উন্মাদনা রুখে দিন এখনই

মতিয়ূর রহমান
ধর্ম, প্রবন্ধ
Bengali
উন্মাদনা রুখে দিন এখনই

বন্ধুগণ, ইচ্ছামত ধার্মিক বা অধার্মিক যা খুশি হোন। কেউ বাধা দেবেনা। কিন্তু অমানুষ হলে বাধা তো দিতেই হবে, উপায় নেই।

শুরুতেই একটা অনুরোধ করি, লেখাটা হয়তো একটু দীর্ঘ হবে। তবে অপ্রয়োজনে না, দয়াকরে শেষ পর্যন্ত পড়বেন। মস্তিষ্কের ‘গ্রে ম্যাটারে’ ঘৃণা আর প্রতিবাদের যে ঝড় উঠেছে তারা যদি সবাই একসাথে বাইরে বার হতে চায় তাহলে নিজেরা ঠোকাঠুকি করে কিম্বা পদপিষ্ট হয়ে পথেই মরে যাবে। তাতে কাজের কাজটা আর হবে না। তাই, আমি চাই তারা এক এক করে ধীরেসুস্থে বার হয়ে আসুক আর ক্ষেপণাস্ত্রের মত নির্ভুল লক্ষ্যে আঘাত করুক। সেইজন্য মাথা ঠাণ্ডা থাকাও লেখক ও পাঠক সবার জন্য দরকার।

স্নায়ু উত্তেজিত থাকলে লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ায় সমূহ সম্ভাবনা। তার ওপর সবকথা তো একসাথে বলা সম্ভবও নয়। সে তো এক মহাসাগর কিংবা এক হিমালয় পরিমাণ কথা। তাই বিশেষ দরকারী কথাগুলো যাতে বাদ পড়ে না যায় তার জন্যও মাথা ঠাণ্ডা থাকা আবশ্যক।

সোস্যাল মিডিয়াতে কখনো কখনো কিছু ভিডিও দেখে মনেহয় ঠিকঠাক দেখছি তো! গায়ে চিমটি কেটে দেখি, জীবিত আছি কিনা! এখানে যাকে দেখলাম তাকে দেখতে অবিকল মানুষের মত লাগলেও সে স্রেফ এক অমানুষ। জানোয়ার বললে পশুরাও বিক্ষুব্ধ হতে পারে। পশুদের সমস্ত কাজের একটা ব্যাখা থাকে। কিন্তু ব্যাখ্যা করা যায় না শুধু নরপশুদের কাজের।

ভিডিওটিতে এক মনোরোগী, বদ্ধ উন্মাদের তর্জনগর্জন ও সীমাহীন হঠকারিতা দেখে-শুনে বিস্মিত ও বিমূঢ় হয়েছি। তাতে যা শোনা যাচ্ছে সেই অশ্রাব্য বক্তব্য শুনলে দেশ ও দশ সকলের অমঙ্গল। আসল কথায় আসা যাক-

এক চূড়ান্ত কাণ্ডজ্ঞানহীন অমানুষ

(সাজ-পোশাকে ও স্বঘোষিত দাবিতে যা দেখা যাচ্ছে তাতে অবশ্যই মুসলমানের রক্ষাকারী) দুনিয়ার সব মুসলমানকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানোর দায়িত্ব সে নিজের ঘাড়ে নিয়ে মরিয়া হয়ে বিদ্বেষের আগুন ছড়াচ্ছে। মানুষের অন্তরে আগুন লাগানোর সেই অপচেষ্টা একেবারেই অসহ্য।

নরাধমের বক্তব্যের সারকথাটি হল – মুসলমান যদি বাঁচতে চায় ও পরকালে জাহান্নামের আগুনে পুড়ে মরতে না কিন্তু চায় তাহলে তারা যেন দুনিয়ায় যত অমুসলমান আছে তাদের সাথে কোনো সংশ্রব না রাখে। তাদেরকে বন্ধু ভাবলে ও বন্ধু করলে আখেরাতে (পরলোকে) যে ভয়ঙ্কর পরিণাম হবে তারই একটা চমৎকার ধারাবিবরণী সে দিচ্ছে এবং এসব কথা স্বয়ং আল্লাহর কথা, এই বলে ভয়ও দেখাচ্ছে।

সাম্প্রদায়িক ঘৃণা ও বিদ্বেষের সেই বক্তব্য জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে যে কোন শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের কানে গরম সীসা ঢালবেই। যাঁদের বিরুদ্ধে বলা হচ্ছে তাদের রাগ, অভিমান ও ঘৃণা যদি কিনারা ছাপিয়ে যায় তাহলে বলার কিছু নেই। অসম্মান সবারই গায়ে লাগে।

