উত্তরাধিকার

আবিদুল ইসলাম
গল্প
Bengali
উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল অর্কিডশোভিত চিত্রকর্মটির পাশে ঝোলানো ইন্টারকম বেজে ওঠে। রাশেদ দক্ষিণের ব্যালকনিতে ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে ম্যাগাজিন পড়া অবস্থায় পকেট থেকে সেলফোন বের করে সময় দেখে নেয়, তারপর গিয়ে ইন্টারকমের রিসিভারটা কানে ঠেকায়। ওপাশ থেকে ভেসে আসা কণ্ঠ শুনে তার ঠোঁটে ফুটে ওঠে মৃদু হাসির রেখা। ‘ঠিক আছে, পাঠিয়ে দাও ওপরে।’

রাশেদ দরজাটা আগে থেকেই খুলে রাখতে পারত, কিন্তু সে তা করে না, ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে অপেক্ষা করে থাকে কখন বেজে উঠবে ডোরবেল। সে হিসেব করে দ্যাখে লিফট যদি এখন একেবারে ওপরের ফ্লোরেও থেকে থাকে, তাহলে গার্ডরুম পেরিয়ে লিফটের সামনে পৌঁছে সেটাকে কল দিয়ে নিচে নামিয়ে এনে তবে তাতে করে পাঁচতলায় উঠতে অতিথির কমপক্ষে মিনিট তিনেকের মতো লাগবে। কিন্তু রাশেদ খেয়াল করে এর মধ্যে পাঁচ মিনিট পার হয়ে গেছে যখন সে ইন্টারকমে অতিথি আগমনের সংবাদটি পেয়েছিল তারপর থেকে। তাহলে গার্ডরুম থেকে লিফট পর্যন্ত হেঁটে আসতে গিয়ে কি দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েছে অতিথি, ভাবছে ফিরে যাবে কিনা? রাশেদ একবার চিন্তা করে গার্ডরুমে খবর নিয়ে দেখবে অতিথি কোথায়, সে লিফটে উঠেছে নাকি বেরিয়ে গেছে বাইরে গেট পেরিয়ে, কিন্তু নিজেকে নিবৃত্ত করে। আরও পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করায় কোনো ক্ষতি নেই। সে তো সময় দিয়েই রেখেছিল বিকেল পাঁচটায়। চেম্বারেও গতকালই জানিয়ে রাখা আছে সে আজ সন্ধ্যায় রোগী দেখতে আসছে না। বাইরে অন্য কোনো কাজও নেই তার। পুরো রাতটা সে নিজের মতো করে কাটাতে পারবে।

ডোরবেল বেজে উঠতেই রাশেদ সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়, তারপরই আবার বসে পড়ে। এতোটা তাড়াহুড়ো করা উচিত হবে না। আরেকবার বাজুক। অতিথির মনের মধ্যে এটা প্রোথিত করে দেয়া দরকার যে প্রয়োজনটা রাশেদের চেয়ে তারই বেশি।

কিন্তু একবার বেল বেজে ওঠার পর আর কোনো নড়াচড়ার আভাস নেই দরজার ওপারে। তাহলে কি কোনো সাড়া না পেয়ে সে ফিরে গেছে লিফট বেয়ে প্রধান ফটকের ওপারের সড়কে? তা তো হওয়ার কথা না। অন্তত দুই-তিনবার বেল বাজিয়ে অপেক্ষা করা উচিত। তাছাড়া অতিথি তো দেখেছে গার্ড তাকে দাঁড় করিয়ে ইন্টারকমে রাশেদের সাথে কথা বলে তারপর ভেতরে যাওয়ার অনুমতি নিয়েছে, তার মানে সে জেনেছে যে রাশেদ বাসায়ই আছে। সে যখন ভাবছে দরজা খুলে দেখবে বাইরে কী হলো তখনই বেলটা আরেকবার বেজে উঠল। আর দেরি করা চলে না। রাশেদ এবার উঠে দরজার নব ঘুরিয়ে পাল্লাটাকে মেলে ধরল।

দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা রেহানার চেহারা কিংবা শরীরী ভাষায় দ্বিধান্বিত চিত্তের কোনো আভাস পাওয়া গেল না। বরাবরই খুব কম প্রসাধন ব্যবহার করে সে, এখনও তার মুখে চড়চড়ে মেকআপ চর্চার কোনো লক্ষণ প্রকাশ পাচ্ছে না। সাদা পাড় নীল সূতির শাড়ির সাথে সাদা ব্লাউজ, খোঁপাটা গাঢ় খয়েরি কাঁটা দিয়ে গেঁথে রাখা। ডান কাঁধে ঝুলছে ভ্যানিটি ব্যাগ। আঁটো করে পরা শাড়ির নিচ থেকে আভাসিত হয়ে ওঠা নির্মেদ অবয়বটা রাশেদ দেখে নেয় এক পলকে, ঠিক ততোটা সময় ব্যয় করে এ কাজে যার অধিক করলে তার চোখের ভাষা ধরে ফেলতে রেহানার অসুবিধা হতো না।

‘কী হলো, এতো দেরি করলি কেন?’

‘দেরি করলাম কোথায়?’ রেহানা উত্তর দ্যায়, ‘তুই তো বলেছিলি পাঁচটার সময় আসতে। আমি সময়মতোই এসেছি।’

‘সে কথা বলি নি। গার্ড তো সেই কখন জানাল তুই এসেছিস। তারপর দেরিটা হলো কোথায়? পাঁচতলায় উঠতে এতো সময় লাগার কথা না।’

‘ভুলে এক তলা নিচে নেমে পড়েছিলাম। তুই বলেছিলি পাঁচতলা, আমি ধরে নিয়েছিলাম পাঁচতলা মানে যেহেতু ফোর্থ ফ্লোর, লিফটের চারে নামতে হবে। কিন্তু এ-৪ নম্বর ফ্ল্যাটের সামনে দাঁড়াতেই ভুল ভাঙল। দেখলাম সামনের নেমপ্লেটে অন্য একজনের নাম, বেলাল আহমেদ না কী যেন, ব্যারিস্টার। বুঝলাম আরেক তলা ওপরে উঠতে হবে। এরপর পাশের সিঁড়ি দিয়ে উঠেছি। তা, এখন কি ভেতরে আসতে দিবি তুই নাকি এখানে দাঁড়িয়েই সব কথা বলব?’

