ইভকণা

পরিতোষ হালদার
কবিতা
Bengali
ইভকণা

স্ল্যান

রাত ছিল―অথচ, অন্য কোনো গভীর রাতে বকুল অব্দি তার রূঢ় ঈর্ষা
ঝরে পড়ে ডটচিহ্ন―রূপার শিশির।

হেমন্ত এলে লাল হয় জিরাফের চোখ
লম্বা আর্তনাদ আর লিরিকের কাছে আড়ি পাতে
মোম।
প্রণয় গলিয়া গেলে, বাকিসব সীমার বাহানা;
রক্ত
মাংস
আর ক্রমগণ শিৎকার খোঁজে।
কি তুমি লুপ্ত করো, না কি তিনভাগ ঝুপঝুপ পাতা।

নিজেরে দণ্ড দাও,
ইহ দাও,
স্ল্যান-যুবকের চশমায় জমা করো গোপন আহুতি।

*
(স্ল্যান: টেলিপ্যাথি জানা বিলুপ্তপ্রায় জনগোষ্ঠি)

ইভকণা

কোথাও পতন হবে, নইলে এতো ফড়িং উড়ছে কেন…

ঘাসে ঘাসে শিশির ও সয়ম্বর; চলো―শরীর খুলে আসি।
অপার স্তনে জন্ম নেবে ছায়াপথ।

খণ্ডিত আপেলে অজস্র ইভকণা, তুমি তার আদিআদি সই।
কি করে ফেরাবে তারে, যে তুমি নিজেই তুমি।

বাতাসে এত পাখি, এত পাখি; কোথায় থেমে আছে স্রোত।
সবগুলো দরজায় রেলের আগাম হুইসেল।

কথা ছিল তুমুল অলোর, লাল কোন বর্ণের পাশে জলপাই বন।
দুজনার এক ছায়া, তৃতীয় বিম্বের মতো বর্ষধারা।

দশমিক

এ কোন শৈশব, সব্জি বাগান থেকে উঁকি দেয় ঝিঙেফুল আর পাখিপাখি রেডিওরেখা।

কোথায় লুকাও তুমি, যে তুমি প্রকট করো…

একটি জোনাকি সারারাত জ্বলে, উড়ে যেতে যেতে কখনো আবার তিনটি জোনাকতারা।

দুইহাতে হুহু ছিটাও, নিমগাছের আকাশ থেকে তেপান্তর আসুক।
দেখ নতুন ঘরবাড়ি, জিরোযান, নতুন নতুন কুঞ্জবিতান।

ওইখানে যুবক জাগিয়া থাকে…

ইমেজের পর কয়েকটি সংখ্যা তারপর হলোপোর্ট তারপর বুড়িগঙ্গা―দশমিকের পরে কতদূর তুমি।

সারারাত একটা ট্রেন

সারারাত একটা ট্রেন, সমস্ত নিঝুম চিড়ে যায়। কু-ঝিক-ঝিক শব্দের কাছে
কিছুটা প্রণয় রেখে ফিরে আসে বন।

শব্দ যায়…ক্রোধ যায়…প্রতি প্লাটফর্মে পড়ে থাকে গতির বিশ্রাম।

ঝাউগাছ দেখো, পাতায় পাতায় লেগে আছে বোধ, শিশিরের জায়মান হিম।
দূর থেকে দূরে, আরো দূরে নতুন সুদূর।

তবু ওই একটাই ট্রেন, সাররাত অন্ধকার। তুমিতুৃমি অজস্র মানুষ
আর
আমি থির হয়ে আছি, ধাবমান ছায়ার মতো।

নির্ণয়

কোথায় যেন কাচ ভাঙছে আর ঝনঝন করে গড়িয়ে যাচ্ছে ক্রোধ।
তুমি কি ছায়া না কি ঠুমরির কোনো স্বর।

বর্ণ বলে ডাকি, কন্যাস্নান শেষে বারবার হতে পারো নীল।

নাচঘরে রাশি রাশি মদের গ্লাস―মুদ্রা নাচে, স্পর্শ নাচে; কতদূর ঝাউয়ের দোলা।
ঘুঙুর খুলে দেখো, টুকরো টুকরো জোছনার কুচি, সমগ্র অসীমে আজ হরিণের তীব্র চিৎকার।

ঝোলানো চাঁদের দেহ, তুমি বুঝে নিও মাংসের হিসাব-নিকাশ।

ট্রোজান ঘোড়া

যেতে যেতে অন্ধকার, ঘণ্টা বেজে গেলে সবগুলো ঘড়ি অতীত বাজায়।
হেসে ওঠে মুণ্ডুহীন মুহূর্তরেখা।

আকাশে আকাশে আজ স্নানের শূন্যতা, প্রকৃত উড়াল তবু অসমাপ্ত চিল।

কোথায় অরণ্য, সংসার থেকে সংসারে তার অশেষ গমন।
সমস্ত শিকারী আজ একসাথে মৃগয়া ডাকে। না আদি, না আদ্যভেদি কোনো সুতীব্র বল্লম।

ভেতরে দস্যুতা নিয়ে কী সুন্দর তুমি, যেন ট্রোজান ঘোড়া
অথবা
ধ্বংসোন্মুখ অন্য কোনো ট্রয় নগর।

