উপহার

কুম্ভকর্ণ
গল্প
Bengali
উপহার

-অবাক কান্ড!! বহ্নিশিখা সেনগুপ্ত কফি হাউসে একা?তোর বাকি দুই মাস্কেটিয়ার্স কই?

-ওরা এখন আমায় এড়িয়ে চলে, কনল।

-হুম !তবে একটা কথা বলি ছেলেটার গায়ে না তুললেই পারতিস..আর এই সব পুলিশের হ্যাপা তুই নিতে পারবি?

-খুব পারবো।ওরা চলে গ্যাছে, তুই চলে গেলেও আমি পারবো।আমি এর শেষ দেখে ছাড়বো।

-আমি আবার কখন বললাম থাকবো না,যাগ্গে ছাড় ফেসবুকে কাল আমার লেখাটা পড়লি?ছয় ঘন্টায় সাড়ে চারশ লাইক বুঝলি!

-পড়েছি, জঘন্য ।তুই মনে হয় ভুত আর ন্যাকা প্রেমের গল্পের বাইরে বেরোতে পারবি না?ডিসগাসটিং,দেশে অনেক সমস্যা আছে সেগুলো নিয়ে লিখতে পারিস না?

-কিন্তু সবাই তো এসবই খাচ্ছে।

-সবার জন্য লিখিস না কনল,নিজের জন্য লেখ দেখবি ভালো লাগবে..!!

-বটে,এতো দেখি দার্শনিক বহ্নি।

-কনল তুমি কখন এলে?কনল..

শিপ্রার ডাক শুনে কনল ফিরে এলো তিন মাস পুরানো কফি হাউস থেকে বর্তমানের যাদবপুরে মানে বহ্নিশিখার বাড়িতে।

-কি ভাবছো কনল?

-কিচ্ছু না মাসীমা,বহ্নির সাথে দ্যাখা করা যাবে?

-হসপিটাল থেকে তুলি বাড়ি ফেরার পর থেকে তুমি রোজ এখানে আসো কনল,কিন্তু মেয়েটা একদিনও তোমার সাথে দ্যাখা করলো না.. আমার খুব খারাপ লাগে কনল।ছোট একটা শ্বাস ছেড়ে হতাশ ভাবে কথা গুলো বললো।

-তাতে কি হয়েছে?আমি তো বহ্নির বন্ধু।শুকনো একটা হেসে কনল বললো।

-কত বন্ধুই তো ছিলো বুলির,তুমি ছাড়া তো কেউ এলোই না ।দাঁড়াও এক বার তুলিকে খবর দিয়ে আসি তুমি এসেছো..মেয়েটা পুরো শেষ হয়ে গ্যালো।শেষ কথা গুলো বলতে গিয়ে শিপ্রার গলাটা জড়িয়ে গ্যালো।

শিপ্রা উঠে গ্যালো দোতলায় বহ্নির ঘরে।

শহরের চারিদিক সেজে উঠছে দেবীপক্ষের সাজে।গত বছরও বহ্নিশিখা কনলকে নিয়ে ধর্মতলায় পুজোর বাজার করছে,শপিং মলের কন্ডিশনড বাতাসে তার নাকি দম বন্ধ হয়ে আসে।কিন্তু এবছর দুই বন্ধুর জীবনটা এলোমেলো হয়ে গ্যাছে গত তিন মাসে,কনলের শখের লেখারও পাঠ উঠেছে।বহ্নিশিখার সাথে সে শেষ কবে কথা বলেছে তার হিসাব সে সেকেন্ডের মধ্যে দিতে পারে।শেষ বারের মতন সে বহ্নিশিখাকে দেখেছিলো হসপিটালে অজ্ঞান অবস্থায়,সেটাও প্রায় দেড় মাস হয়ে গ্যাছে।জ্ঞান ফেরার পর বহ্নিশিখা আর কারুর সাথে দ্যাখা করতে চায়নি।তবু সে আশা ছাড়েনি,হসপিটাল থেকে বহ্নিশিখা বাড়ি ফেরার পর প্রতিদিন সন্ধ্যা বেলায় সে যাদবপুরে তাদের বাড়িতে আসে।পুজোর বাজারের ভিড় কাটিয়ে নিজের বাড়ি ফিরতে তার একটু রাতই হয়।বাড়িতে বাবার এখনও কড়া শাসন,তবুও সে আসে।গত দশদিনে একদিনও বহ্নিশিখা তার সাথে দ্যাখা করেনি । একটা যেন জেদ চেপে গ্যাছে কনলের।মানুষের জেদ তার ব্যর্থতার হতাশাকে ও গ্রাস করে।