অধিকাংশ মানুষ শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষ। তারা গৌতম বুদ্ধ নয়। বুদ্ধ হওয়া এত সহজ নয় বলেই পৃথিবীতে মাত্র একজেই গৌতমবুদ্ধ হয়েছেন।

একবার এক ব্যক্তি ভগবান বুদ্ধকে সর্বসম্মুখে অনেকক্ষণ ধরে অনেক কু কথা বলে মারাত্মকভাবে অপমান করে চললেন। বুদ্ধদেব কোন বাধা দিলেন না কিন্তু তাঁর অনুগামীদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটলো। বুদ্ধদেব তাদেরকে শান্ত হতে বললেন। আক্রমণকারীর আক্রমণ যখন থামল তখন বুদ্ধদেব শান্তভাবে তাকে বললেন- ভদ্র, একটি কথা জিজ্ঞাসা করব?

আক্রমণকারী বললো – বলুন।

বুদ্ধদেব বললেন,

আপনি যদি কোন কিছু কাউকে দেন আর তিনি যদি তা গ্রহণ না করেন তাহলে দেয় বস্তুটি কার থাকে?

আক্রমণকারী বললো, যার জিনিস এবং যে দিতে চেয়েছিল তারই থাকে।

বুদ্ধদেব আরো শান্তভাবে বললেন,

তাহলে এতক্ষণ যে কুকথাগুলো আমাকে দেওয়ার চেষ্টা করলেন তার কিছুই আমি গ্রহণ করিনি। ওগুলো সবই এখনো আপনারই আছে এবং আপনি নিয়ে যান।

সাধারণ মানুষ ভগবান বুদ্ধ হতে পারবে না। তাই মাথাগরম করার মতো কিছু বললে তাদের মাথা গরম হবেই। বিনা প্ররোচনায় মানুষের মাথাগরম যারা করে তাদের উদ্দেশ্য কী তা জানা দরকার। যে ধর্ম বা যাঁদের নাম করে সে এই কাজ করছে

সেটা জানা তাঁদের জন্যও জরুরী। কেননা এর সাথে বিশেষভাবে যুক্ত আছে শান্তি,  সুস্থ সমাজ এবং সমষ্টির মনোভাবটির প্রশ্নও।

সারাপৃথিবী জুড়ে তো বটেই তার উপর ভারতের মতো দেশে কোন মুসলমান যদি মনেকরে হিন্দু, খ্রিস্টান, ইহুদি, শিখ,পার্সি, বৌদ্ধ কিম্বা অন্যান্য ধর্মমতের মানুষের সাথে কোনরকম মানবিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক ও সংস্পর্শ না রেখে সে বাঁচবে তাহলে সে বদ্ধ উন্মাদ।

RSS জাতীয় কাউকে আর কষ্ট করে তাকে ভারত থেকে বের করে দিতে হবেনা। সে নিজগুণেই এখানে থাকার অধিকার ও যোগ্যতা দুটোই হারাবে।

আমার লেখা নানামত ও বিশ্বাসের মানুষ পড়েন। যাঁরা পড়েন তাঁদের প্রত্যেককেই আমি শ্রদ্ধা করি এবং তাঁদের কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ এই কারণে যে, আমার মত একজন অখ্যাত ও অনামী লেখকের লেখাও তাঁরা বিশেষ আগ্রহ নিয়ে পড়েন।

অংশুমালীতে প্রকাশিত এই লেখাটি যদি যুক্তিযুক্ত ও সঠিক বলে মনে হয় তাহলে অন্যান্য সবার কাছে তো বটেই সেইসাথে ইসলাম ধর্মের বাস্তববাদী, প্রগতিশীল, উদার ও প্রকৃত ধার্মিক মানুষদের কাছে আমার সামান্য একটু বাড়তি দাবি আছে। লেখাটি প্রত্যেকেই শেয়ার করুন এবং এই সীমাহীন হঠকারিতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে নিজ নিজ অবস্থানটিও পরিস্কার করুন।

সোচ্চার হবেন মানবিক দায়বদ্ধতা থেকে এবং একটি সুস্থ- স্বাভাবিক সমাজ ও দেশের স্বার্থেই। আপনার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই সমাজ ও দেশ যাতে বাসযোগ্য থাকে তারজন্যও।