ওহ, এতোক্ষণে যেন খেয়াল হয় রাশেদের, ‘আরে, আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম তোকে দরজার সামনে দাঁড়া করিয়ে রেখেছি, আয় ভেতরে আয়।’ যেন এতোক্ষণ ঢুকতে না দেয়ার ক্ষতিপূরণ হিসেবেই সে রেহানার হাত ধরে তাকে ভেতরে নিয়ে আসে, এনে বসায় ড্রইংরুমের সোফায়। দরজা লক করে রেহানার কোনাকুনি একটা সোফায় বসে পড়ে।

রেহানা ঘাড় ঘুরিয়ে ড্রইংরুমের পারিপার্শ্বিক দেখে নিতে থাকে। মূল দরজার ঠিক ডানপাশে কারুকাজখচিত একটা ছোট আয়না। তার পাশে দেয়ালে ঝোলানো টবে ছোট্ট বিদেশি ক্যাকটাস। মুখোমুখি দেয়ালে চল্লিশ ইঞ্চি এলইডি টিভির পাশে সস্ত্রীক রাশেদের একটা ছবি বাঁধাই করা; এর ডানদিকে একটা ওয়াল শেলফে টেরাকোটার কয়েকটি মূর্তি শোভা পাচ্ছে। একপাশের দেয়াল ঘেঁষা বুক শেলফে চার তাক ভর্তি বইপত্র। রেহানা যে সোফায় বসেছে তার পাশে ছোট টেবিলে রদ্যাঁর বিখ্যাত দ্যা থিংকার-এর প্রতিমূর্তি। ওর চোখ দু’টো সমস্ত ড্রইংরুমটাকে কয়েক মুহূর্তে আবর্তন করে ফিরে এসে স্থির হয় রাশেদের মুখের ওপর। সহজ হয়ে হাসার চেষ্টা করে।

‘কীরে, তোর বউ কোথায়? কী নাম যেন, শেফালি-ই তো? ওকে কি ভাবি বলতে হবে নাকি নাম ধরে ডাকলেও চলবে?’

‘সুরভী। ও তো বাসায় নেই। মেয়েকে নিয়ে কয়েক দিনের জন্য গেছে বাপের বাড়ি। রিফাতের স্কুলে গরমের ছুটি এই অবসরে সে এখন মুন্সিগঞ্জ। সামনের সপ্তাহে আসবে।’

‘তার মানে তুই এখন বাসায় একা আছিস?’

‘একাই বলতে পারিস। কাজের মেয়েটা সকালের দিকে এসে কাপড়চোপড় ধোয়া, ঘর পরিষ্কার করা এগুলো করে দিয়ে যায়। ওয়াশিং মেশিন, ভ্যাকুয়াম ক্লিনার আছে, সমস্যা হয় না। সামনের ফ্ল্যাটে এক কপি চাবি রাখা আছে, সেখান থেকে নিয়ে নেয়। ঘর থেকে কিছু হারানোর ভয় নেই, সিসি ক্যামেরা রাখা আছে আর মেয়েটা এই বাসায়ই চারটা ফ্ল্যাটে কাজ করে। মোটামুটি বিশ্বস্ত।’

‘তাহলে, তুই বলছিস যে তুই এ মুহূর্তে একা?’ প্রশ্নটা আবারও করে রেহানা, এবার তার কণ্ঠে একটা অস্বস্তির আভাস টের পাওয়া যায় যেন। ‘তাহলে তুই এ সময় কেন আসতে বললি আমাকে? তোর ওয়াইফ ফিরে এলেই বলতিস নাহয়। তার সাথেও পরিচিত হতে পারতাম।’

‘তার সাথে তোর পরেও পরিচয় হতে পারবে। আপাতত হাত-পা ছড়িয়ে আরাম করে বস। আর চাইলে ভেতরেও আসতে পারিস। আমাদের ব্যালকনি থেকে স্ট্রিট ভিউটা চমৎকার। আর তোকে ইনভাইট যখন করেছি না খাইয়ে তো বিদায় দিচ্ছি না। সন্ধ্যার সময় অনলাইনে অর্ডার দেবো তোর পছন্দমতো। আধঘণ্টার মধ্যেই চলে আসবে।’

‘আমি এতোক্ষণ থাকব না’, রেহানার অস্বস্তি যেন বেড়ে চলে সময়ের সাথে, পারলে সে এখনই উঠে পড়ে।

‘তোকে তো বলেইছিলাম টাইম নিয়ে আসতে। এখন তাড়াহুড়ো করছিস কেন?’

‘তুই তো তখন বলিস নি বাসায় একা থাকবি।’

‘আশ্চর্য, আমি বাসায় একা থাকলে সমস্যা কী? তুই আমার ফ্রেন্ড না সুরভীর? তোকে তো বলেছিলাম কিছু জরুরি আলাপ আছে।’

‘সেটা চেম্বারেই করা যেতো, যদি আমাদের কেসটা নিয়েই হয়।’

‘না, করা যেতো না। একটু বেশি সময় লাগবে, আর চেম্বারে পেশেন্টের ভিড়ে তোকে বসিয়ে রেখে এতো কথা বলা যাবে না। তাছাড়া আমি চাই নি নাজিমের সামনে কথাগুলো বলতে। এগুলো শুধু তোকেই বলা যায়। ভালো কথা, নাজিম কোথায় এখন?’

রেহানা খেয়াল করল তার স্বামীকে নাজিম ভাই না বলে এই প্রথম নাম ধরে উল্লেখ করল রাশেদ। বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় একটা ব্যাংকের অ্যাসিস্টেন্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট নাজিম উদ্দিন রেহানার চেয়ে বছর চারেকের বড়, সুতরাং রাশেদের সাথেও তার বয়সের ব্যবধানটা একই। তাছাড়া, সামনাসামনি সে তো ভাই বলেই সম্বোধন করেছে, এখন তার অনুপস্থিতির জন্য নাজিম ভাই হঠাৎ নাজিমে অধঃপতিত হলো কেন সেটা বুঝতে পারে না সে।

‘ও ঢাকায় নেই, খুলনা গেছে গত পরশু অফিসের কাজে।’

‘যাক, সেটাই ভালো।’ সোফায় হেলান দিয়ে আরাম করে এবার বসতে পারে রাশেদ। একটা সূক্ষ্ম দুশ্চিন্তা কাজ করছিল তার মনের মধ্যে যে রেহানা হয়তো তার স্বামীকে নিয়ে আসতে পারে, যদিও সে সম্ভাবনা ছিল একেবারেই ক্ষীণ। রেহানা তার বহু পুরোনো বন্ধু, তাছাড়া ফোনে যখন বলেছিল শুধু তাকে আসতে – তার স্বামীর নাম একটি বারও উচ্চারণ করে নি – তখন ধরেই নিয়েছিল বাসায় একাই আসবে রেহানা। তবে আরেকটা সম্ভাবনা ছিল ফাহমিদাকে সঙ্গে নিয়ে আসার। বহু বছর পর রেহানার সাথে যে আবার যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হলো তার সূত্র তো ফাহমিদাই। কিন্তু সকালেই ফাহমিদাকে ফোন করে রাশেদ জেনে নিয়েছিল ওর আজকের শিডিউল কী। জেনে খুশি হয়েছে যে গ্রাম থেকে শ্বশুর-শাশুড়ি এসেছেন, এখন দম ফেলার ফুরসত নেই ওর। সুতরাং সে যে রেহানার সঙ্গী হচ্ছে না আজকের দিনে এটা নিশ্চয়তার সাথেই ধরে নেয়া গিয়েছিল।

‘কী এমন কথা যার জন্য আমাকে বাসায় ডেকে আনতে হলো, তা-ও আবার যখন তুই একা আছিস?’