-কনল যাও, তোমায় তুলি ডাকছে।একটু সাবধানে কথা বোলো,মেয়েটা আমার পুরো পালটে গ্যাছে।ও মনে করে সবাই ওকে করুনা করছে।

শিপ্রার গলায় উদ্বেগ থাকলেও একটা স্বস্থির ছাপ আছে।

কনলের মনে যেন হাজার ওয়াটের বাতি জ্বলে উঠলো।এ যেন দীর্ঘ প্রতিক্ষার অবসান।

দোতলার এক কোণে বহ্নিশিখার ঘর।এই ঘরে সে আগেও বহুবার এসেছে কিন্তু এই বারের টা পুরোপুরি আলাদা।

দরজাটা ঠেলে ঘরে ঢুকলো কনল।ঘরের সব জানলা বন্ধ এই সন্ধ্যা বেলাতেই এ সি চলছে। নাইট ল্যাম্পের আলোতে ঘরটা তে চোখ বোলালো সে। ঘরের প্রতিটি ফটো ফ্রেম,ড্রেসিং টেবিল সবই বিতাড়িত।খাটের উপরে মাথা নীচু করে বহ্নিশিখা বসে।ঘরের আলোটা জ্বালতেই কনল দেখলো কফি হাউসের সেই আনন্দময়ী বহ্নিশিখার অনেক পরিবর্তন হয়েছে।চুল গুলো রুক্ষ,চোখটা টক টকে লাল,চেহারাটা যেন শুকিয়ে দড়ি হয়ে গ্যাছে,আর মুখের হাসিটা নিখোঁজ।এই তিন মাসের নব্বই টা দিন যেন ব্লটিং পেপারের মতন তার প্রাণশক্তিটা কে শুষে নিয়েছে।

-এ সি টা বন্ধ করছি।কনল এ সি টা বন্ধ করে জানলা গুলো খুলে দিলো।অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ বাইরে একটা ঠান্ডার আমেজ।কাছেই দূর্গার পুজোর প্যান্ডেলের মাইক টেসটিং চালু হয়েছে।

-কি রে কেমন আছিস?শান্ত ভাবে বললো কনল।

-কি রে কথা বলবি না?আচ্ছা তুই আমার সাথে দ্যাখা করতে..! কথাটা শেষ করার আগে বহ্নিশিখা বললো

-তুই এখানে কি করতে আসিস?

-মানে?আসবো না?

-শোন কনল আমার কোনো সিমপ্যাথির দরকার নেই।

-তোকে আবার কে বললো আমি তোকে সিমপ্যাথি দ্যাখানোর জন্য আসি।

-তাহলে ?লোক দ্যাখাতে আসিস যে তুই কত মহান।

-কোন লোকদের কথা বলছিস?তুই একটু শান্ত হ বহ্নি..।

-ন্যাকা কিছুই বোঝে না..শোন কনল আমার এই ন্যাকামি ভালো লাগে না।তোকে আর আসতে হবে না।

-ও সব কথা ছাড়,কাকিমা বলছিলেন তুই বাড়ি থেকে বেরোস না।কাল আমার সাথে বেরোবি বহ্নি?

বহ্নিশিখা চুপ করে গ্যালো।

-কি রে ? কাল বেরোবি তুই আমার সাথে?

কথা গুলো শেষ হতেই যেন জ্বলে উঠলো বহ্নি।

-ক্যানো রে?লোকের কাছে হিরো সাজার খুব শখ না রে?এক দুস্থ নারীকে সাহায্য করে বাহবা কুড়াবি না রে..তুই বেরিয়ে যা।এক্ষুনি বেরিয়ে যা।

-তুই এরকম ভাবে ক্যানো বলছিস রে?দ্যাখ একবার বেরোলে তোর ভালো লাগবে।

-না আমি যাবো না।তুই আমার চোখের সামনে থেকে চলে যা। এতো অপমান করছি তবু তোর গায়ে লাগছে না।আচ্ছা বেহায়া ছেলে তো তুই।

কথা গুলো বলতে বলতে উঠে দাড়ালো বহ্নিশিখা।তারপর টলতে টলতে কনলের হাতটা ধরে তাকে ঘরের বাইরে বার করে দিয়ে দরজাটা দিয়ে দিলো।

– প্লিস কনল আমার কাছে আর আসিস না।

কনল বেশ কিছুক্ষণ দরজার বাইরে অপেক্ষা করল।তারপর সিড়ি কাছে শিপ্রার সাথে দ্যাখা হোলো কনলের।

-কিছু মনে করোনো কনল।গলাটা ধরে এসেছে শিপ্রার।

-না না কি মনে করবো?শুকনো হেসে কনল বললো।

-আমি সব শুনেছি কনল তুলির ব্যবহারের জন্য আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।শিপ্রা কনলের হাত দুটো ধরে বললো।

-ছি ছি মাসীমা..এ সব কি বলছেন?