সাড়ে পনের আনা ক্ষেত্রে দেখা গেছে মানুষ যা দেয় তাই সে ফিরিয়ে পায়। আমি যদি কাউকে ঘৃণা করি তার থেকে ভালোবাসা আর আশাকরা যায়না।

যীশুর ক্ষমা ও বৈষ্ণবের  ‘মেরেছ কলসির কানা… তাবলে কি প্রেম দেবনা?‘ সেসব এ পৃথিবীতে এক আধবার হয়। বারে বারে হয়না। বাস্তব পৃথিবীর হিসাব ভিন্ন। এখানে যে যা দেবে সে তাই ফিরিয়ে পাবে।

একটি কথা ভেবে পাই না, বিদ্বেষের এই কারবারিরা আসে কোথা থেকে আর এত সাহস পায় কী করে।

দেশের সংবিধান ব্যক্তিস্বাধীনতার, মত প্রকাশের ও ধর্ম পালনের যে অধিকার দিয়েছে তার অপব্যবহার করে অন্যকে আঘাত করার জন্য নয়, কিংবা সমাজ ও দেশকে অস্থির করার জন্য তো নয়ই।

এসব ভিডিও‘র উৎস আমার জানা নেই, ভারত বা বাংলাদেশ যেখানেই এর উৎস থাক সংশ্লিষ্ট দেশের উচিত এই সেয়ানা পাগলদের জেলের ভাত দিয়ে আর ঘানি টানিয়ে যথাযথভাবে আদর ও আপ্যায়ন করা।

সংশ্লিষ্ট সমাজের মানুষদেরও উচিত এদের চরম ও বলিষ্ঠভাবে প্রত্যাখ্যান করা। ‘পাগলে কিনা বলে‘এমন ভেবে, অথবা ‘আমার আর কী করার আছে‘ এইরকম গাছাড়া মনোভাবে নিশ্চুপ থাকলে বহুমাত্রিক এই সমাজে অন্য মানুষদের কাছে একটি ভুল বার্তা পৌঁছুবে। সেটাই স্বাভাবিক এবং তার ফলাফলও মারাত্মক। এই ভাবনাটা ভাবতে যত দেরি হবে ততই অমঙ্গল।

কোন অপরাধী বারবার কারো নাম নিলে নির্দোষীর উচিত সময়মত অন্যদেরকে জানিয়ে দেওয়া যে, অপরাধী তার কেউ না এবং তার বক্তব্যও সে সমর্থন করে না। মৌনতা মানুষকে ভিন্ন অর্থ দিতে পারে।

দুই.

এবার আসি বাস্তব ও সত্য প্রসঙ্গে:

একটি বিশেষ ধর্মের দাবিদার হয়ে তার অগণিত মানুষের মধ্যে বিকৃতির বীজ পোঁতার যে অপচেষ্টা সেটা কে বা কারা করছে সেটা জানা দরকার?

দেশের কোন অন্ধকারময় স্থানে যদি এদের উৎপত্তি হয় তাহলে সংশ্লিষ্ট সমাজ ও রাষ্ট্রকে তার প্রতিবিধান করতেই হবে।

আর এরা যদি বিচ্ছিন্ন, সাজানো ও কোনো অভিসন্ধি মূলক ষড়যন্ত্রের কেউ হয় তাহলেও তা দেখতে হবে। কেন এবং কী উদ্দেশ্যে এরা এই খেলা খেলতে চায় এবং কে বা কারা আছে এর পিছনে তাও জানা দরকার।

সংশ্লিষ্ট সমাজের প্রগতিশীল ও শান্তিপ্রিয় সব মানুষের কাছে এ এক পরীক্ষা। এই উন্মাদের বিদ্বেষমূলক বক্তব্য যে তারা সমর্থন করে না তা বোঝানো একান্ত প্রয়োজন। বোঝাতে যত দেরি হবে ক্ষতির পরিমাণটা ততই বেশি হবে।

বিধর্মীদের সংস্পর্শে এলে ও তাদের সাথে মানবিক সম্পর্ক ও বন্ধুত্ব স্থাপন করলে  যদি মুসলমানকে জাহান্নামে যেতে হয় তাহলে নতুন করে ভেবে আর লাভ নেই। কেননা ওই বিদ্বেষী অমানুষের বক্তব্য অনুযায়ী সে ছাড়া আর সবার জাহান্নাম প্রাপ্তি ইতিমধ্যেই হয়েগেছে।

১) ইসলামের পীঠভূমি সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমীর শাহীসহ বহু ইসলামিক দেশ রাষ্ট্রীয় ও কূটনৈতিক স্তরে এবং আন্তর্জাতিক ক্রীড়াতে খ্রিস্টান, ইহুদি, বৌদ্ধ, হিন্দু ইত্যাদি ধর্মে বিশ্বাসী মানুষ ও দেশের সাথে ঘনিষ্ট যোগাযোগ ও মৈত্রী স্থাপন  করে চলেছে বহুযুগ আগে থেকেই।

এখনো যা অব্যাহত। তাহলে এদের কী হবে?