সোফায় হেলান দেয়ার পর মাথাটাকে পেছনের দিকে নিয়ে গিয়েছিল রাশেদ, ফলে তার দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল ছাদের দিকে। তবে সে ফ্যাকাসে বৈচিত্র্যহীন ছাদের সৌন্দর্য উপভোগ করছিল না, তার মনের মধ্যে ঘটে চলা অজস্র স্মৃতির তোলপাড় তখন তার চোখের সামনে ক্যালিডোস্কোপিক ভঙ্গিমায় বিভিন্ন চিত্রকল্প ফুটিয়ে তুলছিল ক্রমান্বয়ে। রেহানার প্রশ্ন তার সম্বিৎ ফিরিয়ে আনলে সে এবার ঘাড় সোজা করে তার ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে।

‘এখানে বসবি না ভেতরে গিয়ে গল্প করবি?’

‘ড্রয়িংরুমটাই তো ভালো, যা বলার বলে ফ্যাল। তাছাড়া গল্প কেন, তুই তো বলেছিলি জরুরি আলাপ আছে।’

‘আরে, এখানে তো বসে যতো বাইরের মানুষ আসে তারা। তুই কি দূরের কেউ নাকি? হ্যাঁ, অনেকদিন যোগাযোগ ছিল না, তাই বলে কি সম্পর্ক এতো ফর্মাল হয়ে গেছে রে? ভেতরে চল, ওখানে একটা দারুণ বসার জায়গা আছে। রিল্যাক্সড হয়ে বসতে পারবি, ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হতে পারবি।’ অনিচ্ছুক রেহানাকে একপ্রকার টেনে ওঠায় সে। নিয়ে যায় তাদের মাস্টার বেডরুমের পাশের আরেকটা কক্ষে।

রেহানার মধ্যে স্পষ্ট দ্বিধা কাজ করতে থাকে। এ ঘরটায় আসবাবপত্র বেশি নয়। একটি খাট পাতা ঘরের পশ্চিম দেয়াল ঘেঁষে। দক্ষিণে দরজা পথে একটা ছোট ব্যালকনি নজরে আসে। খাটের পাশে চেয়ার সহ একটা টেবিল, তাতে টেবিল ল্যাম্প ছাড়াও কয়েকটা বইপত্র, খাতা, ল্যাপটপ, ওষুধ কোম্পানির দেয়া ডেস্ক ক্যালেন্ডার সহ আরও বিভিন্ন জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখা। খাটের পাশে পশ্চিম দেয়ালে রাশেদ, ওর স্ত্রী আর মেয়ের ছবি কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা অবস্থায় ঝোলানো রয়েছে। ড্রয়িংরুমের ছবিটা বেশ আগের, সম্ভবত ওদের বিয়ের অব্যবহিত পরবর্তী সময়ের, আর এ ছবিটা সাম্প্রতিক- রেহানা খুঁটিয়ে রাশেদের স্ত্রীর মুখাবয়ব লক্ষ করে। তেমন কোনো বৈশিষ্ট্য নেই চেহারার মধ্যে, তবে রঙটা ফরসা আর মুখের গড়ন ধারালো হওয়ায় একটা আকর্ষণ আছে। রেহানা এসব দেখতে দেখতে খাটের ওপর বসে পড়ে।

‘আমি এ রুমেই পড়াশোনা, রিপোর্ট দেখার কাজগুলো করি। স্টাডিরুম বলতে পারিস। তুই আরাম করে পা তুলে বস। প্রয়োজন মনে করলে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসতে পারিস।’ রাশেদ রুমের দরজা বন্ধ করে এসি চালিয়ে চেয়ারটাতে বসে।

‘আমি এভাবেই ঠিক আছি।’ রেহানা খাটের একপাশে ভ্যানিটি ব্যাগটাকে প্রায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে দুই হাত পেছনে নিয়ে তার ওপর শরীরের ঊর্ধ্বাংশের ভর রেখে রাশেদের চোখের দিকে তাকায়। ‘এবারে বল, কী এমন বলবি যার জন্য বাসায় ডেকে নিয়ে আসতে হলো।’

‘বলছি বন্ধু, আস্তে-ধীরে। এখনই এতো অস্থির হয়ে যাওয়ার কারণ কী? সবে তো এলি। আগে আমার জানতে হবে তোর ব্যাপারে আরও কিছু তথ্য। আগে বল তো, তোদের বাসায় ফ্যামিলি মেম্বারের সংখ্যা কতো? মানে বাসায় তোরা মোট কয়জন থাকিস এবং তারা কে কে?’

‘এটা কি আমাদের আলাপের জন্য বিশেষ প্রয়োজন?’

‘সেটা ডিপেন্ড করছে আরও কয়েকটা বিষয়ের ওপর। কিন্তু এটা তো খুব সাধারণ প্রশ্ন। যে কেউই করতে পারে।’

‘বাসায় আমি, আমার হাসব্যান্ড আর শাশুড়ি- মেম্বার এই তিনজন। এছাড়া কাজের মেয়ে আছে একটা পার্মানেন্ট। আর ড্রাইভার আছে। সে অবশ্য আমাদের বাসায় থাকে না, থাকে মোহাম্মদপুরে।’

‘তুই কি আজ গাড়ি নিয়ে এসেছিস নাকি?’

‘না তো, ড্রাইভার গেছে সপ্তাহ খানেকের ছুটিতে। আমি এসেছি সিএনজিতে।’

‘বেশ ভালো করেছিস। এবার আমাকে একটা কথা বল, শাশুড়ির সাথে তোর আন্ডারস্ট্যান্ডিং কেমন?’

‘এসব প্রশ্ন কি বেশি পার্সোনাল হয়ে যাচ্ছে না?’

