ইদানিং অরণি-অরিন্দম

আনিস আহমেদ
কবিতা
Bengali
ইদানিং অরণি-অরিন্দম

যাত্রী

সেতো আজকের কথা নয় আদৌ
ফুলবাড়িয়া থেকে কমলাপুরে
স্টেশন এসেছিল যখন সেই শৈশবে আমার
বড্ড ইচ্ছে ছিল চড়বো উল্কায়
কিংবা সে দিনের সেই গ্রীন অ্যারোতে
ছুটবো তীরের বেগে অজানা কোন গন্তব্যের দিকে
ছিল আগ্রহ অপরিসীম, ছিল না জানা গন্তব্য আদৌ
পথ-চলার আনন্দেই চাইতাম দ্রুতযানে যাত্রা।
ঠিক ঐ গতিতেই কবে বড় হবো
ভেবে ইচ্ছের পাখিটা উড়তো মনের মুক্ত আকাশে।

এখনতো আর হায় ওড়াইনা আকাশে কোন ইচ্ছে-ঘুড়িও
দ্রুতযানে ভ্রমণে কেন জানি ভয় পাই অহরহ
না, না কোন দূর্ঘটনায় পড়বে আমার ট্রেন কখনও
তেমন ভয়ে সন্ত্রস্ত নই আদৌ,তবু এখন শুধু চাই
বাহন আমার চলুক ধীরে,বাজুক তবলা ধীর বোলে
থামে যেমন লোকাল ট্রেন, তেমনি থামুক নানান স্টেশনে
কচি ডাবের পানি, খোসা ছাড়ানো শশা গুটিকয়েক
নেবো কিনে, সাথে কাঁঠালের কোয়া অথবা আমসত্বের স্বাদ
এগুলোই হবে এই যাত্রাকালে সঙ্গী আমার
কামরার কোন সহযাত্রীর সঙ্গে খোশগল্পে সকাল গড়াবে সন্ধ্যায়।

গন্তব্য তো নয় গোপন আদৌ,ধীর গতিতে চলুক না বাহন
চলিষ্ণু সময় ক্ষয়িষ্ণু হতে হতে শুনি না হয় আরও সপ্তকাহন।
স্বর্গ অথবা নরকে জানিনে কোথায় থামবে গাড়িটি আমার
ঈশ্বর নামাবেন পতাকা যেদিন, জানি সময় হবে সেদিনই নামার।
সঙ্গে থাকবে কি সম্পদ কিছু? নাকি কেবলই কতক নিরর্থক বোঝা
পাপ ও পূণ্য যাই-ই থাকুক, অবশেষে হবে শেষ ঈশ্বর খোঁজা।
বলবো সেদিন আলখাল্লা পরা মোল্লারা সব মিছেই দেখালো ভয়
পিতাই বলো, প্রেমিকই বলো প্রাপ্তিতে তাঁর অবিমিশ্র এক জয়।
হয়ত সেদিন বলবো আমি,কেন হলো না বাহন দ্রুতগামী
অদৃষ্ট থাকে দৃষ্টির বাইরে, জানেন শুধু অন্তর্যামী

নস্টালজিয়া

অকারণেই শ্রাবণ মেঘ জমে যখন-তখন
চোখের গভীরে, দু এক ফোঁটা বর্ষণ
তারপর আবারও কষ্টের সম্ভার সাজানো।
স্বদেশ অন্বেষায় কাটে দিনক্ষণ
প্রবাসী এ প্রাণ প্রাচুর্যের প্রাচীর পেরিয়ে
চলে যেতে চায় সেই সবুজ উপত্যকায়
কেটেছিলো একদা দূরন্ত দিনগুলো যেখানে
ডিঙ্গায় ভাসানো স্বপ্নরা, ভিড়েছিলো তীরে
সেইখানে সেই যানজটের ভীড়েই খুঁজে নেবো
শৈশবের সেই চঞ্চল কাঠবেড়ালি মনটাকে।

জানি প্রিয় ও পরিচিত ফটকের দু’পাশে
কামিনী গাছের ছায়া, কাজুবাদামের ফুল
কিছুই পাবো না আর, মায়ের মারের ভয়ে
খিল আঁটা ঘরে কাঁঠাল ভাঙ্গার সেই রোমাঞ্চ
এখন কাহিনী ও কবিতার দেহের উপাদান
কেবল, বাস্তবে অ্যাপার্টমেন্ট অপসংস্কৃতির
বাজারে হারালো কেয়ারি করা বাগান।
তবু্‌ও মনের গহীনে দিবানিশি তারই সন্ধান
যাকে হারাই বার বার। মাটির কাছাকাছি
যেতে চাই সহসা, পেতে চাই হারানো মাকে।

