উর্বশী চাঁদের হাট

মোকসেদুল ইসলাম
কবিতা
Bengali
উর্বশী চাঁদের হাট

উর্বশী চাঁদের হাট

পরম বিশ্বাসী বন্ধু আমার, হারিয়ে যাওয়ার আগে বিশ্বাস ভেঙ্গে দিয়ে যেও। উপেক্ষিত প্রণয়ের দিনে সাক্ষী থাকুক ভেজা মন, নষ্ট বুকখানি। তুমি তো চলেই গেছ, বিপন্ন ধারাপাতে জটিল হয়েছে জীবন। সন্তর্পণ আর্তনাদ করে উড়ে যায় যে পাখি তাঁর কাছে পৃথিবীটা বাসযোগ্য নয়। একজোড়া অন্ধকার চোখ চাই, দেখতে চাই ক্ষণে ক্ষণে বদলে যাওয়া রূপ। প্রকৃতির কাছে আমিও শিখছি উদার হতে— শোকেজে সাজিয়ে রেখেছি দুঃখ প্লেট, কষ্ট গ্লাস— ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাট। বুকের জমিনে সাজিয়ে রেখেছি শখের আসবাব। এখনতো শপিংমলেই কিনতে পাওয়া যায় দুরারোগ্য ব্যাধি— প্রেম সেও তো টুকরো কাচের বাসন। রাত শেষে নর্তকীরা সব মাতাল বেশে হাঁটে যে নগরে আমিও সেই নগরের বাসিন্দা হবো। তাদের সঙ্গে পাঁজর ভাঙ্গা নাচন নেচে সমস্ত জঞ্জাল বিকিয়ে দেবো উর্বশী চাঁদের হাটে।

যারা অন্ধ তারা জ্ঞানী

এইতো সময়। পৃথিবীর তলপেটে হাত ঢুকিয়ে বসে আছি আরামে। পাপের বোঝা মাথায় নিয়ে যারা পাড়ি দিয়েছে মহাকালের পথ আমি তাদের সঙ্গী হতে চেয়েছিলাম মাত্র। অথচ দীর্ঘশ্বাসের সুতোয় আমাকে বন্দি করে চলে গেছে দুরন্ত ঘোড়ার গতিতে। কেউ কেউ নাকি যৌবনের গন্ধে বদ্ধ মাতাল, তীব্র আঘাতে ভেঙ্গে দিতে চায় নারীর সাজানো নগর— বন্দর। শরীরের অলিগলি চষে বেড়াবে বলে নগ্ন পায়ে মাড়িয়ে যায় শিশির ভেজা সবুজ কুঁড়ি। যাদের দুচোখ অন্ধ তারা দেখি ভালই জ্ঞানী। সঙ সেজে সময়ের বৃত্তে বন্দি করে রাখে সব। আর আমরা কাঁপা হাতে কাঁচা ঘর বানাই। বুকের নদী ভাসিয়ে দেই তুচ্ছ ঘটনায়। খোলস পাল্টানো সরীসৃপের ন্যায় আমাদের দুরন্ত সাহস। বোধের দুয়ার বন্ধ করে দেখতে চাই শাশ্বত সূর্য রশ্মি।

নদী বংশের ইতিকথা

একদা আমিও নদী বংশের লোক ছিলাম।সার্কাস বালিকার নদীজলে ডুব দেয়া দেখে আটকাতে পারিনি কামশ্বাস। কোমরের ভাঁজে ভাঁজে ছিল তাঁর সন্ধির প্রস্তাব— উদ্ধত বুকের ঐতিহাসিক ডাক। আমি তো দিয়েছি সাড়া— চন্দ্রকলার ক্ষিপ্র আহ্বানে থামিয়ে দিয়েছে নদীর ঢেউ। এখনও পান করি মধু মিশ্রিত সেই জল— অচল মুদ্রায় সেরে নিচ্ছি নৈশভোজ। আমি নদী বংশের লোক ছিলাম। জলের ওপর ভেসে থাকা চাঁদের পেটে ঢুকিয়ে দিয়েছি মায়াবী মাছ। আমার নথিভুক্ত সব নারী— যারা কিনা নিয়মিত লীলাখেলায় মেতে উঠতো নদীর সাথে— তারা এখন বিগত যৌবনা বলে সব নাম কেটে দিয়েছি— ভাদরের ভরা সময়ে।