‘যদি ধরে নিস আমি ডাক্তার আর তুই আমার পেশেন্ট, তাহলে এটা এমন একটা কেস যেখানে ফ্যামিলির প্রত্যেক মেম্বারের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক কীরকম সেটার সাথে আরও বেশ কিছু জিনিস জড়িত হয়ে পড়েছে। ডাক্তার হিসেবে আমার সেগুলো জানা প্রয়োজন। আর যদি শুধু বন্ধু ভাবিস সেক্ষেত্রেও ফ্যামিলি ম্যাটার শেয়ার করতে পারিস। বন্ধুরা কি নিজেদের মধ্যে এসব আলাপ করে না?’

‘শাশুড়ির সাথে আমার সম্পর্ক ভালো’, বলার পর রেহানার ঠোঁট দু’টো পরস্পরের ওপর শক্ত করে চেপে বসে।

‘ভালো? কীরকম ভালো? কতোটা ভালো?’

‘ভালোর কি কোনো ডেফিনিট মানদণ্ড আছে? গড়পরতা বাঙালি শাশুড়ি-ছেলেবউয়ের সম্পর্ক যেমন হয় তারচেয়ে ভালো।’

রাশেদ এবার মৃদু হাসল। ‘তার মানে বলতে চাস শাশুড়ির ব্যাপারে তোর কোনো অবজেকশন নেই?’

‘না, নেই। এমন কোনো অবজেকশন নেই যেটা জনে জনে বলে বেড়াতে হবে। তোর আসল পয়েন্টটা কী বল তো? এসবের সাথে আমাদের কেসটার সম্পর্কই বা কী?’

‘বলছি। তার আগে দাঁড়া আমাকে একটা সিগারেট খেয়ে নিতে দে।’ রাশেদ উঠে যায়, এবং কিছুক্ষণের মধ্যে একটা সিগারেটের পাছায় মুখ দিয়ে টান দিতে দিতে হাতে অ্যাশট্রে নিয়ে সে ঘরে ঢুকে আগের চেয়ারটাতে বসে পড়ে। এবার ধোঁয়া সে ছুঁড়ে দ্যায় রেহানার প্রায় মুখ বরাবর। রেহানা বিরক্তিতে ভ্রূ কুঁচকে নাকে আঁচল চাপা দ্যায়। বিশ্রী লাগছে গন্ধটা। উপরন্তু এসি বন্ধ করে ব্যালকনির দিকের দরজা মেলে দেয়ায় বাইরের গরম বাতাস আস্তে আস্তে ঘরের ভেতরের আবহাওয়াটাকে উষ্ণ করে তুলতে থাকে।

‘খুব দেখাচ্ছিস যে সিগারেটের ধোঁয়া সহ্য করতে পারিস না। তাহলে যার সাথে প্রতি রাতে বেড শেয়ার করিস তার মুখে সিগারেটের গন্ধ সহ্য করিস কী করে?’

‘ও আমার সামনে সিগারেট খায় না।’

‘তোর সামনে খায় না সেটা ঠিক আছে। কিন্তু রাতের ডিনারের পর তো ছাদে গিয়ে কিংবা ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে একটা-দু’টা শেষ করে। তারপর? রাতে শোয়ার সময় তোকে যখন চুমুটুমু খায় … ’

‘রাশেদ, প্লিজ’, রেহানা ওর একটা হাতে একটা চাপড় মেরে বলে, ‘এসব আজাইরা প্যাঁচাল শুনতে ভাল্লাগছে না। তোর আসল কথাটা এবার খুলে বল।’

‘বলছি। তাহলে এবার মূল পয়েন্টে আসি। আমি কিন্তু তোর আর তোর হাসব্যান্ডের যে টেস্টগুলো করিয়েছি তা থেকেই তোদের সমস্যাটা ধরতে পেরেছি।’

‘কিন্তু তুই তো সেদিন বলছিলি রেজাল্টটা কনক্লুসিভ কিছু না। আরও কিছু টেস্ট করা লাগবে। কয়েকটা ওষুধও দিলি।’

‘সবই ঠিক আছে। ঐ টেস্টগুলো থেকে হয়তো আরও নিশ্চিত হওয়া যাবে। কিন্তু এর মধ্যে আমি সমস্যাটা বুঝে গিয়েছি। তোর টেস্টের রিপোর্ট ঠিকই আছে। তোর ওভারির ফলিকলে কোনো সমস্যা নেই। FSH নর্মাল। মনে হচ্ছে কনসিভ করার ক্ষেত্রে তোর সমস্যা হবে না। প্রবলেমটা আসলে তোর হাসব্যান্ডের। ইরেকটাইল ডিসফাংকশন থাকলে সেখান থেকেই সমস্যাটা একেবারে ধরা যেতো। কিন্তু সেটা যে নেই তা তো বলেছিসই। সেক্সুয়াল ইন্টারকোর্স রেগুলার হয়। কিন্তু তার সিমেন অ্যানালাইসিস থেকে যেটা দেখতে পেলাম স্পার্ম কাউন্ট খুবই কম, পার মিলিতে ৩০ থেকে ৪০ লক্ষের মতো। এবং এটা খুবই মারাত্মক একটা অবস্থা। মেডিক্যালের ভাষায় এই সমস্যাটাকে বলা হয় ওলিগোস্পার্মিয়া। এর তিনটা স্টেজ আছে। তোর হাসব্যান্ডের কেসটা সিভিয়ার ওলিগোস্পার্মিয়ার উদাহরণ। ওয়াই ক্রোমোসোম ইনফার্টিলিটি থেকে এই সমস্যা দেখা দ্যায়। নাজিম সাহেবের ক্ষেত্রে যে অবস্থা দেখলাম তাতে এর চিকিৎসা করে তাকে সন্তান উৎপাদনক্ষম করে তোলা অসম্ভবই বলতে গেলে প্রায়। উন্নত দেশে অবশ্য এর ট্রিটমেন্ট থাকতে পারে।’

‘তাহলে … তাহলে তুই বলতে চাইছিস’, রেহানা এতোক্ষণ স্তব্ধ হয়ে ছিল, সে এবার দু’হাতে তার মুখমণ্ডল চেপে ধরে, শরীর কাঁপছে থরথর করে ভেতর থেকে উৎগত আবেগের ধাক্কা সামাল দিতে গিয়ে। ‘আমরা … আমরা আর কোনোদিনও বাচ্চার মুখ দেখতে পাবো না, কোনোদিনও বাবা-মা হতে পারব না … ’

দু’হাতে মুখ ঢেকে মাথা নিচু করে রাখায় রাশেদের ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠা মৃদু হাসিটুকু নজরে পড়ে না রেহানার। ‘As long as your husband’s concerned, the situation is grave. কিন্তু তোর ক্ষেত্রে সে কথা বলা যায় না। তুই পুরোপুরি ঠিক আছিস।’

