি আর যাবো না ওদের বাসায়। সেদিন তো মীমের বড়বোন বলেই দিল আমার দিকে তাকিয়ে,’তুই আজকাল যা তা মানুষের সাথে মিশছিস মীম।‘ আমার খারাপ লেগেছিল।

কলোনির দুই রুমের বাসায় দাদীসহ আট সদস্য। সকাল থেকে রাত আবার রাত থেকে সকাল- আমাদের কাঙালপনা ঘোঁচে না। এর মাঝে কবিতা বা গানের জায়গা কই?

তবুও প্রাত্যহিক চাহিদাগুলো নিয়ে মায়ের বারমেসে চিৎকারের মাঝে আমি স্বপ্ন দেখি। স্বপ্নে আমি খুব সুন্দর গান করি। আমার গান শুনে রাজকুমার ঘোড়া থামায়। তারপর আমাদের দেখা হয়। আমরা হাত ধরাধরি করে বহুদূর যাই।

কিন্তু আমি আমার স্বপ্নের কথা লিখতে বসিনি। আমি জানি স্বপ্ন স্বপ্নই। আমি আমার জীবনের কথা লিখবো। আমার জীবনের কথা আমি আমাকে লিখবো। অনেক বড় একটা চিঠি, একটা উপন্যাস আমি লিখবো। এক নির্জীবের আত্মকথা’… হা…হা…হা।

তিন বছর হল টেনেটুনে বি এ পাশ করে বসে আছি। না হয় বিয়ে, না হয় চাকরি!

বাবামার নিত্য হা-হুতাশ – আমার জায়গায় কোন ছেলে সন্তান জন্মালে কী কী অসাধ্য সাধন করে ফেলত। মা-বাবার মুখ কালো করে আমার পরে আরো তিন কন্যা সন্তান তাদের। শেষে আসে রাজপুত্তুর। রাজপুত্তুরের কারণে পিঠাপিঠি তিতলি বেচারা ললিপপের কাঠি চুষে গেলো জীবনভর।

রাজাবাবুকে আমরা সবাই ভালোবাসি। তিতলিকে গোপনে ললিপপ কিনে দিলে ভাইয়ের জন্য নিয়ে আসে। টিউশনির বেতন পেলে সবার আগে রাজাবাবু। আমাদের অভাবি সংসারের কেন্দ্রবিন্দু রাজাবাবু। তাকে ঘিরে আছে খিটখিটে মেজাজের কংকালসার অভাবি বাবা, গায়েনীরোগে ভোগা ফ্যাকাশে রক্তহীন মা, শুধু সর্ষের তেল ডলে হাপাঁনীর সাথে সকালসন্ধ্যা যুদ্ধ করা দাদী আর আমরা চারটে বোন।

আতিয়ার কলেজে ভর্তি বন্ধ হত যদি না আমি দায়িত্ব নিতাম। ও আমার ব্যাগ থেকে টাকা চুরি করে ফেয়ার অ্যান্ড লাভলী কেনে। কতকিছুই না এ বয়সে কিনতে ইচ্ছে হয়, কতভাবেই না সাজতে ইচ্ছে হয়। কিছুই পারে না বেচারী। আমি দেখেও না দেখার ভান করি। অনেক কিছু দেখি আবার দেখি না। ও সুন্দর কাপড় পরা মানুষদের কাতারে যেতে চায়। চাইবেই তো। সবাই যেতে চায়। সবার যাওয়া উচিত। আমি কিছু দেখবো না।

আতিয়ার যদি অনেক কিছু চাইতে ইচ্ছে হয় তবে চাইবে। আরিফার যদি অনেক কিছু চাইতে ইচ্ছে হয় তবে চাইবে। তিতলিটার যদি সবকিছু চাইতে ইচ্ছে হয় তবে চাইবে। ওদের সাহস হোক চাওয়ার। আমি চোখ ভরে দেখবো। রাজাবাবু খেলনা চায়, রাজাবাবু সাইকেল চায়। তিতলিটা কিছু চায় না। আরিফার বাইরে যাবার একজোড়া জুতো চাওয়া হয় না। আতিয়া ফেয়ার অ্যান্ড লাভলী লুকিয়ে কেনে। অসহ্য লাগে আমার। ভীষণ কান্না পায়।

মা আর দাদীর আশির্বাদে আমি চাইতে শিখিনি। স্কুলে বাংলা আপা একদিন জিজ্ঞেস করেছিলেন আলাদিনের চেরাগ পেলে কী চাইবে? আমি তো দিশেহারা! কী চাইবো? কী করে চাইতে হয়? মা বকবে, দাদী বকবে, বাবা রাগ হবে। আমি কিছু চাইবো না।

এত বড় শহর, এত দোকান, হাজার রকমের জিনিস, মজার খাবার; কিন্তু আমার কিছু চাওয়ার নাই।

আমার খুব কষ্ট হয়। একসমুদ্র কষ্ট হয়, তার চাইতেও বেশী কষ্ট হয়। আমি মুখ খুললে বোধহয় দরদর করে কান্না বের হবে। আমি কান্না গিলে ফেলি। থরে থরে সাজানো বইয়ের আলমীরা- বাংলা বই, ইংরেজি বই। নরম কার্পেট, সবার জন্য আলাদা ঘর, সুন্দর বিছানা। গ্লাস ভর্তি দুধ, পাউরুটি, পায়েস, পোলাও, সুন্দর গন্ধ। নতুন জামা, জুতো, কত রঙের লিপস্টিক, কানের দুল, মুখের ক্রিম, বডি লোশন। কিন্তু আমি মুখ খুললে শুধু কান্না বের হয়।

আজকাল আমার ঘুম হয় না। বিছানায় এপাশওপাশ করা যায় না, একভাবে শুয়ে থাকি রাতভর। এত ঘিনঘনে কাছাকাছি বাস আমাদের, তবুও যেন আমি আলাদা গ্রহে থাকি। সবাইকে আমার দূরের মনে হয়। ছোট্ট বারান্দায় আমি চিঠি লিখতে বশি আমাকে। শুধু ইতিটুকু লেখা হয়। একান্ত আমাকে আমার কথা বলার সাহসও আমার হয় না।

সাবরিনা ফেরদৌস। লেখক।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