উমাপদ করের শিরোনামহীন কবিতা

উমাপদ কর
কবিতা
উমাপদ করের শিরোনামহীন কবিতা

এক.

জলভাব আমার
আর জলটান গেলো না…
বাস্প তোয়াজে জল আর কুল-কুলে বরফ
সে-ও তো জলই…। একলপ্তে কিছুটা, টানে গভীরে।

#
কীভাবে লেখা হতে পারে, সম্ভাবনাই ছিল না যার!
হেসে উঠতে পারে কলম,
চোখের কালি তবু তো ভরে নিয়েছি
সে-ও তো জল…। আমি আর আমার মধ্যে
ঝুলতে থাকা সেতুসময়টাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়…

#
আগুনের সামনে অঙ্গীকার করা ভিখিরি হাত
অঞ্জলী ভরে যা নেয়, সে-ও টিউকলের জল…
পথ-আবহে স্বরলিপি মনে হয়…
মনে হয় বর্ণমালার হৃদয় ফুঁড়ে সাংগীতিক চিহ্নগুলো
ভিখিরির ঝোলা থেকে এই, এই তো বেরোলো…
ভিখিরি বোঝে না কখন সে নিজেই এক টুকরো জল
বা কবিতা হয়ে গেছে…

 

দুই.

আকাশে তোর আহ্লাদ, বাতাসে ব্যালকনি,
বসন্তের কাক কাম-সেপ্টেম্বর হয়ে ঝোলে
যেন ক্যালেণ্ডার
অংশত ফোঁপানো তোর চুল
ভোরের নির্জনে থাকা কুয়াশা,
বিহারে নেমে বড্ড বেশিই ডাকছিস হতচ্ছাড়া…

#
তীব্র দ্রাক্ষা… পাত্র ভরে ওঠে কা-য়ে কা-য়ে
কুহুতে কুহুতে গলনাঙ্ক ছাড়িয়ে যায় আমলকী শীতের
কোঁকড়ানো সাপটাকে আর বেহুঁস রাখতে পারে না,
জাগিয়েই তোলে…

#
অধরোষ্ঠ লুকিয়ে ফেলা দৃষ্টি পায়ের নখে
বাতাসে গুঞ্জন, ফিসফাস, অবিশ্বাসও…
কিছুতেই ছুঁতে দিস না তোর ছায়া আর নোয়ানো স্তনভার
থমকে চুপ বিপন্ন কাক কোকিল হয়ে উঠছে
ভয়ের একটা গোলা গিলে ফেলেছে গলা…
কণ্ঠায় তার ছোপ… বসন্তের অস্তরাগ…

তিন.

নভচর
দু-হাত ছড়িয়ে ভাসে ভূ-সমলয়ে।
একটা হাত কারও জন্য উৎকণ্ঠ, কিছুটা ম্রিয়ও…
আরেকটায় বরাভয় মুদ্রা ট্রেন্ডস টু ভালোবাসা…
ফড়িং-এর পাশে পাশে ছুট্টে যাওয়া একেকটা আধফোটা সকাল…

#
আপাত স্থিরতায় মানসশিলায় চলমান চোখ
গোত্তা খেতে খেতে বলেনি দাহ ও দহনের কথা।
ইচ্ছে বনাম প্রেম-লতার দ্বৈরথে
চোখের কোণায় অবিকল কণা কণা বিন্দু…
আন্তরিক হলে পদ্ম ফোটে,
কখনও বিম্বে কখনও প্রতিবিম্বে…

#
স্কি করতে করতে নেমে যাওয়া গ্লেসিয়ার ধরে
হুডখোলা পাতালে প্রবেশ,
সুরাতীত কোনও গানের রেশ…
শুধু গোলকের দুটো হাত সান-হাইকে আদরে ভরে
স্মিত মুখে…

চার.