‘কিন্তু … কিন্তু … ’

রাশেদ এবার হাত বাড়িয়ে চেপে ধরে রেহানার দু’টি হাত, মুখের ওপর থেকে টেনে সরিয়ে দ্যায়। ‘কান্নাকাটি বাদ দে। আমার কথা শোন। এবার আসছি তোর ফ্যামিলি প্রবলেমের ব্যাপারটায়। তুই জানিস যে ডাক্তারের কাছে কোনো কিছু লুকোনো রীতিমতো অপরাধ। সেই অপরাধটাই তুই কিছুক্ষণ আগে করেছিস। শাশুড়ির সাথে তোর সম্পর্কটার ব্যাপারে সত্যি কথাটা বলিস নি তুই। আমি আগেই সব জেনে নিয়েছি এ ব্যাপারে। তুই ফাহমিদার সাথে যে ব্যাপারটা শেয়ার করেছিস সেটা আমাকে বলতে তোর এতো অসুবিধা! অথচ আমিও তোর বহু পুরোনো বন্ধু, যদিও মাঝখানে বেশ কয়েক বছর যোগাযোগ ছিল না। এটা কি মিথ্যা যে তোর শাশুড়ি তোকে বলে অলক্ষুণে অপয়া বউ, উনি চাচ্ছে যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব হাসব্যান্ডের সাথে তোর ডিভোর্স ঘটিয়ে তাকে আরেকটা বিয়ে করাবে? তোকে উঠতে-বসতে কথা শোনায় না তোর শাশুড়ি? তার ধারণা তোর কারণেই গত পাঁচ বছরের সংসারে তোদের বাচ্চা-কাচ্চা আসে নি। শুধু শাশুড়ি কেন, তোর খালা-শাশুড়ি, ননদ সবাই একই কথা মনে করে। তোর শাশুড়ি নাহয় পুরোনো দিনের কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষ, কিন্তু ননদ? সে কীভাবে তার মায়ের এসব কথায় সাপোর্ট দিচ্ছে? আর তোর হাসব্যান্ডও তো হাইলি এজুকেটেড মানুষ, তাছাড়া তোরা প্রেম করে বিয়ে করেছিস। সে-ও তো তোর পাশে দাঁড়াচ্ছে না, বলছে না যে সমস্যা দু’জনের মধ্যে যে কারও হতে পারে, পরীক্ষা না করে এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত কথা বলা যায় না। আমার ধারণা তোরা যে আমাকে দেখাচ্ছিস এটাও শাশুড়ির কাছ থেকে গোপন রেখেছিস, তাই না?’

রেহানার অশ্রু-বিধৌত দু’টো চোখ কেবল রাশেদের মুখের দিকে চেয়ে থাকে, তার থরথর কম্পিত অধরোষ্ঠে কোনো বোধগম্য শব্দমালার সৃষ্টি হয় না। ওর হাত দু’টো এখনো রাশেদের মুঠোবন্দি। সে এবার একটা অকস্মাৎ কিন্তু মৃদু টানে রেহানাকে নিজের দিকে আকর্ষণ করে। ‘তোর কি ইচ্ছে হয় না, এই জ্বলন্ত অন্যায়-অবিচারটার মুখে লাথি মারতে? যে কুসংস্কারদোষে বিনা কারণে তোকে ভুগতে হচ্ছে সেটাকে দু’পায়ে মাড়িয়ে যেতে?’

রেহানার মুখ থেকে তখনো কোনো কথা বেরোয় না, সে উদ্ভ্রান্তের মতো এদিক-ওদিক তাকাতে থাকে। রাশেদ বুঝতে পারে ওকে এখন স্থিত হওয়ার জন্য কিছুটা সময় দেয়া প্রয়োজন। উঠে কিচেনে গিয়ে সে দু’জনের জন্য দুই মগ কোল্ড কফি করে নিয়ে আসে। এখন মোটে সাড়ে পাঁচটা বাজে। সন্ধ্যা হতে এখনো প্রায় ঘণ্টা দেড়েক বাকি আছে। খাবারের অর্ডার আর কিছুক্ষণ পরে দিলেও চলবে। সে এবার এসে একটা মগ রেহানার হাতে ধরিয়ে দ্যায়। রেহানাকে মনে হলো এই সময়টুকুর মধ্যে কিছুটা সামলে নিয়েছে। রুমাল দিয়ে চোখমুখ মুছে ফেলেছে।

‘তুই চাইলে ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিতে পারিস। মুখের কী অবস্থা করেছিস দ্যাখ। মাস্কারা-টাস্কারা মুখে লেপ্টে যা-তা অবস্থা। ডিনারের জন্য কী অর্ডার দেবো বল। তোর কী পছন্দ?’

‘রাশেদ, কফিটা শেষ করেই আমি উঠব। কিছু ভাল্লাগছে না। কলেজ থেকে ফিরে রেস্ট নেয়ার সময় পাই নি। আর এখন তোর কথা শুনে মাথা কাজ করছে না।’

‘উঠবি কীরে, আমার আলাপ তো এখনো শেষ হয় নি। এতোক্ষণ ধরে তোর সাথে যে আলোচনা করলাম তার পুরোটাই ডাক্তারি কথাবার্তা। কিন্তু তোর বন্ধু হিসেবে এখনো আসল কথাই বাকি রয়ে গেছে।’

‘আর কী বলবি, বাকি কী আছে বল? আমি তো জেনেই গেছি আমাদের ভবিষ্যত কী।’