২) ‘জিভ টেনে ছিড়ে নেওয়া‘‘র কথা অন্যরকম শোনায় বলে তা বলা গেল না, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ও হিন্দুদের কাফের (অবিশ্বাসী) ভাবতে হবে বলে যে ফতোয়া দেয় এবং যেভাবে দেয় তাতে তার জবান বন্ধ করার আশু প্রয়োজন।

অন্ধকারের ওই জীব মানুষের ধর্ম ও সভ্যতার বিকাশের ইতিহাস কিছুই না জেনে মুসলমানের বড় দাবিদার। সে কী জানে আরব দেশগুলি বিশ্বকবিকে কীভাবে সম্মানিত করে তাঁর সাথে নৈকট্য স্থাপন করেছিল! সে কি জানে হিন্দুপ্রধান ভারতের সাথে আরব দেশগুলির সুসম্পর্ক ও আদানপ্রদানের কথা? সে কি জানে যে তার মসজিদে যে লাইট জ্বলে, ফ্যান ঘোরে ও জল আসে তাতে কাফেরদের কী অবদান? সর্বোপরি যে মাইকটা সামনে রেখেই গরিলার মত বুক বাজিয়ে সে আপন শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করে তাও তো সেই অবিশ্বাসীদের তৈরি।

তাহলে?

৩) ইসলাম বিস্তারের দিনগুলোতে যে পীর, দরবেশ, অলি, আউলিয়ারগণ এই উপমহাদেশে ইসলাম এনেছিলেন তাঁরা তো কেউ এমন কথা বলেননি। আজও তাঁদের মাজারে বা দরগাহে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ যায়। বিধর্মী ও কাফেরদের এই সংশ্রবের জন্য তাঁদের ঠিকানা তো তাহলে জাহান্নামে হওয়ার কথা।

বদ্ধ উন্মাদ ও নিকৃষ্টতম ওই ব্যক্তি কী বলছে তা কি সে নিজেই জানে? ওইসব মহামানবদের থেকে বেশি ইসলাম জানা কারো আবির্ভাব তো নিঃসন্দেহেই এক অশনিসংকেত।

৪) এই উপমহাদেশে ইসলামের বিস্তার ও শক্তিশালী হয়ে ওঠা যাদের হাতে সেই মুঘলদের শুধু ঘনিষ্ঠ মিত্র নয় ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ও (বৈবাহিক সূত্রে) ছিলেন নিষ্ঠাবান হিন্দু রাজপুত রাজারা। যাদের বেশিরভাগ ছিল মুঘলদের সিপাহ্ সলার। গোঁড়া সুন্নি মুসলমান এবং হিন্দু বিদ্বেষী সম্রাট বলে চিহ্নিত বাদশাহ আলমগীর আওরঙ্গজেবও তার ব্যতিক্রম নয়।

হানাফিয়া মজহবের গোঁড়া সুন্নি হওয়া সত্বেও তাঁর অর্ধ শতাব্দীর বাদশাহীতে এক- তৃতীয়াংশের বেশি গুরুত্বপূর্ণ রাজ অমাত্য ছিল হিন্দু। সাম্রাজ্যের শক্তির রজ্জুটিও ছিল হিন্দু সিপাহ্ সলার রাজপুত বীর জয় সিংহের হাতেই। ইতিহাস বলে, তাঁরই সময়ে হিন্দু রাজ অমাত্য ছিল পূর্ববর্তী মুঘল শাসকদের তুলনায় বেশি। এখানে হিন্দুর সাথে সংস্পর্শ, সংশ্রব এবং বন্ধুত্ব কি হয়নি?