-তুমি আবার আসবে তো কনল?

একটু থেমে কনল বললো

-দেখি..!

মেইন রাস্তায় এসে কনল একটা সিগারেট ধরালো।তার মাথার দু পাশটা দপ্ দপ্ করছে।বেশি কিছুক্ষণ এলোমেলো ভাবে হাঁটলো।বহ্নিশিখার ব্যবহারে সে আহত।

তার কি দোষ?

বহ্নিশিখার প্রতিটা সিদ্ধান্তে সে পাশে থেকেছে তবুও এমন ব্যবহার?

কনল কিছুতেই মানতে পারছে না,তার মাথায় আগুন ছুটছে।

অনেক হয়েছে আর নয়..!!

দুই

বারুইপুর স্টেশন থেকে রণেশ মিত্রের বাড়ি মিনিট পাঁচকের হাঁটা পথ।রণেশ বয়স ষাটের কাছাকাছি,গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ।বিশেষ করে দ্বিতীয় সন্তান প্রসব কালে তার স্ত্রীর মৃত্যু তাকে আরও গম্ভীর করেছে।স্ত্রী কে নিজের প্রাণের চাইতে ভালেবাসতো রণেশ,তাই এই মৃত্যুটা এক অদৃশ্য দেওয়াল তুলে দিয়ে ছিলো তার এবং তার দ্বিতীয় সন্তানের মাঝে।যুক্তিবাদী রণেশ সেই দেওয়াল লঙ্ঘনের প্রবল চেষ্টা করেছিলো তবু তাদের সম্পর্কটা স্বাভাবিক হয় নি।তাদের মাঝখানের সেতু বলতে তার বড় ছেলে অনল আর বাড়ির পরিচারক বিল্লু।

অনল মিত্র বিদেশ যাবার পর বিল্লুর উপরেই এই গুরু দায়িত্ব এসে পড়েছে।বিল্লু তাদের সাথে প্রায় বছর পচিঁশ হবে।রণেশ বিখ্যাত এম এন সি তে চাকরি করতেন।কোয়াটার, পরিচারক সবই কোম্পানি থেকে আসতো,বিল্লু সেই কোম্পানির দান।পরে রণেশ কোম্পানি ছাড়লেও বিল্লু কে সে ছাড়েনি।তবে ইদানিং হার্টের অসুখ সঙ্গে হাই প্রেসার তাকে বেশ নাড়িয়ে দুর্বল করেছে।

অনল বিদেশ যাবার পর রাতে ডিনার টেবিলে রণেশ একা।

-বিল্লু, বুম্বার আজকাল ফিরতে রাত হয়?

-হ্যাঁ,ছোটদাদাবাবুর আজকাল বেশ রাত হচ্ছে ফিরতে।

-তোকে কারণ কিছু বলেছে?

-তেমন ভাবে কিছু নয়,তবে শুনেছি ওর এক বন্ধু খুব অসুস্থ।

-কই আমাকে তো কিছু বলেনি।

-তুমি কি দাদাবাবুর সাথে ঠিক করে কথা বলো?

এক ছোট দীর্ঘ শ্বাস ফেলে রণেশ বললো

-বাবিন ও তো কিছু বললো না,কে জানে ছেলেটা কি করছে।

-তুমি একবার কথা বলো না।

রণেশ একটু অবাক হয়ে বললো

-আমি?আমাকে ও সব বলবে?