আমাদের পূর্বপুরুষ সাঁতার জানতেন না

আমাদের পূর্বপুরুষ ঘাতক ছিলেন কিনা সেই আলোচনায় আজ যাচ্ছি না। কিন্তু নিজেই বন্দি হয়ে আছি বয়স্ক ঘোড়ার মতো। বিকারগ্রস্তের ন্যায় বসে থাকা ছাড়া আর কোন নৈর্ব্যক্তিকতা নেই জীবনে। অথচ সূর্যস্পর্শ না করেই আমরা শুদ্ধ হতে চেয়েছিলাম। পূর্বপুরুষের আদর্শকে গুলি করে দূর করতে চেয়েছিলাম অন্ধকার। কোনো শৈল্পিক পদ্ধতিতে নয়, প্রচলিত রীতির বিরুদ্ধে যারা করছে আন্দোলন বৃক্ষের অঙ্কুরিত হওয়া থেকে ফলবান হওয়া পর্যন্ত একদিন তারাই উপেক্ষা করেছিল সব। পূর্বপুরুষ আগুন নিয়ে খেলতে ভালোবাসতেন অথচ ভুলে গিয়েছিলেন প্রজন্মের অস্থিরতা। জানতেন বীজ বুনে কীভাবে ছড়িয়ে দিতে হয় সংক্রামক ব্যাধি। দাঁড়িয়ে দেখছিলেন নর্তকীর দেহজ মুদ্রার নাচ, যে বংশ পরস্পরায় ছড়িয়ে পরা ব্যাধি নিয়ে নেচে চলেছে অপূর্ব ভঙ্গিতে। কোন কিছুই নাগালের বাইরে নয়। যা বের হয়ে আসছে সময়ের জরায়ু ছিঁড়ে সেটা শুধু নয় আগুনের লীলা। সমুদ্রের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকা পূর্বপুরুষের মুখটা ঘুরিয়ে নেয়া এখন অতীব জরুরী। কেননা জলে সাঁতার কাটার পদ্ধতিটা তাঁর জানা নেই।

একটা পাখি সমুদ্র দেখতে চেয়েছিল

সঙ্গম শেষে এইমাত্র যে লোকটি মারা গেল তার যুদ্ধের কৌশল জানা ছিল কী না সে প্রশ্নে আমরা যাচ্ছি না আর। ধরে নিতে পারি সে প্লেটোনিক প্রেমের ভুল শিকার। কেননা নিষিদ্ধ গন্ধমের দিকে পুরুষের হেঁটে আসার কারণই হলো নারী। পুরুষের পুরুষ হওয়াটা নির্ভর করে কিসে? সে প্রশ্নেও যাবো না এখন। আতা ফলের গন্ধ না নিয়ে যারা রাতের অন্ধকার পান করে দুরন্ত দাপটে, এখন না হয় তাদের কথা বলি। নরম হাতের তালুতে রাখা বিচিত্র সুখের কারসাজি। প্রার্থনারত পুরুষ এবার খুলে বসেছে পবিত্র সুখের দোকান। নরম পাখির পালকে লিখে রাখছে একটা নীল বিকেলের ইতিকথা। পানপাত্র ছাড়ো! যে পাখি সমুদ্র খুঁজে আমরা তাকে দেখাই নুড়ি পাথরের ভয়।

মোকসেদুল ইসলাম। জন্ম ১৬ সেপ্টেম্বর ১৯৮৪ তারিখে, বাংলাদেশের কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী উপজেলার নটানপাড়া গ্রামে। পড়াশোনা করেছেন ঢাকা কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্সসহ মাস্টার্স। ব্লগের মাধ্যমেই মূলত তাঁর কবিতার জগতে প্রবেশ। প্রকাশিত বই: 'জলছাপ মেঘ' (যৌথ কাব্যগ্রন্থ, ২০১৫)।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

কবুতর

কবুতর

অগ্নিকাণ্ড আমার চৌহদ্দিতে ধ্বংসস্তুপের ভীড় পুনর্বার নুয়ে পড়া অতীতের তীর জীবনের মাঝপথে রেখে যায় সম্পর্কের…..