সম্রাট শাজাহানের কন্যার চিকিৎসা করে প্রীতি ও বন্ধুত্ব লাভ করেছিল এক ইংরেজ চিকিৎসক। সম্রাট আওরঙ্গজেবের বংশধর মোগল সম্রাট ফারুকশিয়ারের চিকিৎসা করে প্রীতি ও বন্ধুত্ব লাভ করেছিল আর একজন ইংরেজ। সেই উদারতা ও বন্ধুত্বের ইতিহাস বদলে দিল ভারতের ইতিহাস। কারণ এতেই তারা লাভ করেছিল বিনাশুল্কে ভারতে বাণিজ্য করার অধিকার। আর তারপর যা হয়েছে তা ইতিহাসে লেখা আছে। সে যাইহোক বন্ধুত্ব তো হয়েছিল।

আজ ধর্মের নামে মানুষের মানবিক সম্পর্কের ওপর চীনের প্রাচীর তুলতে চায় কোন মূর্খ নরপিশাচ এবং কী তার উদ্দেশ্য? সংশ্লিষ্ট দেশের প্রশাসন তার খোঁজ নিক ও যথাযথ ব্যবস্থা নিক। দেখাযাক কারা বেরিয়ে আসে এর থেকে।

৫) ইসলামী শাস্ত্রে সুপণ্ডিত হওয়ার জন্য ভিন্ন ধর্মের বহু মানুষ যাঁরা ইসলামী জগতের অত্যাধিক প্রীতি ও নৈকট্যলাভ করেছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম দুই বাঙালি হলেন – রাজা রামমোহন রায় ও গিরীশচন্দ্র সেন। প্রথমজন ইসলামের একেশ্বরবাদী চিন্তার সাথে মিল পেয়েছিলেন উপনিষদ বর্ণিত পরম ব্রহ্মবাদের এবং যার ফলে তিনি হয়ে উঠলেন ঘোর পৌত্তলিকতা বিরোধী। এই ঘোর মূর্খের বিচারে ইসলামে অবিশ্বাসী এই কাফেরকে রাজা উপাধিতে ভূষিত করে পরমবন্ধু ভেবে গুরুত্বপূর্ণ রাজপদে বহাল করেছিলেন দিল্লীর তৎকালীন মুঘল বাদশাহ। আর বাংলা ভাষায় কোরান শরিফ অনুবাদ করে গিরীশচন্দ্র সেন হলেন  ‘মৌলবি ভাই গিরীশচন্দ্র সেন‘। ইনিও তো কাফের, তবুও মুসলমানের ভাই।

আজ কিনা  শুনছি – রবীন্দ্রনাথ ও হিন্দুদেরকে কাফের (অবিশ্বাসী) ভাবতে হবে এবং সংস্পর্শ ত্যাগ না করলে দোযখবাস।

কে এই পাষণ্ড, যে এই কথা বলে?

লোকটি যদি বাংলাদেশী হয় তাহলে সেকি জানে তার দেশের জাতীয় সংগীতটি কার রচনা?

এসব সে বোঝে না। কারণ রাস্তার ভবঘুরে হয়ে ঘুরতে ঘুরতে কোন এক অন্ধকারের পাঠশালায় কিছুই না জানা এক বদ গুরুর কাছে ক‘দিন বা এক বছরের তালিমে সে হয়েছে চূড়ান্ত এক মানব বিদ্বেষী এবং স্বঘোষিত ধর্মীয় ব্যক্তি। ফেরি করছে বিদ্বেষ ও ঘৃণা। এদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নিক সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্র।

৬) আধুনিক ভারতের জাতীয় রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রের অজস্র নামের মধ্যে মাত্র কয়েকটির উল্লেখ করি – সীমান্তগান্ধী খাঁন আব্দুল গফুর খাঁন, মওলানা আবুল কালাম আজাদ প্রমূখদের দেহে ছিল খাঁটি আরবীয় রক্ত। কই, এঁরা তো এমন কথা বলেননি। ইসলামী ধর্মশাস্ত্রে এঁদের থেকে বেশি পাণ্ডিত্য যারা দাবি করে তারা আসলে অকাটমূর্খ।

আজ এইসময়ে মাকে খুব মনে পড়লো। কিছুনা কিছু অঘটন ঘটলে মা প্রায়ই বলতেন, “মূর্খ পুত্র যমের সমান“।

তখন বুঝতাম না, আজ বুঝি মা ঠিক কী বলতে চাইতেন।

গালিব, ইকবাল, ওমর খৈয়াম, ইমাম গাজ্জালি তো এমন কথা বলেননি। ভারতের রাষ্ট্রপতিগণ, বহু রাজ্যের রাজ্যপাল ও বহু রাষ্ট্রদূত যাঁরা ইসলাম ধর্ম ও শাস্ত্রে সুপণ্ডিত ছিলেন তাঁরা তো এ কথা বলেননি। বলেননি তো জামা মসজিদের ইমামসহ বিভিন্ন ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ। বরঞ্চ ইফতার পার্টিতেই সমাদর করে ডাকা হয়েছে ইসলামে অবিশ্বাসী (কাফের) জনদের। ধর্মীয় নেতারা তো বলেননি এই সংস্পর্শ তাদেরকে জাহান্নামে নিয়ে যাবে।