-একবার তো কথা বলতে পারো।

চুপ করে গ্যালো রণেশ। খাওয়া শেষ করে ,নিজের ঘরে যাওয়ার আগে শুধু বললো

-আমি জেগে আছি,বুম্বা আসলে একবার আমার ঘরে পাঠাস।

কণলের ফিরতে বেশ রাত হোলো।এলোমেলো অনেক হেঁটে খুব ক্লান্ত লাগছে তার।যাদবপুর থেকে ট্রেন উঠে পড়লো।রাত দশটা অফিস টাইম শেষ হয়ে গ্যাছে তবু ট্রেন টায় যথেষ্ট ভিড়।কোনো ক্রমে দরজায় দাড়িয়ে আছে,রাতের ঠান্ডা হাওয়া বেশ তৃপ্তি দিচ্ছে তাকে।গড়িয়া ছাড়ার পর ট্রেনটা একটু খালি হতে সে কামরা ভিতরে ঢুকলো।

কামরার ভিতরে সারা দিনের ক্লান্তি কে হারিয়ে মানুষের দল তাস খেলছে,খাবার খাচ্ছে,গল্প করছে..আবার কেউ কেউ একটু ঝিমিয়ে নিচ্ছে।কণলের বেশ মজা লাগে ব্যাপার গুলো।

কণল বারুইপুর স্টেশন নামল তখন রাত সাড়ে দশটা।স্টেশন লাগোয়া প্রগতি সংঘের এবারে থিম নারী শক্তি,প্যান্ডলে দেখতে লোক জনের ভীড়।মনে মনে হাসলো কণল।

অন্যদিন গুলোতে কণল এক রাশ ক্ষিদে নিয়ে বাড়ি ঢোকে কিন্তু আজ তার ক্ষিদে নেই।তারপর বিল্লুর কাছে রণেশের আদেশটা শুনে সে ভীষণ

অবাকই হোলো কণল।ছোট থেকেই সে রণেশকে এড়িয়ে চলে,বলতে গেলে পিতা পুত্রের সম্পর্কের তাপমাত্রা হিমাঙ্কের অনেক নীচে। কোনক্রমে খাওয়াটা শেষ করে কণল রণেশের ঘরে ঢুকলো।রণেশের ঘরটা বেশ বড়,দরজার দিকে পিছন করে সে এক মনে গান শুনে যাচ্ছে। সেলোতে (cello) এক শান্ত বাজনা বেজে চলেছে ডেনন এর টার্ণটেবিলটাতে,কণল বুঝতে অসুবিধা হোলো না সুরটা-পাবলো কাসাল -এর Song of the birds! কণল কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে শুনলো তার হঠাৎ ই ব্যস্ত হয়ে উঠলো।

-বাবা তুমি আমায় ডেকেছো?

রণেশ এর চটকা টা ভাঙ্গলো,

-হু,বিল্লু বলছিলো তোমার আজকাল ফিরতে বেশ রাত হচ্ছে।কোন সমস্যায় পড়েছো নাকি?

কণল ভীষণ অবাক হোলো,এ যেন জলে ভাসে শিলা।যে ভদ্রলোক কোনো দিন তার পরীক্ষার রেজাল্টের কথাও জিজ্ঞাসা করেনি সে আজ তার সমস্যার খোঁজ নিচ্ছে।বিরক্ত লাগছে কণলের।রণেশ রিমোটটা দিয়ে মিউজিশ সিস্টেমটা বন্ধ করলো।

-বুম্বা,এইখানে বসো।একটু থেমে আবার বললো,তুমি ভাবছো হঠাৎ তোমার প্রতি আমার এই উদারতার কারন কি?

কণল চুপ করে থাকলো।

-বাবিন বিদেশ যাবার পর,আমি অনেক দিন পর নিজের সাথে কথা বললাম।

কণল এবার বললো

-বাবা আমার কিছু,খুব ঘুম পাচ্ছে এবার যাবো?

-বুম্বা আমি বুঝি তোমার বিরক্ত লাগছে,আমাকে স্বার্থপর ভাবছো,মনে মনে বলছো বাবিন বিদেশ যাবার পর..

-কাউকে নিয়ে ভাবতে গেলে একটা সম্পর্ক থাকতে হয়,তাই না ?একটু কড়া ভাবে বললো কণল।

-জানি,কিন্তু তোমার মায়ের মৃত্যুটা আমি মানতে পারিনি বুম্বা।তোমার জন্মের সময়ে সে আমাকে ছেড়ে গেলেন সেটা আমি মানতে পারি নি।নিজেকে অনেক বুঝিয়েছি তবুও।একটানা কথা গুলো বলল রণেশ।

-এসব এখন বলে কি হবে বাবা?