‘না, এখনো সবটা বলা হয় নি। প্রথমে ফাহমিদাকে দিয়ে শুরু করি। তুই কিন্তু এখান থেকে বেরিয়ে বা অন্য কোনো সময়ও ওকে এ নিয়ে চার্জ করবি না। ও আমার কাছে যা বলেছে তার সবই সরল মনে ইন গুড ফেইথে বলেছে। প্রথমদিকে বলতে চাইছিল না। আমি ওকে বুঝিয়েছি, রেহানার সাথে একসময় খুব ভালো বন্ধুত্ব থাকলেও দীর্ঘদিনের হায়েটাসে একটা মানসিক দূরত্বের সৃষ্টি হয়েছে, যদিও গত কিছুদিনের যোগাযোগে আবার সেটা জোড়া লাগতে শুরু করেছে। সে যেহেতু তোর সবচেয়ে ক্লোজ বান্ধবী তাই ফ্যামিলি ম্যাটারগুলো তার সাথেই তোর শেয়ার করার পসিবিলিটি সবচেয়ে বেশি। যখন তাকে কনভিন্সড করতে পারলাম যে তোর ভালোর জন্যই ব্যাপারটা আমার জানা দরকার, তখন সে আমি তোকে কিছু জানাব না এই শর্তে সব বলতে রাজি হয়েছে। আমার জানা দরকার ছিল গত পাঁচ বছরের দাম্পত্য জীবনে সন্তানহীনতা তোর ফ্যামিলি লাইফে কোনো ক্রাইসিস বা কমপ্লেক্সিটি তৈরি করছে কিনা। আমি সেখান থেকেই শুরু করেছিলাম। ফাহমিদা আমাকে মোটামুটি সবই খুলে বলল। ওর কাছ থেকেই জানতে পারলাম তোর শ্বশুর মারা গেছে তোদের বিয়েরও আগে। ঢাকার বাসায় তোর হাসব্যান্ড শুধু মাকে নিয়ে থাকে। তার আর কোনো ছেলে নেই। এখানেই আসল জটিলতাটা। পুরোনো যুগের সব বাবা-মাই চায় তার বংশধর, সম্পত্তির উত্তরাধিকারী দুনিয়ায় রেখে যেতে। আমাদের পুরুষশাসিত সমাজে ছেলের দিক থেকেই সন্তানের উত্তরাধিকার ডিটারমাইন করা হয়। মেয়ের সন্তান যেন পরিবার বা বংশের কেউ নয়, সে আবার তার শ্বশুরকুলের বংশধর। তোর ননদ যে তোর পিছে লেগেছে, যদি কোনো বাবা-মায়ের এক ছেলের সাথে তার বিয়ে হয় আর সেখানেও এমন অবস্থা তৈরি হয় তখন তার ওপরও একই চাপ পড়বে, যেটা এখন সে বুঝতে পারছে না। আমি যে সেকেন্ড টেস্টগুলো দিয়েছি তারপরও যদি আমি তোর হাসব্যান্ডকে বুঝিয়ে বলি আর সে গিয়ে তোর মাকে বিষয়টা বলে তাহলেও উনি বুঝতে চাইবে না, ভাগ্য পরীক্ষার জন্য ছেলের আরেকটা বিয়ের চেষ্টা সে করবেই করবে, এটা আমি বলে দিতে পারি এখনই। আমি তোর শাশুড়িকে দেখি নি, কিন্তু ফাহমিদা তো তাকে ভালোমতোই চেনে-জানে, তার কাছ থেকে শুনে ওনার সম্পর্কে ধারণা করতে পেরেছি। এ ধরনের টিপিক্যাল মহিলাদের মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে আমার ভালোই জানা আছে। শহরে বাস করেও এরা নিজেদের ভেতরের গ্রাম্য অন্ধকার কোনোদিনই দূর করতে পারে না। আর এই অন্ধ মন-মানসিকতার মাশুল গুনতে হয় তোদের মতো পুত্রবধূদের।’

এতোক্ষণ একটানা শুনতে শুনতে কফির মগে চুমুক দিতে ভুলে গিয়েছিল রেহানা। এবার সে এক চুমুকে অনেকটা কফি গলাধকরণ করে নিয়ে বলল, ‘তাহলে এ মুহূর্তে করণীয় কী আছে আর?’

‘আছে। সেটা বলার জন্যই তোকে ডেকে নিয়ে এসেছি আমার আস্তানায়। তোরা দু’জন আগামি সপ্তাহে আমার চেম্বারে হাজিরা দিবি। আমি তোদের রিপোর্ট দেখে দু’জনকেই জানাব সমস্যাটা তোর না, তোর হাসব্যান্ডের। এ পর্যন্ত ঠিক আছে। কিন্তু এরপরে একটা মিথ্যার আশ্রয় নিতে হবে। তাকে বলতে হবে তার সমস্যাটা সিভিয়ার না, মাইল্ড- স্টেম সেল থেরাপি দিলেই স্পার্ম কাউন্ট বাড়তে থাকবে। আমি এরমধ্যে ভুয়া টেস্ট রিপোর্ট তৈরি করে নেব, যাতে দেখাবে পার মিলি সিমেনে তার স্পার্ম দেড় কোটির কাছাকাছি অর্থাৎ প্রায় স্বাভাবিক পর্যায়ে পৌঁছেছে। তাকে বলা হবে এর মধ্যেই যে ওষুধগুলো দেয়া হয়েছে তাতে অবস্থার লক্ষণীয় উন্নতি হয়েছে, সে এখন সন্তান প্রজননে সক্ষম পুরুষের কাছাকাছি অবস্থায় চলে এসেছে। কিন্তু এতোদিন পর্যন্ত তার সমস্যার কারণেই তোর কনসিভ করায় সমস্যা হচ্ছিল। কথাগুলো এমনভাবে তাকে বলব যাতে সে এগুলো গিয়ে আবার তোর শাশুড়িকে বলে, যাতে তোর ওপর কোনোমতেই ব্লেম না আসে, ছেলেকে আবার বিয়ে দেয়ার জন্য সে তাড়াহুড়ো না করে।’

‘কিন্তু … কিন্তু, এসব মিথ্যে কথা বলে কী লাভ হবে, ভবিষ্যতের জন্য মিথ্যে আশা রেখে? যখন শাশুড়ি দেখবে অনেক দিন পার হয়েও কোনো ফল হচ্ছে না তখন তো সেই আবার আগের মতোই শুরু হবে দোষারোপের পর্ব?’

রাশেদ সামনের দিকে ঝুঁকে রেহানার হাত থেকে কফির মগটা নিয়ে টেবিলের ওপর রাখে। তারপর ওর দু’টো হাত নিজের মুঠোর দখলে নিয়ে নেয়। এখনো রেহানার হাত কী নরম, সেই কলেজ জীবনের মতো। মনে হয় মাঝখানের এতোগুলো বছর যেন পেরিয়ে যায় নি, যেনবা রেহানার ওপর এসে আছড়ে পড়ে নি দাম্পত্য জীবনের যাবতীয় ঝড়ঝাপ্টা। সে যেন ফিরে গেছে তার আঠার বছর আগের জীবনে, সুখের অনেকগুলো যাপিত মুহূর্তের মাঝখানে, যখন কিনা …