৭) অসংখ্যজনের মধ্যে দু‘একজনের নাম উল্লেখ করি – সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলী, দার্শনিক আবু সয়ীদ আইউব ও সুপণ্ডিত, ভাষাবিদ ও চিন্তাবিদ ড. মোহম্মদ শহীদুল্লাহ, স্বনামধন্য এস ওয়াজেদ আলী, কাজী আব্দুল ওদুদ প্রমুখের সীমাহীন প্রজ্ঞা ও ইসলামী জ্ঞান যাঁরা জানেন তাঁরা জানেন। এঁরা ছিলেন আরবি ভাষা ও সাহিত্য এবং ইসলামী তত্ত্বের এক একটি স্তম্ভ। কই, এঁরা তো এমন কথা বলেননি। বরঞ্চ এদের প্রত্যেকেরই এক বা একাধিক বই আছে রবীন্দ্রনাথের ওপর।

৮) আরবি ভাষা ও সাহিত্য এবং ইসলাম ধর্ম ও তত্ত্বের সুপণ্ডিত, তেরো খণ্ডের ‘ইসলামের ধারাবাহিক সাংস্কৃতিক ইতিহাস‘ এই মহাগ্রন্থের রচয়িতা কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন বিভাগীয় প্রধান স্বনামধন্য অধ্যাপক ড. ওসমান গনীর বিখ্যাত বই -কোরয়ানের আলোকে ‘ইসলাম ও রবীন্দ্রনাথ‘ (ইসলামের ধারাবাহিক সাংস্কৃতিক ইতিহাস, ষষ্ঠ খণ্ড)। দু‘এক পাতায় লেখা না, ৫৬০ পৃষ্ঠার বই। রবীন্দ্রনাথে কী পেলেন তিনি যে এত কথা লিখতে হল? কোন বিরোধ হল না কেন সেখানে? যত বিরোধ সব এই অন্ধকারের জীবদের সাথেই?

কোরয়ানের আলোকে  ‘ইসলাম ও রবীন্দ্রনাথ‘ এর কথা লিখতে যদি কম করে ৫৬০ পৃষ্ঠা লেখার প্রয়োজন হয় তাহলে ধন্য রবীন্দ্রনাথ ও ধন্য ইসলাম। সেখানে এক অর্বাচীন উন্মাদ কিনা বলছে, রবীন্দ্রনাথ ও হিন্দুদেরকে কাফের ভাবতে হবে। আর শিক্ষিত ও প্রগতিশীল মুসলমান তা নীরবে দেখে যাবে?

(ওই ভিডিও টির যে লিঙ্ক  www.islamerkotha.com  সার্চ করে দেখছি, পাওয়া যায় না। তবুও এ জাতীয় জিনিস তো এই মাধ্যমে ঘুরছে এবং এর ধ্বংসাত্মক ক্রিয়াটিও করছে। যেমন কদিন আগে এটি আমাকে দিলেন বন্ধু মানিক লাল রায়। শ্রদ্ধেয় মানিক বাবু যে মরমি কথাগুলি আমাকে লিখেছেন তা থেকেই জন্ম এই প্রবন্ধের। এবং এই বিশেষ দরকারী লেখাটি লিখতে পারার জন্য আমি মানিকবাবুর কাছে বিশেষ কৃতজ্ঞ।

মানিকবাবুর  বক্তব্য ছিল, এ কোনো ষড়যন্ত্র কিনা বা কাদের ষড়যন্ত্র তাও দেখা দরকার। বাংলাদেশের পাঠক-বন্ধুদের কাছে আমার অনুরোধওল রইল একই।

ধরে নিচ্ছি এটি এদেশীয় কোন অমানুষের কাজ এবং সেইমত আমার প্রতিক্রিয়াটি জানালাম এবং যতটুকু পারলাম আমার কর্তব্যও করলাম। কেননা যেভাবেই আসুক আমি মনে করি এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক এক ভিডিও।