-জানি কিছুই হবে না তবু শেষ বয়সে এসে আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাইছি বুম্বা।রণেশ কণলের হাতটা জড়িয়ে ধরলো।

-এ কি করছে তুমি,ছাড়ো..!কণল উঠে দাঁড়ালো।

-বুম্বা আমাকে ছেড়ে যাস না।রণেশ কাতর ভাবে কথা গুলো বললো।

কণল দাড়িয়ে পড়লো। কি অদ্ভুত সমাপতন আজ তার জীবনে, যে মানুষটিকে সে সবচেয়ে ভালোবাসে এবং পাশে থাকতে চায়,সেই মানুষটি তাকে অপমান করে তাড়িয়ে দিলো।আর তার জীবনের চরম ঘৃণিত মানুষটি তার কাছে উপস্থিতি ভিক্ষা করছে।মনে মনে হাসলো কণল,তারপর বললো

-না না বাবা আমি আছি,তুমি শান্ত হও।

রণেশ জড়িয়ে ধরলো কণলকে,প্রথম বার।পিতৃ আলিঙ্গণের উষ্ণতায় কণলের কঠিন অভিমান কিছুটা হলেও তরল হয়ে গ্যালো।

-বলবি না বুম্বা,তোর কষ্টটা আমায় বলবি না..!আদ্র স্বরে রণেশ বললো।

কণল সংক্ষেপে বহ্নিশিখার ঘটনাগুলো ক্রমান্বয়ে বললো রণেশকে।একটা ছোট দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো

-সাসপেক্ট অ্যারেস্ট হয়েছে?

-হু।

-তুই বহ্নিশিখাকে ভালোবাসিস,তাই না বুম্বা?

চুপ করে গ্যালো কণল।

-কাল তুই বহ্নিশিখার বাড়ি যাবি?

-বাবা,আজকের অপমানের পরেও তুমি আমাকে ওখানে যাবার কথা বোলছো?অবাক হয়ে কণল বললো।

-দুর পাগোল,ভালোবাসায় আবার মান অপমান কি?

-না বাবা,আমি আর যাবো না..!

-বুম্বা ভালোবাসার মানুষকে এমন ভাবে হারিয়ে ফেলিস না।আমি জানি ভালোবাসার মানুষ হারানোর কষ্ট এবং তার অনেক সাইড এফেক্ট থাকে যেটা সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হয়।

কণল চুপ করে গ্যালো।

-কাল সকালে যখন যাবি,দেখবি বহ্নিশিখা তোর জন্য অপেক্ষা করে আছে।শান্ত ভাবে বললো রণেশ।

-তুমি বহ্নি কে জানো না বাবা,খুব জেদি..

হেসে উঠলো রণেশ,তারপর বললো

-অধিকার থেকে জেদ জন্মায় বুম্বা।

রণেশ উঠে নিজের আলমারি খুললো,একটা বড় প্যাকেট বার করে কণলের হাতে দিয়ে বললো

-তোর মায়ের জন্য বাংলাদেশ থেকে এনেছিলাম।সে তো আর জিনিসটা দেখতে পেলো না,এটা তুই বহ্নিশিখাকে দিস।

কণল প্যাকেটা খুলে অবাক হয়ে রণেশের দিকে তাকালো।

-এটা ওকে লড়াই করার শক্তি দেবে।

-তুমি এটা রেখে দাও বাবা,আমি আর ওদের বাড়ি যাবো না।

-এটা রেখে দে।যেদিন যাবি সেদিন নিয়ে যাবি।যা শুয়ে পড় অনেক রাত হয়েছে।

তিন

পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতক প্রশ্নের উত্তরে কণল অবশ্যই তার হৃদয়ের কথা বলবে।সারা রাত ধরে তার মস্তিষ্ক তাকে অনেক কিছু বোঝালো,কিন্তু সকালে উঠে যে কে সেই।হৃদয়ের টানে সকাল বেলায় ট্রেনে চেপে যাদবপুর।পুজো পুজো রদ্দুর আর চারপাশে নতুন জামার গন্ধ কণলের গতরাতের গ্লানিটা পুরোটাই কেটেছে।রণেশের সাথে সম্পর্কের সরলতাটা তার খুশীর অন্য এক মাত্রা দিয়েছে।

শহর জুড়ে দুগ্গা পুজোর ভীড় কাটিয়ে কণল তার লক্ষ্যে পৌছালো তখন ঘড়িতে সাড়ে ন’টা।

-তুমি এসেছো কণল?আমি জানতাম তুমি আসবে।শিপ্রার চোখে মুখে উদ্বেগ স্পষ্ট।

কণল শুধু একটু হাসলো।

-তুমি চলে যাবার পর তুলি খুব কেঁদেছে।শুধু বলছে “আমার জন্য কণলের জীবনটা ও শেষ হোক আমি চাই না,আমার কাউকে লাগবে না।”

রাতে কিচ্ছু মুখে পর্যন্ত দ্যায়নি।একটানা কথা গুলো বললো শিপ্রা।

-মাসীমা,সে ঘুম থেকে উঠেছে?