মর্মর

দূরত্ব যেন পাখি, উড়ে যায় নক্ষত্রের দেশ, উড়ে যায় হিজিবিজি বাংলাখাতা।
কে বেশি বাজে দোতারা, সেতার, না কি তুমিই একতারা;
সমস্ত কাঁপন থেকে ঝরে পড়ে সুর।

অসংখ্য মর্মর এসে ধাক্কা খায়, কোলাহলে ফেটে পড়ে মর্মরেণু। আমি তো আমার প্রেমিক, অতীত থেকে আসা একজন আমি।
আর্শির সামনে পিতা-মাতা, পুত্র-কন্যা সবই আমি।

তবুও শরীর খুলে নেমে যাবে রাত, দুধভাতের মতো নির্জন।
মোড়ে মোড়ে দাঁড়াও চাঁদ, জোছনার ট্রাফিক পুলিশ।

শোধিত সন্ধ্যা

সব চোখে জ্বলে ওঠে রোদ ও অন্ধকার। শেষ দেখা শেষ হলে ফিরে যায় অতীতরেখা।
প্রশ্নের পরে প্রশ্ন তারপর উত্তরের কোলাহল তারপর রং তারপর সারি সারি আজকাল।

তদের ডেকে আনো এইসব শোধিত সন্ধ্যায়; মুহূর্ত বদল হলে নিভে যাবে রাত।
তোমার পোশাকের মতো আলো আর দেহের উৎসব।

দরজা খুলে দেখো অদ্ভুত কোনো ট্রেন, একই চরিত্রে আমিও আবাসিক,
সমবেগে ছুটতে গিয়ে আপাত স্থির হয়ে আছি।

নিঝুম

যখন নিঝুম ফোটে তখনো বসন্ত, সারাদিন ঝুমঝুম ঝরাপাতা।
বিবিধ রঙ্গে নাচো, যাও-আসো আর একসাথে ইন্দ্র জাগিয়ে তোল।
ভেতরে প্রাণ, জল ও জলদস্যু; তবু অসংখ্য জেরক্স তুমি, অশেষ রঙের মাঝে ধীরে ধীরে ঝরে পড়ে রং।

আমি ডটগুলো দেখি, ছোট ছোট অন্ধকারে লুকিয়ে আছে ছায়াপথ।
অথচ, অতীত হয়ে আছি, চলো আগামিতে যাই।

তোমার শরীর একটা ঘড়ি, যেখানে সারাদিন দম্পতি বাজে।

রেলগান

ফিরে যায় যাকিছু অতীত, হেমন্তও মেলে ধরে অশেষ ছায়া। অবিরাম প্রতিজলের জগৎ,
টান খায় নক্ষত্রের এপার-ওপার।

স্পর্শ কোনো পাখি, যখন দৃশ্য দেখে তখন সে ভিন্ন উড়াল।
যেতে যেতে ফেলে যায় প্রেম, জোড়া অহংকার।
জেগে থাকে আয়নারেখা―গুচ্ছবিম্বের মতো হতে পারি আমি।

সময়ের অধীক তুমি, তারপর বিরতী। কোথায় শব্দ―চলো রেলগান, চলো যাই…

প্রচুর হাতছানি আসে, তবু কার প্রতিক্ষা করে আমাদের ন্যানো মাতামহী।

স্কেচ

ক্রমশ ভারী হয়ে ওঠে তোমার শরীর। রচিত ছাইয়ের দেশ―যেতে যেতে সাঁ সাঁ ঘড়ির কাটা।

কোনোদিন, কেউ কি ফিরে আসে। নৈশ রাতের মতো চাঁদ আর লিবিডো চিৎকার আর
রূপান্তরের প্রণয় গান―
চূর্ণ খোলো, চারণ দুলিয়া ওঠে, বিবিধ মৃণাল পথে।

এদিকে একটা বাড়ি, তার পাশে সাদা পাখির হুল্লোড়।
পাখিরা লাল-নীল সকাল, নিমিষে ডালিমগাছ।
চলো, নির্জন উড়াল আঁকি।
ছবি আঁকি, স্কেচে বাড়তি রঙ দিলে তুমি হয়ে ওঠো সৌরফড়িং।

রোদ

রেডিওর মতো রোদ; যেতে যেতে সন্ধ্যা এনে দাও।

সব দরজা খুলে চলো, ভুলগুলো লিখে আসি পঞ্চম খাতায়। পতনের পরে একটি আপেল আজ রং, কাল সে রঙের অভাব।

রাতও রোদের লিপি…শুধু গান, কোটি কোটি ইমন কণা।
যে সূর্য একা ওঠে একা একা অস্ত যায়, তার প্রেম কোনো দিন নিলে না তুমি।

শুধু অন্ধকারে নিজেকে প্রেমিক বলে জানো, চুপচাপ হেমন্ত ছড়িয়ে দাও বাতাসের বাতাসে-বাতাসে।

পরিতোষ হালদার। কবি ও কলেজ শিক্ষক। জন্ম বাংলাদেশের বাগেরহাট জেলার কচুয়া উপজেলার আন্ধারমানিক গ্রামে। প্রকাশিত বই: কবিতা - ১০টি, উপন্যাস - ২টি।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