৯) আসুন দৈনন্দিন ব্যবহারিক জীবনে যাই – চব্বিশ পরগণার দুই প্রান্তে আমার নিকট দুই আত্মীয়ের জানাজায় (মৃতদেহ কবরস্থ করার আগের প্রার্থনা) কিছু কিছু হিন্দু ও খ্রিস্টান ধর্মালম্বী মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। দুটিক্ষেত্রেই ওই প্রার্থনা পরিচালনা করেছিলেন ভিন্ন ভিন্ন দুজন মানুষ, যাঁরা ইসলামী শাস্ত্রে সুপণ্ডিত ও ধর্মীয় নেতা। তাঁরা কেউ কিন্তু বলেনি যে, অমুসলমানকে সাথে নিয়ে ওই প্রার্থনা করা যাবেনা এবং তাতে মৃত ব্যক্তির জান্নাতবাস হবেনা। বরঞ্চ বলেছিলেন, এই ব্যক্তি অশেষ পুণ্যবান, মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন।

এসব বহু সত্যের মাঝে এই বক্তব্য এবং এই চরম বিদ্বেষীরাও সত্য। এরা যে মোটে নেই তা নয়, আছে। তাহলে উপায়! উপায় বার করবে শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ, শান্তিপ্রিয় ও প্রগতিশীল মুসলিম।

১০) যাক, খতিয়ান দিতে থাকলে এই রচনা আর শেষ হবেনা। বাংলায় বলা এবং বলার ধরন দেখে মনেহয় এই ভিডিওটির জন্মস্থান বাংলাদেশ। মনে হওয়ার আরো একটি কারণ হল এদেশে বসবাসকারী কোন মুসলমানের একথা বলা উচিতও না সম্ভবও না। কেননা তার নিজের বক্তব্যটি তার নিজের বিরুদ্ধে যাবে নিম্নোক্ত কারণেই-

বাঁচার জন্য যা কিছু প্রয়োজন এবং জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত যা কিছু হয় বা হওয়া সম্ভব সেই রোজকার জীবনে খাদ্য-পানীয়, বস্ত্র, বাসস্থান, বাণিজ্য, যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশাসন ও আইনকানুন ইত্যাদির কোথায় নেই তার ধর্মে অবিশ্বাসী বা কাফেরদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ  সংস্পর্শ ও প্রবল অবদান? বরঞ্চ তাদের অবদান হাজারগুণ, লাখোগুণ বেশি। তাহলে এ কথার অর্থ কী? একি নিছক বিকৃতি ও বিকারগ্রস্ততা, না কি বিশেষ কোন মতলব?

গলা পর্যন্ত কারো উপকার, সাহায্য ও অবদান গ্রহণের পর কোন ব্যক্তি বা সমষ্টি যদি উপকারকারীর ঋণ স্বীকার না করে তখন তাকে স্রেফ অকৃতজ্ঞ ও অমানুষ বলা হয়। আর ধর্ম যারা ভালো বোঝেন তাঁরাই তো বলেন –

“আল্লাহ অকৃতজ্ঞ জনকে সবচেয়ে বেশি অপছন্দ করেন।”

ধর্মগ্রন্থকে অনুসরণ করে তাঁরাই তো বলেন,

“তোমার ধর্ম তোমার। অন্যের ধর্ম তার। তুমি কারো বিচারক নও।”

– এই মহাজ্ঞানীর বক্তব্যে কী তার প্রতিফলন আছে?

“শিক্ষার প্রয়োজনে চীনদেশেও যেতে হবে।”

তা চীনদেশে স্বধর্মী কোথায়? তাহলে কেন সেখানে যেতে বলা হল? ইসলামের এই স্বঘোষিত রক্ষক তা কি জানে?

“মানুষকে ভালোবাসা ও স্বদেশ প্রেম ইমানের অঙ্গ।”

তার কোন গন্ধ কি আছে এই জ্ঞানীর বক্তব্যের কোথাও? বরঞ্চ সে তো স্বদেশকে ঘৃণা করা শেখাচ্ছে।

আরো অনেক কথা বলার আছে কিন্তু পরিসরের অভাবে তা বলা সম্ভব না। ধর্ম না করলে শেষ পর্যন্ত ব্যক্তির দোযখ (নরক) বাস হবে কিনা তাও নির্ভর করছে মহান আল্লাহর ওপর। তিনি ক্ষমাশীল, তিনি ক্ষমা করতেও পারেন। একথা ধর্মশাস্ত্রই বলে। ধর্মশাস্ত্র আরো বলে, ভুল ব্যাখা ও মানুষকে বিপথগামী করার জন্য সবচেয়ে বেশি দোযখে যাবে আলেমরা। এর আচরণই তার প্রমাণ।

১১) অনেক বছর আগে পশ্চিমবঙ্গ কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির এক সম্মেলনে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি ভাষা ও সাহিত্য এবং তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের তৎকালীন বিশিষ্ট অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ড. বদিউর রহমানকে বলেছিলাম,

সাহেব, আরবি ভাষাটা জানিনা তবে কোরানের ইংরেজি ও বাংলা দুই অনুবাদই পড়েছি কিন্তু মনে হয়না পরিস্কার করে তেমন কিছু বুঝেছি। এই সমস্যা কেন হচ্ছে?