‘রেহানা, তুই হয়তো ভুলে গেছিস কিন্তু আমি কীভাবে ভুলতে পারি যে আমরা দু’জন ভালো বন্ধু থাকলেও আমি তোকে অন্য চোখে দেখতাম? অনেক দিন কলেজ ছুটির পর ধানমন্ডি লেকের পাড়ে সময় কাটানোর মুহূর্তগুলোতে বলতে চেয়েও বলতে পারি নি। তারপর কলেজ জীবন শেষ হয়ে আসার কয়েকটা দিন আগে যেদিন সব দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে তোকে আমার মনের কথাটা জানিয়ে দিলাম তুই তখন কী করলি? সোজাসুজি রিজেক্ট করে দিলি আমাকে! বললি আমাকে শুধু বন্ধুর চোখে দেখিস তুই, তাছাড়া ক্লাসমেটের সাথে প্রেম করা, তাকে বিয়ে করা তোর পক্ষে সম্ভব না। কেন, কারণটা কী? আর কিছু না, সেই ছেলে যতোই ভালো হোক না কেন, স্বামীকে হতে হবে স্ত্রীর চেয়ে বয়সে বড় গাম্ভীর্যপূর্ণ রাশভারি টাইপের কেউ, যে স্ত্রীর দায়িত্ব নেবে- শহুরে শিক্ষিত হয়েও সেইসব পুরানো গ্রাম্য বস্তাপঁচা মন-মানসিকতা নিয়ে পড়ে আছিস তুই জেনে আমার মধ্যে একটা ধাক্কা লাগল। তোকে বোঝাতে চেয়েও পারলাম না। কয়েকবার নিজে বলে, জেসমিন আর ফাহমিদার মাধ্যমে চেষ্টা করেও লাভ তো হলোই না, মাঝখান থেকে বন্ধুত্বের সম্পর্কটাও গেল নড়বড়ে হয়ে। এইচএসসির পর আমি ভর্তি হলাম মেডিক্যালে, তুই ইউনিভার্সিটিতে বোটানি নিলি। তোর খবরাখবর কিন্তু ঠিকই পৌঁছাতে লাগল আমার কানে। এর মধ্যে একসময় জানতে পেলাম তোর ক্লাসমেটের এক কাজিন, ব্যাংকিংয়ে এমবিএ করছে এমন এক ছেলের সাথে চুটিয়ে প্রেম করছিস। আমার তখন আর বলার কিছু ছিল না। কতোবার মনে হয়েছে, মেডিক্যাল থেকে বিজনেস ফ্যাকাল্টি তো বেশি দূরে না, একদিন খবর নিয়ে গিয়ে সোজা জায়গামতো হাজির হয়ে তোদের অভিসারে বাগড়া বসাই। কিন্তু নিজেকে সামলে নিয়েছি।

‘নিজের অপ্রাপ্তির কারণে মনের মধ্যে যে ক্ষুব্ধতা তৈরি হয়েছিল তাকে ঠাণ্ডা করার জন্য আমি মনোযোগ দিই স্টাডির দিকে। কয়েকটা বছর প্রচুর পরিশ্রম গেছে। এর মধ্যে আর তোদের খবর নিতে যাই নি। তোকে মনে হতো প্রবল সেল্ফিশ, স্বার্থপর। এর মধ্যে গেলাম এক্সকারশনে রংপুরে, সেখানে বসেই জানতে পারলাম আমার কাজিন বাইক অ্যাক্সিডেন্ট করে উন্ডেড অবস্থায় ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি, রক্ত লাগবে। আমি তো সাথে সাথে ঢাকার পথে রওনা দিয়েছি। কাজিনের ব্লাডের গ্রুপ রেয়ার, ডোনার খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না অথচ মিনিমাম তিন ব্যাগ রক্ত লাগবে। ঢাকায় যতোক্ষণে পৌঁছাই দু’ব্যাগ রক্ত কালেক্ট করা হয়ে গেছে। আরেক ব্যাগ কিছুক্ষণের মধ্যেই পাওয়া গেল। তখন অবশ্য জানতাম না, কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই জেসমিনের কাছ থেকে জানতে পারলাম অ্যাক্সিডেন্টের খবর পেয়ে দ্রুত মেডিক্যালে এসে এক ব্যাগ রক্ত দিয়ে গেছিস তুই, কিন্তু ওদেরকে নিষেধ করে দিয়েছিস তোর কথা আমাকে কিছু না জানাতে। সেদিন থেকে কিন্তু তোর ব্যাপারে আমার মনোভাব পরিবর্তন হতে শুরু করল। মনে মনে ভাবলাম তোকে যতোটা স্বার্থপর মনে করছি ততোটা হয়তো তুই না। তোর মঙ্গল কামনাই করেছিলাম, যোগাযোগের আর চেষ্টা করি নি। তোর আর কী হলো না হলো সেই খবরও রাখতে যাই নি। এই এতো বছর বাদে সপ্তাহ দুই আগে ফাহমিদা ফোন করে তোর ব্যাপারটা আমাকে জানাল। সেই সাথে বলল, এ ব্যাপারে কোনো ডাক্তারের কাছে যেতে রাজি করাতে পারছে না তোকে। কিন্তু ফাহমিদাই অনেক বলে-কয়ে তোকে রাজি করিয়েছে আমার কাছে আসতে। আমার নম্বরও সে তোর কাছে দিয়েছে। এর দিন দুই পরেই তোর ফোন পেলাম, তোকে স্বামী সহ আসতে বললাম আমার চেম্বারে। আবার এতোদিন পর সেদিন তোকে দেখে কী যে হলো আমার, মনে হলো আগের চেয়ে অনেক বেশি সুন্দরী হয়েছিস তুই। চেহারার ওপর একটা অস্পষ্ট বিষণ্নতার ছাপ তোকে করে তুলেছে ক্ল্যাসিকাল হলিউড নায়িকাদের মতো অপরূপা। মনের মধ্যে আবার পুরোনো আবেগের উথালপাথাল ফিরে আসা টের পেতে থাকলাম।’

রেহানার হাতের ওপর চেপে বসেছে রাশেদের দুই হাত, রেহানা ছাড়াতে চেয়েও পারছে না, তার চোখ দু’টো বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেছে রাশেদের কথা শুনে। এই শেষ বিকেলের দ্বারপ্রান্তে রাশেদের নির্জন ফ্ল্যাটে বসে যে এই কথাগুলো শুনতে হবে তার জন্য একেবারেই মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিল না সে। রাশেদের বন্ধনমুক্ত হওয়ার জন্য তার প্রচেষ্টা টের পেয়ে সে ছেড়ে দ্যায় ওর একটা হাত, অথবা নিজের একটা হাতকে মুক্ত করতেই বোধহয়, কেননা এখন সে তার হাতটিকে ব্যবহার করছে দেয়ালের গায়ে ঝোলানো তার সুখী দাম্পত্য জীবনের বাঁধাই করা ছবিটার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশের জন্য। ‘এই ছবিতে সুরভীর জায়গায় তুই থাকতে পারতি। রিফাতের মতো একটা ফুটফুটে মেয়ে আসতে পারত তোর কোলজুড়ে। আজকে যে ঝড়ঝাপ্টা তোর ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে তার কিছুই হতো না। আমাকে দ্যাখ, রাজশাহীতে গ্রামের বাড়িতে আমাদের অনেক প্রপার্টি। বাবা-মা সেখানেই থাকে। আমি ঢাকায় থেকে পড়াশোনা করেছি মামা-মামির কাছে। স্বাবলম্বী হওয়ার পর নিজের সংসার নিজেই গড়েছি। আমার বাপ-মা গ্রামে থেকেই খুশি। সেখানে দেখাশোনার জন্য আমার বড় ভাই আছে, চাকর-বাকর আছে। আমার দাম্পত্য জীবনে তারা কোনো ইন্টারফেয়ার করে না। এভাবে অনেক সুখী হতে পারতি তুই।’ শেষের দিকে এসে যেন আবেগে কেঁপে যায় তার কণ্ঠস্বর।