শিপ্রা মাথা নেড়ে সন্মতি জানালো।কণল আজ আর বৈঠক খানায় অপেক্ষা করলো না,সোজা চলে গ্যালো দোতলায়।বহ্নিশিখার ঘরের দু বার টোকা মেরে একে বারে ঢুকে পড়লো।

-কি রে কি ভেবেছিলি আমি আর আসবো না।বহ্নিশিখা সেনগুপ্ত,কণল মিত্তর অতো সহজে কিছু ছাড়ে না।

এক এক করে জানলা গুলো খুলতে খুলতে কথা গুলো বললো কণল।কণল বহ্নিশিখার কাছে এগিয়ে এলো,তারপর নিজের কাছে টেনে নিয়ে বললো

-চট করে রেডি হয়ে নে,এবার তোকে বারুইপুরের ঠাকুর দ্যাখাতে নিয়ে যাবো।

-তুই ফিরে এসেছিস..আরও কিন্তু বলতে যাচ্ছিলো বহ্নিশিখা কিন্তু সে অঝোরে কেঁদে ফেললো কণলকে জড়িয়ে।

-মার খাবি বহ্নি,দেবী পক্ষে মেয়েদের কাঁদতে নেই জানিস না।বহ্নিশিখাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে বললো কণল।

-কিন্তু আমি এভাবে কি করে লোকের সামনে দাড়াবো।বহ্নিশিখা একটু শান্ত হয়ে বললো।

-বহ্নি মানুষের সাথে মানুষের বন্ধনটা মানসিক,শারীরিক নয় তাই না? আর তুই কবে থেকে এসব মানতে শুরু করলি।

-না রে কণল,আমি পারবো না..

-শোন আজ মহাষষ্ঠি,গত বছরের লাল শাড়িটা পারলে পরিস,সেটা তো মনে হয় এখনও নতুন আছে।আমি ঠিক পনেরো মিনিট পর আসছি।

-কণল,কণল শোন..!

কণল বেরিয়ে গ্যালো।বহ্নিশিখার এ যুদ্ধটা তার একান্ত নিজের,নিজেকেই লড়তে হবে..শুধু আজ নয় সারা জীবন।

পনেরো মিনিটে পরে কণল।লাল শাড়িতে বহ্নিশিখা কে বেশ মানিয়েছে।

-কি রে মেক আপ করবি না?

একটু চুপ থেকে বহ্নিশিখা হতাশ গলায় বললো

-অ্যাসিডে পোড়া মুখে আর কি মেক আপ করবো কণল?

-দুর অ্যাসিডে মানুষের মুখ পোড়ে মানুষের মন নয়।তোর ঘরের প্রতিটি ছবি গুলো ফিরিয়ে আন,আর পারলে এটাও রাখিস।কণল তার হাতের বড় খামটা বহ্নিশিখার হাতে দিলো।

-কি এটা?

-খুলে দ্যাখ।আমার মায়ের স্মৃতি বলতে পারিস।

প্যাকেটটা খুলে বহ্নিশিথা অবাক,এক প্রমান সাইজের আয়না সঙ্গে মেহগনি গাছের ভারি সুন্দর ফ্রেম।

-এটা তোর পুজোর উপহার।নিজের সঙ্গে যখন লড়াই করবি তখন এর সামনে এসে দাঁড়াবি,তোর ভিতরের মনটা তোকে লড়াই এর শক্তি দেবে।কণল বললো।

-দারুন দারুন কিন্তু মাসীমার জিনিসটা কে দিলো?

-আমার বাবা।

-মেসোমশাই?বহ্নিশিখা অবাক হয়ে জিজ্ঞাস করলো।

-আমার পুজোর উপহার..হেসে বললো কণল।

কুম্ভকর্ণ (ছদ্মনাম)। লেখক। জন্ম ভারতের পশ্চিমবঙ্গে। পেশায় প্রকৌশলী।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..