বিদগ্ধ ও অমায়িক মানুষটি সংক্ষিপ্ত উত্তরে বললেন, হবে।

বললাম, কেন হবে? এবার তিনি মুখ খুললেন ও বললেন,

সাহেব কোরানকে বোঝা এত সহজ না, তার কারণ –

প্রথমতঃ ভাষাগত দিক দিয়ে এটি অত্যন্ত উচ্চমানের কবিতায় লেখা, যার বাইরের অর্থের সাথে মর্মার্থের প্রভেদ অনেক।

দ্বিতীয়তঃ কোরান নাজেল (আগমন) এর ধারাবাহিক ঘটনাপ্রবাহ ও সমকালীন আরব ও তার চারপাশের ইতিহাস সবকিছুকে মাথায় ও মনে ঠিকমত রাখতে না পারলে ওই সমস্যা আরো দূরুহ হবেই। কাজটা ভয়ঙ্কররকমের কঠিন বলে সত্যিকারের ইসলামী তাত্ত্বিকের এত অভাব।

অল্পক্ষণ চুপকরে থেকে কী যেন ভেবে আবার বললেন, কাজটা ভয়ঙ্কর রকমের কঠিন বলেই আজ এত বিপুলসংখ্যক তাত্ত্বিকও জুটেছে যেখানে সেখানে, অন্ততঃ এই দেশে তো বটে।

শুনে থ হয়ে গিয়েছিলাম। আর আজ এত বছর পরে মনে হল এতদিন পর আমিও  ঠিকঠাক বুঝলাম ড. বদিউর রহমান ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছিলেন।

যাইহোক, পরকালের হিসাব নিকাশ তো পরকালেই। কিন্তু ইহকালটা যারা জাহান্নাম করে দিতে চাইছে তাদের জন্য কিন্তু সকলের সতর্ক থাকা খুবই দরকার।

একটি কথা, এই ভিডিও দেশের মধ্যের হোক বা সীমান্তপার যেখানেরই হোক এর ধ্বংসাত্মক প্রভাব কিন্তু একই। তাই আমার স্বদেশ ও প্রতিবেশী রাষ্ট্র কেউই যেন বিষয়টিকে ছোট করে না দেখে। কেন, আশাকরি তা আর বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন নেই।

সংশ্লিষ্ট মহাজ্ঞানী ধর্মরক্ষক ও তার  অনুগামীদের জন্য ছোট্ট একটি প্রশ্ন রাখি –

মুসলমান ছাড়া আর সব মানুষ যদি আল্লাহর এত অপছন্দের, তাহলে সর্ব শক্তিমান তিনিইবা তাদের রেখেছেন কেন?  তিনি শুধুই যে তাদেরকে রেখেছেন তা তো নয় বরঞ্চ অনেকের থেকে অনেক বেশি ভালো রেখেছেন। তাহলে আল্লাহ যাকে সহ্য করেন আর ভালো রাখেন তুমি বা তোমরা তা পারছ না কেন আর কোন দুঃখে?

বিকৃত ও বিকারগ্রস্থ উন্মাদের কাছে আবেদন করে কোনো লাভ নেই। তাই যারা সুস্থ তাঁদের কাছে অনুরোধ এই অসুস্থতা রোধ করতে এগিয়ে আসুন। এই নিকৃষ্টতম কাজ ও তার কাজীকে বাধা দিন। দেরি করলে ভবিষ্যতে অনেক চড়া মাশুল দিতে হতে পারে।

 মতিয়ূর রহমান। লেখক, প্রাবন্ধিক ও অধ্যাপক। জন্ম ভারতের পশ্চিমবঙ্গে। তিন দশকের বেশি সময় ধরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সরকার পোষিত কলেজের উদ্ভিদ বিজ্ঞানের শিক্ষক। জীববিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়, জীববৈচিত্র্যের সংকট ও পরিবেশ বিষয়ক নানা দিক ও নানা বিষয়ের গবেষণামূলক নিবন্ধ লেখক। আবার সমাজ,...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