‘ছাড় আমাকে তুই’, বলে এক ঝটকায় নিজের আরেকটা হাতও রাশেদের থেকে ছাড়িয়ে আনে রেহানা। ‘এসব বলার জন্যই একলা বাসায় ডেকে এনেছিস বুঝি! তোর ঐ পুরোনো দিনের প্রেমের বুলি ঝেড়ে আমার সমস্যার কী সমাধান হবে! অতীত কি আবার ফিরে আসবে? তাছাড়া, ওকে এখনো অনেক ভালোবাসি আমি। আমাদের সন্তান হয় নি বলে সে ভালোবাসা ফুরিয়ে যায় নি।’

‘যায় নি, কিন্তু যেতে কতোক্ষণ? আমি ফাহমিদার কাছে এটাও শুনেছি তোর হাসব্যান্ড এমনিতে খুব ভালো মানুষ, কিন্তু মায়ের একেবারে ন্যাওটা। মায়ের কথার বাইরে কিছু বলার বা করার সাহস নেই। ধর, আমি যখন তাকে বলব সে সুস্থ হয়ে যাচ্ছে আর সে গিয়ে তার মাকে বলে দেবে সে কথা আর যখন দেখা যাবে বছর পেরিয়ে গেলেও তোর কনসিভ করার নামগন্ধ নেই, তখন ঠিকই তোর শাশুড়ি দেখিস উঠেপড়ে লাগবে তোর প্রিয় স্বামীটিকে আবার বিয়ে করানোর জন্য। সেদিন কোথায় যাবি তুই?’

‘তো, আমি এখন তার কী করব? তুই এমন মিথ্যে তাকে বলবি কেন, যা আমাদের আরও বড় কোনো বিপদে ফেলে দেবে? কী দরকার এই মিথ্যে প্রবোধ দিয়ে? এরচেয়ে সত্যিটাই বলে দিস না কেন? তারপর যা হয় হোক। আমার তো করার কিছু নেই এখানে।’

‘আছে, করার আছে তোর! তোর হাতেই এখন সব কিছু। তোর শাশুড়ি পাবে তার স্বামী-সন্তানের বংশের উত্তরাধিকার, তোর হাসব্যান্ড পাবে পিতৃত্বের স্বাদ, আর তুই পাবি তোর শাশুড়ি ও সমাজের কাছে গঞ্জনার হাত থেকে মুক্তি।’

‘কীভাবে?’

‘প্রতিশোধ নিয়ে। একই সাথে প্রতিশোধ আর আত্মরক্ষা- দুটোই। ভেবে দ্যাখ কোনো কারণ ছাড়াই গত পাঁচ-ছ’টা বছর তোকে কী ধরনের হিউমিলিয়েটিং অবস্থার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে। বিনা কারণে অলক্ষুণে, অপয়া, বাঁজা এসব বিশ্রী গালিগালাজ শুনতে হয়েছে। খালা-শাশুড়ি আর ফ্যামিলির যতো খাণ্ডারণি মুরুব্বি মহিলাদের বাঁকা চোখের চাহনি আর বাজে মন্তব্য মুখ বুঁজে হজম করতে হয়েছে। এমনকি তোর চেয়ে বয়সে ছোট যে ননদ, যার এখনো বিয়েই হয় নি, সে-ও তো তোকে কথা শোনাতে পিছপা হয় নি। এসবের প্রতিশোধ নিতে হবে না? একই সাথে নিজেকে মুক্ত করতে হবে না এই বলয় থেকে? এই পঁচে যাওয়া সমাজ, রাষ্ট্রীয় আইন সতিত্বের যে বায়বীয় ধারণা আরোপ করে রেখেছে মেয়েদের ওপর তার কি কোনো বাস্তব মূল্য আছে? এসব সতীপনা আঁকড়ে ধরে কতো মেয়ের জীবন-যৌবন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। পাশ্চাত্যের কথা ভেবে দ্যাখ। সেখানে মেয়েরা এইসব সামাজিক প্রতিবন্ধকতা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে এখন কতো স্বাধীন হয়েছে। নিজের ইচ্ছেমতো জীবন যাপন করতে পারে। পার্টনার পছন্দ না হলে সেপারেশনে গিয়ে নতুন জীবনসঙ্গী খুঁজে নিতে সমস্যা হয় না, অথবা চাইলে একাও থাকতে পারে। সিঙ্গেল মাদারদেরও কোনো অসুবিধা নেই। আর আমরা এখনো পড়ে আছি মেয়েদের সতিত্বের মতো একটা বাজে ধারণা নিয়ে। এই সতিত্ব, স্বামীর কাছে নিজের দৈহিক বিশ্বস্ততা রক্ষা কী দিতে পারে তোর জীবনে ভেবে দ্যাখ, লাঞ্ছনা আর গঞ্জনা ছাড়া? অথচ তুই শিক্ষিত মেয়ে, একটা কলেজের টিচার। তোর কেন এমন অবস্থা হবে! আজকেই এই সমাজের পাছায়, ঐ দুর্মুখ মুরুব্বিগুলোর মুখে লাথি মার, লাথি মেরে উড়িয়ে দে মেয়েদের সতিত্ব নামে বাজে বিশ্রী বস্তাপঁচা ধারণাকে। আজ এই সন্ধ্যায় তুই আর আমি মিলে চল, তোর ভবিষ্যত সুখী জীবনসৌধের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করি।’

রেশমা একগাদা অবিশ্বাস নিয়ে বিস্ফারিত দু’চোখ মেলে চেয়ে থাকে তার সামনে বসে অদম্য কামনার টগবগে জলে ফুটতে থাকা রাশেদের দিকে।

আবিদুল ইসলাম। লেখক ও অ্যাকিটিভিস্ট। জন্ম ও বাস বাংলাদেশে। তিনি বাংলাদেশ লেখক শিবিরের সদস্য।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