হয়ত জানি এ ও বেদনা বিলাস এক ধরনের,
কবিতার দেহকে পুষ্ট করার এ এক ছলনা।
প্রাপ্তি যে নেই, তাও বলি কেমন করে আজ
মা ও মাটিকে ভাবতে গিয়ে অকস্মাৎই দেখি
মেঘ ভেঙ্গে অঝোর এ বৃষ্টিপাত, মনের শুষ্ক ভূমিতে।

 

নৈঃশব্দের শব্দ

শব্দের সঙ্গে নৈঃশব্দের এমন যে বিরল মিল
স্ববিরোধী সংজ্ঞা সত্বেও
যে এক অলিখিত সম্পৃক্তি দু জনের
তাতেই বিস্মিত আনন্দে, মেঘ ফেটে নামে
বৃষ্টির অঝোর ধারা।
কিংবা কাঁটার আধিপত্যকে ছাপিয়ে
ফোটে থোকায় থোকায় গোলাপ।

শব্দ যখন উচ্চকিত উচ্ছাসে
নিজেকে করে উচ্চারিত বার বার
নৈঃশব্দ তখন নীরবে নিশিথ করে পার।
শব্দ যখন বর্ণে, গন্ধে, মাতোয়ারা চারিদিক
নৈঃশব্দ তখন নিমগ্ন নিজেরই মধ্যে
যেন আবর্তিত এক ঘড়ির কাঁটার মতো
বৃত্তের ভেতরেই তার আনাগোনা।

সাগর পারে আছড়ে পড়া ঢেউয়ের মতোই
শব্দ তখন ধ্বনি থেকে রূপান্তরিত প্রতিধ্বনিতে।
নৈঃশব্দ তখন দ্রুতগামি চাঁদের মতো নিস্তরঙ্গ;
ডুব দেয় সাগরেরই ভিন্ন মেরুতে।

শব্দের অট্রহাসিতে চৌচির যখন
নৈঃশব্দের দেয়াল,
তখনও কেবল নীরবে অশ্রুমোচন
বেদনার রঙে নীল হয়ে থাকা,
শব্দেরই এক পাশে।
শব্দ ও নৈঃশব্দের এই মিথস্ক্রিয়ায়
জয়ী কে, কে বা জানে
নৈঃ শব্দের হৃদয়ের ভেতেরই তো আছে
শব্দের অনুদগত অস্তিত্ব।

 

ইদানিং অরণি-অরিন্দম

অরণি -অরিন্দমের সম্পর্কে বিশাল এক ছেদ-চিহ্ন
বিচ্ছেদ নয় বটে তবু জগৎটা যে তাদের এখন ভিন্ন
দুজনই তারা প্লেটোর প্লেট থেকে নেয় প্রেমের বিমূ্র্ত সাদ
প্রত্যক্ষ প্রণয় বারণ নাকি, প্রেম নদীতে বিশাল এক বাঁধ।
নায়াগ্রার মতো ঝরতো যে একদা অজস্র প্রেমের প্রপাত
এখন কেন তবে স্তব্ধ সবই হবে না’ক কখনওই প্রভাত!

পাখিরাতো এখনও ঠোঁটে ঠোঁট রাখে, করে সুখের কূজন
কে দিল দূরে ঠেলে অরণি-অরিন্দমেরে, পৃথক কেন দুজন
নদীরাতো এখনও বয়ে যায় বরাবরের মতো দুজনেরই কুলে
রমনা কিংবা রবীন্দ্র সরোবর এখনও তো ভরে ফুলে ফুলে
ওদের প্রেমের মুকুল কেন আজ ফোটে নাতো ফুল হয়ে
বন্ধ ঘরের মধ্যেই কী তবে সম্ভাবনা সব যাবে ক্ষয়ে।

দূজনই দেখেছে, সূর্য উঠেছে, তবু বাইরে যাওয়া বারণ
এ কেমন তরো শাসন তোমার, বোঝেনা তারা কারণ
জানালার ওপারে অরণি বসে থাকে কষ্ট-কলস কাঁখে
অরিন্দম অনর্গল লিখে যায় কবিতা, জীবনের দূর্গম বাঁকে।
নিষেধের দেয়াল তুলেছে আজ, অনুজীবেরা হয়ে ব্যাধি
ভালোবাসা হয়ে যাবে কী হায় নির্জন কোন সমাধি

ঢেউয়েরা সব আছড়ে পড়ে, শত বাঁধনের বাধাতে
কৃষ্ণ কি তবে রাখাল হয়ে র’বে, মিলবে না সে রাধাতে!

আনিস আহমেদ। কবি, সাংবাদিক ও সাংবাদিকতার শিক্ষক। জন্ম বাংলাদেশের কুমিল্লায়। তিনি ইংরেজি সাহিত্য ও ভাষা বিষয়ে ঢাকা এবং ইংল্যান্ডে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়াশুনো করেছেন। ঢাকার নটরডেম কলেজ ও সেন্ট্রাল উইমেন্স কলেজে শিক্ষকতা দিয়ে তাঁর কর্মজীবনের সূচনা। পরে ১৯৮২ থেকে...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