উড়ালপুলের ছায়ায় ঝুঁকে থাকা নিন্দিত চাঁদে
যেদিন প্রথম ঠোঁট পুড়ে যাওয়া
ছাই হয়ে যাওয়া মনতিয়াসা…
হতে হতেও না হওয়া কবিতার ক্লিশে পাণ্ডুলিপি
সেদিনই মোচাফুল হয়ে ফুটে উঠল
পলাশ পাগল বিদ্যাস্থানেভ্য এবচেঃ

#
মানুষ বলছে— কত কী করলাম, রিটার্ন পেলাম না…
গীতা বলছেন— কর্ম করে যাও, মা ফলেষু কদাচন…
এই কনফ্লিক্ট বা বিরোধের মধ্যে কাজের হাত-দুটো রাখলাম
পুড়ে ছাই…। চলনের পা রাখলাম…। চিতা-ভস্ম…
বুঝলাম, শরীর চলবে না। মন ছোঁয়ালাম। ধোঁয়া…
কুণ্ডলী পাকিয়ে গাছ, পল্লবময়… ছায়া ছায়া…

#
কারো উদাসে হারিয়ে যাবো বলেই ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা
বেহালা হোক না অসীম
শুধু এড়িয়ে যাব দীর্ঘশ্বাস আর না-বোঝা বিমর্ষ হাসিটির কোণা…
ডানার আন্দোলন ঠিকঠাক বোঝানো যায় না…
ফল-লাভের নূপুর তবু নাভিকুণ্ডলী ঘিরে নিং-নিং বাজতেই থাকে…

পাঁচ.

কবিতার সাঁকোটিকে বিমূর্তি ভঙ্গুর করে রাখে…
অনেক কবিতায় শব্দটি আমার হয়েও যেন হয় না
তোমরাও কেমন মূর্তি-কল্পটির শিরদাঁড়া পাল্টে
আমার দেখা সাঁকোগুলোর ফিলসফি ভেঙে দাও…
আমি মূর্তি-বিমূর্তির মধ্যিখানে পিং-পং-এ বুঝি
সাঁকোগুলো কোনো মেটাফর নয়…
এমনকি তোমাদেরটা মোটেও আমারটার মতো নয়…
যদিও সাঁকো একটি সাধারণ শব্দ, যা নির্বিশেষে ব্যবহার্য…

#
কুসুমতলীর মাঠে কয়েক ক্রোশ হেঁটে মানুষ যেত
এখনও কয়েক কিমিঃ যায় সাইকেলে বা বাইকে
শুনশান দুপুরকে ওই মাঠ গিলে খাচ্ছে, আমি দেখেছি…
তোমরা বলছ, দুপুরটাই মাঠটাকে গিলে খেয়েছে
এ-দুটো গল্পই মাঠটাকে একটা চরিত্র বানায়, বকলমে প্রতীক…

#
এইসব টুকিটাকি কখনও ভায়োলেট রং হতে থাকে,
আমার পছন্দের ঘোড়া যেমন কোনোদিন রেস-কোর্সের মাঠ দেখেনি
তোমাদের ভালো-লাগাও কোনোদিন ঘোড়াটাকে লাগাম পরাতে দিল না
এ-সবকে আবার রূপক কিংবা প্রতীক বোলো না
আমাদের চেয়ে ঢের ভালো বলতে পারবে
সাঁকো, মাঠ, ঘোড়া আর চেতন-দূ্রবীন
আসলে তারা ঠিক কী!

উমাপদ কর। জন্ম ১৯৫৫, স্থান বহরমপুর, মুর্শিদাবাদ। বর্তমানে কলকাতাবাসী। পদার্থবিদ্যায় স্নাতক এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কর্মচারী ছিলেন। যৌথ সম্পাদনা: ‘শ্রাবস্তী’, কর্মী: ‘রৌরব’ ইত্যাদি লিটিল ম্যাগাজিন। অল্পদিনের জন্য হলেও একসময় পারফর্মিং আর্টের সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন। নাটক, থিয়েটার, আবৃত্তি, ভাবনাট্য, নৃত্যনাট্য। অংশগ্রহণ করতেন বিতর্ক,...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

কবুতর

কবুতর

অগ্নিকাণ্ড আমার চৌহদ্দিতে ধ্বংসস্তুপের ভীড় পুনর্বার নুয়ে পড়া অতীতের তীর জীবনের মাঝপথে রেখে যায় সম্পর্কের…..